পাবনা জেলার ফরিদপুর রাজবাড়ীর চারদিকে দীঘিবেষ্টিত একটি মাত্র প্রবেশদ্বার সংরক্ষিত ছায়াঘেরা আম বাগানের মধ্যে মনোরম বাড়ীটিই ফরিদপুর রাজবাড়ী বা বনওয়ারীনগর রাজবাড়ী নামে পরিচিত। রাজবাড়ীটি এখন উপজেলা পরিষদ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাড়াশের জমিদার বনওয়ারী লাল রায় নদীবেষ্টিত বনবেষ্টিত ছায়া সুনিবিড় আম্রকাননের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁর নাম অনুসারে একটি গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম বনওয়ারীনগর। তাঁর আগে জায়গাটির নাম ছিল ফরিদপুর। হযরত শাহ শেখ ফরিদ (রা:) নাম অনুসারে ফরিদপুরের নামকরণ করা হয়। হযরত শাহ শেখ ফরিদ (রা:) এর মাজার উপজেলা সদর থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে বড়াল নদীর ওপারে পার ফরিদপুর গ্রামে রয়েছে। মাজারের নিকট একটি মসজিদও রয়েছে।
বনওয়ারীনগর রাজবাড়ী প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে আরও একটি জনশ্রুতি আছে তবে তাঁহার ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তৎকালে জমিদার তাড়াশ থেকে করতোয়া, গুমানী, বড়াল ও চিকনাই নদীপথে এসে ইছামতি নদী দিয়ে পাবনা সদরে খাজনা দিতে যেতেন। যাত্রাপথে একবার তিনি বড়াল নদীর পাড়ে এ সুন্দর ছায়াঘেরা স্থানে যাত্রা বিরতি করে বিশ্রাম করেন। সে সময় তিনি একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখে মুগ্ধ বা বিস্মিত হন। ব্যাঙ সাপকে ভক্ষণ করছে। এতে তিনি বুঝতে পারেন জায়গাটি ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ হিন্দু শাস্ত্রমতে সাপ মনসাদেবীর প্রতিমূর্তি। তিনি জায়গাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে বাড়ী তৈরি করেন এবং আস্তে আস্তে তাড়াশ থেকে বনওয়ারীনগরে তাঁর জমিদারীর সকল কার্যক্রম স্থানান্তর করেন।
জমিদার বনওয়ারী লাল রায় বাহাদুর বৃহত্তর পাবনা জেলার বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার দেব চড়িয়া গ্রামের বাসুদেব তালুকদার ওরফে নারায়ণদেব চৌধুরীর বংশধর। বাসুদেব তালুকদার ওরফে নারায়ণদেব চৌধুরী তৎকালে ঢাকার নবাব ইসলাম খাঁর অধীনে চাকরি করতেন। নবাব তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে "চৌধুরীরাই তাড়াশ" নামক সম্পত্তি তাঁকে জায়গীর দান করেন। এবং রায় চৌধুরী উপাধী প্রদান করেন। তৎকালে পরগনা কাটার মহল্লা রাজশাহীর সাঁতৈলের রাজার জমিদারী ছিল। এর দু'শ মৌজা নিয়ে এতাড়াশ জমিদারী সৃষ্টি হয়। এটা ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগের কথা।
১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে বনমালী রায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৮২ সালে দত্তক পিতা বনওয়ারী লাল রায়ের মৃত্যুরপর বনমালী রায় তাঁর বিষয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে জমিদারী পরিচালনা করতে থাকেন। পিতা-পুত্র উভয়ই ধার্মিক, বিদ্যানুরাগী ও প্রজাহিতৈষী ছিলেন। তাঁরা উভয়ই প্রজাদের কল্যাণে নিবেদিত বলে অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। বনওয়ারী লাল রায় সে সময় এক লাখ টাকা ব্যয়ে সিরাজগঞ্জ বনওয়ারী লাল হাই স্কুল (বিএল হাই স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পাবনা জেলা জজকোর্টের পশ্চিম পাশে ইছামতি নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণ করেন। তিনি প্রজাদের জলকষ্ট দূর করার জন্য তাড়াশ ও বনওয়ারীনগর রাজবাড়ী বেষ্টন করে দীঘি খনন করেন। এছাড়া বনওয়ারীনগরে আরও একটি দীঘি খনন করেন।
বনওয়ারীনগরে করনেশন বনমালী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মুখে দীঘিটির নাম দুধ সাগর। ব্যবসা ভিত্তিক মাছ চাষের আগে দীঘিটির পানি ছিল স্বচ্ছ ও সুন্দর। তিনি মারা যাবার পর তাঁর পুত্র বনমালী রায়ও তাঁর বাবার ন্যায় প্রজাদের শিক্ষা বিস্তারে তাড়াশ ও বনওয়ারীনগরে করনেশন বনমালী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় বা সিবিপি উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১২ সালে) হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
এছাড়া পাবনা বনমালী ইনস্টিটিউট, টমসন হল, ইলিয়ট শিল্প বিদ্যালয়, হাসপাতাল, টাউন হল, দুর্ভিক্ষ ভাণ্ডার, জগন্নাথদেবের মন্দির নির্মাণ করেন। তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বিজ্ঞানাগার নির্মাণের জন্য এবং যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ৫০ হাজার টাকা দান করেন। ১৮৯৪ সালে ইংরেজ সরকার তাঁর দানের প্রশংসা করে একটি পত্র দেন এবং তাঁকে "রায় বাহাদুর" উপাধী প্রদান করেন।
বনমালী রায় বাহাদুর শেষ জীবনে নবদ্বীপ ধামে বাস করতেন। তিনি গৌরাঙ্গের ভক্ত ছিলেন। তিনি অনেক প্রতিষ্ঠানকে মাসিক বা বার্ষিক সাহায্য করতেন। তিনি দীন দু:খী ও অন্ধ অচলদের অন্ন, বস্ত্র, ওষুধ, অর্থদান করতেন। তিনি পাবনা জেলার শ্রেষ্ঠ জমিদার ও বরেন্দ কায়স্ত্র সমাজের জননায়ক ছিলেন। বাৎসরিক ৬০ হাজার টাকা আয়ের সম্পত্তি তিনি কূলদেবতার জন্য দান করেন।
.png)
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
পাবনা জেলার ফরিদপুর রাজবাড়ীর চারদিকে দীঘিবেষ্টিত একটি মাত্র প্রবেশদ্বার সংরক্ষিত ছায়াঘেরা আম বাগানের মধ্যে মনোরম বাড়ীটিই ফরিদপুর রাজবাড়ী বা বনওয়ারীনগর রাজবাড়ী নামে পরিচিত। রাজবাড়ীটি এখন উপজেলা পরিষদ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাড়াশের জমিদার বনওয়ারী লাল রায় নদীবেষ্টিত বনবেষ্টিত ছায়া সুনিবিড় আম্রকাননের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁর নাম অনুসারে একটি গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম বনওয়ারীনগর। তাঁর আগে জায়গাটির নাম ছিল ফরিদপুর। হযরত শাহ শেখ ফরিদ (রা:) নাম অনুসারে ফরিদপুরের নামকরণ করা হয়। হযরত শাহ শেখ ফরিদ (রা:) এর মাজার উপজেলা সদর থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে বড়াল নদীর ওপারে পার ফরিদপুর গ্রামে রয়েছে। মাজারের নিকট একটি মসজিদও রয়েছে।
বনওয়ারীনগর রাজবাড়ী প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে আরও একটি জনশ্রুতি আছে তবে তাঁহার ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তৎকালে জমিদার তাড়াশ থেকে করতোয়া, গুমানী, বড়াল ও চিকনাই নদীপথে এসে ইছামতি নদী দিয়ে পাবনা সদরে খাজনা দিতে যেতেন। যাত্রাপথে একবার তিনি বড়াল নদীর পাড়ে এ সুন্দর ছায়াঘেরা স্থানে যাত্রা বিরতি করে বিশ্রাম করেন। সে সময় তিনি একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখে মুগ্ধ বা বিস্মিত হন। ব্যাঙ সাপকে ভক্ষণ করছে। এতে তিনি বুঝতে পারেন জায়গাটি ব্যতিক্রমধর্মী। কারণ হিন্দু শাস্ত্রমতে সাপ মনসাদেবীর প্রতিমূর্তি। তিনি জায়গাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে এখানে বাড়ী তৈরি করেন এবং আস্তে আস্তে তাড়াশ থেকে বনওয়ারীনগরে তাঁর জমিদারীর সকল কার্যক্রম স্থানান্তর করেন।
জমিদার বনওয়ারী লাল রায় বাহাদুর বৃহত্তর পাবনা জেলার বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার দেব চড়িয়া গ্রামের বাসুদেব তালুকদার ওরফে নারায়ণদেব চৌধুরীর বংশধর। বাসুদেব তালুকদার ওরফে নারায়ণদেব চৌধুরী তৎকালে ঢাকার নবাব ইসলাম খাঁর অধীনে চাকরি করতেন। নবাব তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে "চৌধুরীরাই তাড়াশ" নামক সম্পত্তি তাঁকে জায়গীর দান করেন। এবং রায় চৌধুরী উপাধী প্রদান করেন। তৎকালে পরগনা কাটার মহল্লা রাজশাহীর সাঁতৈলের রাজার জমিদারী ছিল। এর দু'শ মৌজা নিয়ে এতাড়াশ জমিদারী সৃষ্টি হয়। এটা ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগের কথা।
১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে বনমালী রায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৮২ সালে দত্তক পিতা বনওয়ারী লাল রায়ের মৃত্যুরপর বনমালী রায় তাঁর বিষয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে জমিদারী পরিচালনা করতে থাকেন। পিতা-পুত্র উভয়ই ধার্মিক, বিদ্যানুরাগী ও প্রজাহিতৈষী ছিলেন। তাঁরা উভয়ই প্রজাদের কল্যাণে নিবেদিত বলে অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। বনওয়ারী লাল রায় সে সময় এক লাখ টাকা ব্যয়ে সিরাজগঞ্জ বনওয়ারী লাল হাই স্কুল (বিএল হাই স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পাবনা জেলা জজকোর্টের পশ্চিম পাশে ইছামতি নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণ করেন। তিনি প্রজাদের জলকষ্ট দূর করার জন্য তাড়াশ ও বনওয়ারীনগর রাজবাড়ী বেষ্টন করে দীঘি খনন করেন। এছাড়া বনওয়ারীনগরে আরও একটি দীঘি খনন করেন।
বনওয়ারীনগরে করনেশন বনমালী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মুখে দীঘিটির নাম দুধ সাগর। ব্যবসা ভিত্তিক মাছ চাষের আগে দীঘিটির পানি ছিল স্বচ্ছ ও সুন্দর। তিনি মারা যাবার পর তাঁর পুত্র বনমালী রায়ও তাঁর বাবার ন্যায় প্রজাদের শিক্ষা বিস্তারে তাড়াশ ও বনওয়ারীনগরে করনেশন বনমালী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় বা সিবিপি উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১২ সালে) হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
এছাড়া পাবনা বনমালী ইনস্টিটিউট, টমসন হল, ইলিয়ট শিল্প বিদ্যালয়, হাসপাতাল, টাউন হল, দুর্ভিক্ষ ভাণ্ডার, জগন্নাথদেবের মন্দির নির্মাণ করেন। তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বিজ্ঞানাগার নির্মাণের জন্য এবং যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ৫০ হাজার টাকা দান করেন। ১৮৯৪ সালে ইংরেজ সরকার তাঁর দানের প্রশংসা করে একটি পত্র দেন এবং তাঁকে "রায় বাহাদুর" উপাধী প্রদান করেন।
বনমালী রায় বাহাদুর শেষ জীবনে নবদ্বীপ ধামে বাস করতেন। তিনি গৌরাঙ্গের ভক্ত ছিলেন। তিনি অনেক প্রতিষ্ঠানকে মাসিক বা বার্ষিক সাহায্য করতেন। তিনি দীন দু:খী ও অন্ধ অচলদের অন্ন, বস্ত্র, ওষুধ, অর্থদান করতেন। তিনি পাবনা জেলার শ্রেষ্ঠ জমিদার ও বরেন্দ কায়স্ত্র সমাজের জননায়ক ছিলেন। বাৎসরিক ৬০ হাজার টাকা আয়ের সম্পত্তি তিনি কূলদেবতার জন্য দান করেন।
.png)
আপনার মতামত লিখুন