ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ১৯৪৭ সালেই শুরু হয় প্রথম প্রতিবাদ

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের আগেই বাংলা ভাষার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় ও বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ৩ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের দেশভাগ পরিকল্পনা প্রকাশের পর জুলাই মাসে ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দুকে করার দাবি তোলেন। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যের এই বিতর্কিত প্রস্তাবের বিপরীতে মুসলিম লীগ নেতারা তখন রহস্যজনক নীরবতা পালন করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির উত্তাল সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন উদাসীনতা ও ভাষার প্রশ্নে একপাক্ষিক অবস্থানই মূলত বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।ড. জিয়াউদ্দিনের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রথম বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ২৯ জুলাই (১৯৪৭ সাল) ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কালজয়ী প্রবন্ধ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’-তে তিনি অকাট্য যুক্তি দিয়ে বাংলার দাবি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি বাঙালির শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হওয়া উচিত বাংলা। কেবল লেখনীতেই নয়, বরং আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দাপ্তরিক কাজে বাংলার উপযোগিতা নিয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, যা পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের মূল প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক পরিসরেও ভাষার দাবি সম্পূর্ণ নতুন ছিল না। ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রস্তাবিত রূপরেখা ম্যানিফেস্টোতে আবুল হাশিম মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের দাবি উত্থাপন করেন। যা পরে ১৯৪৭ সালেই গণ আজাদী লীগ ও গণতান্ত্রিক যুবলীগ তাদের ইশতেহারে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম ও আদালতের ভাষা করার প্রস্তাব দেয়। তবে সরকারি সমর্থকদের বাধা এবং মুসলিম ছাত্রলীগের বিরোধিতার কারণে এসব উদ্যোগ তেমন কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। এ পটভূমিতে ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসে সাংগঠনিকভাবে প্রথম অগ্রণী ভূমিকা পালন করে 'তমদ্দুন মজলিশ'। ১ সেপ্টেম্বর (১৯৪৭ সালে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেমের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এই সাংস্কৃতিক সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে। একদল নিবেদিতপ্রাণ ছাত্র ও শিক্ষকের সমন্বয়ে গঠিত এই সংগঠনের মূল আদর্শ ছিল একটি মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ বিনির্মাণ। ১৯৪৮ সালে তারা তাদের নিজস্ব মুখপত্র সাপ্তাহিক 'সৈনিক' প্রকাশ করে। মূলত সাংস্কৃতিক সংগঠন হলেও, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা ছাড়িয়ে সারাদেশে জনমত তৈরিতে তমদ্দুন মজলিশ এক সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই, ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ শীর্ষক একটি ঐতিহাসিক বই প্রকাশ করে। পরে এতে অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন সতর্ক করে বলেন, ‘বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উর্দুকে বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্যর্থ হবে।‘একই পুস্তিকায় প্রখ্যাত সম্পাদক ও মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতা আবুল মনসুর আহমদ একটি বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাতারাতি সরকারি চাকরির অযোগ্য হয়ে পড়বে—যেমনটি ঘটেছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি চালু হওয়ার সময়। চাকরি হারানোর এই আশঙ্কা ভাষা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এই পুস্তিকায় অধ্যাপক আবুল কাশেম সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেন—পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা, আদালত ও দাপ্তরিক ভাষা হবে বাংলা। আর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুটি—বাংলা ও উর্দু। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের উদাহরণ টেনে দেখান, ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার নীতি মূলত সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। তমদ্দুন মজলিশ কেবল লেখালেখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে ফজলুল হক হলে আয়োজিত এক সাহিত্যসভায় হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, কবি জসীমউদ্‌দীনসহ বিশিষ্টজনেরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে এবং অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁঞাকে আহ্বায়ক করে রশিদ বিল্ডিংয়ে গঠিত হয় প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচি শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে ছাত্রদের প্রথম বিক্ষোভ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনের ঢেউ সচিবালয় পর্যন্ত পৌঁছালে ১২ ডিসেম্বর সরকারি কর্মচারীরাও ধর্মঘটে শামিল হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করলেও আন্দোলন দমে থাকেনি। ১৯৪৮-এর শুরুতে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান ঢাকা এলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ডাকটিকিট, মুদ্রা ও নিয়োগ পরীক্ষা থেকে বাংলা বাতিলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। মন্ত্রীর সঙ্গে এক উত্তপ্ত বিতর্ক শেষে তিনি এই বর্জনকে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে স্বীকার করতে বাধ্য হন। মূলত তমদ্দুন মজলিশের হাত ধরেই ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামোর সূচনা ঘটে। তাদের প্রাথমিক প্রতিরোধ, পুস্তিকা প্রকাশ এবং প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনই ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের বাধা দূর করে।   তথ্যসূত্র: ১. পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি: বদরুদ্দীন উমর ২. ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস: বশীর আল্ হেলাল ৩. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ঘটনা প্রবাহ ও প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ: এম.এ. বার্ণিক।     এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ১৯৪৭ সালেই শুরু হয় প্রথম প্রতিবাদ