উঁচু রাস্তার নিচে দুই পাশের ঢালু জায়গায় ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে একদল মানুষ। নানা স্থান থেকে, নানা সময়ে এই মানুষগুলো
এই দঙ্গলে জড়ো হয়েছিল। ‘এই হিম হিম হাওয়া পরশা’র কৃষ্ণপক্ষের
আলো-আঁধারিতে ছাওয়া জায়গাটিতে কেউ বলতে পারবে না—এরা কোথায় যাচ্ছিল। তবে এদের গন্তব্য যদি একটি স্টেশন আগেও হতো, তাহলে এরা এই অবস্থায়
পড়ে থাকত না।
নতুন ধান আর খড়ের গন্ধে চারদিকের বাতাস আমোদিত। নগরায়ণের আগ্রাসনের পরও এরকম প্রায় পরিত্যক্ত স্থান রয়েছে দেশের কোনো কোনো স্থানে। তাই, কোনো অপরাধ ঘটার কিছুক্ষণ পরও আলামতগুলি অবিকৃত থাকে। আশপাশের সবচেয়ে কাছের গ্রামটিও আধমাইল দূরে। কেবল একটি বিকট ধাতব শব্দই তাদের কারো কারো কানে পৌঁছেছিল, তাই কেউ এখনো এখানে এসে পৌঁছেনি। যে মধ্যবয়স্ক
মানুষটি উপুড় হয়ে পড়ে ছিল, তার পরনে এই শীতেও একখানি সাদা ধুতি। ওপরে সোয়েটার। মানুষটার নাম কী? হয়তো খগেন বা দয়ারাম।
না, দয়ারাম নামটায় ঠিক বাঙালিয়ানার গন্ধ নেই। হয়তো তার নাম সুরেন্দ্রনাথ বা সুনীল কর্মকার। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটি পুরোনো, তবে দামি। ওতে নানা জিনিসের সঙ্গে একটি সোনার আংটি আছে। আংটিটির ঘের একেবারে ছোট। কে জানে হয়তো এই প্রৌঢ় তার কোনো নাতনিকে দেখতে যাচ্ছিলেন। খেতের ধান কেটে নেওয়ার পর যেরকম ধানের গোড়া রয়ে যায়, তেমনি শক্ত কিছু গুল্ম। তার ওপর দুই জন পুরুষ মানুষ পড়ে আছে। তাদের পরনে মলিন লুঙ্গি, আর পুরোনো
সোয়েটার। পায়ে সস্তা রবারের চপ্পল। গায়ে বালি আর মাটির গুঁড়ো লেগে আছে। বয়স ত্রিশের নিচে হবে। এদের সঙ্গে কোদাল ছিল। সেগুলো কোথায় যেন ছিটকে গেছে। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এদের এই বিপত্তি।
সুরুজ আলী নামের লোকটার সঙ্গে একটা টিফিন ক্যারিয়ার ছিল। ওতে ছিল দুপুরের খাবারের অবশিষ্ট।
ডোবায় পড়ে রয়েছে একটা শিশুর লাশ। শিশুটির জিন্সের হাফ-প্যান্টটি দামি। জাম্প কেড্সটি নতুন। ফর্সা ও স্বাস্থ্যভরা
মুখ দেখে বোঝা যায়, ভালো খেয়েদেয়ে শিশুটি বড় হচ্ছিল।
সঙ্গে ছিল মামা, সে বাসের ভেতর এখনো আটকে আছে।
বোরকাওয়ালি এত রাতে কোথায় যাচ্ছিল? এ-ও একজন শ্রমজীবী। ইট বা মাটি টানা না হলেও কাজটি হলো ঠিকানাবিহীন একটি ওষুধ কোম্পানির লিফলেট বিনা মূল্যে মানুষকে দেওয়া। এসব লিফলেটে জটিল, কঠিন ও পুরোনো
রোগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে মানবকুলের হেন ব্যাধি নেই, যার নিরাময়ের ওষুধের কথা বলা হয় না। ল্যামিনটেড আইডি কার্ডয়ের আদলে কিংবা নিউজপ্রিন্টের ওপর ছাপানো এই প্রচারপত্রটিতে
শক্তি ও সৌর্যবীর্যের
চিহ্ন হিসেবে অনেক সময় কুমির বা লম্ফমান
ঘোড়ার ছবিও শোভা পায়। ছাইদানের ছাই, আমলকী, বহেরা, ভুজপাতা, বাইন্যা আদা ও অন্যান্য
মহাভেষজ থেকে শুরু করে সর্বশেষ অ্যালোপ্যাথিকে নাকচ করে দিয়ে এই প্রচারপত্রে
দাবি করা হয়—এগুলো রোগ নিরাময়ে অব্যর্থ। এই মেয়েটির
কাজ ছিল সব ধরনের যানবাহনের দরজা-জানালা এবং অন্য যে কোনো ছিদ্রপথে এই প্রচারপত্রটি
যত বেশি সম্ভব, বর্তমান ও ভবিষ্যত্
রোগীর হাতে পৌঁছে দেওয়া, তথা নিক্ষেপ করা। আজও মেয়েটি পাঁচ শ প্রচারপত্র
যথাস্থানে নিক্ষেপ করে ‘প্রচারেই প্রসার’—দর্শন বাস্তবায়নের কাজে ভূমিকা রেখে দিনশেষে বাড়ি ফিরছিল।
মেয়েটির সামনে একটা তরল পদার্থ শকটের মেঝেকে আঠাল করে রেখেছে। পাশেই একটা বালতি উলটে আছে। যে প্রৌঢ় মানুষটি এই তরল পদার্থের মালিক, তার নাম হারাধন। এই দুধটুকু
আজ বিক্রি করতে পারেনি। তবে সত্তর টাকা মূল্যের এই দ্রব্যটুকু
ফেরত নিয়ে বাড়ি আসার পথে তার অমূল্য প্রাণটুকু খোয়া গেছে। হারাধনের নাক ও দাঁত থেঁতলে সামনের সিটের পেছনের অংশের সঙ্গে লেগে আছে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
উঁচু রাস্তার নিচে দুই পাশের ঢালু জায়গায় ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে একদল মানুষ। নানা স্থান থেকে, নানা সময়ে এই মানুষগুলো
এই দঙ্গলে জড়ো হয়েছিল। ‘এই হিম হিম হাওয়া পরশা’র কৃষ্ণপক্ষের
আলো-আঁধারিতে ছাওয়া জায়গাটিতে কেউ বলতে পারবে না—এরা কোথায় যাচ্ছিল। তবে এদের গন্তব্য যদি একটি স্টেশন আগেও হতো, তাহলে এরা এই অবস্থায়
পড়ে থাকত না।
নতুন ধান আর খড়ের গন্ধে চারদিকের বাতাস আমোদিত। নগরায়ণের আগ্রাসনের পরও এরকম প্রায় পরিত্যক্ত স্থান রয়েছে দেশের কোনো কোনো স্থানে। তাই, কোনো অপরাধ ঘটার কিছুক্ষণ পরও আলামতগুলি অবিকৃত থাকে। আশপাশের সবচেয়ে কাছের গ্রামটিও আধমাইল দূরে। কেবল একটি বিকট ধাতব শব্দই তাদের কারো কারো কানে পৌঁছেছিল, তাই কেউ এখনো এখানে এসে পৌঁছেনি। যে মধ্যবয়স্ক
মানুষটি উপুড় হয়ে পড়ে ছিল, তার পরনে এই শীতেও একখানি সাদা ধুতি। ওপরে সোয়েটার। মানুষটার নাম কী? হয়তো খগেন বা দয়ারাম।
না, দয়ারাম নামটায় ঠিক বাঙালিয়ানার গন্ধ নেই। হয়তো তার নাম সুরেন্দ্রনাথ বা সুনীল কর্মকার। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটি পুরোনো, তবে দামি। ওতে নানা জিনিসের সঙ্গে একটি সোনার আংটি আছে। আংটিটির ঘের একেবারে ছোট। কে জানে হয়তো এই প্রৌঢ় তার কোনো নাতনিকে দেখতে যাচ্ছিলেন। খেতের ধান কেটে নেওয়ার পর যেরকম ধানের গোড়া রয়ে যায়, তেমনি শক্ত কিছু গুল্ম। তার ওপর দুই জন পুরুষ মানুষ পড়ে আছে। তাদের পরনে মলিন লুঙ্গি, আর পুরোনো
সোয়েটার। পায়ে সস্তা রবারের চপ্পল। গায়ে বালি আর মাটির গুঁড়ো লেগে আছে। বয়স ত্রিশের নিচে হবে। এদের সঙ্গে কোদাল ছিল। সেগুলো কোথায় যেন ছিটকে গেছে। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এদের এই বিপত্তি।
সুরুজ আলী নামের লোকটার সঙ্গে একটা টিফিন ক্যারিয়ার ছিল। ওতে ছিল দুপুরের খাবারের অবশিষ্ট।
ডোবায় পড়ে রয়েছে একটা শিশুর লাশ। শিশুটির জিন্সের হাফ-প্যান্টটি দামি। জাম্প কেড্সটি নতুন। ফর্সা ও স্বাস্থ্যভরা
মুখ দেখে বোঝা যায়, ভালো খেয়েদেয়ে শিশুটি বড় হচ্ছিল।
সঙ্গে ছিল মামা, সে বাসের ভেতর এখনো আটকে আছে।
বোরকাওয়ালি এত রাতে কোথায় যাচ্ছিল? এ-ও একজন শ্রমজীবী। ইট বা মাটি টানা না হলেও কাজটি হলো ঠিকানাবিহীন একটি ওষুধ কোম্পানির লিফলেট বিনা মূল্যে মানুষকে দেওয়া। এসব লিফলেটে জটিল, কঠিন ও পুরোনো
রোগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে মানবকুলের হেন ব্যাধি নেই, যার নিরাময়ের ওষুধের কথা বলা হয় না। ল্যামিনটেড আইডি কার্ডয়ের আদলে কিংবা নিউজপ্রিন্টের ওপর ছাপানো এই প্রচারপত্রটিতে
শক্তি ও সৌর্যবীর্যের
চিহ্ন হিসেবে অনেক সময় কুমির বা লম্ফমান
ঘোড়ার ছবিও শোভা পায়। ছাইদানের ছাই, আমলকী, বহেরা, ভুজপাতা, বাইন্যা আদা ও অন্যান্য
মহাভেষজ থেকে শুরু করে সর্বশেষ অ্যালোপ্যাথিকে নাকচ করে দিয়ে এই প্রচারপত্রে
দাবি করা হয়—এগুলো রোগ নিরাময়ে অব্যর্থ। এই মেয়েটির
কাজ ছিল সব ধরনের যানবাহনের দরজা-জানালা এবং অন্য যে কোনো ছিদ্রপথে এই প্রচারপত্রটি
যত বেশি সম্ভব, বর্তমান ও ভবিষ্যত্
রোগীর হাতে পৌঁছে দেওয়া, তথা নিক্ষেপ করা। আজও মেয়েটি পাঁচ শ প্রচারপত্র
যথাস্থানে নিক্ষেপ করে ‘প্রচারেই প্রসার’—দর্শন বাস্তবায়নের কাজে ভূমিকা রেখে দিনশেষে বাড়ি ফিরছিল।
মেয়েটির সামনে একটা তরল পদার্থ শকটের মেঝেকে আঠাল করে রেখেছে। পাশেই একটা বালতি উলটে আছে। যে প্রৌঢ় মানুষটি এই তরল পদার্থের মালিক, তার নাম হারাধন। এই দুধটুকু
আজ বিক্রি করতে পারেনি। তবে সত্তর টাকা মূল্যের এই দ্রব্যটুকু
ফেরত নিয়ে বাড়ি আসার পথে তার অমূল্য প্রাণটুকু খোয়া গেছে। হারাধনের নাক ও দাঁত থেঁতলে সামনের সিটের পেছনের অংশের সঙ্গে লেগে আছে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন