ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

গণহত্যার নীলনকশা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনিবার্য প্রেক্ষাপট

দ্বিজাতি তত্ত্বের আলোকে মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব-বাংলা (পূর্ব পাকিস্তান যা স্বাধীন বাংলাদেশ) পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডের সাথে মিলিত হয়ে স্বাধীনতার অমিয় স্বাদ গ্রহণে দিশেহারা ছিল। কিন্তু ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলা ভূখন্ডের মানুষের জীবন হাবিয়ার দোষখের নিপীড়ন আর অত্যাচার ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি। এমন সময় স্বাধীনচেতা মানুষগুলো মুক্তির নেশায় আওয়াজ তুলে। তাতেই নিপীড়কগোষ্ঠী রাক্ষসরূপী দানবের চেহারা ধারণ করে। এরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এ জাতির নিরস্ত্র মানুষগুলোর ওপর। বাঙালির ইতিহাসে এটি কেবল একটি ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের স্মারক নয়; যা ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর রাজনৈতিক ব্যর্থতা, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি সামরিক অবজ্ঞা এবং একটি জনগোষ্ঠীর জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করার চূড়ান্ত পরিণতি। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, তার সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। কিন্তু যে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল একটি ভূখণ্ডের মানুষকে দমিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে, সেটিই শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথকে আরও অনিবার্য করে তোলে। ন্যাক্কারজনক অপারেশন সার্চলাইটকে বুঝতে হলে ২৫ মার্চের রাত থেকে ইতিহাসের আলোচনা শুরু করলে চলবে না। এর শিকড় খুঁজতে হবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বাঙালির দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ও বৈষম্যের সূচনা : ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুটি অংশ ছিল—পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। মাঝখানে ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের ভারতীয় ভূখণ্ড। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হলেও দুই অংশের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনবৈচিত্র, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছিল উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনা, সামরিক বাহিনী, প্রশাসন এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদিত পাট ও বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়ন বরাদ্দ ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বাঞ্চল দীর্ঘদিন বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আসছিল।১৯৪৮ সালে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার গণসংগ্রামে রূপ দেয়। ভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ (সালাম-রফিক ও জব্বার) সবাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি নির্মাণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা : ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন এবং পরবর্তী সময়ে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করে। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংগঠিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ছয় দফাকে রাষ্ট্রের ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। মুজিব’সহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের শাসনের পতন ঘটে এবং শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান। এই ঘটনাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আর কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান চাইছিল না; তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিফলন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও দাবি করছিল।১৯৭০ সালের নির্বাচন ও সংকটের চূড়ান্ত বাঁক : ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের ধীরগতি এবং অবহেলার অভিযোগ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর ৭ ডিসেম্বর ও জানুয়ারি ১৯৭১-এ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। সংরক্ষিত আসনসহ জাতীয় পরিষদে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের মোট ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ এককভাবে ১৬০টি আসন পায়। গণতান্ত্রিক নিয়মে পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ, বিশেষ করে জুলফিকার আলী ভুট্টো, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আপত্তি ও রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে সংকট দীর্ঘায়িত করেন।১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল বাঙালির গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি সরাসরি আঘাত। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক প্রতিবাদ, অসহযোগ আন্দোলন এবং কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব অস্বীকারের পরিস্থিতি। ৭ মার্চের ভাষণ ও অসহযোগ আন্দোলন : ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি সামরিক আইন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। তাঁর ভাষণ ছিল একদিকে রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান, অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রতিরোধের প্রস্তুতির নির্দেশনা। তিনি ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এরপর ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত এ-দেশের নেতাদের নির্দেশেই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে। অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জনগোষ্ঠী পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়।এই বাস্তবতা পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, কেবল রাজনৈতিক আলোচনা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে। অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন : ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং মুজিবুর রহমানের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা চলছিল। কিন্তু আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে শক্তি বৃদ্ধি এবং সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। ঢাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে একযোগে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানার তৎকালীন ইপিআর সদর দপ্তর এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ইপিআর সদস্যদের মধ্যেও প্রতিরোধের সূচনা ঘটে। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দমন করতে চায়নি; তারা বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাংগঠনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নিরাপত্তাগত ভিত্তিকে ভেঙে দিতে চেয়েছিল।  ২৫ মার্চের রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের আগে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বলে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া গেলেও গবেষকদের কথা হলো তিনি আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তিনি স্বাধীনতা চাননি; চেয়েছিলেন স্বাধীকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। এবং আওয়ামী লীগের সকল নেতৃবিন্দ আত্মগোপনে যান। তাই দেশের ক্রান্তিলগ্নে রাজনৈতিক নেতারা যখন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তখন টগবগে তরুণ মেজর জিয়াউর রহমান (২৫ মার্চ রাতের শেষ প্রহর এবং ২৬ মার্চ-এর প্রথম প্রহরে) জীবনের মায়া তুচ্ছ করে, তরুণী সহধর্মীনি ও শিশুপুত্রদের চরম বিপদে রেখে চট্টগ্রামের বেতারকেন্দ্র থেকে  ডব জবাড়ষঃ বলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের সূচনা ঘটে এবং বিভিন্ন স্থানে একটি সামরিক অভিযান কীভাবে রাষ্ট্রের পতন ডেকে আনল : অপারেশন সার্চলাইটের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, এটি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটকে সামরিক সংকটে এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপান্তরিত করে। সামরিক শক্তির মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার চেষ্টা রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষা করতে পারেনি; বরং রাষ্ট্রটির ভাঙনকে ত্বরান্বিত করেছে। ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের পর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্রমেই বিস্তৃত হয়। পরবর্তী নয় মাসে মুক্তিযুদ্ধ, ব্যাপক প্রাণহানি, শরণার্থী সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইতিহাসের নির্মোহ পাঠ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের শক্তি শুধু সেনাবাহিনী, অস্ত্র কিংবা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিহিত নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি হচ্ছে জনগণের সম্মতি, রাজনৈতিক অধিকার, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নির্বাচনী রায় অস্বীকার করে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কোনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ-এর অপারেশন সার্চলাইট এবং ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা শুধু একটি গণহত্যার রাত নয়; এটি ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈধতার চূড়ান্ত সংকটের রাত এবং আজকের বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন করে বিকশিত হওয়ার ঐতিহাসিক স্বপ্নময় ঘটনা। অপারেশন সার্চলাইট বাঙালিকে পরাজিত করতে পারেনি। বরং এই অভিযানই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে এক নির্মম, কিন্তু নির্ধারক অধ্যায় হয়ে আছে।    লেখক: আসাদ পারভেজভূরাজনীতির গবেষক ও রাষ্ট্রচিন্তক

গণহত্যার নীলনকশা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনিবার্য প্রেক্ষাপট