বান্দরবানের
থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের পর্দ্দাঝিড়ির মুখে গত ৫৫ বছরেও নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী
সেতু। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে
নির্মিত বাঁশের সাঁকোই ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। জীবনের
ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন এই সাঁকো পারাপার হচ্ছেন শত শত গ্রামবাসী, শিক্ষার্থী ও পর্যটক।
দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী ঝুলন্ত সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। তবে জনপ্রতিনিধি
ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও এখনো মেলেনি কার্যকর উদ্যোগ।
সম্প্রতি
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ২ নম্বর তিন্দু ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত পর্দ্দাঝিড়ির
মুখে দুই পাশে সুউচ্চ পাথুরে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে গভীর পানির খুম। প্রায় ৪০০
ফুট দীর্ঘ এই জলপথ পদ্মমুখ বা পদ্মঝিড়ি নামেও পরিচিত। বর্ষা মৌসুমে প্রায় তিন মাস ইঞ্জিনচালিত
নৌকায় এবং বাকি নয় মাস স্থানীয়দের তৈরি বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হতে হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ
এই সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন পারাপার হচ্ছেন থাংলং ম্রো, অংথোয়াইপ্রু, রুনাজন, জিন্না ও
সত্যমনি পাড়াসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের বাসিন্দারা। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী,
নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ। পাশাপাশি বেলাখুম, আমিয়াখুমসহ আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতকারী
পর্যটকদেরও এই সাঁকো ব্যবহার করতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষ এই
সাঁকো দিয়ে চলাচল করেন।
রুনাজন
পাড়ার কারবারি সুজন ত্রিপুরা বলেন, প্রতিবছর নিজেদের উদ্যোগ ও অর্থায়নে বাঁশের সাঁকো
তৈরি করে ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের মানুষকে চলাচল করতে হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থী, বয়স্ক,
অসুস্থ মানুষ ও পর্যটক—সবাই
এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো ব্যবহার করেন। গত ১৫ বছর ধরে জনপ্রতিনিধিরা লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে
একটি স্থায়ী ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো সেই প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়িত হয়নি।
৪
নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উহ্লামং মারমা বলেন, পর্দ্দাঝিড়ির ওপারে ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের
পাশাপাশি বেলাখুম, আমিয়াখুম, জিন্না পাড়া ও রেমাক্রী খাল এলাকায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ
পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। এসব স্থানে যাতায়াতের প্রধান পথ এই বাঁশের সাঁকো। শুধু পর্যটন
নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্য আনা-নেওয়া এবং জুমের উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি
আরও বলেন, ২০২২ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই চেয়ারম্যানের কাছে লোহার
অ্যাঙ্গেলের একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণের আবেদন জানিয়ে আসছি। কিন্তু
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
সত্যমনি
ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা খুবাইতি ত্রিপুরা বলেন, গত বর্ষা মৌসুমে প্রবল পানির স্রোতে
দুই শিক্ষার্থী পানিতে ডুবে মারা গেছে। এমন দুর্ঘটনার পরও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা
না হওয়ায় এলাকাবাসী উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
তিন্দু
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভাগ্যচন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের টিআর, কাবিখা,
কাবিটা ও এলজিএসপি বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালার সীমাবদ্ধতা থাকায় এত বড় অবকাঠামো
প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ওই ঝিড়ির ওপর লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে ঝুলন্ত
সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। এটি নির্মাণে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ বিষয়ে
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে।
এ
বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) লামা উপজেলা প্রকৌশলী ও থানচি উপজেলার
অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবু হানিফ বলেন, পর্দ্দাঝিড়ির পাথুরে পাহাড়ের
মাঝখানে সম্পূর্ণ লোহার কাঠামো ব্যবহার করে একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। তবে
একাধিক উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় এখনো সরেজমিন পরিদর্শন করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনিক
কর্মকর্তাদের সঙ্গে সময় সমন্বয় করে তিনি এলাকা পরিদর্শনে যাবেন। পাশাপাশি সহকারী প্রকৌশলী
পাঠিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করে ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬
বান্দরবানের
থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের পর্দ্দাঝিড়ির মুখে গত ৫৫ বছরেও নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী
সেতু। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে
নির্মিত বাঁশের সাঁকোই ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা। জীবনের
ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন এই সাঁকো পারাপার হচ্ছেন শত শত গ্রামবাসী, শিক্ষার্থী ও পর্যটক।
দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী ঝুলন্ত সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। তবে জনপ্রতিনিধি
ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেও এখনো মেলেনি কার্যকর উদ্যোগ।
সম্প্রতি
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ২ নম্বর তিন্দু ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত পর্দ্দাঝিড়ির
মুখে দুই পাশে সুউচ্চ পাথুরে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে গভীর পানির খুম। প্রায় ৪০০
ফুট দীর্ঘ এই জলপথ পদ্মমুখ বা পদ্মঝিড়ি নামেও পরিচিত। বর্ষা মৌসুমে প্রায় তিন মাস ইঞ্জিনচালিত
নৌকায় এবং বাকি নয় মাস স্থানীয়দের তৈরি বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হতে হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ
এই সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন পারাপার হচ্ছেন থাংলং ম্রো, অংথোয়াইপ্রু, রুনাজন, জিন্না ও
সত্যমনি পাড়াসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের বাসিন্দারা। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী,
নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ। পাশাপাশি বেলাখুম, আমিয়াখুমসহ আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতকারী
পর্যটকদেরও এই সাঁকো ব্যবহার করতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষ এই
সাঁকো দিয়ে চলাচল করেন।
রুনাজন
পাড়ার কারবারি সুজন ত্রিপুরা বলেন, প্রতিবছর নিজেদের উদ্যোগ ও অর্থায়নে বাঁশের সাঁকো
তৈরি করে ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের মানুষকে চলাচল করতে হয়। কোমলমতি শিক্ষার্থী, বয়স্ক,
অসুস্থ মানুষ ও পর্যটক—সবাই
এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো ব্যবহার করেন। গত ১৫ বছর ধরে জনপ্রতিনিধিরা লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে
একটি স্থায়ী ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো সেই প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়িত হয়নি।
৪
নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য উহ্লামং মারমা বলেন, পর্দ্দাঝিড়ির ওপারে ১৫ থেকে ১৬টি গ্রামের
পাশাপাশি বেলাখুম, আমিয়াখুম, জিন্না পাড়া ও রেমাক্রী খাল এলাকায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ
পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। এসব স্থানে যাতায়াতের প্রধান পথ এই বাঁশের সাঁকো। শুধু পর্যটন
নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্য আনা-নেওয়া এবং জুমের উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি
আরও বলেন, ২০২২ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই চেয়ারম্যানের কাছে লোহার
অ্যাঙ্গেলের একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণের আবেদন জানিয়ে আসছি। কিন্তু
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
সত্যমনি
ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা খুবাইতি ত্রিপুরা বলেন, গত বর্ষা মৌসুমে প্রবল পানির স্রোতে
দুই শিক্ষার্থী পানিতে ডুবে মারা গেছে। এমন দুর্ঘটনার পরও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা
না হওয়ায় এলাকাবাসী উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
তিন্দু
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভাগ্যচন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের টিআর, কাবিখা,
কাবিটা ও এলজিএসপি বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালার সীমাবদ্ধতা থাকায় এত বড় অবকাঠামো
প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ওই ঝিড়ির ওপর লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে ঝুলন্ত
সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। এটি নির্মাণে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এ বিষয়ে
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে।
এ
বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) লামা উপজেলা প্রকৌশলী ও থানচি উপজেলার
অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবু হানিফ বলেন, পর্দ্দাঝিড়ির পাথুরে পাহাড়ের
মাঝখানে সম্পূর্ণ লোহার কাঠামো ব্যবহার করে একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। তবে
একাধিক উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় এখনো সরেজমিন পরিদর্শন করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনিক
কর্মকর্তাদের সঙ্গে সময় সমন্বয় করে তিনি এলাকা পরিদর্শনে যাবেন। পাশাপাশি সহকারী প্রকৌশলী
পাঠিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করে ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন