ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

শেখ আকিজ উদ্দিন: ১৭ টাকা থেকে হাজার কোটির সাম্রাজ্য গড়ার গল্প



শেখ আকিজ উদ্দিন: ১৭ টাকা থেকে হাজার কোটির সাম্রাজ্য গড়ার গল্প
ছবি: শেখ আকিজ উদ্দিন

বাংলাদেশের করপোরেট ইতিহাসে শেখ আকিজ উদ্দিনের নাম মিশে আছে এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হিসেবে। ১৯২৯ সালে খুলনার ফুলতলার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কেবল মেধা আর শ্রমের জোরে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। দারিদ্র্যের কারণে শৈশবেই কলম ছেড়ে ধরতে হয়েছিল বাবার ব্যবসার হাল। কিন্তু যাঁর স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া, তাঁকে কি আর ক্ষুদ্র সীমানায় আটকে রাখা যায়? পকেটে মাত্র ১৭ টাকা নিয়ে শুরু করেছিলেন তার জীবনের ব্যবসায়িক যাত্রা। আজ, তার প্রতিষ্ঠিত আকিজ গ্রুপ (Akiz Group) বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলোর একটি, যার মালিকানায় রয়েছে ২৯টি শিল্প কারখানা এবং ৫০ হাজারেরও বেশি কর্মচারী।

আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা দেখব শূন্য থেকে শুরু করা এক মানুষ, যিনি জীবনের কঠিন পথে হেঁটে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন কিংবদন্তি হিসেবে।

১৯২৯ সালে খুলনার ফুলতলার মধ্যেডাঙ্গা গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন শেখ আকিজ উদ্দিন। বাবা মফিজউদ্দিন ছোটখাটো ব্যবসা করতেন, আর মা মাতিনা বেগম সামলাতেন সংসার। অভাবের সংসার হওয়ায় বই-খাতার বদলে কিশোর আকিজকে নামতে হয় জীবনযুদ্ধে। দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের পাঠ চুকিয়ে বাবার ব্যবসায় হাত লাগাতে হয় তাঁকে। তবে বড় হওয়ার অদম্য ইচ্ছা ছিল প্রবল। মায়ের জমানো মাত্র কয়েক আনা পুঁজি নিয়ে স্টেশনে ফেরি করে বাদাম লজেন্স বিক্রি শুরু করেনএটাই ছিল তাঁর ব্যবসার হাতেখড়ি।

কিন্তু ভাগ্যের অন্বেষণে ১৯৪২ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে কিশোর আকিজ পাড়ি জমান কলকাতায়। পকেটে সম্বল বলতে ছিল মাত্র ১৭ টাকা। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় দিনের পর দিন শিয়ালদহ স্টেশনেই রাত কাটিয়েছেন। পুঁজি ফুরিয়ে আসার ভয়ে শুরু করেন কমলালেবুর হকারি। সামান্য লাভে দিনরাত পরিশ্রম করে তিনি কিছু টাকা জমাতে শুরু করেন। এই কঠিন জীবনই তাঁকে শিখিয়েছিল কীভাবে শূন্য থেকে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়।

তবে শুধুমাত্র কমলার ব্যবসা নয়, এর পাশাপাশি তিনি কলকাতায় ঠেলা গাড়িতে করে মনিহারির পশরা সাজান। ছোট এই ব্যবসাগুলি তাকে একটু একটু করে যখনি আত্মবিশ্বাস এনে দেয়, তখনি কলকাতার কঠিন পরিবেশ এবং আইনি জটিলতায় তিনি একাধিকবার বাধাপ্রাপ্ত হন।  তাকে অনুমতি ছাড়া রাস্তায় দোকান সাজানোর জন্য পুলিশ গ্রেফতার করে এবং তাকে তিন দিনের জেল খাটতে হয়। এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও শেখ আকিজ উদ্দিন কখনো দমে যাননি। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেও তিনি তার উদ্যোগ চালিয়ে যেতে থাকেন।

কিছুকাল পর, কলকাতায় তার অবস্থার উন্নতি হলেও, তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তার নিজের দেশে ফিরে আসবেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে নিজের দেশেই তার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের পথ সুগম। কলকাতা থেকে ফিরে আসার পর, তিনি খুলনায় নতুনভাবে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেন।

খুলনায় ফিরে এসে তিনি তার পুরনো বন্ধুর নিতাই এর সাথে সাক্ষাত হয়, নিতাই এর পিতা বিধু বাবু তখন বিড়ি তৈরির ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন আর সেই বিড়ির নাম ছিলবিধুর বিড়ি শেখ আকিজ উদ্দিন বিধু বাবুর কাছ থেকে বিড়ি ব্যবসার সমস্ত কলাকৌশল শিখতে থাকেন। তিনি বন্ধু নিতাই এর সাথে প্রায় যেতেন খুলনাতে তামাক কিনতে। এছাড়া বিড়ি তৈরির পদ্ধতির শিখে ফেলেন দ্রুতই। আর এই অভিজ্ঞতা ছিল তার উদ্যক্তা হওয়ার প্রেরনা। কিন্তু সাফল্যের সিঁড়িতে পা রাখতেই এক গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে আকিজ উদ্দিনের জীবনেহঠাৎই পরলোকগমন করেন তাঁর মা। তার মা এর শেষ ইচ্ছা পুরন করার জন্য বিয়ে করেন নিজ গ্রামের ছকিনা খাতুন কে। আর শশুর এর ইচ্ছায় স্থানিয় বাজারে মুদির দোকান দেন। গ্রাম্য হাটের দিন তার দোকানে বিড়ির আসর বসতে দেখে নিজেই বিড়ি তৈরি করা সিদ্ধান্ত নেন। দিন বাদেই তিন জন কর্মচারী নিয়ে আকিজ উদ্দিন বিড়ি তৈরি কারখানা চালু করেন আর পন্যের নাম দেন আকিজ বিড়ি।

সেই সময় বিড়ি তৈরির প্রধান উপাদান টেন্ডু তামাক পাতা আমদানী করতে হত। স্বল্প পুজী থাকায় তাই বাজারের অন্যান্য বিড়ির সাথে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছিলেন না আকিজ। তাই তিনি বিড়ির স্বাদ, গন্ধ আর বিপনন কৌশল এর দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে থাকেন। যেহেতু তখন প্যাকেট কোন ব্রান্ডিং থাকতো না তাই তিনি বিভিন্ন বিড়ির প্যাকেট আকিজ বিড়ি ঢুকিয়ে দিতেন। আর এভাবেই তার বিঁড়ি জনপ্রিয়তা পায়।

কিন্তু আকিজের এই সাফল্য তাকে অনেক ব্যবসায়ির ব্যবসায়িক রেষারেষি মুখে ফেলে দেয়। এক সন্ধায় দোকানে থাকা কালীন অবস্থায় আকিজ তার সহকারি মহন আগুন দুর্ঘটনার স্বীকার হোন। এক নিমিষে শেষ হয়ে যায় আকিজের সমস্ত পুঁজি। পথে বসে যান আকিজ উদ্দিন। কিন্তু প্রতিকূলতা জয় করে নিজের জমানো ৩০ হাজার টাকা দিয়ে আবার ব্যবসা শুরু করেন।


১৯৫৬ সালে আকিজ একটি বেবি ট্যাক্সি কিনে নিজেই বাজারে বাজারে নিজের পণ্য সাপ্লাই করা শুরু করেন,আর ধিরে ধিরে তিনি তার ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকলে আকিজ বিড়ি দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে।  বিড়ি ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত লাভের টাকা তিনি আরও বড় ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে শুরু করেন।

৬০-এর দশকের শেষের দিকে, শেখ আকিজ উদ্দিন পাট ব্যবসায় প্রবেশ করেন। পাট তখন ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পণ্য। তার বিড়ির ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত সঞ্চয় দিয়ে তিনি পাট ব্যবসায় বিনিয়োগ শুরু করেন। বিড়ি কারখানার  জন্য কেনা ২০ বিঘা জমির একাংশে তিনি পাটের গুদাম হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করেন।  এই সময় পাটের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য লাভের মুখ দেখেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের প্রচুর চাহিদা থাকায়, শেখ আকিজ উদ্দিনের পাট ব্যবসা দ্রুত সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু এখানেও তিনি ধাক্কা খান। তার ব্যবসায়িক অংশীদার  লক্ষ টাকা আত্বসাত করে পালিয়ে যান। যা পুষিয়ে নিতে আকিজের বেশ বেগ পেতে হয়। এর পর আর কখনো অংশীদারী ব্যবসা তে যোগ দেন নি আকিজ উদ্দিন। 

পাট ব্যবসার সাফল্য তাঁকে নতুন খাতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করে, এবং এই সময়ে তিনি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দেন। ১৯৭০ সালে এক বন্ধুর সহয়তায় লাখ টাকা ঋণ নেন যা তার ব্যবসায় বেশ গতি আনে। 

১৯৭৭ সালে সরকার লোকসানে চলাঢাকা টোবাকো ইন্ডাস্ট্রিস’(Dhaka Tobacco Industries) বিক্রি করার সিধান্ত নেয়। শেখ আকিজ উদ্দিন নিজের বিড়ির ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর উদ্দ্যেশে প্রায় ৮৩ লক্ষ টাকা দিয়েঢাকা টোবাকোর মালিকানা স্বত্ত কিনে নেন।লোকসানে চলা এই কারখানা কে লাভের মুখ দেখান আকিজ উদ্দিন।  ১৯৭৮ ‘ঢাকা টোবাকো ইন্ডাস্ট্রিস’(Dhaka Tobacco Industries) ছিল দেশের মধ্যে ৩য়। প্রায় হাজার লোকবল নিয়ে চলা এই কারখানায় দৈনিক প্রায় ৩৫ হাজার কোটি সিগারেট উৎপাদিত হত। ২০১৮ সালে আকিজের তামাক বিভাগ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় জাপান টোবাকোর কাছে বিক্রি হয় যা ছিল বাংলাদেশে যা ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে বড় একক প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ। 

১৯৮০-এর দশকে যখন দেশের চামড়া শিল্প ঘোর সংকটে, ঠিক তখনই এই খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেন শেখ আকিজ উদ্দিন। তিনিস্কটিশ অ্যান্ড ফ্যামিলি লেদারনামের একটি লোকসানি মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠান কিনে নেন। যদিও এই খাতে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন দূরদর্শী। ব্যবসার হাল ধরতে মেজ ছেলে শেখ মোমিন উদ্দিনকে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠান ইংল্যান্ডে। সেখান থেকে লেদার টেকনোলজিতে ডিগ্রি নিয়ে ফিরে এসে মোমিন উদ্দিনসাফ লেদার’-এর দায়িত্ব নেন। তাঁর আধুনিক পরিকল্পনা নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের জয়জয়কার শুরু হয়।

১৯৯২ সালে তাঁর সেজো ছেলের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় দেশের প্রথম স্বয়ংক্রিয় দিয়াশলাই কারখানা। তাঁদের উৎপাদিতডলফিন ম্যাচআজও বাঙালির ঘরে ঘরে এক অতি পরিচিত নাম। এরপর ঢাকার ধামরাইয়ে ৫০ একর বিশাল জায়গায় ছেলে শেখ বশির উদ্দিনকে নিয়ে গড়ে তোলেনআকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ তাঁদের প্রথম পণ্যফার্ম ফ্রেশদুধ বাজারে আসামাত্রই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ফ্রুটিকা মোজোর মতো ব্র্যান্ডগুলো পানীয় বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে, যা বর্তমানে কোকাকোলা বা পেপসির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সমন্বয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আজকের সুবিশাল আকিজ গ্রুপ(Akiz Group)

আকিজ গ্রুপ বর্তমানে কাগজ, বোর্ড (board), টেক্সটাইল (textile), সিমেন্ট (cement), সিরামিক (Ceramic), খাদ্যপণ্য এবং নির্মাণসামগ্রী সহ অনেক খাতে নেতৃত্বস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।  তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো এখন বাংলাদেশের শিল্প-অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং দেশের জন্য এক বিরাট অবদান রেখে যাচ্ছে।

শেখ আকিজ উদ্দিনের আকিজ গ্রুপ(Akiz Group) আজ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তাঁর মৃত্যুর সময় আকিজ গ্রুপের অধীনে ছিল ৫০,০০০+ কর্মী এবং প্রায় ২৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান 2009 সালের দিকে কোম্পানিটির মোট সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৮৯ বিলিয়ন(billion) টাকা আকিজ উদ্দিনের শ্রম, মেধা নেতৃত্বের গুণাবলী তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিল্পপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

শেখ আকিজ উদ্দিনের ব্যবসায়িক সাফল্য তাঁকে বিভিন্ন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত করে। তাঁর প্রচেষ্টা দেশের শিল্প-বাণিজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ সরকার থেকে একাধিক ব্যবসায়িক সম্মাননা। 

শেখ আকিজ উদ্দিন সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধের জন্যও পরিচিত ছিলেন। তার সেবামূলক কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো “আদ দ্বীন ফাউন্ডেশন (Ad-din Foundation)”

ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি শেখ আকিজ উদ্দিনের হৃদয়ে ছিল সাধারণ মানুষের জন্য গভীর মমতা। আর সেই মমত্ববোধ থেকেই জন্ম নেয়আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন মূলত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা শিক্ষা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য তিনি হাসপাতাল, ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন।

স্বাস্থ্যের পাশাপাশি শিক্ষার আলো ছড়াতেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। সমাজের অবহেলিত অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য তিনি অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো। তবে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মধ্যেই তাঁর দানশীলতা সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি মসজিদ নির্মাণ, গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি এবং নিয়মিত আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। মূলত এই নিঃস্বার্থ পরোপকারী মানসিকতার কারণেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে একজন আদর্শ অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

আকিজ উদ্দিনে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর মৃত্যু বরন করেন, এবং তিনি তার পিছনে রেখে যান এক বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য এবং একাধিক উত্তরাধিকারী। তার পরিবার বর্তমানে আকিজ গ্রুপের পরিচালনায় নিয়োজিত, এবং তারা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বে রয়েছেন। 

আকিজ উদ্দিনের সন্তানদের মধ্যে বিশেষত দুইজন ছেলের নাম বেশ আলোচিত: শেখ নাসির উদ্দিন এবং শেখ বশির উদ্দিন। শেখ নাসির উদ্দিন বর্তমানে আকিজ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে তিনি গ্রুপের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে, শেখ বশির উদ্দিন গ্রুপের অধীনে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। 

রাস্তার ধারে কমলালেবু বিক্রেতা থেকে দেশের শীর্ষতম শিল্পপতি হয়ে ওঠার এই যে মহাকাব্য, তা কেবল পরিশ্রম নয় বরং অদম্য সাহসের নাম। শেখ আকিজ উদ্দিন তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে যে বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য রেখে গেছেন, তা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অপরিহার্য ভিত্তি। তবে কেবল মুনাফা নয়, মানবসেবা সমাজকল্যাণে তাঁর অবদান তাঁকে যুগের পর যুগ অমর করে রাখবে। তাঁর প্রয়াণের পর যোগ্য উত্তরসূরিরা সেই স্বপ্নের মশালটি বহন করে চলেছেন এবং তাঁর আদর্শকে বুকে ধারণ করেই আকিজ গ্রুপকে নিয়ে যাচ্ছেন আরও উচ্চতায়। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর দেখানো পথ হাজারো তরুণ উদ্যোক্তার জন্য চিরকাল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

বিষয় : শেখ আকিজ উদ্দিন সাম্রাজ্য ১৭ টাকা

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


শেখ আকিজ উদ্দিন: ১৭ টাকা থেকে হাজার কোটির সাম্রাজ্য গড়ার গল্প

প্রকাশের তারিখ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের করপোরেট ইতিহাসে শেখ আকিজ উদ্দিনের নাম মিশে আছে এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হিসেবে। ১৯২৯ সালে খুলনার ফুলতলার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কেবল মেধা আর শ্রমের জোরে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। দারিদ্র্যের কারণে শৈশবেই কলম ছেড়ে ধরতে হয়েছিল বাবার ব্যবসার হাল। কিন্তু যাঁর স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া, তাঁকে কি আর ক্ষুদ্র সীমানায় আটকে রাখা যায়? পকেটে মাত্র ১৭ টাকা নিয়ে শুরু করেছিলেন তার জীবনের ব্যবসায়িক যাত্রা। আজ, তার প্রতিষ্ঠিত আকিজ গ্রুপ (Akiz Group) বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলোর একটি, যার মালিকানায় রয়েছে ২৯টি শিল্প কারখানা এবং ৫০ হাজারেরও বেশি কর্মচারী।

আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা দেখব শূন্য থেকে শুরু করা এক মানুষ, যিনি জীবনের কঠিন পথে হেঁটে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন কিংবদন্তি হিসেবে।

১৯২৯ সালে খুলনার ফুলতলার মধ্যেডাঙ্গা গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন শেখ আকিজ উদ্দিন। বাবা মফিজউদ্দিন ছোটখাটো ব্যবসা করতেন, আর মা মাতিনা বেগম সামলাতেন সংসার। অভাবের সংসার হওয়ায় বই-খাতার বদলে কিশোর আকিজকে নামতে হয় জীবনযুদ্ধে। দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের পাঠ চুকিয়ে বাবার ব্যবসায় হাত লাগাতে হয় তাঁকে। তবে বড় হওয়ার অদম্য ইচ্ছা ছিল প্রবল। মায়ের জমানো মাত্র কয়েক আনা পুঁজি নিয়ে স্টেশনে ফেরি করে বাদাম লজেন্স বিক্রি শুরু করেনএটাই ছিল তাঁর ব্যবসার হাতেখড়ি।

কিন্তু ভাগ্যের অন্বেষণে ১৯৪২ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে কিশোর আকিজ পাড়ি জমান কলকাতায়। পকেটে সম্বল বলতে ছিল মাত্র ১৭ টাকা। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় দিনের পর দিন শিয়ালদহ স্টেশনেই রাত কাটিয়েছেন। পুঁজি ফুরিয়ে আসার ভয়ে শুরু করেন কমলালেবুর হকারি। সামান্য লাভে দিনরাত পরিশ্রম করে তিনি কিছু টাকা জমাতে শুরু করেন। এই কঠিন জীবনই তাঁকে শিখিয়েছিল কীভাবে শূন্য থেকে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়।

তবে শুধুমাত্র কমলার ব্যবসা নয়, এর পাশাপাশি তিনি কলকাতায় ঠেলা গাড়িতে করে মনিহারির পশরা সাজান। ছোট এই ব্যবসাগুলি তাকে একটু একটু করে যখনি আত্মবিশ্বাস এনে দেয়, তখনি কলকাতার কঠিন পরিবেশ এবং আইনি জটিলতায় তিনি একাধিকবার বাধাপ্রাপ্ত হন।  তাকে অনুমতি ছাড়া রাস্তায় দোকান সাজানোর জন্য পুলিশ গ্রেফতার করে এবং তাকে তিন দিনের জেল খাটতে হয়। এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও শেখ আকিজ উদ্দিন কখনো দমে যাননি। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেও তিনি তার উদ্যোগ চালিয়ে যেতে থাকেন।

কিছুকাল পর, কলকাতায় তার অবস্থার উন্নতি হলেও, তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তার নিজের দেশে ফিরে আসবেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে নিজের দেশেই তার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের পথ সুগম। কলকাতা থেকে ফিরে আসার পর, তিনি খুলনায় নতুনভাবে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেন।

খুলনায় ফিরে এসে তিনি তার পুরনো বন্ধুর নিতাই এর সাথে সাক্ষাত হয়, নিতাই এর পিতা বিধু বাবু তখন বিড়ি তৈরির ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন আর সেই বিড়ির নাম ছিলবিধুর বিড়ি শেখ আকিজ উদ্দিন বিধু বাবুর কাছ থেকে বিড়ি ব্যবসার সমস্ত কলাকৌশল শিখতে থাকেন। তিনি বন্ধু নিতাই এর সাথে প্রায় যেতেন খুলনাতে তামাক কিনতে। এছাড়া বিড়ি তৈরির পদ্ধতির শিখে ফেলেন দ্রুতই। আর এই অভিজ্ঞতা ছিল তার উদ্যক্তা হওয়ার প্রেরনা। কিন্তু সাফল্যের সিঁড়িতে পা রাখতেই এক গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে আকিজ উদ্দিনের জীবনেহঠাৎই পরলোকগমন করেন তাঁর মা। তার মা এর শেষ ইচ্ছা পুরন করার জন্য বিয়ে করেন নিজ গ্রামের ছকিনা খাতুন কে। আর শশুর এর ইচ্ছায় স্থানিয় বাজারে মুদির দোকান দেন। গ্রাম্য হাটের দিন তার দোকানে বিড়ির আসর বসতে দেখে নিজেই বিড়ি তৈরি করা সিদ্ধান্ত নেন। দিন বাদেই তিন জন কর্মচারী নিয়ে আকিজ উদ্দিন বিড়ি তৈরি কারখানা চালু করেন আর পন্যের নাম দেন আকিজ বিড়ি।

সেই সময় বিড়ি তৈরির প্রধান উপাদান টেন্ডু তামাক পাতা আমদানী করতে হত। স্বল্প পুজী থাকায় তাই বাজারের অন্যান্য বিড়ির সাথে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছিলেন না আকিজ। তাই তিনি বিড়ির স্বাদ, গন্ধ আর বিপনন কৌশল এর দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে থাকেন। যেহেতু তখন প্যাকেট কোন ব্রান্ডিং থাকতো না তাই তিনি বিভিন্ন বিড়ির প্যাকেট আকিজ বিড়ি ঢুকিয়ে দিতেন। আর এভাবেই তার বিঁড়ি জনপ্রিয়তা পায়।

কিন্তু আকিজের এই সাফল্য তাকে অনেক ব্যবসায়ির ব্যবসায়িক রেষারেষি মুখে ফেলে দেয়। এক সন্ধায় দোকানে থাকা কালীন অবস্থায় আকিজ তার সহকারি মহন আগুন দুর্ঘটনার স্বীকার হোন। এক নিমিষে শেষ হয়ে যায় আকিজের সমস্ত পুঁজি। পথে বসে যান আকিজ উদ্দিন। কিন্তু প্রতিকূলতা জয় করে নিজের জমানো ৩০ হাজার টাকা দিয়ে আবার ব্যবসা শুরু করেন।


১৯৫৬ সালে আকিজ একটি বেবি ট্যাক্সি কিনে নিজেই বাজারে বাজারে নিজের পণ্য সাপ্লাই করা শুরু করেন,আর ধিরে ধিরে তিনি তার ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকলে আকিজ বিড়ি দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে।  বিড়ি ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত লাভের টাকা তিনি আরও বড় ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে শুরু করেন।

৬০-এর দশকের শেষের দিকে, শেখ আকিজ উদ্দিন পাট ব্যবসায় প্রবেশ করেন। পাট তখন ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পণ্য। তার বিড়ির ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত সঞ্চয় দিয়ে তিনি পাট ব্যবসায় বিনিয়োগ শুরু করেন। বিড়ি কারখানার  জন্য কেনা ২০ বিঘা জমির একাংশে তিনি পাটের গুদাম হিসাবে ব্যবহার করা শুরু করেন।  এই সময় পাটের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য লাভের মুখ দেখেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের প্রচুর চাহিদা থাকায়, শেখ আকিজ উদ্দিনের পাট ব্যবসা দ্রুত সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু এখানেও তিনি ধাক্কা খান। তার ব্যবসায়িক অংশীদার  লক্ষ টাকা আত্বসাত করে পালিয়ে যান। যা পুষিয়ে নিতে আকিজের বেশ বেগ পেতে হয়। এর পর আর কখনো অংশীদারী ব্যবসা তে যোগ দেন নি আকিজ উদ্দিন। 

পাট ব্যবসার সাফল্য তাঁকে নতুন খাতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করে, এবং এই সময়ে তিনি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দেন। ১৯৭০ সালে এক বন্ধুর সহয়তায় লাখ টাকা ঋণ নেন যা তার ব্যবসায় বেশ গতি আনে। 

১৯৭৭ সালে সরকার লোকসানে চলাঢাকা টোবাকো ইন্ডাস্ট্রিস’(Dhaka Tobacco Industries) বিক্রি করার সিধান্ত নেয়। শেখ আকিজ উদ্দিন নিজের বিড়ির ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর উদ্দ্যেশে প্রায় ৮৩ লক্ষ টাকা দিয়েঢাকা টোবাকোর মালিকানা স্বত্ত কিনে নেন।লোকসানে চলা এই কারখানা কে লাভের মুখ দেখান আকিজ উদ্দিন।  ১৯৭৮ ‘ঢাকা টোবাকো ইন্ডাস্ট্রিস’(Dhaka Tobacco Industries) ছিল দেশের মধ্যে ৩য়। প্রায় হাজার লোকবল নিয়ে চলা এই কারখানায় দৈনিক প্রায় ৩৫ হাজার কোটি সিগারেট উৎপাদিত হত। ২০১৮ সালে আকিজের তামাক বিভাগ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় জাপান টোবাকোর কাছে বিক্রি হয় যা ছিল বাংলাদেশে যা ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে বড় একক প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ। 

১৯৮০-এর দশকে যখন দেশের চামড়া শিল্প ঘোর সংকটে, ঠিক তখনই এই খাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেন শেখ আকিজ উদ্দিন। তিনিস্কটিশ অ্যান্ড ফ্যামিলি লেদারনামের একটি লোকসানি মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠান কিনে নেন। যদিও এই খাতে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন দূরদর্শী। ব্যবসার হাল ধরতে মেজ ছেলে শেখ মোমিন উদ্দিনকে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠান ইংল্যান্ডে। সেখান থেকে লেদার টেকনোলজিতে ডিগ্রি নিয়ে ফিরে এসে মোমিন উদ্দিনসাফ লেদার’-এর দায়িত্ব নেন। তাঁর আধুনিক পরিকল্পনা নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের জয়জয়কার শুরু হয়।

১৯৯২ সালে তাঁর সেজো ছেলের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় দেশের প্রথম স্বয়ংক্রিয় দিয়াশলাই কারখানা। তাঁদের উৎপাদিতডলফিন ম্যাচআজও বাঙালির ঘরে ঘরে এক অতি পরিচিত নাম। এরপর ঢাকার ধামরাইয়ে ৫০ একর বিশাল জায়গায় ছেলে শেখ বশির উদ্দিনকে নিয়ে গড়ে তোলেনআকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ তাঁদের প্রথম পণ্যফার্ম ফ্রেশদুধ বাজারে আসামাত্রই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ফ্রুটিকা মোজোর মতো ব্র্যান্ডগুলো পানীয় বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে, যা বর্তমানে কোকাকোলা বা পেপসির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সমন্বয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আজকের সুবিশাল আকিজ গ্রুপ(Akiz Group)

আকিজ গ্রুপ বর্তমানে কাগজ, বোর্ড (board), টেক্সটাইল (textile), সিমেন্ট (cement), সিরামিক (Ceramic), খাদ্যপণ্য এবং নির্মাণসামগ্রী সহ অনেক খাতে নেতৃত্বস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।  তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো এখন বাংলাদেশের শিল্প-অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং দেশের জন্য এক বিরাট অবদান রেখে যাচ্ছে।

শেখ আকিজ উদ্দিনের আকিজ গ্রুপ(Akiz Group) আজ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তাঁর মৃত্যুর সময় আকিজ গ্রুপের অধীনে ছিল ৫০,০০০+ কর্মী এবং প্রায় ২৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান 2009 সালের দিকে কোম্পানিটির মোট সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৮৯ বিলিয়ন(billion) টাকা আকিজ উদ্দিনের শ্রম, মেধা নেতৃত্বের গুণাবলী তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিল্পপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

শেখ আকিজ উদ্দিনের ব্যবসায়িক সাফল্য তাঁকে বিভিন্ন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত করে। তাঁর প্রচেষ্টা দেশের শিল্প-বাণিজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ সরকার থেকে একাধিক ব্যবসায়িক সম্মাননা। 

শেখ আকিজ উদ্দিন সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধের জন্যও পরিচিত ছিলেন। তার সেবামূলক কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো “আদ দ্বীন ফাউন্ডেশন (Ad-din Foundation)”

ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি শেখ আকিজ উদ্দিনের হৃদয়ে ছিল সাধারণ মানুষের জন্য গভীর মমতা। আর সেই মমত্ববোধ থেকেই জন্ম নেয়আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন মূলত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা শিক্ষা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য তিনি হাসপাতাল, ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন।

স্বাস্থ্যের পাশাপাশি শিক্ষার আলো ছড়াতেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। সমাজের অবহেলিত অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য তিনি অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো। তবে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মধ্যেই তাঁর দানশীলতা সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি মসজিদ নির্মাণ, গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি এবং নিয়মিত আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। মূলত এই নিঃস্বার্থ পরোপকারী মানসিকতার কারণেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে একজন আদর্শ অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

আকিজ উদ্দিনে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর মৃত্যু বরন করেন, এবং তিনি তার পিছনে রেখে যান এক বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য এবং একাধিক উত্তরাধিকারী। তার পরিবার বর্তমানে আকিজ গ্রুপের পরিচালনায় নিয়োজিত, এবং তারা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বে রয়েছেন। 

আকিজ উদ্দিনের সন্তানদের মধ্যে বিশেষত দুইজন ছেলের নাম বেশ আলোচিত: শেখ নাসির উদ্দিন এবং শেখ বশির উদ্দিন। শেখ নাসির উদ্দিন বর্তমানে আকিজ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে তিনি গ্রুপের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অন্যদিকে, শেখ বশির উদ্দিন গ্রুপের অধীনে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। 

রাস্তার ধারে কমলালেবু বিক্রেতা থেকে দেশের শীর্ষতম শিল্পপতি হয়ে ওঠার এই যে মহাকাব্য, তা কেবল পরিশ্রম নয় বরং অদম্য সাহসের নাম। শেখ আকিজ উদ্দিন তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে যে বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য রেখে গেছেন, তা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অপরিহার্য ভিত্তি। তবে কেবল মুনাফা নয়, মানবসেবা সমাজকল্যাণে তাঁর অবদান তাঁকে যুগের পর যুগ অমর করে রাখবে। তাঁর প্রয়াণের পর যোগ্য উত্তরসূরিরা সেই স্বপ্নের মশালটি বহন করে চলেছেন এবং তাঁর আদর্শকে বুকে ধারণ করেই আকিজ গ্রুপকে নিয়ে যাচ্ছেন আরও উচ্চতায়। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর দেখানো পথ হাজারো তরুণ উদ্যোক্তার জন্য চিরকাল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত