ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

আক্কেলপুরে বর্ষায কাদার ফাঁদে ৫০০ মিটার রাস্তা, দুর্ভোগে আড়াইশ পরিবার



আক্কেলপুরে বর্ষায কাদার ফাঁদে ৫০০ মিটার রাস্তা, দুর্ভোগে আড়াইশ পরিবার

লাঠিতে ভর দিয়ে কাদামাখা রাস্তা পার হচ্ছেন এক বৃদ্ধ। একটু এগোতেই কাদায় আটকে থাকা ভ্যান—যাত্রীদের নামিয়ে কয়েকজন মিলে সেটি ঠেলে তুলছেন।কোথাও খানাখন্দ এড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে মোটরসাইকেল। বৃষ্টি বাড়লেই এমন দৃশ্য যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রীকৃষ্টপুর স্কুলপাড়া গ্রামের প্রায় আড়াইশ পরিবারের যাতায়াতের একমাত্র প্রায় ৫০০ মিটার কাঁচা রাস্তার চিত্র এটি। বর্ষা এলেই রাস্তাটি পরিণত হয় কাদা, পানি আর দুর্ভোগের এক দীর্ঘ ফাঁদে।

স্থানীয়দের জন্য এই পথ শুধু যাতায়াতের রাস্তা নয়—এটাই তাদের স্কুল-কলেজ, বাজার, চিকিৎসাকেন্দ্র ও কর্মস্থলে পৌঁছানোর প্রধান ভরসা। কৃষকের উৎপাদিত ধান-সবজি বাজারে নেওয়া থেকে শুরু করে অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া—প্রতিটি প্রয়োজনেই নির্ভর করতে হয় এই রাস্তাটির ওপর। অথচ সামান্য বৃষ্টিতেই সেই পথ হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার বিভিন্ন স্থানে জমে আছে পানি। কোথাও হাঁটুসমান না হলেও কয়েক ইঞ্চি গভীর কাদা, আবার কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ভ্যানের চাকা কাদায় দেবে যাচ্ছে বারবার। যাত্রীদের নেমে দাঁড়াতে হচ্ছে রাস্তার পাশে। কখনো চালক, কখনো যাত্রীরাই মিলে ভ্যান ঠেলে কাদা থেকে তুলছেন।

মোটরসাইকেল চালকরাও রয়েছেন চরম ঝুঁকিতে। খানাখন্দ ও পিচ্ছিল কাদার কারণে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে তাদের। আর পথচারীদের অনেকেই জুতা হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে পার হচ্ছেন।

গ্রামের বাসিন্দা মো. আলাউদ্দীন (৬৫) বলেন, বৃষ্টি হলে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাই কঠিন হয়ে যায়। বয়স হয়েছে, কাদায় পা পিছলে পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানোও কষ্টকর। কিন্তু প্রয়োজনের কারণে তো ঘরে বসে থাকা যায় না।

ভ্যানচালক আনোয়ার (৫৫) বলেন,কাদায় চাকা আটকে গেলে যাত্রীদের নামিয়ে দিতে হয়। অনেক সময় সবাই মিলে ভ্যান ঠেলে নিতে হয়। এই রাস্তায় ভ্যান চালানো খুব কষ্টের।

গৃহবধূ শাহিদা বেগম (৩২) বলেন, গর্ভবতী বা গুরুতর অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নিতে হলে আগে থেকেই ভয় লাগে। মাঝপথে গাড়ি আটকে গেলে তখন কী হবে, সেই চিন্তাই বেশি।

স্থানীয়দের দাবি, গত বর্ষায় রাতে এক গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় কাদায় আটকে যায় ভ্যান। পরে স্থানীয় কয়েকজন যুবক গিয়ে ভ্যানটি ঠেলে মূল সড়কে তুলে দেন। সেই ঘটনার পর থেকে জরুরি রোগী পরিবহন নিয়ে আরও বেশি আতঙ্কে রয়েছেন গ্রামবাসী।

কৃষক সেকেন্দার (৪২) বলেন, ধান, সবজি বা অন্য ফসল বাজারে নিতে গেলে ভ্যানচালকরা বেশি ভাড়া চান। অনেকে আবার রাস্তার অবস্থা দেখে আসতেই চান না। এতে আমাদের পরিবহন খরচ বাড়ে, সময়ও নষ্ট হয়।

স্থানীয়রা জানান, রাস্তার এই দুরবস্থা এক-দুই বছরের নয়। বছরের পর বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে একই ভোগান্তি পোহাতে হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বৃষ্টি এলেই যোগাযোগব্যবস্থা অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম চপল বলেন, রাস্তাটির সমস্যার বিষয়টি আমাদের জানা আছে। বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যায়। প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বিষয়টি জানানো হয়ছে।

পৌরসভার ইঞ্জিনিয়াররা যদি একটু নজর দেন, তাহলে এই রাস্তাসহ এলাকার অনেক রাস্তারই উন্নয়ন করা সম্ভব।

তবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের অবসানের আশ্বাস দিয়েছেন আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক আবিদা খানম বৈশাখী।

তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের যাতায়াতের জন্য রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তাটি সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি টেন্ডারের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রতিবছর বর্ষা আসে, কাদা জমে, দুর্ভোগ বাড়ে—আবার বর্ষা শেষে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও থেকে যায় সেই পুরোনো সমস্যা। এখন গ্রামবাসীর একটাই প্রত্যাশা, আশ্বাস যেন কাগজেকলমে আটকে না থাকে; দ্রুত বাস্তবায়ন হোক ৫০০ মিটার এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংস্কার। তাহলেই বর্ষার কাদায় আটকে থাকা আড়াইশ পরিবারের চলাচলে ফিরবে স্বস্তি।

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬


আক্কেলপুরে বর্ষায কাদার ফাঁদে ৫০০ মিটার রাস্তা, দুর্ভোগে আড়াইশ পরিবার

প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

লাঠিতে ভর দিয়ে কাদামাখা রাস্তা পার হচ্ছেন এক বৃদ্ধ। একটু এগোতেই কাদায় আটকে থাকা ভ্যান—যাত্রীদের নামিয়ে কয়েকজন মিলে সেটি ঠেলে তুলছেন।কোথাও খানাখন্দ এড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে মোটরসাইকেল। বৃষ্টি বাড়লেই এমন দৃশ্য যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শ্রীকৃষ্টপুর স্কুলপাড়া গ্রামের প্রায় আড়াইশ পরিবারের যাতায়াতের একমাত্র প্রায় ৫০০ মিটার কাঁচা রাস্তার চিত্র এটি। বর্ষা এলেই রাস্তাটি পরিণত হয় কাদা, পানি আর দুর্ভোগের এক দীর্ঘ ফাঁদে।

স্থানীয়দের জন্য এই পথ শুধু যাতায়াতের রাস্তা নয়—এটাই তাদের স্কুল-কলেজ, বাজার, চিকিৎসাকেন্দ্র ও কর্মস্থলে পৌঁছানোর প্রধান ভরসা। কৃষকের উৎপাদিত ধান-সবজি বাজারে নেওয়া থেকে শুরু করে অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া—প্রতিটি প্রয়োজনেই নির্ভর করতে হয় এই রাস্তাটির ওপর। অথচ সামান্য বৃষ্টিতেই সেই পথ হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার বিভিন্ন স্থানে জমে আছে পানি। কোথাও হাঁটুসমান না হলেও কয়েক ইঞ্চি গভীর কাদা, আবার কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ভ্যানের চাকা কাদায় দেবে যাচ্ছে বারবার। যাত্রীদের নেমে দাঁড়াতে হচ্ছে রাস্তার পাশে। কখনো চালক, কখনো যাত্রীরাই মিলে ভ্যান ঠেলে কাদা থেকে তুলছেন।

মোটরসাইকেল চালকরাও রয়েছেন চরম ঝুঁকিতে। খানাখন্দ ও পিচ্ছিল কাদার কারণে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে তাদের। আর পথচারীদের অনেকেই জুতা হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে পার হচ্ছেন।

গ্রামের বাসিন্দা মো. আলাউদ্দীন (৬৫) বলেন, বৃষ্টি হলে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাই কঠিন হয়ে যায়। বয়স হয়েছে, কাদায় পা পিছলে পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানোও কষ্টকর। কিন্তু প্রয়োজনের কারণে তো ঘরে বসে থাকা যায় না।

ভ্যানচালক আনোয়ার (৫৫) বলেন,কাদায় চাকা আটকে গেলে যাত্রীদের নামিয়ে দিতে হয়। অনেক সময় সবাই মিলে ভ্যান ঠেলে নিতে হয়। এই রাস্তায় ভ্যান চালানো খুব কষ্টের।

গৃহবধূ শাহিদা বেগম (৩২) বলেন, গর্ভবতী বা গুরুতর অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নিতে হলে আগে থেকেই ভয় লাগে। মাঝপথে গাড়ি আটকে গেলে তখন কী হবে, সেই চিন্তাই বেশি।

স্থানীয়দের দাবি, গত বর্ষায় রাতে এক গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় কাদায় আটকে যায় ভ্যান। পরে স্থানীয় কয়েকজন যুবক গিয়ে ভ্যানটি ঠেলে মূল সড়কে তুলে দেন। সেই ঘটনার পর থেকে জরুরি রোগী পরিবহন নিয়ে আরও বেশি আতঙ্কে রয়েছেন গ্রামবাসী।

কৃষক সেকেন্দার (৪২) বলেন, ধান, সবজি বা অন্য ফসল বাজারে নিতে গেলে ভ্যানচালকরা বেশি ভাড়া চান। অনেকে আবার রাস্তার অবস্থা দেখে আসতেই চান না। এতে আমাদের পরিবহন খরচ বাড়ে, সময়ও নষ্ট হয়।

স্থানীয়রা জানান, রাস্তার এই দুরবস্থা এক-দুই বছরের নয়। বছরের পর বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে একই ভোগান্তি পোহাতে হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বৃষ্টি এলেই যোগাযোগব্যবস্থা অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম চপল বলেন, রাস্তাটির সমস্যার বিষয়টি আমাদের জানা আছে। বর্ষায় মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যায়। প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বিষয়টি জানানো হয়ছে।

পৌরসভার ইঞ্জিনিয়াররা যদি একটু নজর দেন, তাহলে এই রাস্তাসহ এলাকার অনেক রাস্তারই উন্নয়ন করা সম্ভব।

তবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের অবসানের আশ্বাস দিয়েছেন আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক আবিদা খানম বৈশাখী।

তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের যাতায়াতের জন্য রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তাটি সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি টেন্ডারের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রতিবছর বর্ষা আসে, কাদা জমে, দুর্ভোগ বাড়ে—আবার বর্ষা শেষে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও থেকে যায় সেই পুরোনো সমস্যা। এখন গ্রামবাসীর একটাই প্রত্যাশা, আশ্বাস যেন কাগজেকলমে আটকে না থাকে; দ্রুত বাস্তবায়ন হোক ৫০০ মিটার এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংস্কার। তাহলেই বর্ষার কাদায় আটকে থাকা আড়াইশ পরিবারের চলাচলে ফিরবে স্বস্তি।


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত