দেশের স্থাপত্য,
ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ইতিহাসের অন্যতম অমূল্য নিদর্শন বাগেরহাটের বিশ্ব ঐতিহ্য
ষাটগম্বুজ মসজিদ দ্রুত ক্ষয়ের মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত লবণাক্ততা,
আর্দ্রতা এবং পরিবেশগত দূষণের প্রভাবে মসজিদের দেয়াল, মিহরাব, স্তম্ভ ও গম্বুজে
মারাত্মক ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানায়,
দ্রুত সংরক্ষণ কাজ শুরু না হলে মসজিদের প্রধান মিহরাব যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে।
মধ্যযুগে
সুফি সাধক উলুগ খানজাহান আলীর গড়ে তোলা বাগেরহাট একসময় পরিচিত ছিল সুপরিকল্পিত নগর
হিসেবে।
তার
স্থাপত্যশৈলীর অদ্বিতীয় নিদর্শনগুলোর মধ্যে ষাটগম্বুজ মসজিদ অন্যতম, যা ইউনেস্কো
১৯৮৫ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। চুনসুরকি, পোড়ামাটির ইট ও বেলে পাথরের
নিখুঁত কারুকাজে নির্মিত এই মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততা ও আর্দ্রতার ক্ষতিকর
প্রভাবে ভুগছে।
মসজিদের
নিচের অংশ দিয়ে উঠে আসা লবণাক্ত পানি ইটের ভেতরে লবণ স্ফটিক তৈরি করছে, যা ইটের
বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে। দেয়ালজুড়ে জমেছে সাদা লবণের স্তর, জায়গায় জায়গায় দেখা
দিয়েছে ফাটল, খসে পড়ছে চুন। মিহরাবের সূক্ষ্ম
নকশাও হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
সম্প্রতি
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি এবং আইকমসের এক যৌথ গবেষণায় উঠে
এসেছে আরো উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, শিল্প এলাকার দূষণ,
বর্ষার আর্দ্রতা ও ভূগর্ভস্থ লবণাক্ততার কারণে মসজিদের ক্ষয় আগের তুলনায় বহুগুণে
বেড়েছে।
অধিদপ্তর
সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শফিকুল আলমকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ
কমিটি গঠন করে।
গত ১৭
এপ্রিল কমিটি পরিদর্শন শেষে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে— ষাটগম্বুজ
মসজিদের মূল মিহরাব এখন যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
ড.
শফিকুল আলম বলেন, ‘সিডর ও আইলার জলোচ্ছ্বাস থেকে বায়ু–বাহিত লবণাক্ত পানি মসজিদের
মিহরাবে বড় ক্ষতি করেছে, যা সময়ের সঙ্গে আরো তীব্র হয়েছে। বেলে পাথরে নির্মিত
হওয়ায় স্তম্ভ ও মিহরাব সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মিহরাবের দুই পাশের স্তম্ভে
শূন্যতা তৈরি হয়েছে। পাথরগুলো ধরে রাখার লোহার ক্ল্যাম্প ও ডাওয়েলে তীব্র জং ধরায়
সংযোগ দুর্বল হয়ে গেছে। এর ফলে মিহরাবের বহনক্ষমতা
কমে গেছে।’
তিনি
আরও বলেন, ‘মিহরাব ধসে পড়লে ইউনেস্কো ষাটগম্বুজ মসজিদকে World Heritage in Danger
ঘোষণা করতে পারে, যা দেশের জন্য বড় নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হবে।’
প্রত্নতত্ত্ব
অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন জানায়,
ইউনেস্কোর সহায়তায় মসজিদের প্রতিটি দেয়াল, স্তম্ভ ও গম্বুজের ক্ষয়-মানচিত্র তৈরি
করা হবে, যার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে টেকসই সংরক্ষণ কাজ শুরু হবে।
তিনি
বলেন, ‘দেশে পাথরের স্থাপনা সংরক্ষণে দক্ষ জনবল নেই। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা
অপরিহার্য। প্রয়োজন হলে বুয়েটের স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ারদের যুক্ত করা হবে।’ তিনি
আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে দেশীয় স্থপতি, প্রকৌশলী,
রসায়নবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে ভবিষ্যতে
অন্যান্য প্রত্ন স্থাপনা সংরক্ষণেও দেশ স্বনির্ভর হবে।’
বিশেষজ্ঞ
কমিটি বলছে, এখনই জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক সংরক্ষণ কাজ না শুরু করলে শুধু মিহরাব নয়,
মসজিদের মূল কাঠামোও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। বাগেরহাটের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের এই
অনন্য সাক্ষ্য রক্ষায় সময় এখন অত্যন্ত সীমিত।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫
দেশের স্থাপত্য,
ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ইতিহাসের অন্যতম অমূল্য নিদর্শন বাগেরহাটের বিশ্ব ঐতিহ্য
ষাটগম্বুজ মসজিদ দ্রুত ক্ষয়ের মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত লবণাক্ততা,
আর্দ্রতা এবং পরিবেশগত দূষণের প্রভাবে মসজিদের দেয়াল, মিহরাব, স্তম্ভ ও গম্বুজে
মারাত্মক ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানায়,
দ্রুত সংরক্ষণ কাজ শুরু না হলে মসজিদের প্রধান মিহরাব যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে।
মধ্যযুগে
সুফি সাধক উলুগ খানজাহান আলীর গড়ে তোলা বাগেরহাট একসময় পরিচিত ছিল সুপরিকল্পিত নগর
হিসেবে।
তার
স্থাপত্যশৈলীর অদ্বিতীয় নিদর্শনগুলোর মধ্যে ষাটগম্বুজ মসজিদ অন্যতম, যা ইউনেস্কো
১৯৮৫ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। চুনসুরকি, পোড়ামাটির ইট ও বেলে পাথরের
নিখুঁত কারুকাজে নির্মিত এই মসজিদটি দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততা ও আর্দ্রতার ক্ষতিকর
প্রভাবে ভুগছে।
মসজিদের
নিচের অংশ দিয়ে উঠে আসা লবণাক্ত পানি ইটের ভেতরে লবণ স্ফটিক তৈরি করছে, যা ইটের
বন্ধন দুর্বল করে দিচ্ছে। দেয়ালজুড়ে জমেছে সাদা লবণের স্তর, জায়গায় জায়গায় দেখা
দিয়েছে ফাটল, খসে পড়ছে চুন। মিহরাবের সূক্ষ্ম
নকশাও হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
সম্প্রতি
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি এবং আইকমসের এক যৌথ গবেষণায় উঠে
এসেছে আরো উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, শিল্প এলাকার দূষণ,
বর্ষার আর্দ্রতা ও ভূগর্ভস্থ লবণাক্ততার কারণে মসজিদের ক্ষয় আগের তুলনায় বহুগুণে
বেড়েছে।
অধিদপ্তর
সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শফিকুল আলমকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ
কমিটি গঠন করে।
গত ১৭
এপ্রিল কমিটি পরিদর্শন শেষে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে— ষাটগম্বুজ
মসজিদের মূল মিহরাব এখন যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
ড.
শফিকুল আলম বলেন, ‘সিডর ও আইলার জলোচ্ছ্বাস থেকে বায়ু–বাহিত লবণাক্ত পানি মসজিদের
মিহরাবে বড় ক্ষতি করেছে, যা সময়ের সঙ্গে আরো তীব্র হয়েছে। বেলে পাথরে নির্মিত
হওয়ায় স্তম্ভ ও মিহরাব সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মিহরাবের দুই পাশের স্তম্ভে
শূন্যতা তৈরি হয়েছে। পাথরগুলো ধরে রাখার লোহার ক্ল্যাম্প ও ডাওয়েলে তীব্র জং ধরায়
সংযোগ দুর্বল হয়ে গেছে। এর ফলে মিহরাবের বহনক্ষমতা
কমে গেছে।’
তিনি
আরও বলেন, ‘মিহরাব ধসে পড়লে ইউনেস্কো ষাটগম্বুজ মসজিদকে World Heritage in Danger
ঘোষণা করতে পারে, যা দেশের জন্য বড় নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হবে।’
প্রত্নতত্ত্ব
অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন জানায়,
ইউনেস্কোর সহায়তায় মসজিদের প্রতিটি দেয়াল, স্তম্ভ ও গম্বুজের ক্ষয়-মানচিত্র তৈরি
করা হবে, যার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে টেকসই সংরক্ষণ কাজ শুরু হবে।
তিনি
বলেন, ‘দেশে পাথরের স্থাপনা সংরক্ষণে দক্ষ জনবল নেই। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা
অপরিহার্য। প্রয়োজন হলে বুয়েটের স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ারদের যুক্ত করা হবে।’ তিনি
আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে দেশীয় স্থপতি, প্রকৌশলী,
রসায়নবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে ভবিষ্যতে
অন্যান্য প্রত্ন স্থাপনা সংরক্ষণেও দেশ স্বনির্ভর হবে।’
বিশেষজ্ঞ
কমিটি বলছে, এখনই জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক সংরক্ষণ কাজ না শুরু করলে শুধু মিহরাব নয়,
মসজিদের মূল কাঠামোও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। বাগেরহাটের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের এই
অনন্য সাক্ষ্য রক্ষায় সময় এখন অত্যন্ত সীমিত।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন