ঘাটে নৌকা পৌঁছানো মাত্রই কৃষকদের থেকে চাঁদা আদায়
লক্ষ্মীপুরের
কমলনগর উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়নের মাঝেরচর। মেঘনা নদীবেষ্টিত এ চরের কৃষিজমিতে তরমুজসহ
নানা ফসল উৎপাদিত হয়। তবে এসব ফসল বাজারজাত করতে গিয়ে চাঁদাবাজি ও হয়রানির শিকার হতে
হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকরা
জানান, মাঝেরচর থেকে বাজারে কৃষিপণ্য তোলা জন্য তিনটি ঘাট ব্যবহার করা হয়।তাদের
অভিযোগ, ট্রলার থেকে যে ঘাটেই কৃষিপণ্য নামানো হোক না কেন, পণ্যের ধরন অনুযায়ী চাঁদা
দিতে হয়। তারা বলেন, চরের বিভিন্ন ঘাটে স্থানীয় চরকালকিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ
সম্পাদক ইব্রাহিম সুমনের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে উঠেছে। তারা কৃষকদের কাছ
থেকে জোর করে চাঁদা আদায় করছে। ঘাট ইজারার নামে নাছিরগঞ্জ এলাকার ঘাটে আসা সব পণ্যবাহী
নৌকা ও ট্রলার থেকে পণ্যের ধরণ অনুযায়ী আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। এতে তাদের ক্ষতির মুখে
পড়তে হচ্ছে।কৃষকদের
দাবি, তারা কষ্ট করে উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, সবজি ও তরমুজসহ বিভিন্ন ফসল নৌপথে ঘাটে এনে
স্থানীয় বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন। কিন্তু ঘাটে নৌকা পৌঁছানো মাত্রই তাদের
কাছ থেকে চাঁদা করা হচ্ছে। চাঁদা না দিলে ঘাটে নৌকা ভিড়তে দেওয়া হয় না বা নানা অজুহাতে
পণ্য আটকে রাখা হয়।স্থানীয়
সূত্র জানা যায়, ঘাটে চাঁদাবাজির সঙ্গে বিএনপির প্রভাবশালী ওই নেতার নেতৃত্বে চরকালকিনি
ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আবদুল মজিদ মেম্বার, ৭ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি অদুদ মাঝি, স্বেচ্ছাসেবক
দলের ইউনিয়ন সভাপতি ইসমাইল হোসেন সবুজ, ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ফারুক বাঘাসহ
১০ থেকে ১২ জনের একটি চক্র জড়িত। তারা মৌওসুমের প্রতিপিস তরমুজে তিন টাকা; ধান,
সয়াবিন ও মরিচের বস্তাপ্রতি ৪০ টাকা; পণ্যবাহী নৌকা, ট্রলার ও কার্গোর থেকে প্রতিব্যাগ
সিমেন্ট ১৫ টাকা, বালি পরিবহনের বলগেট প্রতি দুই হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।
এতে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। মাসে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার
চাঁদাবাজি হচ্ছে নাছিরগঞ্জ এলাকায়। আর এ চাঁদার ভাগ ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের
পকেটে যাচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, তারা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে
চাষাবাদ করেন। কিন্তু ঘাটে এসে চাঁদা দিতে হলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই ওঠে না। চাঁদাবাজির
কারণে সামনের মৌসুমে ফসল উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান তারা।আরেকজন
কৃষক বলেন, প্রতিদিনই চাঁদাবাজির কারণে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে। আমরা প্রশাসন ও দলীয় নেতাদের
কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেছি। কিন্তু তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি।চরাঞ্চলের
কৃষকদের দাবি, দ্রুত এই চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে তারা নির্বিঘ্নে
উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে পারেন।নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া
হবে।’অভিযোগ
প্রসঙ্গে চরকালকিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম সুমন বলেন, বিআইডাব্লিউটিএ’র
অধীনে ঘাটের সাব-ইজারা নিয়ে ইসমাইল হোসেন সবুজ ও তার লোকজন নির্ধারিত হারে টোল আদায়
করে থাকেন। ঘাটের
ইজারাদার ভোলা জেলার বাসিন্দা সাবেরুল ইসলাম বলেন, কমলনগরের জনৈক হুমায়ুন কবির আমার
কাছ থেকে সাব-ইজারা নিয়েছেন ওই ঘাট। কিন্তু হুমায়ুন কবিরকেও কোনো পাত্তা দিচ্ছে না
স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী ওই পাঁচ নেতার চক্রটি। বেপরোয়া চাঁদাবাজি করছেন তারা।এ
ব্যাপারে উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন,
খোঁজ নিয়ে অভিযুক্ত বিএনপির ওই পাঁচ নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কমলনগর
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদুল আলম বলেন, মেঘনা নদী ও ঘাট এলাকায় চাঁদাবাজির
বিষয়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা
নেওয়া হবে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ