হুতি, ইরান ও ট্রাম্প : যুদ্ধ-সমীকরণে মধ্যপ্রাচ্য
জায়নবাদী চক্রান্তে ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান আক্রমণ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা আগেই জিইয়ে রেখেছে। যদিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ উত্তপ্ত করে রেখেছে বিশ্ববাসীকে। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা বিশ্বমোড়লদের জিজ্ঞাসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যু্দ্ধ ছড়িয়ে পড়া থেকে দুনিয়া মুক্তি পাবে।এমন সময়ে হুতিদের আক্রমণে দিশেহারা সৌদি সরকার। যদিও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনার অযোগ্যতাই এমন সমস্যা তৈরি করেছে।মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন আর কেবল দুটি রাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত নয়। এটি ক্রমেই পরিণত হচ্ছে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার লড়াইয়ে। সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের হামলা এবং রাজধানী রিয়াদে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশিসহ কয়েকজনের প্রাণহানির খবর এই সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ঘটনাটি তাই শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; বাংলাদেশের নাগরিকদের জীবন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে।ভূরাজনীতির সমীকরণকৃত প্রশ্ন, হুতিরা কি নিজেদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে হামলা চালাচ্ছে, নাকি ইরান তাদের ব্যবহার করে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করছে? বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে অস্থিতিশীল করে কি হরমুজ প্রণালির মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথকে বৈশ্বিক রাজনীতির দর-কষাকষির অস্ত্রে পরিণত করা সম্ভব? আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযান চালান, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য কি এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, যার পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করা ওয়াশিংটনের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে উঠবে? অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের এখনকার যুদ্ধ আর মার্কিন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেই। এখানে পাকিস্তান, চীন ও রাশিয়াও একটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে ইরানের অনুকূলে। অস্থির এসময়ে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগকে পাশ কাটিয়ে ভূরাজনীতি, সামরিক সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।সৌদি আরবে হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক নতুন পরীক্ষা। সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্য তথা দুনিয়াজুড়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক (পাকিস্তান ও তুরস্কের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি এবং মার্কিন পূর্ণ সমর্থন) শক্তি। দেশটির রাজধানী রিয়াদ, বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলো শুধু সৌদি রাষ্ট্রের সম্পদ নয়; এগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে এসব স্থাপনাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা হলে তার প্রভাব সৌদি আরবের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না।গত কয়েকদিন আগেকার হামলা ও প্রাণহানির খবরের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং দেশটি ভবিষ্যতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মতো তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী শক্তিশালী রাষ্ট্রকেও প্রতিরক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করতে পারে। আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় বাস্তবতা হলো—আক্রমণকারীর জন্য যে অস্ত্র তুলনামূলক সস্তা, তা প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষাকারীকে অনেক বেশি ব্যয় করতে হতে পারে। যুদ্ধের এসকল সমীকরণ বিশ্বব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে বাধ্য।তবে রিয়াদে হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু, হতাহতের সংখ্যা, হামলাকারীর পরিচয় এবং হুতিদের দায় স্বীকারের তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো হামলার পেছনে ইরানের সরাসরি নির্দেশ ছিল—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছাতে হলে আলাদা প্রমাণ দরকার। বিশ্লেষণের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে এই পার্থক্যগুলো বজায় রাখার ওপর। কেননা, জায়নবাদী ইজরাইল মধ্যেপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করতে অনেক নাটক মঞ্চস্থ করে।তাছাড়া আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, হুতিরা কি ইরানের হাতিয়ার? ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন, আনসার আল্লাহ নামে পরিচিত, দেশটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী হয়েছে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আন্দোলনটি ইয়েমেনের ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রধান পক্ষ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনীতির অংশে পরিণত হয়। ইয়েমেনের মাত্র ২০শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী সরকারকে সৌদি আরব ও মার্কিন সরকার সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য ইরানের সাথে হুতিদের রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে বলে বহু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বৃহত্তর নেটওয়ার্কে হুতিদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তবে হুতিদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তেহরান থেকে আসে—এমন ধারণা অতিসরলীকরণ হবে। ইয়েমেনের নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা, হুতিদের নেতৃত্বের হিসাব এবং স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বও তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তারপরও ইরানের জন্য হুতিদের কৌশলগত গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। ইরানের ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থিত একটি সশস্ত্র শক্তি সৌদি আরবের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীকে চাপে রাখতে পারলে তেহরান সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়েও আঞ্চলিক সমীকরণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এতে সৌদিকে প্রতিরক্ষায় ব্যয় বাড়াতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তা সহায়তা দিতে হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এই কৌশলকে বলা যায় পরোক্ষ চাপ প্রয়োগের রাজনীতি। কিন্তু কৌশলগত সুবিধা আর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়। হুতিদের কোনো হামলা যদি বড় ধরনের সৌদি বা মার্কিন প্রতিশোধ ডেকে আনে, তবে তার ক্ষতি ইরানের স্বার্থেও লাগতে পারে।সমু্দ্র পথ 'বাব আল-মান্দেব' অনেকটা হরমুজের মতো আরেকটি কৌশলগত ফটক। মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ নিয়ে আলোচনায় সাধারণত হরমুজ প্রণালি বেশি গুরুত্ব পায়। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এই ভৌগোলিক অবস্থানকে দীর্ঘদিন ধরে তার কৌশলগত গুরুত্বের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। অন্যদিকে, ইয়েমেন ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচলকারী বহু বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই এলাকায় হামলা বা নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে জাহাজকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলতে হতে পারে, বাড়তে পারে পরিবহন ব্যয়, বিমার খরচ ও পণ্য সরবরাহে বিলম্ব।এখানেই হুতিদের সামরিক তৎপরতার আন্তর্জাতিক তাৎপর্য। তারা বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারলে তার প্রভাব সৌদি আরবের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা চাপে পড়ে। তবে বাব আল-মান্দেবকে হরমুজের হুবহু বিকল্প বলা ঠিক হবে না। দুটি প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্যিক ভূমিকা ও সামরিক বাস্তবতা আলাদা। হুতিরা এ অঞ্চলে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কিন্তু পুরো প্রণালি স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আন্তর্জাতিক নৌচলাচল বন্ধ করে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সামরিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ইরান ও হুতিদের সম্ভাব্য কৌশলগত লাভ এখানেই—প্রণালি পুরোপুরি দখল না করেও নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা তৈরি করা যায়। কিন্তু এই চাপ যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা জোট ও সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও তত বাড়বে।নতুন প্রশ্ন, বিশ্ব মোড়ল ট্রাম্প এতো চাপে পড়ে কি ইরানে ‘বোমার জনক বোমা’ ফেলবেন? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে ইরান প্রশ্নে একাধিক পথ রয়েছে। তিনি কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সীমিত সামরিক অভিযান কিংবা বৃহত্তর আক্রমণের পথ বেছে নিতে পারেন। কোন পথ নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে মার্কিন স্বার্থ, গোয়েন্দা মূল্যায়ন, মিত্রদের অবস্থান এবং সম্ভাব্য প্রতিশোধের মাত্রার ওপর। যদিও তা যতটা বলা সহজ, ততটা কঠিন সমীকরণ। এ প্রসঙ্গে ‘বোমার জনক বোমা’ বলে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের জিবিইউ-৪৩/বি, অর্থাৎ এমওএবি (MOAB) নিয়ে আলোচনা হয়। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রচলিত বিস্ফোরক বোমা—যা পারমাণবিক অস্ত্র নয়। ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র এটি ব্যবহার করেছিল। কিন্তু এই অস্ত্রকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করলেই দেশটির সামরিক সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে—এমন ধারণার বাস্তব ভিত্তি নেই। এমন অস্ত্র ব্যবহার করেও মার্কিন সরকার লেজ ঘুটিয়ে আফগান থেকে বিদায় নিয়েছে।ইরান একটি বৃহৎ তথা বিস্তৃত ভূখণ্ডের দেশ। এর সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সামরিক সম্পদকে একটি মাত্র অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। বড় বোমার ব্যবহার সাময়িক সামরিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু তা রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত করে না। বরং ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের হামলা হলে তেহরান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। ইজরাইল, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা, জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক অংশীদাররা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সংঘাতের বিস্তার ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু হামলার সামরিক সাফল্য নয়, পরবর্তী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও বিবেচনা করতে হবে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধ বৃহৎ আকার ধারণ করলে ইজরাইলের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। ট্রাম্পের সামনে প্রশ্নটি শুধু কত শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করা সম্ভব, তা নয়; বরং সেই হামলার পর কী ঘটবে এবং যুদ্ধের শেষ কোথায় হবে।সাধারণ জনগণের প্রশ্ন, ইরান কি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস করতে পারবে? ইরানের পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করতে হলে দুটি বিষয় আলাদা করা প্রয়োজন: আঘাত হানার সক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের সব সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার সক্ষমতা। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ধ্বংস করে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি হলেও, এটা নিশ্চিত যে মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন সকল ঘাটি নিসন্দেহে ধ্বংস হবে। এবং সৌদি, কাতার, জর্ডান, আরব আমিরাতের জনগণের ভাগ্যে ধ্বংসলীলা নিজ চোখে দেখার সুযোগ করে দিবে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি একাধিক দেশে বিস্তৃত। এসব স্থাপনার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, বিমানশক্তি ও মিত্রদেশগুলোর সহযোগিতা যদিও রয়েছে। অন্যদিকে, কোনো বড় যুদ্ধ হলে ইরানের সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এখানে বিপজ্জনক বিষয় হলো, দুই পক্ষই প্রতিপক্ষকে বড় ক্ষতি করতে পারলেও কেউ সহজে নিশ্চিত বিজয় অর্জন করতে পারবে না। ফলে সীমিত প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া সংঘাত ধাপে ধাপে বিস্তৃত যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। একটি হামলার জবাবে আরেকটি হামলা, তার পর আরও বড় প্রতিশোধ—এই চক্রই আঞ্চলিক যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।আজকের দিনে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের উদ্বেগ এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব বাংলাদেশে সরাসরি অনুভূত হতে পারে। প্রথমত, সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। সেখানে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে তাঁদের জীবন, কর্মসংস্থান ও পরিবারের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। রিয়াদে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানির খবর তাই আমাদের জন্য নিছক আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়; এটি মানবিক ও জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়লে তেলের দাম, জাহাজের বিমা, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এর প্রভাব জ্বালানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর পড়তে পারে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে ইউরোপমুখী বাণিজ্যের সময় ও খরচও বাড়তে পারে।তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে হবে। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও ধর্মীয় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ; আবার আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নাগরিকদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কোনো পক্ষের সামরিক অভিযানের অন্ধ সমর্থনের বদলে আন্তর্জাতিক আইন, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে অবস্থান নেওয়া উচিত।বাংলাদেশ সরকারের উচিত মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত নাগরিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা, দূতাবাসের জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা এবং হতাহত বা নিখোঁজ হওয়ার খবর দ্রুত যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে প্রবাসীদের নিরাপত্তা, প্রয়োজনে সহায়তা এবং দেশে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এ যুদ্ধ রাজনীতি নয়, প্রয়োজন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করা। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ভুল হবে প্রতিটি হামলাকে একটি বৃহত্তর যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী সূচনা হিসেবে ধরে নেওয়া। একইভাবে, হুতিদের প্রতিটি পদক্ষেপকে ইরানের সরাসরি নির্দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সামরিক হুমকিকে আসন্ন সর্বাত্মক যুদ্ধের নিশ্চিত সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করাও যথার্থ নয়। কিন্তু এসব সম্ভাবনাকে অবহেলা করার সুযোগও নেই। ইরান যদি আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তবে তার প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটন আরও কঠোর সামরিক অবস্থান নিতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে দ্রুত নতি স্বীকার করানো সম্ভব, তবে সেই হিসাবও ভুল প্রমাণিত হবে। সামরিক শক্তি প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করতে পারে না—ইতিহাসে এর বহু নজির রয়েছে।সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল নিরাপদ রাখা—এই চারটি বিষয় পরস্পর সম্পর্কিত। একটিকে অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে সমস্যার সমাধান কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সামনে এখন দুটি পথ: প্রতিশোধের পাল্টাপাল্টি চক্রে আরও গভীরে প্রবেশ করা, অথবা সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনীতিকে কার্যকর করা। প্রথম পথের ফল হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা এবং সাধারণ মানুষের আরও দুর্ভোগ। দ্বিতীয় পথ কঠিন, কিন্তু সেটিই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বেশি যুক্তিসংগত। হুতিদের হামলা, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আজ এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এখানে কোনো পক্ষের সামরিক সাফল্যকে চূড়ান্ত বিজয় ধরে নেওয়া যাবে না। কারণ একটি ক্ষেপণাস্ত্র সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে, একটি বোমা অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে; কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারিত হয় তার চেয়ে অনেক বড় রাজনৈতিক বাস্তবতায়।আটশত কোটি মানবের এ বিশ্বের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, কে কাকে কত বড় আঘাত করতে পারে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কোনো পক্ষ কি এমন এক সংঘাত শুরু করে বসবে, যার পরিণতি আর কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না? বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর স্বার্থেই এই প্রশ্নের উত্তর যুদ্ধের ভাষায় নয়, কূটনীতি, সংযম ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। যদিও গত কয়েকদিন আগে পবিত্র নগরী মক্কায় একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুজন বাংলাদেশি নর-নারীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হলেও এদেশের দূতাবাস কিছুই জানত না। তাই বলব, প্রধানমন্ত্রী কি দিয়ে দুপুরের খাওয়ার খেয়েছেন এটি জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, জনগণের জন্য তিনি কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মানে ব্যস্ত —তা কিন্তু জরুরি ও অতিব গুরুত্বপূর্ণ।আসাদ পারভেজ লেখক : ভূরাজনীতির গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক
৫ ঘন্টা আগে