ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

নীরবতার গভীরে এক ছায়াতল: বাকৃবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় বাবা দিবস



নীরবতার গভীরে এক ছায়াতল: বাকৃবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় বাবা দিবস

প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার যখন আসে, তখন ক্যালেন্ডারের পাতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটা বিশেষ দিনের কথা- বিশ্ব বাবা দিবস। আজ রোববার (২১ জুন) সেই বিশেষ দিন। মা দিবস নিয়ে চারপাশে যতটা হইচই হয়, বাবা দিবসটা সাধারণত পার হয়ে যায় বেশ নীরবেই। আসলে একজন বাবার ভালোবাসাও তো এমনই; তিনি মুখে কখনো ভালোবাসার কথা বলেন না, কিন্তু দিন-রাত হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে পরিবারের সব আবদার পূরণ করেন। তাঁর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে নীরবতার গভীরে।


বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, ১৯১০ সালে ওয়াশিংটনের স্পোকেন শহরের সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক তরুণী যখন তাঁর একাকী যুদ্ধ করা বাবার সম্মানে এই দিনটির সূচনা করেছিলেন, তখন হয়তো তিনি জানতেনও না যে- পৃথিবীর কোটি কোটি সন্তানের হৃদয়ের অব্যক্ত কথা প্রকাশের একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যাচ্ছেন তিনি। 


আজ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সবুজ ক্যাম্পাসের আমবাগান, কেআর মার্কেট কিংবা ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসে একদল তরুণ-তরুণী যখন তাঁদের বাবার কথা ভাবছেন, তখন তাঁদের বুকের ভেতর বইছে এক অদ্ভুত আবেগের ঝড়।


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই দিনগুলোতে হুট করে যখন পকেটে টান পড়ে, কিংবা সেমিস্টার ফাইনালের টেনশনে রাতে ঘুম আসে না, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে একটা ফোন আসে। গম্ভীর, ছোট ছোট বাক্যে সাজানো সেই কণ্ঠস্বর- "টাকা পাঠিয়েছি, ঠিকমতো খেয়ো।" এই সংক্ষিপ্ত বার্তার পেছনে যে কতটা নির্ঘুম রাত আর ত্যাগের গল্প লুকিয়ে থাকে, তা হয়তো এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি শিক্ষার্থী এখন একটু একটু করে উপলব্ধি করতে পারছে।


বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু হানিফ আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মনের গহীনে জমে থাকা সেই বাবার গল্পগুলো তুলে এনেছেন। তাঁদের জবানিতেই শোনা যাক সেই ছায়াঘেরা মানুষদের উপাখ্যান:


মেয়েদের মুখে হাসি ফোটানোর জাদুকর; সুমাইয়া কামাল দিশা (শিক্ষার্থী, কৃষি অর্থনীতি অনুষদ, দ্বিতীয় বর্ষ):


"বাবা আমার জীবনের ছায়াঘেরা বৃক্ষ, নিরাপদ আশ্রয় এবং ঝড়-ঝাপটার দিনে মাথার ওপর ধরা নির্ভরতার ছাতা। তাঁর ভালোবাসা শব্দহীন, অথচ সবচেয়ে গভীর। আমার আব্বা, মোহাম্মদ কামাল হোসেন, শুধু একজন বাবা নন; তিনি একজন আদর্শ স্বামী, সন্তান এবং অনন্য মানবিক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ। আমরা তিন বোনের ছোট-বড় সব ইচ্ছা সাধ্যমতো পূরণ করতে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। রাত যতই হোক, আমাদের পছন্দের কিছু খেতে ইচ্ছে হলে তা এনে দিয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে কত কিছু বয়ে এনেছেন শুধুই আমাদের হাসিমুখ দেখার জন্য। রান্নাবান্না, সেলাই, ঘরের কাজ কিংবা ভাঙা জিনিস নতুন করে গড়ে তোলা- এমন কোনো কাজ নেই যা তিনি পারেন না। মানুষের উপকারে তিনি সবসময় এগিয়ে থাকেন। জীবনের প্রতিকূলতায় হাসিমুখে থাকা এবং সন্তুষ্ট থাকতে শেখার সবচেয়ে বড় শিক্ষকও তিনি। আমি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছি, আর আমার প্রতিটি অর্জনের পেছনে তাঁর নিঃশব্দ ত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রম জড়িয়ে আছে। বাবা দিবস উপলক্ষে আব্বাকে জানাই অফুরন্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।"


বাবার ভালোবাসা শব্দে নয়, অনুভবে প্রকাশ পায়; কাজী সুমাইয়া (শিক্ষার্থী, বাকৃবি):

"বাবাকে নিয়ে লিখতে বসলে শব্দগুলো যেন ছোট হয়ে যায়। জীবনের প্রতিটি ধাপে তার ভালোবাসা, ত্যাগ আর স্নেহ আমাকে আগলে রেখেছে। ছোটবেলায় আম্মু বকাঝকা করতে এলে আব্বুর কাছেই আশ্রয় নিতাম। রাগ করে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে তিনিই পরম মমতায় খাবার নিয়ে পাশে বসে থাকতেন। ভালোবাসার কথা মুখে কম বললেও, তাঁর প্রতিটি কাজে ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার দিন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, 'নিজের যত্ন নিস।' তাঁর চোখের পানি দেখে সেদিন বুঝেছিলাম, বাবার ভালোবাসা আসলে শব্দে নয়, অনুভবে প্রকাশ পায়। আজ দূরে থেকেও জানি, আমার সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আমার বাবা। ভালোবাসি আব্বু। আল্লাহ তোমাকে সুস্থ ও ভালো রাখুন।"


কঠিন পথে এগিয়ে চলার নাম 'বাবা'; রোজিয়া তাকী রমা(শিক্ষার্থী, বাকৃবি):

"প্রিয় বাবা, ছোটবেলায় যখন প্রথম হাঁটতে শিখেছিলাম, তখন আমার ছোট্ট হাতটি শক্ত করে ধরে রেখেছিলে তুমি। শুধু হাঁটা নয়, জীবনের প্রতিটি কঠিন পথে এগিয়ে চলার সাহসও তুমি দিয়েছ। আমার হাসির আড়ালে তোমার অসংখ্য ত্যাগ আর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। নিজের কষ্টগুলো আড়াল করে তুমি সবসময় আমার স্বপ্নগুলোকে আগলে রেখেছ। যখনই ভয় পেয়েছি বা দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছি, তোমার একটি বাক্যই ম্যাজিকের মতো সাহস জুগিয়েছে—'কোনো চিন্তা করো না, আমি আছি।' বাবা, হয়তো প্রতিদিন মুখে বলা হয় না, কিন্তু আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তোমার ত্যাগ, পরিশ্রম আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। বাবা দিবসে তোমার প্রতি রইল অফুরন্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তোমার দোয়া যেন সবসময় আমার পথচলার আলো হয়ে থাকে।"



বাবা এক নিঃশব্দ যোদ্ধা ও জীবনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি; শাহরিয়ার নিহাল রাতুল (শিক্ষার্থী, কৃষি অর্থনীতি অনুষদ, দ্বিতীয় বর্ষ):

"বাবা শব্দটার ওজন সহজে বোঝা যায় না। যার উপস্থিতি আমরা অনেক সময় খুব স্বাভাবিকভাবে নিই, তার অনুপস্থিতিতেই বুঝি তিনি জীবনের কত বড় ভিত্তি ছিলেন। একমাত্র সন্তান হওয়ায় এই উপলব্ধিটা আমার আরও গভীর। ছোট থেকে কোনো আবদারই তিনি ফেলেননি। পৃথিবীতে হয়তো খারাপ মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো খারাপ বাবা নেই। বাবা হলেন সেই ছাদ, যা সরে গেলে জীবনের আসল মানেটাই হারিয়ে যায়। খারাপ সময়েও তিনি অভয় দিয়ে বলেন, 'কিছুই হয়নি বাবা, সামনে ভালো হবে'। হলিউডের *Interstellar* সিনেমার বাবা 'কুপার' চরিত্রটি এই সত্যই তুলে ধরে—বাবার কাছে সন্তানের গুরুত্ব মহাবিশ্বের চেয়েও মূল্যবান। সন্তানের জন্য বাবা সময়, দূরত্ব, এমনকি নিজের অস্তিত্বকেও পেছনে ফেলতে পারেন। অথচ মুখ ফুটে ওনাকে কখনো বলা হয় না, 'তোমায় ভালোবাসি'।"


লড়াকু মানসিকতার এক নীরব অনুপ্রেরণা বাবা; আশিকুর রহমান আশিক (শিক্ষার্থী, কৃষি অর্থনীতি অনুষদ):

"ছেলেদের কাছে বাবার গুরুত্বটা একটু অন্যরকম। বাবারা ছেলেদের সাথে সহজে আবেগের কথা বলেন না, আর ছেলেরাও বাবার সামনে কেমন যেন আড়ষ্ট থাকে। যেন দুজনের মাঝে নীরব এক দেয়াল! কিন্তু একজন ছেলেই বোঝে, বাবার কাঁধের দায়িত্বের বোঝাটা ঠিক কতটা ভারী। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যখন হাঁটতাম, নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মনে হতো। আজ যখন নিজের ক্যারিয়ার গড়ার লড়াইয়ে নেমেছি, প্রতিটা পদক্ষেপে বাবার সেই লড়াকু মানসিকতা আমাকে শক্তি দেয়। আমি হয়তো বাবার সামনে গিয়ে কোনোদিন বলতে পারব না 'ভালোবাসি', কিন্তু মনে মনে প্রতিটা ক্ষণে আমি ওনার মতোই একজন দায়িত্বশীল পুরুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি।"


বাবা নেই, তবুও প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর ছায়া খুঁজি; আমিন উল্লাহ (শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ) :

"বাবা যেন এক ছায়াতল, বটবৃক্ষের মতো আগলে রাখা এক নিরাপদ আশ্রয়। পরিবারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে সন্তানের মুখের হাসিতেই যিনি খুঁজে নেন নিজের সুখ। ছোটবেলা থেকে দেখেছি, আমাদের ভালো রাখার জন্য বাবা কত কষ্ট করেছেন, কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। তারপর থেকে প্রতিটি দিনই যেন তাঁকে নতুন করে মনে করার দিন। তোমার ভালোবাসা, তোমার স্নেহ, তোমার উপদেশ আর হাজারো স্মৃতি আজও আমাকে পথ দেখায়। বাবা, তোমার শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। শুধু একটি আক্ষেপ হৃদয়ে রয়ে গেছে- তোমার জন্য কিছু করার আগেই তুমি চলে গেলে। তবুও তোমার শেখানো পথেই চলার চেষ্টা করি, আর হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করি, কারণ তুমি সেটাই চাইতে। তোমার ছেলে তোমাকে অনেক ভালোবাসে বাবা, আজও, প্রতিদিন।"


গল্পগুলো আলাদা, মুখগুলো ভিন্ন, কিন্তু অনুভূতির সুতোটা ঠিক একই জায়গায় গিয়ে মিলেছে। এই পৃথিবীতে বাবারা এমনই হন- তাঁরা কখনো বৃক্ষ, কখনো ছাতা, আবার কখনো ঝড়ের রাতে এক বুক সাহস। আর যাঁদের বাবা আজ এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের জন্য আজ শুধুই হৃদয়ের গভীর থেকে প্রার্থনা "আল্লাহ তাঁদের জান্নাত নসীব করুন।"

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

রোববার, ২১ জুন ২০২৬


নীরবতার গভীরে এক ছায়াতল: বাকৃবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় বাবা দিবস

প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬

featured Image

প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার যখন আসে, তখন ক্যালেন্ডারের পাতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটা বিশেষ দিনের কথা- বিশ্ব বাবা দিবস। আজ রোববার (২১ জুন) সেই বিশেষ দিন। মা দিবস নিয়ে চারপাশে যতটা হইচই হয়, বাবা দিবসটা সাধারণত পার হয়ে যায় বেশ নীরবেই। আসলে একজন বাবার ভালোবাসাও তো এমনই; তিনি মুখে কখনো ভালোবাসার কথা বলেন না, কিন্তু দিন-রাত হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে পরিবারের সব আবদার পূরণ করেন। তাঁর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে নীরবতার গভীরে।


বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, ১৯১০ সালে ওয়াশিংটনের স্পোকেন শহরের সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক তরুণী যখন তাঁর একাকী যুদ্ধ করা বাবার সম্মানে এই দিনটির সূচনা করেছিলেন, তখন হয়তো তিনি জানতেনও না যে- পৃথিবীর কোটি কোটি সন্তানের হৃদয়ের অব্যক্ত কথা প্রকাশের একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যাচ্ছেন তিনি। 


আজ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সবুজ ক্যাম্পাসের আমবাগান, কেআর মার্কেট কিংবা ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসে একদল তরুণ-তরুণী যখন তাঁদের বাবার কথা ভাবছেন, তখন তাঁদের বুকের ভেতর বইছে এক অদ্ভুত আবেগের ঝড়।


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই দিনগুলোতে হুট করে যখন পকেটে টান পড়ে, কিংবা সেমিস্টার ফাইনালের টেনশনে রাতে ঘুম আসে না, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে একটা ফোন আসে। গম্ভীর, ছোট ছোট বাক্যে সাজানো সেই কণ্ঠস্বর- "টাকা পাঠিয়েছি, ঠিকমতো খেয়ো।" এই সংক্ষিপ্ত বার্তার পেছনে যে কতটা নির্ঘুম রাত আর ত্যাগের গল্প লুকিয়ে থাকে, তা হয়তো এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি শিক্ষার্থী এখন একটু একটু করে উপলব্ধি করতে পারছে।


বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু হানিফ আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মনের গহীনে জমে থাকা সেই বাবার গল্পগুলো তুলে এনেছেন। তাঁদের জবানিতেই শোনা যাক সেই ছায়াঘেরা মানুষদের উপাখ্যান:


মেয়েদের মুখে হাসি ফোটানোর জাদুকর; সুমাইয়া কামাল দিশা (শিক্ষার্থী, কৃষি অর্থনীতি অনুষদ, দ্বিতীয় বর্ষ):


"বাবা আমার জীবনের ছায়াঘেরা বৃক্ষ, নিরাপদ আশ্রয় এবং ঝড়-ঝাপটার দিনে মাথার ওপর ধরা নির্ভরতার ছাতা। তাঁর ভালোবাসা শব্দহীন, অথচ সবচেয়ে গভীর। আমার আব্বা, মোহাম্মদ কামাল হোসেন, শুধু একজন বাবা নন; তিনি একজন আদর্শ স্বামী, সন্তান এবং অনন্য মানবিক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ। আমরা তিন বোনের ছোট-বড় সব ইচ্ছা সাধ্যমতো পূরণ করতে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। রাত যতই হোক, আমাদের পছন্দের কিছু খেতে ইচ্ছে হলে তা এনে দিয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে কত কিছু বয়ে এনেছেন শুধুই আমাদের হাসিমুখ দেখার জন্য। রান্নাবান্না, সেলাই, ঘরের কাজ কিংবা ভাঙা জিনিস নতুন করে গড়ে তোলা- এমন কোনো কাজ নেই যা তিনি পারেন না। মানুষের উপকারে তিনি সবসময় এগিয়ে থাকেন। জীবনের প্রতিকূলতায় হাসিমুখে থাকা এবং সন্তুষ্ট থাকতে শেখার সবচেয়ে বড় শিক্ষকও তিনি। আমি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছি, আর আমার প্রতিটি অর্জনের পেছনে তাঁর নিঃশব্দ ত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রম জড়িয়ে আছে। বাবা দিবস উপলক্ষে আব্বাকে জানাই অফুরন্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।"


বাবার ভালোবাসা শব্দে নয়, অনুভবে প্রকাশ পায়; কাজী সুমাইয়া (শিক্ষার্থী, বাকৃবি):

"বাবাকে নিয়ে লিখতে বসলে শব্দগুলো যেন ছোট হয়ে যায়। জীবনের প্রতিটি ধাপে তার ভালোবাসা, ত্যাগ আর স্নেহ আমাকে আগলে রেখেছে। ছোটবেলায় আম্মু বকাঝকা করতে এলে আব্বুর কাছেই আশ্রয় নিতাম। রাগ করে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে তিনিই পরম মমতায় খাবার নিয়ে পাশে বসে থাকতেন। ভালোবাসার কথা মুখে কম বললেও, তাঁর প্রতিটি কাজে ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার দিন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, 'নিজের যত্ন নিস।' তাঁর চোখের পানি দেখে সেদিন বুঝেছিলাম, বাবার ভালোবাসা আসলে শব্দে নয়, অনুভবে প্রকাশ পায়। আজ দূরে থেকেও জানি, আমার সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আমার বাবা। ভালোবাসি আব্বু। আল্লাহ তোমাকে সুস্থ ও ভালো রাখুন।"


কঠিন পথে এগিয়ে চলার নাম 'বাবা'; রোজিয়া তাকী রমা(শিক্ষার্থী, বাকৃবি):

"প্রিয় বাবা, ছোটবেলায় যখন প্রথম হাঁটতে শিখেছিলাম, তখন আমার ছোট্ট হাতটি শক্ত করে ধরে রেখেছিলে তুমি। শুধু হাঁটা নয়, জীবনের প্রতিটি কঠিন পথে এগিয়ে চলার সাহসও তুমি দিয়েছ। আমার হাসির আড়ালে তোমার অসংখ্য ত্যাগ আর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। নিজের কষ্টগুলো আড়াল করে তুমি সবসময় আমার স্বপ্নগুলোকে আগলে রেখেছ। যখনই ভয় পেয়েছি বা দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছি, তোমার একটি বাক্যই ম্যাজিকের মতো সাহস জুগিয়েছে—'কোনো চিন্তা করো না, আমি আছি।' বাবা, হয়তো প্রতিদিন মুখে বলা হয় না, কিন্তু আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তোমার ত্যাগ, পরিশ্রম আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। বাবা দিবসে তোমার প্রতি রইল অফুরন্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তোমার দোয়া যেন সবসময় আমার পথচলার আলো হয়ে থাকে।"



বাবা এক নিঃশব্দ যোদ্ধা ও জীবনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি; শাহরিয়ার নিহাল রাতুল (শিক্ষার্থী, কৃষি অর্থনীতি অনুষদ, দ্বিতীয় বর্ষ):

"বাবা শব্দটার ওজন সহজে বোঝা যায় না। যার উপস্থিতি আমরা অনেক সময় খুব স্বাভাবিকভাবে নিই, তার অনুপস্থিতিতেই বুঝি তিনি জীবনের কত বড় ভিত্তি ছিলেন। একমাত্র সন্তান হওয়ায় এই উপলব্ধিটা আমার আরও গভীর। ছোট থেকে কোনো আবদারই তিনি ফেলেননি। পৃথিবীতে হয়তো খারাপ মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো খারাপ বাবা নেই। বাবা হলেন সেই ছাদ, যা সরে গেলে জীবনের আসল মানেটাই হারিয়ে যায়। খারাপ সময়েও তিনি অভয় দিয়ে বলেন, 'কিছুই হয়নি বাবা, সামনে ভালো হবে'। হলিউডের *Interstellar* সিনেমার বাবা 'কুপার' চরিত্রটি এই সত্যই তুলে ধরে—বাবার কাছে সন্তানের গুরুত্ব মহাবিশ্বের চেয়েও মূল্যবান। সন্তানের জন্য বাবা সময়, দূরত্ব, এমনকি নিজের অস্তিত্বকেও পেছনে ফেলতে পারেন। অথচ মুখ ফুটে ওনাকে কখনো বলা হয় না, 'তোমায় ভালোবাসি'।"


লড়াকু মানসিকতার এক নীরব অনুপ্রেরণা বাবা; আশিকুর রহমান আশিক (শিক্ষার্থী, কৃষি অর্থনীতি অনুষদ):

"ছেলেদের কাছে বাবার গুরুত্বটা একটু অন্যরকম। বাবারা ছেলেদের সাথে সহজে আবেগের কথা বলেন না, আর ছেলেরাও বাবার সামনে কেমন যেন আড়ষ্ট থাকে। যেন দুজনের মাঝে নীরব এক দেয়াল! কিন্তু একজন ছেলেই বোঝে, বাবার কাঁধের দায়িত্বের বোঝাটা ঠিক কতটা ভারী। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যখন হাঁটতাম, নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মনে হতো। আজ যখন নিজের ক্যারিয়ার গড়ার লড়াইয়ে নেমেছি, প্রতিটা পদক্ষেপে বাবার সেই লড়াকু মানসিকতা আমাকে শক্তি দেয়। আমি হয়তো বাবার সামনে গিয়ে কোনোদিন বলতে পারব না 'ভালোবাসি', কিন্তু মনে মনে প্রতিটা ক্ষণে আমি ওনার মতোই একজন দায়িত্বশীল পুরুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি।"


বাবা নেই, তবুও প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর ছায়া খুঁজি; আমিন উল্লাহ (শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ) :

"বাবা যেন এক ছায়াতল, বটবৃক্ষের মতো আগলে রাখা এক নিরাপদ আশ্রয়। পরিবারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে সন্তানের মুখের হাসিতেই যিনি খুঁজে নেন নিজের সুখ। ছোটবেলা থেকে দেখেছি, আমাদের ভালো রাখার জন্য বাবা কত কষ্ট করেছেন, কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। তারপর থেকে প্রতিটি দিনই যেন তাঁকে নতুন করে মনে করার দিন। তোমার ভালোবাসা, তোমার স্নেহ, তোমার উপদেশ আর হাজারো স্মৃতি আজও আমাকে পথ দেখায়। বাবা, তোমার শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। শুধু একটি আক্ষেপ হৃদয়ে রয়ে গেছে- তোমার জন্য কিছু করার আগেই তুমি চলে গেলে। তবুও তোমার শেখানো পথেই চলার চেষ্টা করি, আর হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করি, কারণ তুমি সেটাই চাইতে। তোমার ছেলে তোমাকে অনেক ভালোবাসে বাবা, আজও, প্রতিদিন।"


গল্পগুলো আলাদা, মুখগুলো ভিন্ন, কিন্তু অনুভূতির সুতোটা ঠিক একই জায়গায় গিয়ে মিলেছে। এই পৃথিবীতে বাবারা এমনই হন- তাঁরা কখনো বৃক্ষ, কখনো ছাতা, আবার কখনো ঝড়ের রাতে এক বুক সাহস। আর যাঁদের বাবা আজ এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের জন্য আজ শুধুই হৃদয়ের গভীর থেকে প্রার্থনা "আল্লাহ তাঁদের জান্নাত নসীব করুন।"


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত