ঢাকার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে চীনের সহায়তায় স্মার্ট ক্লাসরুম
ঢাকার মাতুয়াইলে অবস্থিত সামসুল
হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ কর্মসূচি। আজ
৫ নভেম্বর সকালে প্রতিষ্ঠানটির প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘লাইটিং আপ দ্য ফিউচার’ শীর্ষক
অনুষ্ঠানে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের
মন্ত্রী লিউ হাইসিং এবং বাংলাদেশের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. এ. এন.
এম. এহসানুল হক মিলন যৌথভাবে দুটি আধুনিক ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্বোধন
করেন। লিউ হাইসিংয়ের তিন দিনব্যাপী বাংলাদেশ সফরের শেষ দিনে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক
সূচনা বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আরেকটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছে।এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে এক
আবেগময় ঐতিহাসিক যোগসূত্র। ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব
পালন করেছিলেন লিউ হাইসিংয়ের বাবা বিশিষ্ট কূটনীতিক লিউ শুচুইং। চার দশক পর পিতার
কূটনৈতিক পদাঙ্ক অনুসরণ করে সিপিসি’র আন্তর্জাতিক বিভাগের শীর্ষনেতা
হিসেবে লিউ হাইসিংয়ের ঢাকায় আসা কেবল পারিবারিক ও কূটনৈতিক ধারাবাহিকতারই প্রতীক
নয়; বরং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়ার
নতুন স্তরে উন্নীত করার সুযোগও তৈরি করেছে।অবকাঠামোর
পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে নতুন সহযোগিতাবিগত দুই দশকে বাংলাদেশে চীনের
অর্থনৈতিক সহযোগিতা মূলত বড় অবকাঠামো প্রকল্প—সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সমুদ্রবন্দর—কেন্দ্রিক
ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সহযোগিতার পরিধি শিক্ষা, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন
ও মানবসম্পদ গড়ার মতো ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড
কলেজে স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন সেই সম্প্রসারিত সহযোগিতারই একটি বাস্তব উদাহরণ।এই উদ্যোগটি ঢাকা ও বেইজিংয়ের
মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা জোরদারের প্রত্যক্ষ ফল। দুই দেশের শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে যে
নয়টি প্রধান ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্মতি হয়েছে, তার মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তর,
বৃত্তিমূলক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বিশ্বমানের স্মার্ট ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা অন্যতম।
চায়না ফাউন্ডেশন ফর পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (CFPD)-এর বাস্তবায়নে এবং বাংলাদেশে
বসবাসরত চীনা প্রবাসীদের সংগঠনের সহায়তায় পরিচালিত এই উদ্যোগে হুয়াওয়ের প্রযুক্তিগত
সক্ষমতাকে শিক্ষা খাতে কাজে লাগানো হয়েছে।অনুষ্ঠানে মোট ২৮টি ক্যাটাগরির
শিক্ষা ও প্রযুক্তি সরঞ্জাম হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে প্রধান উপকরণ হিসেবে রয়েছে
২টি স্মার্ট ক্লাসরুম এবং ৫০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার। ইন্টারেক্টিভ শিক্ষার জন্য দেওয়া
হয়েছে ১টি হুয়াওয়ে স্মার্টবোর্ড (IdeaHub)। শিক্ষার্থীদের আরামদায়ক শিখন পরিবেশ
নিশ্চিত করতে ৪৮ সেট আধুনিক টেবিল-চেয়ার এবং ৪টি এয়ার কন্ডিশনার সরবরাহ করা হয়। এছাড়া
রয়েছে ১টি ওয়াটার হিটার। সবশেষে, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সমন্বিত সহায়তার
জন্য বিভিন্ন ধরনের পেন্সিল বক্স, নোটবুক ও ক্রীড়া সামগ্রী প্রদান করা হয়।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনা দূতাবাসের
চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউইন, সিপিসি’র উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি
দল এবং বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এই সহযোগিতাকে
আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।তৃণমূলের
শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগশিক্ষামন্ত্রী ড. এ. এন. এম.
এহসানুল হক মিলন অনুষ্ঠানে দুই দেশের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে সামাজিক উন্নয়নের
সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, চীনা প্রযুক্তিগত সহায়তাকে শুধু চুক্তির
নথিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ঢাকার প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের হাতের
নাগালে পৌঁছে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,
আধুনিক কম্পিউটার শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ভাষা শেখানোর উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক
শ্রমবাজারের জন্য আরও উপযুক্ত করে তুলবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।অন্যদিকে লিউ হাইসিং বলেন,
এই স্মার্ট ক্লাসরুম ও প্রযুক্তিসামগ্রী নিছক দান নয়; এগুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের
ডিজিটাল অর্থনীতিতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার স্থায়ী সুযোগ তৈরি করবে। চীন
ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকগুলোর বাস্তবায়ন তৃণমূল পর্যায়ে
পৌঁছেছে—এই
উদ্যোগ তারই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ।ভাষা
ও প্রযুক্তির সমন্বয়ঢাকার এই উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে
প্রযুক্তি সরবরাহের পাশাপাশি চীনা ভাষা শিখন কর্মসূচি চালুর বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রযুক্তির সঙ্গে ভাষা শিক্ষাকে যুক্ত করার এই উদ্যোগ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য
চীনের বিকাশমান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার নতুন দরজা খুলে
দিচ্ছে। এর আগে চাঁদপুর ও সিলেটে সরকারি ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চীনের অনুরূপ
‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিল।
ঢাকায় এই উদ্যোগ সেই সহযোগিতাকে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।বন্ধুত্বের
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগপর্যবেক্ষকরা বলছেন, শিক্ষা
ও প্রযুক্তি খাতে এই ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা
নিশ্চিত করতে সহায়ক। পুঁজি বা অবকাঠামোর পাশাপাশি জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তি বিনিময়
এখন দুই দেশের বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠছে। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড
কলেজে চীনের সহায়তায় স্মার্ট ক্লাসরুম শুধু একটি প্রযুক্তিগত সংযোজন নয়; এটি বাংলাদেশের
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ-চীন মৈত্রীর নতুন প্রজন্মের সেতুও নির্মাণ
করছে।পরিশেষে বলা যায় যে শিক্ষা,
প্রযুক্তি ও মানুষের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বকে আরও গভীর ও
জনমুখী করার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে ঢাকার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে
চীনের সহায়তায় স্থাপিত স্মার্ট ক্লাসরুম।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ