গাজায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েল
দীর্ঘ সময়
ধরে গাজার স্বাস্থ্য
কর্তৃপক্ষের দেওয়া নিহতের
পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ
প্রকাশ করে আসলেও,
এখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী
নিজেই প্রায় একই
ধরনের একটি হিসাব
মেনে নিয়েছে। এর
আগে তেল আবিব
দাবি করেছিল যে,
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকায়
তাদের দেওয়া তথ্য
বিশ্বাসযোগ্য নয়, যদিও জাতিসংঘ
শুরু থেকেই ওই
পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে
স্বীকৃতি দিয়ে আসছিল।গাজায়
নিজেদের নির্বিচার হামলায় প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার কথা প্রথমবারের
মতো স্বীকার করেছে হামলাকারী ইসরায়েল। অবশ্য এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় নিখোঁজ
ফিলিস্তিনিদের ধরা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা
কর্মকর্তা ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেছেন। পরদিন শুক্রবার ইসরায়েলের প্রায় সব
সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে প্রতিবেদন করেছে।ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানিয়েছেন যে, তাদের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার গাজাবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এই সংখ্যার
মধ্যে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তিনি আরও জানান যে, এই বিপুল সংখ্যক নিহতের মধ্যে কতজন সশস্ত্র যোদ্ধা ছিলেন এবং কতজন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক ছিলেন, তা নিরূপণ
করতে বর্তমানে সেনাবাহিনী কাজ করছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে যে, চূড়ান্ত
প্রতিবেদন নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরে প্রকাশ করা হবে। ইসরায়েলের এই স্বীকারোক্তি
আন্তর্জাতিক মহলে গাজায় মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।২০২৩ সালের
অক্টোবরে আকাশ, স্থল ও জলপথে গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। শুরু থেকে
হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করে আসছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সংখ্যার পাশাপাশি
নিহত ব্যক্তির নাম, বয়স, জন্মতারিখ এবং ইসরায়েলের ইস্যু করা পরিচয়পত্রের নম্বরও
প্রকাশ করেছে হামাস পরিচালিত মন্ত্রণালয়টি।জাতিসংঘসহ
অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে মোটাদাগে সঠিক বলে
মনে করে; কিন্তু ইসরায়েল সরকার ও দেশটির সেনাবাহিনী সব সময় বলে আসছে, হতাহতের এ
সংখ্যা ‘সঠিক নয়’। এসব হামাসের ‘অপপ্রচার’। ইসরায়েলের উদারপন্থী পত্রিকা হারেৎজ
ছাড়া প্রায় সব সংবাদমাধ্যম নেতানিয়াহু সরকারের সুরে কথা বলেছে।গাজা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে কাতার ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরা জানায়, গাজা
নগরী, খান ইউনিসসহ গাজার বিভিন্ন স্থানে গতকাল শনিবার ভোর থেকে ইসরায়েলের হামলায় ৬
শিশুসহ অন্তত ৩১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত বছরের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি চুক্তি
কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়াল।ফিলিস্তিনের
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ নিয়ে ইসরায়েলের দুই বছরের বেশি
সময়ের আগ্রাসনে গাজায় অন্তত ৭১ হাজার ৭৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন
অন্তত ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৮৩ জন। তা ছাড়া হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ এখনো ভবনের
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।২০২৩ সালের
৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নিহত হয়েছিলেন
অন্তত ১ হাজার ১৩৯ জন। আর প্রায় আড়াই শ জনকে বন্দী করে গাজায় নিয়ে আসা হয়েছিল।নিহতের
সংখ্যা নিয়ে হঠাৎ করে অবস্থান পরিবর্তনের ফলে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে
নিজেদের দীর্ঘদিনের দাবি বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের একটি কমিশন, বিভিন্ন
মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষকেরা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে
উল্লেখ করেছে।বেসামরিক
নিহতের সংখ্যা কতনিরাপত্তা
কর্মকর্তার ব্রিফিংয়ের পর ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজ প্রশ্ন তুলেছে, আর কী কী
অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হতে পারে? সংবাদমাধ্যমটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই
বিলম্বিত স্বীকৃতি গাজায় ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে সেনাবাহিনী ও সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা
সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়—তা ইসরায়েলের জনগণকে নিজেদের কাছেই প্রশ্ন করে দেখতে হবে।এর আগে
ইসরায়েলের সেনাবাহিনী দাবি করেছিল, তারা গাজায় ২২ হাজার ‘যোদ্ধা’কে হত্যা করেছে।
এটাকে সত্য ধরে নিলে ৭০ হাজার নিহত ফিলিস্তিনির মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি
বেসামরিক মানুষ। তবে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর এক গোপন ডেটাবেজে গাজায় নিহতদের
মধ্যে বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ৮৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।টাইমস অব
ইসরায়েল জানিয়েছে, গাজায় নিহতদের মধ্যে বেসামরিক মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা
এখনো পর্যালোচনা করছে ইসরায়েল। অন্যদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডেটাবেজে
নিহতদের মধ্যে কতজন যোদ্ধা, কতজন বেসামরিক মানুষ, তা আলাদা করা হয়নি।রাফাহ
খুলছেদেড় বছরের
বেশি সময় বন্ধ রাখার পর আজ রোববার মিসর সীমান্তবর্তী রাফার মূল ক্রসিং খুলে দেওয়ার
কথা জানিয়েছে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। ২০২৪ সালের মে মাস থেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে
ক্রসিংটি বন্ধ করে রেখেছেন ইসরায়েলের সেনারা।ইসরায়েলের
সেনাবাহিনীর (আইডিএফ) একজন মুখপাত্র জানান, যাঁরা গাজা ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা এবার
ফেরার জন্য আবেদন করতে পারবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি বাহিনী ক্রসিংটি
তত্ত্বাবধান করবে। কিন্তু গাজায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পুরো বিষয় নিয়ন্ত্রণ করবেন
ইসরায়েলের সেনারা।যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ
কার্যকরের অন্যতম শর্ত হচ্ছে রাফা ক্রসিং খুলে দেওয়া। কিন্তু ক্রসিংটি কেবল
পদচারীদের জন্য খোলা হবে। ফলে গাজায় খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য মানবিক সহায়তা
সরবরাহে তেমন কোনো সুবিধা হবে না। এমএইছ/ধ্রুবকন্ঠ