ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

মতামত

বাংলাদেশকে ভালোবাসব কর্মে, সততায়, শপথে এবং ত্যাগে

সশস্ত্র বাহিনীর দরবারে গুণে গুণে বলা কয়েক শব্দ ও বাক্যে অনেক কথা জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মান বিচারে এগুলো যতো না কথা, তার চেয়ে বেশি তথ্য। সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে তার ভাবনা-পরিকল্পণার কথা কম-বেশি আগেও জানিয়েছেন। রবিবার সকালে ঢাকা সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনীর দরবারে দেওয়া বক্তব্যে কথা ছিল আরো ঝরঝরে।সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বার্তায় পরিপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বলেছেন, এ বাহিনী কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা দলের সম্পদ নয়, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য গঠিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কর্মে, সততায়, শপথে, ত্যাগে এবং ভালোবাসায় দায়িত্ব পালনে দলমতের উর্ধ্বে উঠে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে ব্যক্ত করেন নিজের প্রত্যয়ের কথাও।ঢাকা সেনানিবাসের এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।বিশেষ এ দরবারে ঢাকা সেনানিবাসের সামরিক ও অসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সেনানিবাসের সদস্যরা ভিডিও টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন। দরবারে প্রধানমন্ত্রী গত আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও শান্তি রক্ষায় এই বাহিনীর অবদান বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।সরাসরি বলেন, কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব গ্রহণযোগ্য হবে না।অতীতে সেনাবাহিনীকে দুর্বল ও বিতর্কিত করতে পিলখানা হত্যাকাণ্ডসহ নানা ঘটনা ও কর্মকাণ্ডের কথাও বাদ যায়নি। গত দেড় দশকের শাসন ও শোষণের সময় সশস্ত্র বাহিনীকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টার কথা বলতে গেলে চলে আসে পিলখানা ট্র্যাজেডির ঘটনা। বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতেই পিলখানা হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। জানান, ওই দুঃখজনক ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিতে তার সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জুলাই আন্দোলনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জনগণকে আশাবাদী করেছে অভিমত জানিয়ে বলেন, সশস্ত্র বাহিনী শক্তিমান ও ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ দেশকে পরাভূত করতে পারবে না।সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানের কথাও উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। সেনানীবাসে নিজের বেড়ে ওঠা, প্রয়াত বাবা-মা, ভাই ও সেনাকর্মকর্তাদের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। তার আহ্বান- সেনাবাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায়ে রেখে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি স্তরে দেশপ্রেমের যে অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, তা যেন কখনো নিভে না যায়- মিনতির মতো সেই আহ্বান যোগ করেন তারেক রহমান। দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা বিভাজন গ্রহণযোগ্য হবে না। কেবল সেনাবাহিনী নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতের সংস্কার ও উন্নয়ন করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুণর্ব্যক্ত করেন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও।কী করলে, কিভাবে চললে সশস্ত্র বাহিনীকে বহিঃশক্তি সমীহ করবে, জনগণ আস্থায় রাখবে- সেই নির্দেশনাও বাদ যায়নি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। পেশাদারিত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করে সশস্ত্র বাহিনীকে সব সময় সুউচ্চ আদর্শিক অবস্থানে থাকার আহ্বান জানাতে গিয়ে বলেন, সশস্ত্র বাহিনী একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শক্তি এবং মর্যাদার প্রতীক। রাষ্ট্রীয় সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জনগণের অবিচল আস্থাই হতে হবে সশস্ত্র বাহিনীর পথ চলার প্রধান ভিত্তি। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই আমাদের প্রতিটি সদস্যের একমাত্র এবং পবিত্র চূড়ান্ত দায়িত্ব। সেই লক্ষ্যে জনগণের অবিচল আস্থা ধরে রাখা ও বাড়ানোর তাগিদ তারেক রহমানের। আর সশস্ত্র বাহিনীর পথ চলার প্রধান ভিত্তি করতে হবে রাষ্ট্রীয় সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতাকে। তার স্পষ্ট কথা ও আকাঙ্খা এমন একটি সশস্ত্র বাহিনীর, যাদেরকে বহিঃশক্তি সমীহ করবে, আর দেশের জনগণ রাখবে আস্থায়। পেশাদারিত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করে সুউচ্চ আদর্শিক অবস্থানে থাকলে এ আশাবাদ অমূলক হবে না। বৈশ্বিক মানসম্পন্ন ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বাহিনী গঠনের অভিপ্রায় প্রধানমন্ত্রী আগেও প্রকাশ করেছেন। আলোকপাত করেছেন গণতন্ত্র রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান এবং দেশপ্রেমে বলীয়ান থাকার কথা। দিয়েছেন সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা স্বার্থে ব্যবহার করতে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। সেখানে যোগ করেছেন: শুধু সেনাবাহিনী নয়, দেশের প্রতিটি সেক্টর সংস্কার ও প্রতিটি মানুষের উন্নয়নের ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে চান। রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে বিএনপির জুলাই সনদে সই করার কথাও উল্লেখ করেন।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেনাবাহিনীর স্বতঃস্ফূর্তভাবে দায়িত্ব পালনের কথাও এসেছে। ভবিষ্যতের নির্বাচনসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাহিনীর ভূমিকা আরো স্বচ্ছ ও পেশাদারিত্বের প্রত্যাশা রাখেন তিনি। গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যমণ্ডিত অংশগ্রহণের কথা। তাদেরকে বিশ্বসভায় অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া বিএনপি সরকারের কৃতিত্ব। সশস্ত্র বাহিনীকে আরো শক্তিশালী ও আধুনিক করতে তার সরকারের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস তিনি আবারও ব্যক্ত করেছেন। সেখানে চলেই আসে ২০২৪ সালে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী অস্থির সময়ে প্রশাসনিক অচলাবস্থা নিরসনে এই বাহিনীর অসাধারণ ভূমিকায় জনগণকে আশান্বিত করার ঐতিহাসিক পর্বের কথা। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিন বাহিনী প্রধানদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতেও প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ে তার অভিপ্রায়ের কথা জানিয়েছেন। রবিবার সেনা সদরের বৈঠকে জানিয়েছেন তুলনামূলক আরো খোলাসা করে। কেবল প্রতিরক্ষা বা সমরবিদ নন, সচেতন যে কারো কাছেই তা সহজবোধ্য। লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

বাংলাদেশকে ভালোবাসব কর্মে, সততায়, শপথে এবং ত্যাগে