ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

সমষ্টির বাইরে ঘটে না মুক্তি



সমষ্টির বাইরে ঘটে না মুক্তি

বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। বাংলা যাদের মাতৃভাষা পৃথিবীতে আজ তাদের সংখ্যা ২৫ কোটি। সেই হিসাবে বাংলা এখন চতুর্থ স্থানে। বাংলায় রয়েছে উৎকৃষ্ট সাহিত্য।

অন্তরায়টা কোথায়? বলা হবে অভাব আছে সদিচ্ছার। কিন্তু কার ইচ্ছার কথা বলা হচ্ছে? ব্যক্তি, নাকি প্রতিষ্ঠানের? ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা কিন্তু অনেক আগেও দেখা গেছে। এখনো যে দেখা যায় না তা নয়। তবে তাতে কাজ হয়নি, বাংলা চলেনি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশশাসিত অবিভক্ত ভারতে, বাংলা প্রচলনের আগ্রহের ব্যাপারে খবর পাওয়া যায়; রাজনারায়ণ বসু জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। যেখানে নিয়ম চালু করা হয়েছিল যে কথাবার্তা সব বাংলায় হবে। কেবল তা- নয়, অভ্যাসবশত কেউ যদি ইংরেজি ব্যবহার করেন, তবে প্রতি বাক্যের জন্য তাকে এক পয়সা হারে জরিমানা দিতে হবে। বলা বাহুল্য এক পয়সা তখন অনেক পয়সা বৈকি।

কিন্তু ওই প্রচেষ্টায় তেমন জোর ছিল না। কেননা এটা সীমাবদ্ধ ছিল গুটিকয়েক ভদ্রলোকের cHতর। যারা নিজেদের কেবল বাঙালি নয়, একই সঙ্গে বাঙালি হিন্দু মনে করতেন, কখনো কখনো হিন্দু পরিচয়টিই বরং বড় হয়ে উঠত। ঠিক উল্টো কাজ অবশ্য করতে আগ্রহী ছিলেন নবাব আবদুল লতিফের অনুসারীরা। তারা বাংলা নয়, উর্দু চালু করতে উৎসাহী ছিলেন।

তবে পরস্পরবিরোধী দুই দলের মধ্যে মানসিকতার দিক থেকে এক জায়গায় ঐক্য ছিল। সেটা হলোছোটলোকদের কাছ থেকে দূরে থাকা এবং নিজেদের সাম্প্রদায়িক পরিচয় উচ্চে তুলে ধরা।

কিন্তু রাজনারায়ণদের বাংলা ভাষা এবং আবদুল লতিফদের উর্দু ভাষা চালু করার সদিচ্ছা-এই দুয়ের কোনোটাই যে সফল হয়নি, তার মূল কারণ ছিল একটাই। রাষ্ট্রক্ষমতার বিরূপতা। রাষ্ট্র চায়নি স্থানীয় ভাষা চলুক, তাই প্রচলনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ নামে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাষ্ট্র তো চায় বাংলা চলুক। তাহলে চলছে না কেন? জবাবটা সোজা, রাষ্ট্র বলে বটে যে সে চায়, কিন্তু আসলে চায় না, চাইলে বাংলা চলত। কেন চায় না? রাষ্ট্র তো বাঙালির রাষ্ট্র। তাহলে? জবাব হলো এই যে এই রাষ্ট্র বাঙালিরা প্রতিষ্ঠা করেছে ঠিকই, কিন্তু এটি এখনো সত্যিকার অর্থে জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। রাষ্ট্র রয়ে গেছে সেই আগের মতোই। এবং পর্যায়ক্রমে এই রাষ্ট্রের কর্তা যারা, তারাই কার্যকরভাবে চায় না বাংলা চলুক, যেজন্য বাংলার এমন কোণঠাসা দশা। এখানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক।

শাসক শ্রেণি এখন নির্বাচন নিয়ে খুবই ব্যস্ত। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তথাকথিত সুশীল সমাজকেও যখন দেখি, কীভাবে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে, এসব নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হতে, তখন নতুন করে বোঝা যায় যে নির্বাচন নিয়ে অনভিপ্রেত কিছু ঘটার পাঁয়তারা চলছে।

রাজার ভাষা আর প্রজার ভাষা যে এক হয় না, তার প্রমাণ তো আমাদের ইতিহাসে রয়েছে। বাংলা চিরকালই ছিল প্রজার ভাষা, রাজার ভাষা ছিল ভিন্ন, সংস্কৃত, ফার্সি ইংরেজি। এখন অবশ্য রাজা নেই, কিন্তু শাসক শ্রেণি তো আছে। তারাও অনেক ক্ষেত্রে জনগণ থেকে নিজেদের আলাদা মনে করে। সেই যে তাদের দূরত্ব তার প্রকাশ নানাভাবে ঘটে। ধনসম্পদ, ক্ষমতা, শিক্ষা, পাহারাদার, পোশাকপরিচ্ছদ, আহারবিহারসহ বহু ক্ষেত্রে শাসকরা জনগণ থেকে আলাদা। আলাদা তারা ভাষাতেও। তারা ইংরেজিই পছন্দ করে। কেননা ওই ভাষা ব্যবহার করলে তারা যে বাংলাদেশের মানুষ হয়েও সাধারণ মানুষ নয়, সেটা প্রকাশ পায়। তা ছাড়া বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি হচ্ছে বিশ্ব পুঁজিবাদের আজ্ঞাবহ। ওই পুঁজিবাদের রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে ইংরেজি। সেটা একটা বড় কারণ, যেজন্য শাসক শ্রেণি ইংরেজি ভক্ত। ব্যাপারটা তাই স্পষ্ট। বাংলা ভাষার শত্রু অন্য কেউ নয়, শত্রু হচ্ছে দেশের শাসক শ্রেণি এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য যোগাযোগসক্ষমতা অর্জনের আকুলতা। জনগণের ভাষা এখানে ততটাই অসহায়, জনগণ নিজেরা যতটা দুর্দশার ভিতর পতিত। ভাষার লড়াইটা আসলেই একটা রাজনৈতিক লড়াই, আগেও ছিল, এখনো রয়েছে। দেশে বাংলা তখনই সর্বস্তরে সর্বপর্যায়ে চালু হবে, যখন রাষ্ট্র যথার্থই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হবে, তার আগে নয়। ভাষা প্রচলনের চেষ্টাকে তাই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এর বাইরের কাজগুলো হবে সংস্কারমূলক। তাতে অর্জন কিছু ঘটলেও তা বিস্তৃত হবে না, তাদের ধরে রাখাও সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে এখন যে ধরনের মৌলবাদী তৎপরতা চলছে, তার সঙ্গেও বাংলার অপ্রচলন সরাসরি জড়িত। মৌলবাদীদের প্রায় সবাই মাদ্রাসায় শিক্ষিত, অর্থাৎ বাংলা ভাষার শিক্ষা ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার যে বিস্তার সেটাও কিন্তু খড়ে-ঠাসা কৃত্রিম মানুষ তৈরি করছে। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ সৃষ্টির জন্য মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায়ই নেই।

মোটকথা আমরা কিছুতেই সুস্থ স্বাভাবিক হতে পারব না, এগোতেও পারব না সামনের দিকে, যদি না সর্বস্তরে সগৌরবে বাংলার প্রচলন ঘটাতে পারি। বিশ্বায়নের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়ানোর জায়গাটাও কিন্তু ওই মাতৃভাষার চর্চাই। ওইখানে দাঁড়িয়েই আমাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক হওয়া সম্ভব। যে-বৃক্ষের শিকড় দুর্বল, সে কি করে আকাশের দিকে বেড়ে উঠবে, তার পক্ষে তো টিকে থাকাটাই অসম্ভব।

দুই.

এখন এটা আর মোটেই অস্পষ্ট নয় যে বাংলাদেশের অসংখ্য সমস্যার ভিতর প্রধানটি হচ্ছে দেশের শাসক শ্রেণি। সবকিছু এরাই করে এবং যা কিছু করে তার বেশির ভাগই জনগণের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এই শাসক শ্রেণির নানা অংশ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আছে, মানুষ আছে নানা ধরনের। আর এদের সবাই যে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত মন্দ স্বভাবের তা- নয়। তবে শ্রেণি হিসেবে শাসকরা অখণ্ড বটে এবং এদের সমষ্টিগত চরিত্র জনবিরোধী। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আজকের দিনে আমাদের দেশে প্রধান দ্বন্দ্বটা হচ্ছে শাসকদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব।

শাসক শ্রেণিতে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সাবেক বর্তমান আমলা, বিত্তবান পেশাজীবী, সবাই আছে; এবং শ্রেণিটি যে আনকোরা নতুন, তা- নয়। ব্রিটিশ শাসনের কালে এর বিকাশের শুরু, পাকিস্তান আমলে সে অনুকূল আলো-হাওয়া পেয়েছে। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনভাবে বিস্ময়কর গতিতে বেড়েছে, ফুলেছে ফেঁপেছে। এদের মূল কাজ উৎপাদন নয়। এমনকি উৎপাদনে উৎসাহ দানও নয়, মূল কাজ হচ্ছে লুণ্ঠন। সে কারণে দেশে রাজনীতি বলতে এখন যা দাঁড়িয়েছে, তা হলো ক্ষমতা সম্পদ নিয়ে এই শ্রেণির বিভিন্ন অংশের ভিতর নির্লজ্জ কাড়াকাড়ি।

এর বিপরীতে জনগণের কাজটা সম্পূর্ণ আলাদা। তারা উৎপাদন করে এবং মুক্তি চায়। জনগণের মুক্তি দরকার শাসক শ্রেণির নিষ্পেষণের কবজা থেকে। সেই লক্ষ্যে তাদের সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। মুক্তির সেই সংগ্রামটা আজও চলছে। ইতোমধ্যে জনগণের কারণে যত কিছু অর্জন ঘটেছে, তা শাসক শ্রেণি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

একাত্তরের যুদ্ধের কথা আমরা বারবার স্মরণ করি, করা উচিতও বটে। সেই যুদ্ধে দেশের সব শ্রেণির মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তখন সবাই ছিল সবার মিত্র। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র চিত্রটা বদলে গেছে। রাজনৈতিকভাবে বিত্তবানরাই নেতৃত্বে ছিল, যুদ্ধের পরে তারা আরও বিত্তবান হওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। সমষ্টির স্বার্থকে সবিক্রমে পদদলিত করে নিজের নিজের স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর হয়েছিল। তাদের লালসা, অপচয় ভোগবাদিতা দেশের আবহাওয়া বিষাক্ত করে ছেড়েছে। তাদের চাপ দৃষ্টান্তে ক্রমাবনতি ঘটেছে দেশপ্রেমের।

কিন্তু এর মধ্যেও মানুষ রুখে দাঁড়াচ্ছে। যেমন দাঁড়িয়েছিল একাত্তরে, কারও ঘোষণা বা ডাক শোনার জন্য অপেক্ষা করেনি। দেশের শাসক শ্রেণি তৈরি পোশাক-শ্রমিকদের দুর্দশার খোঁজ রাখে না, তারা শ্রমিক বিদ্রোহের কারণ বোঝে না, কেবল ষড়যন্ত্র দেখতে পায়। আত্মস্বার্থ উদ্ধারে কবলিত সম্পূর্ণরূপে দেশপ্রেমবিবর্জিত এই শাসক শ্রেণি কেবল যে শোষণ করে তা নয়, তারা দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারেও লিপ্ত। তথাকথিত বিদেশি বিনিয়োগকে এরা প্রাণপণে ডাকাডাকি করে, কিন্তু দেশের ভিতর পুঁজি গড়ে উঠুক, বিনিয়োগের জন্য অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো পরিবেশ তৈরি হোক এটা চায় না। চালু কলকারখানাকে বন্ধ করে দিয়ে এরা জমি যন্ত্রপাতি লুটপাট করে নেওয়ার ঘটনা ক্রমাগত ঘটেছে।

শাসক শ্রেণি এখন নির্বাচন নিয়ে খুবই ব্যস্ত। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তথাকথিত সুশীল সমাজকেও যখন দেখি, কীভাবে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে, এসব নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হতে, তখন নতুন করে বোঝা যায় যে নির্বাচন নিয়ে অনভিপ্রেত কিছু ঘটার পাঁয়তারা চলছে। জনগণ কিন্তু ঠিকই জানে যে নির্বাচন হচ্ছে শাসকদের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নানা কৌশল, সেটা প্রায় উন্মোচিত। অভিজ্ঞতাই বলে দেয় যে নির্বাচন জনগণকে মুক্তি দেবে না; শাসক শ্রেণির অপকর্ম অব্যাহত রাখার ব্যাপারে বৈধতা নেওয়ার আয়োজন আশঙ্কা করছি মাত্র।

জনগণ চায় মুক্তি। নির্বাচন এখন পঞ্চবার্ষিকী তামাশা বটে। এতে ঢাকঢোল বাজে, টাকার স্রোত বয়। মানুষ তাতে অংশ নেবে বলে মনে হচ্ছে না, জনগণের মুক্তির জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। প্রয়োজন ব্যক্তির সামাজিক অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তু মনে রাখতে হবে-ব্যক্তির মুক্তি কখনোই সমষ্টির মুক্তির বাইরে ঘটে না, উপায় নেই ঘটবার।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : মতামত মুক্তি

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬


সমষ্টির বাইরে ঘটে না মুক্তি

প্রকাশের তারিখ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। বাংলা যাদের মাতৃভাষা পৃথিবীতে আজ তাদের সংখ্যা ২৫ কোটি। সেই হিসাবে বাংলা এখন চতুর্থ স্থানে। বাংলায় রয়েছে উৎকৃষ্ট সাহিত্য।

অন্তরায়টা কোথায়? বলা হবে অভাব আছে সদিচ্ছার। কিন্তু কার ইচ্ছার কথা বলা হচ্ছে? ব্যক্তি, নাকি প্রতিষ্ঠানের? ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা কিন্তু অনেক আগেও দেখা গেছে। এখনো যে দেখা যায় না তা নয়। তবে তাতে কাজ হয়নি, বাংলা চলেনি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশশাসিত অবিভক্ত ভারতে, বাংলা প্রচলনের আগ্রহের ব্যাপারে খবর পাওয়া যায়; রাজনারায়ণ বসু জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। যেখানে নিয়ম চালু করা হয়েছিল যে কথাবার্তা সব বাংলায় হবে। কেবল তা- নয়, অভ্যাসবশত কেউ যদি ইংরেজি ব্যবহার করেন, তবে প্রতি বাক্যের জন্য তাকে এক পয়সা হারে জরিমানা দিতে হবে। বলা বাহুল্য এক পয়সা তখন অনেক পয়সা বৈকি।

কিন্তু ওই প্রচেষ্টায় তেমন জোর ছিল না। কেননা এটা সীমাবদ্ধ ছিল গুটিকয়েক ভদ্রলোকের cHতর। যারা নিজেদের কেবল বাঙালি নয়, একই সঙ্গে বাঙালি হিন্দু মনে করতেন, কখনো কখনো হিন্দু পরিচয়টিই বরং বড় হয়ে উঠত। ঠিক উল্টো কাজ অবশ্য করতে আগ্রহী ছিলেন নবাব আবদুল লতিফের অনুসারীরা। তারা বাংলা নয়, উর্দু চালু করতে উৎসাহী ছিলেন।

তবে পরস্পরবিরোধী দুই দলের মধ্যে মানসিকতার দিক থেকে এক জায়গায় ঐক্য ছিল। সেটা হলোছোটলোকদের কাছ থেকে দূরে থাকা এবং নিজেদের সাম্প্রদায়িক পরিচয় উচ্চে তুলে ধরা।

কিন্তু রাজনারায়ণদের বাংলা ভাষা এবং আবদুল লতিফদের উর্দু ভাষা চালু করার সদিচ্ছা-এই দুয়ের কোনোটাই যে সফল হয়নি, তার মূল কারণ ছিল একটাই। রাষ্ট্রক্ষমতার বিরূপতা। রাষ্ট্র চায়নি স্থানীয় ভাষা চলুক, তাই প্রচলনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ নামে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাষ্ট্র তো চায় বাংলা চলুক। তাহলে চলছে না কেন? জবাবটা সোজা, রাষ্ট্র বলে বটে যে সে চায়, কিন্তু আসলে চায় না, চাইলে বাংলা চলত। কেন চায় না? রাষ্ট্র তো বাঙালির রাষ্ট্র। তাহলে? জবাব হলো এই যে এই রাষ্ট্র বাঙালিরা প্রতিষ্ঠা করেছে ঠিকই, কিন্তু এটি এখনো সত্যিকার অর্থে জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। রাষ্ট্র রয়ে গেছে সেই আগের মতোই। এবং পর্যায়ক্রমে এই রাষ্ট্রের কর্তা যারা, তারাই কার্যকরভাবে চায় না বাংলা চলুক, যেজন্য বাংলার এমন কোণঠাসা দশা। এখানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক।

শাসক শ্রেণি এখন নির্বাচন নিয়ে খুবই ব্যস্ত। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তথাকথিত সুশীল সমাজকেও যখন দেখি, কীভাবে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে, এসব নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হতে, তখন নতুন করে বোঝা যায় যে নির্বাচন নিয়ে অনভিপ্রেত কিছু ঘটার পাঁয়তারা চলছে।

রাজার ভাষা আর প্রজার ভাষা যে এক হয় না, তার প্রমাণ তো আমাদের ইতিহাসে রয়েছে। বাংলা চিরকালই ছিল প্রজার ভাষা, রাজার ভাষা ছিল ভিন্ন, সংস্কৃত, ফার্সি ইংরেজি। এখন অবশ্য রাজা নেই, কিন্তু শাসক শ্রেণি তো আছে। তারাও অনেক ক্ষেত্রে জনগণ থেকে নিজেদের আলাদা মনে করে। সেই যে তাদের দূরত্ব তার প্রকাশ নানাভাবে ঘটে। ধনসম্পদ, ক্ষমতা, শিক্ষা, পাহারাদার, পোশাকপরিচ্ছদ, আহারবিহারসহ বহু ক্ষেত্রে শাসকরা জনগণ থেকে আলাদা। আলাদা তারা ভাষাতেও। তারা ইংরেজিই পছন্দ করে। কেননা ওই ভাষা ব্যবহার করলে তারা যে বাংলাদেশের মানুষ হয়েও সাধারণ মানুষ নয়, সেটা প্রকাশ পায়। তা ছাড়া বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি হচ্ছে বিশ্ব পুঁজিবাদের আজ্ঞাবহ। ওই পুঁজিবাদের রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে ইংরেজি। সেটা একটা বড় কারণ, যেজন্য শাসক শ্রেণি ইংরেজি ভক্ত। ব্যাপারটা তাই স্পষ্ট। বাংলা ভাষার শত্রু অন্য কেউ নয়, শত্রু হচ্ছে দেশের শাসক শ্রেণি এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য যোগাযোগসক্ষমতা অর্জনের আকুলতা। জনগণের ভাষা এখানে ততটাই অসহায়, জনগণ নিজেরা যতটা দুর্দশার ভিতর পতিত। ভাষার লড়াইটা আসলেই একটা রাজনৈতিক লড়াই, আগেও ছিল, এখনো রয়েছে। দেশে বাংলা তখনই সর্বস্তরে সর্বপর্যায়ে চালু হবে, যখন রাষ্ট্র যথার্থই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হবে, তার আগে নয়। ভাষা প্রচলনের চেষ্টাকে তাই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এর বাইরের কাজগুলো হবে সংস্কারমূলক। তাতে অর্জন কিছু ঘটলেও তা বিস্তৃত হবে না, তাদের ধরে রাখাও সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে এখন যে ধরনের মৌলবাদী তৎপরতা চলছে, তার সঙ্গেও বাংলার অপ্রচলন সরাসরি জড়িত। মৌলবাদীদের প্রায় সবাই মাদ্রাসায় শিক্ষিত, অর্থাৎ বাংলা ভাষার শিক্ষা ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার যে বিস্তার সেটাও কিন্তু খড়ে-ঠাসা কৃত্রিম মানুষ তৈরি করছে। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ সৃষ্টির জন্য মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায়ই নেই।

মোটকথা আমরা কিছুতেই সুস্থ স্বাভাবিক হতে পারব না, এগোতেও পারব না সামনের দিকে, যদি না সর্বস্তরে সগৌরবে বাংলার প্রচলন ঘটাতে পারি। বিশ্বায়নের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়ানোর জায়গাটাও কিন্তু ওই মাতৃভাষার চর্চাই। ওইখানে দাঁড়িয়েই আমাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক হওয়া সম্ভব। যে-বৃক্ষের শিকড় দুর্বল, সে কি করে আকাশের দিকে বেড়ে উঠবে, তার পক্ষে তো টিকে থাকাটাই অসম্ভব।

দুই.

এখন এটা আর মোটেই অস্পষ্ট নয় যে বাংলাদেশের অসংখ্য সমস্যার ভিতর প্রধানটি হচ্ছে দেশের শাসক শ্রেণি। সবকিছু এরাই করে এবং যা কিছু করে তার বেশির ভাগই জনগণের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এই শাসক শ্রেণির নানা অংশ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আছে, মানুষ আছে নানা ধরনের। আর এদের সবাই যে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত মন্দ স্বভাবের তা- নয়। তবে শ্রেণি হিসেবে শাসকরা অখণ্ড বটে এবং এদের সমষ্টিগত চরিত্র জনবিরোধী। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আজকের দিনে আমাদের দেশে প্রধান দ্বন্দ্বটা হচ্ছে শাসকদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব।

শাসক শ্রেণিতে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সাবেক বর্তমান আমলা, বিত্তবান পেশাজীবী, সবাই আছে; এবং শ্রেণিটি যে আনকোরা নতুন, তা- নয়। ব্রিটিশ শাসনের কালে এর বিকাশের শুরু, পাকিস্তান আমলে সে অনুকূল আলো-হাওয়া পেয়েছে। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনভাবে বিস্ময়কর গতিতে বেড়েছে, ফুলেছে ফেঁপেছে। এদের মূল কাজ উৎপাদন নয়। এমনকি উৎপাদনে উৎসাহ দানও নয়, মূল কাজ হচ্ছে লুণ্ঠন। সে কারণে দেশে রাজনীতি বলতে এখন যা দাঁড়িয়েছে, তা হলো ক্ষমতা সম্পদ নিয়ে এই শ্রেণির বিভিন্ন অংশের ভিতর নির্লজ্জ কাড়াকাড়ি।

এর বিপরীতে জনগণের কাজটা সম্পূর্ণ আলাদা। তারা উৎপাদন করে এবং মুক্তি চায়। জনগণের মুক্তি দরকার শাসক শ্রেণির নিষ্পেষণের কবজা থেকে। সেই লক্ষ্যে তাদের সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। মুক্তির সেই সংগ্রামটা আজও চলছে। ইতোমধ্যে জনগণের কারণে যত কিছু অর্জন ঘটেছে, তা শাসক শ্রেণি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

একাত্তরের যুদ্ধের কথা আমরা বারবার স্মরণ করি, করা উচিতও বটে। সেই যুদ্ধে দেশের সব শ্রেণির মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তখন সবাই ছিল সবার মিত্র। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র চিত্রটা বদলে গেছে। রাজনৈতিকভাবে বিত্তবানরাই নেতৃত্বে ছিল, যুদ্ধের পরে তারা আরও বিত্তবান হওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। সমষ্টির স্বার্থকে সবিক্রমে পদদলিত করে নিজের নিজের স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর হয়েছিল। তাদের লালসা, অপচয় ভোগবাদিতা দেশের আবহাওয়া বিষাক্ত করে ছেড়েছে। তাদের চাপ দৃষ্টান্তে ক্রমাবনতি ঘটেছে দেশপ্রেমের।

কিন্তু এর মধ্যেও মানুষ রুখে দাঁড়াচ্ছে। যেমন দাঁড়িয়েছিল একাত্তরে, কারও ঘোষণা বা ডাক শোনার জন্য অপেক্ষা করেনি। দেশের শাসক শ্রেণি তৈরি পোশাক-শ্রমিকদের দুর্দশার খোঁজ রাখে না, তারা শ্রমিক বিদ্রোহের কারণ বোঝে না, কেবল ষড়যন্ত্র দেখতে পায়। আত্মস্বার্থ উদ্ধারে কবলিত সম্পূর্ণরূপে দেশপ্রেমবিবর্জিত এই শাসক শ্রেণি কেবল যে শোষণ করে তা নয়, তারা দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারেও লিপ্ত। তথাকথিত বিদেশি বিনিয়োগকে এরা প্রাণপণে ডাকাডাকি করে, কিন্তু দেশের ভিতর পুঁজি গড়ে উঠুক, বিনিয়োগের জন্য অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো পরিবেশ তৈরি হোক এটা চায় না। চালু কলকারখানাকে বন্ধ করে দিয়ে এরা জমি যন্ত্রপাতি লুটপাট করে নেওয়ার ঘটনা ক্রমাগত ঘটেছে।

শাসক শ্রেণি এখন নির্বাচন নিয়ে খুবই ব্যস্ত। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তথাকথিত সুশীল সমাজকেও যখন দেখি, কীভাবে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে, এসব নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হতে, তখন নতুন করে বোঝা যায় যে নির্বাচন নিয়ে অনভিপ্রেত কিছু ঘটার পাঁয়তারা চলছে। জনগণ কিন্তু ঠিকই জানে যে নির্বাচন হচ্ছে শাসকদের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নানা কৌশল, সেটা প্রায় উন্মোচিত। অভিজ্ঞতাই বলে দেয় যে নির্বাচন জনগণকে মুক্তি দেবে না; শাসক শ্রেণির অপকর্ম অব্যাহত রাখার ব্যাপারে বৈধতা নেওয়ার আয়োজন আশঙ্কা করছি মাত্র।

জনগণ চায় মুক্তি। নির্বাচন এখন পঞ্চবার্ষিকী তামাশা বটে। এতে ঢাকঢোল বাজে, টাকার স্রোত বয়। মানুষ তাতে অংশ নেবে বলে মনে হচ্ছে না, জনগণের মুক্তির জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। প্রয়োজন ব্যক্তির সামাজিক অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তু মনে রাখতে হবে-ব্যক্তির মুক্তি কখনোই সমষ্টির মুক্তির বাইরে ঘটে না, উপায় নেই ঘটবার।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত