বেরোবিতে ক্রিকেট ম্যাচকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
রংপুরের
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) শারীরিক শিক্ষা বিভাগের আয়োজিত প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচকে কেন্দ্র করে এবার পাল্টা
অভিযোগ তুলেছে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত, অশালীন আচরণ ও বুলিংয়ের
অভিযোগ এনে শারীরিক শিক্ষা
বিভাগের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ
দায়ের করেছেন তারা।রবিবার
(১৯ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ
ও ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচে এ ঘটনা ঘটে।সোমবার
(২০ এপ্রিল) শারীরিক শিক্ষা বিভাগের পরিচালক বরাবর জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, ম্যাচ চলাকালে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আচরণে
তারা শারীরিক আঘাত, অশালীন আচরণ এবং বুলিংয়ের
শিকার হন।অভিযোগপত্রে
বলা হয়, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের
নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাটিংয়ের সময় ভূগোল ও
পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা অশালীন ভাষা ব্যবহার করে,
যার প্রেক্ষিতে আম্পায়ার দুইবার তাদের সতর্ক করেন।এছাড়া,
ম্যাচের এক পর্যায়ে পদার্থবিজ্ঞান
বিভাগের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হলে তাদের
শিক্ষার্থীরা আনন্দ প্রকাশ করে স্লোগান দেন—“জিতবে কে, জিতবে কে:
ফিজিক্স, ফিজিক্স। ক্যাম্পাসে কোনো টিম আছে
রে—ফিজিক্স।”অভিযোগ
অনুযায়ী, এ সময় ভূগোল
ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বোলার বর্ষা মেজাজ হারিয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দর্শকদের ‘টোকাই, ‘ছোটলোক' সহ বিভিন্ন অকথ্য
ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে মাঠ
ছেড়ে তাদের দিকে তেড়ে আসেন।
একই সময়ে মাঠের অন্য প্রান্ত থেকে
ভলান্টিয়ার আবির এসে পদার্থবিজ্ঞান
বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আলমগীরকে শারীরিকভাবে
আঘাত করেন। পুরো ঘটনার ভিডিও
ফুটেজ সংযুক্ত রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ
করা হয়।অভিযোগে
আরও বলা হয়, এরপর
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের শিক্ষার্থীরা মাঠের অন্যপ্রান্ত থেকে স্টাম্প, ব্যাট,
ইট ও গাছের ডাল
নিয়ে এসে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের
শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।এতে
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী
শাখিরার ঠোঁটে গভীর জখম হয়
বলে দাবি করা হয়।
এ বিষয়ে প্রেসক্রিপশনও রয়েছে বলে উল্লেখ করা
হয়। এছাড়া ১৫তম ব্যাচের এক
শিক্ষার্থীর কাঁধে এবং ১৩তম ব্যাচের
আরেক শিক্ষার্থীর কবজির পাশে গাছের ডালের
আঘাত লাগে।অভিযোগপত্রে
আরও বলা হয়, এ
অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে আঘাত করার জন্য
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহুয়া শবনম ব্যাট এগিয়ে
দেন।পরে
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের শিক্ষার্থীরা অকথ্য, অশ্লীল ও অবর্ণনীয় ভাষায়
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অব্যাহতভাবে
বুলিং করতে থাকেন বলেও
অভিযোগ করা হয়।মীমাংসার
জন্য দুই বিভাগের শিক্ষক,
শারীরিক শিক্ষা দপ্তর ও সংশ্লিষ্টরা আলোচনায়
বসলে অভিযোগ অনুযায়ী, সমাধানের পরিবর্তে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহুয়া শবনম প্রথমে পদার্থবিজ্ঞান
বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ফিমেল হ্যারাসমেন্টের মামলা এবং বিভাগকে দুই
বছরের জন্য সব ধরনের
টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কারের দাবি
তোলেন।এছাড়া,
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
মো. মোশারফুজ রহমান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষককে অকথ্য
ও অশালীন ভাষায় অপমান করেন বলেও অভিযোগে
উল্লেখ করা হয়।অভিযোগকারীরা
জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শালীনতা ও মার্জিত চিন্তাধারার
চর্চার সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড সামঞ্জস্যপূর্ণ
নয়। তাদের কাছে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর
ভিডিও ও ছবিসহ প্রমাণ
রয়েছে এবং প্রয়োজনে তা
উপস্থাপন করা হবে।এ অবস্থায় উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক
ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের
কাছে আবেদন জানিয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা।এর আগে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের
শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ইভটিজিং, বুলিং ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির
লিখিত অভিযোগ দেন ভূগোল ও
পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী।অভিযোগপত্রে
ওই নারী শিক্ষার্থী উল্লেখ
করেন, ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারে বল করার সময়
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দর্শকদের পক্ষ থেকে তিনি
অকথ্য স্লেজিং, বুলিং ও হ্যারাসমেন্টের শিকার
হন। বিষয়টি আম্পায়ারকে জানালে তিনি বলেন, “স্লেজিং
খেলার অংশ, তুমি খেলা
চালিয়ে যাও।”তিনি
আরও জানান, চতুর্থ ওভারের চতুর্থ বলে কৃষ্ণচূড়া রোডসংলগ্ন
বাউন্ডারির পাশে অবস্থানরত মতিউর,
মিঠুসহ কয়েকজন তাকে উদ্দেশ্য করে
অকথ্য ভাষায় বুলিং, বডি শেমিং, ইভটিজিং
ও ফিমেল হ্যারাসমেন্ট করেন। একপর্যায়ে উচ্চস্বরে বলা হয়, “আম্পায়ারের
বোলারকে পছন্দ হয়েছে”, যা আম্পায়ারের নজরে
আসে এবং তিনি তাদের
সতর্ক করেন।অভিযোগে
আরও বলা হয়, এরপরও
ব্যক্তিগতভাবে নানা অশোভন মন্তব্য
করা হয়। প্রতিবাদ করলে
মিত্তির নামের এক শিক্ষার্থী তাকে
মারতে তেড়ে আসে এবং হুমকি
দিয়ে বলে, “আমাকে চিনিস, আমি কে?” পরিস্থিতি
উত্তপ্ত হলে তার টিমমেট
ও সহপাঠীরা এগিয়ে এলে তাদের ওপর
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা হামলা চালায় এবং কয়েকজন আহত
হন।খেলা
পুনরায় শুরু করা যাবে
কি না, সে বিষয়ে
আলোচনা চলাকালে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. বকুল কুমার
চক্রবর্তী ক্ষিপ্ত হয়ে স্ট্যাম্প তুলে
মাঠে ছুড়ে ফেলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ
করা হয়।এ সময় ভূগোল ও
পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মহুয়া শবনম পরিস্থিতি শান্ত
করার চেষ্টা করলে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের
শিক্ষক তানিয়াও তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক
আচরণ করেন বলে অভিযোগ
ওঠে।অভিযোগপত্রে
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী র্যাগিং, বুলিং,
ফিমেল হ্যারাসমেন্ট, বডি শেমিং ও
ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।অভিযোগকারী
জানান, ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান
বিভাগের নারী দল পরবর্তী
কোনো ম্যাচে অংশ নেবে না।
পাশাপাশি, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগকে টুর্নামেন্টের সব ধরনের খেলা
থেকে বিরত রাখা এবং
বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন ও
নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের মাধ্যমে তদন্ত করার দাবিও জানানো
হয়।সার্বিক
বিষয়ে জানতে চাইলে শারীরিক শিক্ষা বিভাগের পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন
বলেন, আমরা দুইটি অভিযোগপত্রই
পেয়েছি। কিন্তু আমরা বিচার করার
আগেই আপনারা সাংবাদিকরা এর বিচার করে
দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সুনাম তো
আছে।
এএমএন/ধ্রুবকন্ঠ