বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল গণতন্ত্র, সাম্য এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। দীর্ঘ ২৫ বছরের পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির যে লড়াই, তার চূড়ান্ত রূপ ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছরে দেশ এক চরম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের যে ম্যান্ডেট ছিল, তা রক্ষায় তৎকালীন সরকারের সীমাবদ্ধতা এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) কায়েমের ফলে দেশের রাজনীতিতে এক ধরণের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক শূন্যতা এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চলা বিশৃঙ্খলা দূর করতে একজন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল, যা পূরণ করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে আসাটা ছিল যেমন আকস্মিক, তেমনি তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে অনিবার্য। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান রণাঙ্গনে তার বীরত্বগাথা আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান করে দেয়। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতা বিপ্লবের পর তিনি যখন রাষ্ট্রক্ষমতার পাদপ্রদীপে আসেন, তখন তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল একটি বিশৃঙ্খল জাতিকে সুশৃঙ্খল করা। তিনি কঠোর হাতে সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং স্থগিত হয়ে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা বটমূলে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম ছিল না, বরং এটি ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ নামক এক কালজয়ী দর্শনের উদ্ভাবন। বিএনপির মূল লক্ষ্য ছিল—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলা।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন কেবল শহরকেন্দ্রিক হলে চলবে না, তা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। তার ‘উনিশ দফা’ কর্মসূচি ছিল এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলের ইশতেহার। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ২০৭টি আসন জয়লাভ করে প্রথম সরকার গঠন করে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে একটি স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি যখন নেতৃত্ব সংকটে দিশেহারা, ঠিক তখন দলের হাল ধরেন তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি দলের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক মোড়। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিএনপিকে ভাঙার এবং স্তব্ধ করার নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের আকুল আবেদনে বেগম জিয়া রাজপথে নামেন এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার লড়াই ছিল উদাহরণ সৃষ্টি করার মতো। তিনি বারবার গৃহবন্দী ও কারারুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু স্বৈরাচারের সাথে কোনো ধরণের আপস করেননি। ১৯৮৬ সালের পাতানো নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি ক্ষমতার চেয়ে আদর্শকে বেশি প্রাধান্য দেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করেন এবং ১৫ দলীয় জোটের সাথে সমন্বয় করে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে তার অটল মনোভাবই ছিল মূল চালিকাশক্তি।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে খালেদা জিয়া ৫টি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে জয়ী হন এবং বিএনপি ১৪৪টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ২০ মার্চ ১৯৯১ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল সংবিধানে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা। তার শাসনামলে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, মেয়েদের বিনা মূল্যে শিক্ষা এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বিরোধী দলে থাকার পর, বিএনপি জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর সাথে মিলে ‘চারদলীয় জোট’ গঠন করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে এই জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় দফার এই শাসনামলে দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। যমুনা সেতুসহ বড় বড় সেতু ও সড়ক নির্মাণ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় স্থাপন এবং র্যাব গঠনের মাধ্যমে অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এই সময়েই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী হরতাল ও অবরোধের রাজনীতি শুরু হয়, যা দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে।
২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশ এক গভীর সংকটে পড়ে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সামরিক সমর্থিত একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এই সরকার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে থাকাকালীন তার ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি দেশের মাটি ছেড়ে যেতে রাজি হননি। তার এই দেশপ্রেম ও সাহসিকতা দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের বিতর্কিত নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে বিএনপিকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলে বিএনপি পুনরায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নামে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনগুলোতে কারচুপি ও বাধার সম্মুখীন হয়েও বিএনপি রাজপথে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। বর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি একটি আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল গণতন্ত্র, সাম্য এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। দীর্ঘ ২৫ বছরের পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির যে লড়াই, তার চূড়ান্ত রূপ ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছরে দেশ এক চরম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের যে ম্যান্ডেট ছিল, তা রক্ষায় তৎকালীন সরকারের সীমাবদ্ধতা এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) কায়েমের ফলে দেশের রাজনীতিতে এক ধরণের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক শূন্যতা এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চলা বিশৃঙ্খলা দূর করতে একজন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল, যা পূরণ করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে আসাটা ছিল যেমন আকস্মিক, তেমনি তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে অনিবার্য। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান রণাঙ্গনে তার বীরত্বগাথা আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান করে দেয়। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতা বিপ্লবের পর তিনি যখন রাষ্ট্রক্ষমতার পাদপ্রদীপে আসেন, তখন তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল একটি বিশৃঙ্খল জাতিকে সুশৃঙ্খল করা। তিনি কঠোর হাতে সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং স্থগিত হয়ে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা বটমূলে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম ছিল না, বরং এটি ছিল ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ নামক এক কালজয়ী দর্শনের উদ্ভাবন। বিএনপির মূল লক্ষ্য ছিল—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের মধ্যে একটি শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলা।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন কেবল শহরকেন্দ্রিক হলে চলবে না, তা গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। তার ‘উনিশ দফা’ কর্মসূচি ছিল এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলের ইশতেহার। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ২০৭টি আসন জয়লাভ করে প্রথম সরকার গঠন করে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে একটি স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি যখন নেতৃত্ব সংকটে দিশেহারা, ঠিক তখন দলের হাল ধরেন তার সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি দলের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক মোড়। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিএনপিকে ভাঙার এবং স্তব্ধ করার নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের আকুল আবেদনে বেগম জিয়া রাজপথে নামেন এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার লড়াই ছিল উদাহরণ সৃষ্টি করার মতো। তিনি বারবার গৃহবন্দী ও কারারুদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু স্বৈরাচারের সাথে কোনো ধরণের আপস করেননি। ১৯৮৬ সালের পাতানো নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি ক্ষমতার চেয়ে আদর্শকে বেশি প্রাধান্য দেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সাত দলীয় জোট গঠন করেন এবং ১৫ দলীয় জোটের সাথে সমন্বয় করে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে তার অটল মনোভাবই ছিল মূল চালিকাশক্তি।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে খালেদা জিয়া ৫টি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে জয়ী হন এবং বিএনপি ১৪৪টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ২০ মার্চ ১৯৯১ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল সংবিধানে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা। তার শাসনামলে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, মেয়েদের বিনা মূল্যে শিক্ষা এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বিরোধী দলে থাকার পর, বিএনপি জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর সাথে মিলে ‘চারদলীয় জোট’ গঠন করে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে এই জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় দফার এই শাসনামলে দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। যমুনা সেতুসহ বড় বড় সেতু ও সড়ক নির্মাণ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় স্থাপন এবং র্যাব গঠনের মাধ্যমে অপরাধ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এই সময়েই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী হরতাল ও অবরোধের রাজনীতি শুরু হয়, যা দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে।
২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশ এক গভীর সংকটে পড়ে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সামরিক সমর্থিত একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এই সরকার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে থাকাকালীন তার ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি দেশের মাটি ছেড়ে যেতে রাজি হননি। তার এই দেশপ্রেম ও সাহসিকতা দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের বিতর্কিত নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকে বিএনপিকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলে বিএনপি পুনরায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নামে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনগুলোতে কারচুপি ও বাধার সম্মুখীন হয়েও বিএনপি রাজপথে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। বর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি একটি আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন