ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

কবি নজরুল: বিদ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের চিরন্তন

কাজী নজরুল ইসলাম— জন্মই এক মহাকাব্যিক ইতিহাস। তাঁর জন্ম বিশ্ব মানচিত্রের এক ঐতিহাসিক পর্বে। নজরুল কবি, ঔপনাসিক, গল্পকার হয়েই শুধু ইতিহাস রচনা করেননি। তিনি একাধারে বিদ্রোহী ও রাজনীতিবিদও ছিলেন। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, গল্প, প্রবন্ধ ও জাতীয় চেতনায় কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক নাম— যিনি কেবল একজন কবি নন; তিনি এক মহাকালের প্রতীক, একটি সংগ্রামের ভাষা, সাম্যের প্রেমিক এবং মানবমুক্তির অগ্নিস্বর। তাঁর কবিতার শব্দে যেমন বিদ্রোহের বজ্রধ্বনি, তেমনি প্রেম, সাম্য, মানবতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির স্নিগ্ধ আহ্বান। অটল থেকেই মুক্তির গান গেয়েছেন নবযুগের মহাস্বপ্নে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিপরীতে নজরুল পরিগঠিত করেন নিজের আত্মপরিচয়। তিনি জানতে চান, কে আমি? তিনি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ করেছেন— এই ভূখন্ডে। তিনি গণচেতনার উত্থান গঠিয়ে জনতার দু:খ আর বিষাদকে ‘বুরোক্রেসি’ বা আমলাতন্ত্র শাসিত দেশের মায়াজাল থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন।জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম আমাদের জন্য শুধু স্মরণ করার উপলক্ষ নয়, শুধু একজন কবির জন্মস্মরণ নয়— বরং তাঁর আদর্শ, দর্শন ও চেতনাকে নতুনভাবে অনুধাবনের একটি সময় এবং মুক্তি ও মানবিক চেনতারও পুনরাবিষ্কারের দিন। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব কেটেছে— যা তাকে বিদ্রোহী ও সাম্যের কবি হয়ে উঠতে সার্বিক সহায়তা করেছে। জীবনসংগ্রামের সেই কঠিন বাস্তবতাই তাঁকে দিয়েছিল মানুষের দুঃখ বুঝার শক্তি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার সাহস। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা তিনি রূপ দিয়েছেন কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধে। তাই নজরুলকে বুঝতে হলে কেবল সাহিত্য পাঠ যথেষ্ট নয়; বুঝতে হবে তাঁর সময়, সমাজ ও সংগ্রাম।বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব ছিল এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মতো। রবীন্দ্রনাথের বিতর্কিত সাহিত্যধারার পাশাপাশি নজরুল নিয়ে এলেন বিদ্রোহের ভাষা। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা যেন বাঙালির আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার ঘোষণা। ‘আমি চির বিদ্রোহী বীর’— এই উচ্চারণ কেবল একটি কবিতার পংক্তি নয়, এটি পরাধীন মানুষের মুক্তির মন্ত্র। তিনি অন্যায়, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন নির্ভীকভাবে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল অগ্নিগর্ভ। এজন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে। কিন্তু কারাগারের অন্ধকারও তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি।বিদ্রোহী নজরুল ছিলেন গণমানুষের কবি। তিনি শ্রমিক, কৃষক, মজুর ও নিপীড়িত মানুষের কথা বলেছেন অপ্রত্যাশিত সাহসের সঙ্গে। তাঁর কবিতায় বারবার উঠে এসেছে অসাম্প্রদায়িক দুনিয়ায় সাম্যের বাণী। ‘গাহি সাম্যের গান— মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’— এই চেতনা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বিশ্বে যখন বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন, নিপীড়ন-নির্যাতন, গণহত্যা ও সামাজিক অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন নজরুলের সাম্যের দর্শন নতুন করে মানবজাতিকে পথ দেখায়। তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা দিয়েছেন। জাত, ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণির বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানবতাকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন।ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন অনবদ্য ও অনন্য— যার দ্বিতীয়জন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তিনি ছিলেন একজন মুসলমান কবি, কিন্তু তাঁর সাহিত্য ছিল অসাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি যেমন লিখেছেন ইসলামী গান ও হামদ-নাত, তেমনি রচনা করেছেন শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও ভজন। তাঁর কলমে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের সুর ছিল অত্যন্ত প্রবল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম মানুষের কল্যাণের জন্য, বিভেদের জন্য নয়। আজ যখন সমাজে ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজনের রাজনীতি করা হয়, তখন নজরুলের সাহিত্য আমাদের সম্প্রীতির পাঠ দেয়। আজকের দিনে ভারতীয় সমাজে হিন্দুত্ববাদের যে উগ্রতা চাষাবাদ হচ্ছে— যা জমিদার রবীন্দ্রনাথের তালুকদারেও ছিল, নজরুলের সাম্যের দুনিয়ায় এমনটা মোটেও ছিল না। নজরুলের মানবপ্রেম ও মানবিকতার চিন্তা-চেতনা ছিল গভীর। তাঁর প্রেমের কবিতা যেমন আবেগময়, তেমনি মানবপ্রেমে পূর্ণ। তিনি নারীজাতির মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নেও ছিলেন অগ্রসর চিন্তার মহামানব। তাই লিখেছেন—‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। এই উচ্চারণ নারীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও সমঅধিকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে। সেই সময়ের সমাজে যখন নারীকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ রাখা হতো, তখন নজরুল নারীর মুক্তি ও মর্যাদার কথা বারবার বলেছেন দৃঢভাবে।বাংলা সংগীতের বিশাল জগতেও নজরুল এক অনন্য বিস্ময়। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গান বাংলা সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। দিয়েছে বিশ্বদরবারে শীর্ষস্থান। প্রেম, দ্রোহ, আধ্যাত্মিকতা, দেশপ্রেম, ইসলামী চেতনা কিংবা শ্যামাসাধনা— সবক্ষেত্রেই তিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কালজয়ী গান। নজরুল সংগীত কেবল সুরের দুনিয়া নয়; এটি বাঙালির আবেগের জায়গা, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর গান মানুষকে জাগিয়েছে, আন্দোলিত করেছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে।বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সাবভৌমত্ব, সংগ্রাম ও জাতীয় চেতনায়ও নজরুলের প্রভাব অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর গান ও কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের হিংস্র দানবদের বিরুদ্ধে মুক্তি সংগ্রাম করতে অনুপ্রাণিত করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে জাতিকে গর্বিত করেছে। কারণ তাঁর সাহিত্য বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্খার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর কণ্ঠে আমরা শুনি মুক্তির মহান ডাক, প্রতিবাদের আহ্বান এবং মানবতার জয়গান।বর্তমান এই প্রজন্মের কাছে নজরুলকে নতুনভাবে তুলে ধরা একান্ত জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে তরুণদের অনেকেই সাহিত্য থেকে কেন জানি দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ নজরুলের সাহিত্য কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়; এটি জীবনের মূল্যবান শিক্ষা। মানবজাতির অন্তর্নিহিত পরিপূর্ণ বিকাশে নজরুল চর্চা অনিবার্য। নজরুলের রেখে যাওয়া মানবীয় সম্পদ জাতির সন্তানদের সুশিক্ষায় ব্যবহার করতে পারলেই জাতি হবে সমৃদ্ধ।  তাঁর সাহস, আত্মমর্যাদা, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা তরুণ সমাজকে আলোকিত করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে নজরুলচর্চা আরও বিস্তৃত করতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, তাঁর আদর্শকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণ করাই হবে প্রকৃত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।নজরুলের জীবন জাতিকে শেখায়, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হলে আপস করা যায় না। তিনি কখনও ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি। সাহিত্যকে তিনি মানুষের চূড়ান্ত মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কলমে ছিল প্রতিবাদের আগুন, আবার সাম্য ও মানবতার অমৃতধারা। তাই তিনি একই সঙ্গে বিদ্রোহের কবি এবং প্রেম ও দ্রোহের কবি। আজকের বিশ্বে যুদ্ধ, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্যের যে সংকট, সেখানে নজরুলের দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি শিখিয়েছেন মানুষে মানুষে বিভেদ নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা ও সাম্য। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই মানবতার দাবি। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের জন্মের ইতিহাস আমাদেরকে তাঁর চেতনাকে ধারণ করার অঙ্গিকারে ওয়াদাবদ্ধ হতে উৎসাহিত করে। কেবল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো নয়, সমাজে সাম্য, মানবতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তাঁকে সত্যিকার অর্থে সম্মান জানাতে হবে। তবেই সম্ভব হবে তাঁর চেনতাকে প্রকৃত ধারণের। নজরুল কোনো একটি সময়ের কবি নন; তিনি সব যুগের, সব মানুষের মহান এক কবি। তাঁর বিদ্রোহ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, তাঁর প্রেম মানবতার জন্য, তাঁর গান মুক্তির স্বপক্ষে।নজরুল অতীত থেকে বর্তমান প্রাসঙ্গিক। কারণ পৃথিবীতে এখনও অন্যায় আছে, শোষণ আছে, বৈষম্য আছে। যতদিন দুনিয়াজুড়ে মানবমুক্তির সংগ্রাম থাকবে, ততদিন নজরুল বেঁচে থাকবেন তাঁর কবিতা, গান ও চেতনায়। তাঁর জন্মদিন তাই কেবল স্মৃতিচারণের দিন নয়; এটি নতুন করে জেগে ওঠার দিন; সত্য, সাম্য ও ন্যায়ের পথে চলার এবং মুক্তি ও প্রেরণার দিন।জাতীয় কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে বলা যায়, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির হৃদয়ে নজরুল চির অম্লান, চির জাগ্রত, চির স্থায়ী। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত বিদ্রোহের শঙ্খধ্বনি আজও আমাদের সাহস জোগায়, তাঁর সাম্যের গান আজও মানবতার পথ দেখায়। তাই নজরুল মানেই জাগরণ, স্বাধীনতার চেতনা, মানুষের মুক্তির অমর আহ্বান। নজরুল মানেই সাম্য ও দারিদ্র মুক্ত এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।আসাদ পারভেজলেখক: ভূরাজনীতির গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক

কবি নজরুল: বিদ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের চিরন্তন