ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল, এসএসসির ফল বিপর্যয়

থানচিতে চার বিদ্যালয়ে ২০৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস ৫২, জিপিএ-৫ শূন্য



থানচিতে চার বিদ্যালয়ে ২০৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস ৫২, জিপিএ-৫ শূন্য
ছবি: অনুপম মারমা

দুর্গম পাহাড়ি জনপদ উপজেলা বান্দরবানের থানচিতে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

উপজেলার একটি কেন্দ্রে চারটি বিদ্যালয়ের মোট ২০৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২০৩ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৫২ জন। সর্বোচ্চ অর্জিত জিপিএ ৪.০০ হলেও কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ।

গত বছরের তুলনায় এবার থানচিতে পাসের হার প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা সীমাবদ্ধতা, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির অভাব এবং অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাকে ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

থানচি উপজেলার চারটি বিদ্যালয়ের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেছে থানচি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের ৬২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৪২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

অন্যদিকে বলীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৫ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করেছে মাত্র ১০ জন। বিদ্যালয়টির পাসের হার প্রায় ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।

থানচি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৪ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। উত্তীর্ণ হয়েছে ১৫ জন। পাসের হার প্রায় ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ।

সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে দুর্গম রেমাক্রী উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র একজন। পাসের হার ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

অনিয়মিত শিক্ষার্থীরাই বড় চ্যালেঞ্জ

ফল বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর মোহাম্মদ বলেন, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শুধু ফরম পূরণের সময় বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফরম পূরণের পর পুরো একটি বছর তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। ফলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ তৈরি হয় না।

তিনি বলেন, “অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা ফরম ফিলাপ করে একটি বছর কোনো প্রকার স্কুলগামী না থাকায় শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকে না। এর প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলে পড়েছে।

অভিভাবকদের প্রত্যাশা, নিয়মিত পাঠদান

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক স্থানীয় অভিভাবকদের কয়েকজন মনে করেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষার মান উন্নয়নে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের মতে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নিয়মিত ও গুরুত্ব দিয়ে পাঠদান করায় সেখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

তবে সরকারি-বেসরকারি বিভাজনের বাইরে উপজেলার চারটি বিদ্যালয়েই শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের মান উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন অভিভাবকেরা। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়মুখী করা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর দাবি তাঁদের।

দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার সংকট

থানচির বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় অনেক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে যাতায়াতই বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়, আবার বর্ষাকালে পাহাড়ি সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষক সংকট, নিয়মিত উপস্থিতির সমস্যা, অভিভাবকদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ক্যহ্লাচিং মারমা মতে এসব বাস্তবতায় শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় দেওয়া নয়, বরং কেন তারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারছে নাতা খুঁজে বের করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

সাবেক এ চেয়ারম্যানের  মতে, থানচির শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘুরে দাঁড় করাতে বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ, দুর্বল বিষয়ে অতিরিক্ত পাঠদান, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিয়মিত করার উদ্যোগ, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।

এসএসসির ফলাফলে থানচির এই চিত্র পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে। এখন ফল বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী দিনেও দুর্গম পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

 

 

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

বিষয় : এসএসসি থানচি দুর্গম পাহাড় শিক্ষা ব্যবস্থা

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬


থানচিতে চার বিদ্যালয়ে ২০৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস ৫২, জিপিএ-৫ শূন্য

প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দুর্গম পাহাড়ি জনপদ উপজেলা বান্দরবানের থানচিতে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

উপজেলার একটি কেন্দ্রে চারটি বিদ্যালয়ের মোট ২০৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২০৩ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৫২ জন। সর্বোচ্চ অর্জিত জিপিএ ৪.০০ হলেও কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ।

গত বছরের তুলনায় এবার থানচিতে পাসের হার প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা সীমাবদ্ধতা, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির অভাব এবং অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাকে ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

থানচি উপজেলার চারটি বিদ্যালয়ের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেছে থানচি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের ৬২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৪২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

অন্যদিকে বলীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৫ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করেছে মাত্র ১০ জন। বিদ্যালয়টির পাসের হার প্রায় ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।

থানচি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৪ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। উত্তীর্ণ হয়েছে ১৫ জন। পাসের হার প্রায় ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ।

সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে দুর্গম রেমাক্রী উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র একজন। পাসের হার ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

অনিয়মিত শিক্ষার্থীরাই বড় চ্যালেঞ্জ

ফল বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর মোহাম্মদ বলেন, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শুধু ফরম পূরণের সময় বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফরম পূরণের পর পুরো একটি বছর তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। ফলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ তৈরি হয় না।

তিনি বলেন, “অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা ফরম ফিলাপ করে একটি বছর কোনো প্রকার স্কুলগামী না থাকায় শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকে না। এর প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলে পড়েছে।

অভিভাবকদের প্রত্যাশা, নিয়মিত পাঠদান

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক স্থানীয় অভিভাবকদের কয়েকজন মনে করেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষার মান উন্নয়নে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের মতে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নিয়মিত ও গুরুত্ব দিয়ে পাঠদান করায় সেখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

তবে সরকারি-বেসরকারি বিভাজনের বাইরে উপজেলার চারটি বিদ্যালয়েই শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের মান উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন অভিভাবকেরা। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়মুখী করা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর দাবি তাঁদের।

দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার সংকট

থানচির বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় অনেক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে যাতায়াতই বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়, আবার বর্ষাকালে পাহাড়ি সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষক সংকট, নিয়মিত উপস্থিতির সমস্যা, অভিভাবকদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ক্যহ্লাচিং মারমা মতে এসব বাস্তবতায় শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় দেওয়া নয়, বরং কেন তারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারছে নাতা খুঁজে বের করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

সাবেক এ চেয়ারম্যানের  মতে, থানচির শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘুরে দাঁড় করাতে বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ, দুর্বল বিষয়ে অতিরিক্ত পাঠদান, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিয়মিত করার উদ্যোগ, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।

এসএসসির ফলাফলে থানচির এই চিত্র পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে। এখন ফল বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী দিনেও দুর্গম পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

 

 

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত