দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থাংশ বা কোয়ার্টার সেঞ্চুরি। এই অংশের শেষ মাস ডিসেম্বর শেষ হয়েছে হয়েছে কান্না ভেজা ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে। এর আগে শেষ হয়েছে ভুলতে না পারা নভেম্বর। ছোটবেলা থেকে অনবরত ইতিহাস পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সনদ লাভের জন্য রাজনীতি বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে গিয়েও রাজনৈতিক ইতিহাস পড়তে হয়েছে। তাই কোন কিছু নিয়ে লিখতে গেলেই অতীতের অনেক ঘটনা প্রবাহ মনে ভর করে। বিশেষ করে নভেম্বর ও ডিসেম্বরের ঘটনা ভুলার মত নয়।
এ বছর নভেম্বর মাস শুরু হয়েছিল ব্যতিক্রমী ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। ১৯৭০ সালের ১২ ই নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) দক্ষিণাঞ্চলে এই উপমহাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহনতম ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এতে ৫০ থেকে ৭৫ হাজার মানুষ এবং কয়েক লক্ষ গবাদীতে পশুর মৃত্যুর ঘটে। শুধুমাত্র ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলায় তৎকালীন ৪৬ শতাংশ (প্রায় ১৭ হাজার) মানুষের জীবনহানির কারণে দিনটি ভোলাবাসীর কাছে আতঙ্কের নাম। এই ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস প্রদানে ব্যর্থতা, যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনে গাফিলতি ও ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে ত্রাণ পুনর্বাসন এমনকি মৃতদের সৎকারে পাকিস্তান সরকারের আন্তরিকতার অভাব চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে পশ্চিম পাকিস্তানের উপর নির্ভর করে আর চলা যাবে না। এ সময় আরো প্রমাণিত হয় যে, দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় থাকা প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা বহুমাত্রিক রাজনীতি করলেও তাদের ভাগ্য উন্নয়নে যথাযথ নজর ও গুরুত্ব দেয়ার সময় নেই শহুরে দেবতাদের। এমন উপলব্ধি ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ করা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে। তবে ১৯৭০ থেকে ২০২৫, এই ৫৫ বছরে প্রান্তিক জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটা সফল হয়েছে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ, তা এক বিরাট প্রশ্ন।
১৯৮৮ সালের ২৯শে নভেম্বর আরেকটি ঘূর্ণিঝড় লন্ডভন্ড করে দেয় বাংলাদেশের বাগেরহাট, বরগুনা, ভোলা, যশোর, খুলনা, পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরা জেলা এবং মংলা বন্দর ও সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এই ঝড়ে বাংলাদেশের ৫৭০৮ জনের মৃত্যু ঘটে । তাছাড়াও ৭০ শতাংশ ফসল বিনষ্ট ও ৩৩ হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু, ১০ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস, ২২টি মাঝারি নৌযান, শতাধিক মাছ ট্রলার ও ১টি বড় জাহাজ ডুবির করুন সাক্ষী ১৯৮৮ সালের ২৯ শে নভেম্বর। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঝড়ঝাপটা তেমন লক্ষ্য করা যায়নি সত্য, তবে নরসিংদীতে উৎপন্ন হওয়া ২১শে নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প জানিয়ে দিয়েছে সতর্ক না হলে বড় বিপদ আসন্ন। ভূমিকম্প কাঁপিয়েছে রাজধানী সহ সারাদেশ। তবে এতেও ঘুম ভাঙ্গেনি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে থাকা লাখো মানুষের । এর চেয়েও আশঙ্কার বিষয় ভূমিকম্পে সবার আগে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কিছু হাসপাতাল। ফলে ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে বিনা চিকিৎসায় বহু মানুষের প্রাণ হারানোর শঙ্কা রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক দুর্যোগের কারণেও নভেম্বর এক আতংকের নাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটে। এরপর জেলখানায় আটক জাতীয়পর্যয়ের চার রাজনৈতিক নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় নভেম্বরের ৩ তারিখ রাতে। এর পরপরই বন্দী করা হয় তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে। পরবর্তীতে সিপাহী জনতার এক ঝটিকা অপারেশনে বন্দিদশা থেকে ৭ই নভেম্বর তারিখে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। আর একই দিনে জিয়ার বিরুদ্ধে যাওয়ায় উত্তেজিত সেনারা হত্যা করেন সাভার সেনানিবাসে আশ্রয় নেয়া মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ, বীর উত্তম, কর্নেল নাজমুল হুদা, বীরবিক্রম এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার, বীরউত্তম কে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও নভেম্বর এক ঘটনাবহুল মাসের নাম। ১৯৬৩ সালের ২২ শে নভেম্বর তারিখে লী হার্ভে অসয়ার্ড এক প্রাক্তন মেরিন সেনা গুলি করে হত্যা করে আমেরিকার ৩৫ তম প্রেসিডেন্ট এফ ক্যানেডিকে। ৩রা নভেম্বর ৬৪৪ সালে শাহাদাত বরণ করেন মুসলমানদের অন্যতম খলিফা ওমর বিন খাত্তাব ।আবার মুসলমানদের শত্রু রূপে বিবেচিত ইসরাইলের দুবারের প্রধানমন্ত্রী ইসহাক রবিন ১৯৯৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর তারিখে আততায়ির গুলিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এছাড়াও বিভিন্ন বছরে এই নভেম্বর মাসে যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের অন্যতম রোমান সম্রাট নিউমেরিয়ান ও মৌরিসি, ডেনমার্কের রাজা পঞ্চম এরিক, নেপালের প্রধানমন্ত্রী রন্দীপ সিং, চীনের সম্রাট গুয়াংজু, ডোমিনিকানের প্রেসিডেন্ট রেমন, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী জোশী, জাপানের প্রধানমন্ত্রী হারা তাকাসাকি, আফগানিস্তানের রাজা নাদির শাহ, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট কার্লোস, ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট দিন দিয়েন, জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী ওয়াসফি তাল প্রমুখ। তাই নভেম্বরকে রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশে সার্বিক বিচারে নভেম্বর মাসে তেমন বড় মাপের কোন অঘটন ঘটেনি। সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নির্বাচন কমিশন। আলোচিত বিষয় ছিল সামনের নির্বাচন। দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা। আর প্রশ্ন ছিল তারেক জিয়া কেন আসছেন না? কবে আসবেন? আসলেই কি আসবেন? কেন একক সিদ্ধান্তে তিনি দেশে আসতে পারছেন না বলে জানালেন ইত্যাদি।
নভেম্বর গড়িয়ে ডিসেম্বর এলো। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে ১৬ ই ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল বিধায় জাতীয় জীবনে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন এবং এই দিনটির কারণে ডিসেম্বর অতি গুরুত্বপূর্ণ মাস। একাত্তরের ১৪ই ডিসেম্বর এদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার যুদ্ধে ডিসেম্বর মাস জুড়ে বহু মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ বাঙালি শাহাদাত বরণ করেন বলে এই মাসে দেশবাসী বিজয়ের সাথে স্বজন হারানোর বেদনাও অনুভব করে। এবছর এই বেদনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে জুলাই বিপ্লবের সম্মুখ সারীর অগ্রসৈনিক শহীদ ওসমান শরীফ হাদীর শাহাদাত বারণ। ১২ই ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর তার মাথায় গুলি করে কিছুদিন আগে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া এক চিহ্নিত ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। ৭ দিন পর ১৯ ডিসেম্বর তারিখে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় ওসমান শরীফ হাদী শাহাদাত বরণ করেন। পরদিন ২০শে ডিসেম্বর তারিখে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বীরউত্তমের নীরব মৃত্যু। ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি রূপে উপস্থিত ছিলেন। তবে তার দেওয়া কিছু বক্তব্য এবং তার লেখা বইয়ের কিছু অংশের সাথে একমত না হওয়ায় বিগত সরকারের আমলে তাকে কোণঠাসা করা হয় এবং কেবল আওয়ামী লীগই নয়, রাজনীতি থেকেই একপ্রকার নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। অন্যদিকে সুদানে কর্মরত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে কর্মরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ জন সদস্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আচমকা ড্রোন আক্রমণে প্রাণ হারায়।
এমন বেদনাবিধূর ঘটনাসমূহের পর ২৫ ডিসেম্বর তারিখে সপরিবারে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরেন বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার তার দেওয়া বক্তব্য এবং আই হ্যাভ এ প্ল্যান শীর্ষক স্লোগান কেবল দলীয় নেতাকর্মীদের নয়, সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক আসার সঞ্চার করে।
অনেকেই তারেক জিয়ার নিরাপত্তার জন্য যাবতীয় আয়োজন নিয়ে কথা তুলেছেন। তবে তাদের মনেরাখতে হবে ২০০৭ সালের এমন ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে নির্বাসন থেকে ফিরে আসা পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনীতিবিদ বেনজির ভুট্টো রাওয়াল পিন্ডিতে নির্বাচনী জনসভা শেষে গাড়িতে ফেরার মুহূর্তে বোমা হামলায় তাৎক্ষণিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ১৯৮৩ সালের ২১ শে আগস্ট ফিলিপাইনের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ফারদিনান্দ মার্কোসের আমলে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরা তার প্রতিদ্বন্দ্বী বেনিগ্নো নিনয় একুইনো জুনিয়র বিমান থেকে নামামাত্র বিমানবন্দরেই সরকারি এজেন্টদের গুলির আঘাতে প্রাণ হারান। রোমকে ধরা হয় প্রাচীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার আঁতুড়ঘর। ৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রোম সাম্রাজ্যের ৮ জন সম্রাট এই ডিসেম্বর মাসেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এছাড়াও নরওয়ের রাজা হোরাল্ড গিল, সুইডেনের রাজা প্রথম সেভারকার, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী জন প্রিম, পর্তুগালের রাষ্ট্রপতি সিন্দনিয়া পেইজ, পোল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি গ্যাব্রিল নারুতোউজ, মিশরের প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ নকরাশী পাশা, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবিবি আরিজাল, স্পেনের আরেক প্রধানমন্ত্রী লুইস কারিরো ব্লেমকো এবং কারগিজস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম সুলতান ইব্রাহিমভ বিভিন্ন বছরে এই ডিসেম্বর মাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাই বছরের শেষ মাসটি কেটেছে অজানা আশঙ্কা নিয়ে।
বছরটি শেষ হতে যখন ৪৮ ঘণ্টা বাকি, তখন সবার হৃদয় বিদীর্ণ করে খবর এলো ৩০ ডিসেম্বর সকাল ছটায় সবাইকে কাঁদিয়ে এক গৌরবময় জীবনের ইতি টেনেছেন বেগম খালেদা জিয়া। যে মানুষটিকে এতিমের টাকা আত্মসাৎ কারী বলে অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা চলেছিল ১৫ বছর ধরে, সেই মানুষটিকে আদত একজন সৎ ও খাঁটি দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ হিসেবে মানুষ কতটা শ্রদ্ধাভরে ভালবাসে তা দেখানোর জন্যই স্রষ্টা যেন তাকে এই আটটি দশক বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাকে সরাসরি জেলখানায় হত্যা করা না হলেও উপযুক্ত চিকিৎসা বঞ্চিত করে এবং পরিবার-পরিজন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রেখে তিলে তিলে তাকে হত্যার সব প্রচেষ্টায় চালিয়েছিল বিগত সরকার। এই মহীয়সী নারী সম্পর্কে আরেক নারী রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা যে কদর্য ভাষায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছে সর্বমহল। অন্যদিকে ৫ ই আগস্টে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল বেগম খালেদা জিয়া তার সম্পর্কে কোন প্রকার কটুক্তি করেননি। এই ঘটনা এমনকি তার সুযোগ্য উত্তরসূরী তারেক জিয়া জানাযা পূর্ববর্তী সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে একজন খাঁটি মুসলমান ও পুত্র রূপে কেবল তার মার পক্ষে ক্ষমা চেয়েছেন এবং কোন ঋণ থাকলে তা পরিশোধের ওয়াদা করেছেন। একটি বারও তিনি শেখ হাসিনার কূটকচাল কিংবা তার মার প্রতি অবিচারের কথা প্রকাশ করেননি। এভাবেই যোগ্য পিতামাতার যোগ্য সন্তান রূপেই তারেক জিয়া আবির্ভূত হলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং সব লোভ লালসা ও ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে বেগম জিয়ার সেবায় নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে উজাড় করে দিয়ে একজন ফাতেমা মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার এক নতুন উদাহরণ তৈরি করেছেন। আর সেই উদাহরণকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে তারেক জিয়া ও তার পরিবার ফাতেমাকে নিজেদের পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন আরেক মহান উদাহরণ।
বেগম খালেদা জিয়ার জানাযায় কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতি ও স্মরণকালের বৃহত্তর সমাবেশ প্রমাণ করেছে যে দেশপ্রেমিক এবং সৎ মানুষকে এদেশের মানুষ এবং বিশ্ব সমাজ শ্রদ্ধা করতে জানে। এ থেকে আগামীদিনের রাজনীতিবিদরা যথাযথ শিক্ষা নেবেন বলেই প্রত্যাশিত।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে "যায় দিন ভালো"। নানা কারণে ডিসেম্বর মাস আমাদের জন্য সুখকর হয়েছে বলে দাবি করা যায় না। একসময় শীত মৌসুমকে কেন্দ্র করে মেলা, যাত্রা, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সার্কাস, পুতুল নাচ প্রভৃতির আসর বসতো। জোরেসোরে চলতো পীর আউলিয়ার স্মরণে মাজারকেন্দ্রিক ওরস ও মেলা, কাওয়ালির আসর, ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিল, দলবদ্ধ জিকির আসকার প্রভৃতি। বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে তাবলীগ প্রিয় দেশ-বিদেশের লাখো মুসল্লির সমাবেশ করত ঢাকার অদূরে টঙ্গীতে। বছর শেষে এসব আয়োজনে এবছর ভাটা পড়েছিল। কারণ যাই হোক, মানুষ একসাথে হয়ে কোন কিছু উপভোগ করার আগ্রহ যেন হারিয়ে ফেলেছে। তার বিপরীতে লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল ১৭ বছর পর তারেক জিয়ার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে। অথচ বেগম খালেদা জিয়া যখন দুটি বালু ট্রাক এর কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছিলেন না, তখন তা সরাতে কোন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাজনীতির এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই তারেক জিয়া দেশ ও জনগণের জন্য তার পরিকল্পনা সাজিয়েছেন এমনটাই প্রত্যাশা করছি। আরো প্রত্যাশা করছি সততা ও দেশপ্রেমের যে মশাল বেগম খালেদা জিয়া জ্বালিয়ে গেছেন, তা অনির্বাণ শিখা হয়ে প্রজ্জ্বলিত থাকুক সেই মশাল। ২০২৬ হোক বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল একটি বছর এবং বিশ্বের দরবারে এবং গণতন্ত্রের ইতিহাসে বাংলাদেশের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখারমতো একটি উপলক্ষ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর, গবেষক, বিশ্লেষক ও কালামিস্ট
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
বিষয় : গণতন্ত্র ছাব্বিশ প্রতিষ্ঠার বছর
.png)
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬
দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থাংশ বা কোয়ার্টার সেঞ্চুরি। এই অংশের শেষ মাস ডিসেম্বর শেষ হয়েছে হয়েছে কান্না ভেজা ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে। এর আগে শেষ হয়েছে ভুলতে না পারা নভেম্বর। ছোটবেলা থেকে অনবরত ইতিহাস পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সনদ লাভের জন্য রাজনীতি বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে গিয়েও রাজনৈতিক ইতিহাস পড়তে হয়েছে। তাই কোন কিছু নিয়ে লিখতে গেলেই অতীতের অনেক ঘটনা প্রবাহ মনে ভর করে। বিশেষ করে নভেম্বর ও ডিসেম্বরের ঘটনা ভুলার মত নয়।
এ বছর নভেম্বর মাস শুরু হয়েছিল ব্যতিক্রমী ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে। ১৯৭০ সালের ১২ ই নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) দক্ষিণাঞ্চলে এই উপমহাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহনতম ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এতে ৫০ থেকে ৭৫ হাজার মানুষ এবং কয়েক লক্ষ গবাদীতে পশুর মৃত্যুর ঘটে। শুধুমাত্র ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলায় তৎকালীন ৪৬ শতাংশ (প্রায় ১৭ হাজার) মানুষের জীবনহানির কারণে দিনটি ভোলাবাসীর কাছে আতঙ্কের নাম। এই ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস প্রদানে ব্যর্থতা, যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনে গাফিলতি ও ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে ত্রাণ পুনর্বাসন এমনকি মৃতদের সৎকারে পাকিস্তান সরকারের আন্তরিকতার অভাব চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে পশ্চিম পাকিস্তানের উপর নির্ভর করে আর চলা যাবে না। এ সময় আরো প্রমাণিত হয় যে, দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় থাকা প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা বহুমাত্রিক রাজনীতি করলেও তাদের ভাগ্য উন্নয়নে যথাযথ নজর ও গুরুত্ব দেয়ার সময় নেই শহুরে দেবতাদের। এমন উপলব্ধি ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ করা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে। তবে ১৯৭০ থেকে ২০২৫, এই ৫৫ বছরে প্রান্তিক জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটা সফল হয়েছে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ, তা এক বিরাট প্রশ্ন।
১৯৮৮ সালের ২৯শে নভেম্বর আরেকটি ঘূর্ণিঝড় লন্ডভন্ড করে দেয় বাংলাদেশের বাগেরহাট, বরগুনা, ভোলা, যশোর, খুলনা, পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরা জেলা এবং মংলা বন্দর ও সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এই ঝড়ে বাংলাদেশের ৫৭০৮ জনের মৃত্যু ঘটে । তাছাড়াও ৭০ শতাংশ ফসল বিনষ্ট ও ৩৩ হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু, ১০ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস, ২২টি মাঝারি নৌযান, শতাধিক মাছ ট্রলার ও ১টি বড় জাহাজ ডুবির করুন সাক্ষী ১৯৮৮ সালের ২৯ শে নভেম্বর। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঝড়ঝাপটা তেমন লক্ষ্য করা যায়নি সত্য, তবে নরসিংদীতে উৎপন্ন হওয়া ২১শে নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প জানিয়ে দিয়েছে সতর্ক না হলে বড় বিপদ আসন্ন। ভূমিকম্প কাঁপিয়েছে রাজধানী সহ সারাদেশ। তবে এতেও ঘুম ভাঙ্গেনি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে থাকা লাখো মানুষের । এর চেয়েও আশঙ্কার বিষয় ভূমিকম্পে সবার আগে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কিছু হাসপাতাল। ফলে ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে বিনা চিকিৎসায় বহু মানুষের প্রাণ হারানোর শঙ্কা রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক দুর্যোগের কারণেও নভেম্বর এক আতংকের নাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটে। এরপর জেলখানায় আটক জাতীয়পর্যয়ের চার রাজনৈতিক নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় নভেম্বরের ৩ তারিখ রাতে। এর পরপরই বন্দী করা হয় তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে। পরবর্তীতে সিপাহী জনতার এক ঝটিকা অপারেশনে বন্দিদশা থেকে ৭ই নভেম্বর তারিখে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। আর একই দিনে জিয়ার বিরুদ্ধে যাওয়ায় উত্তেজিত সেনারা হত্যা করেন সাভার সেনানিবাসে আশ্রয় নেয়া মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ, বীর উত্তম, কর্নেল নাজমুল হুদা, বীরবিক্রম এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার, বীরউত্তম কে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও নভেম্বর এক ঘটনাবহুল মাসের নাম। ১৯৬৩ সালের ২২ শে নভেম্বর তারিখে লী হার্ভে অসয়ার্ড এক প্রাক্তন মেরিন সেনা গুলি করে হত্যা করে আমেরিকার ৩৫ তম প্রেসিডেন্ট এফ ক্যানেডিকে। ৩রা নভেম্বর ৬৪৪ সালে শাহাদাত বরণ করেন মুসলমানদের অন্যতম খলিফা ওমর বিন খাত্তাব ।আবার মুসলমানদের শত্রু রূপে বিবেচিত ইসরাইলের দুবারের প্রধানমন্ত্রী ইসহাক রবিন ১৯৯৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর তারিখে আততায়ির গুলিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এছাড়াও বিভিন্ন বছরে এই নভেম্বর মাসে যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের অন্যতম রোমান সম্রাট নিউমেরিয়ান ও মৌরিসি, ডেনমার্কের রাজা পঞ্চম এরিক, নেপালের প্রধানমন্ত্রী রন্দীপ সিং, চীনের সম্রাট গুয়াংজু, ডোমিনিকানের প্রেসিডেন্ট রেমন, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী জোশী, জাপানের প্রধানমন্ত্রী হারা তাকাসাকি, আফগানিস্তানের রাজা নাদির শাহ, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট কার্লোস, ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট দিন দিয়েন, জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী ওয়াসফি তাল প্রমুখ। তাই নভেম্বরকে রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশে সার্বিক বিচারে নভেম্বর মাসে তেমন বড় মাপের কোন অঘটন ঘটেনি। সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নির্বাচন কমিশন। আলোচিত বিষয় ছিল সামনের নির্বাচন। দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা। আর প্রশ্ন ছিল তারেক জিয়া কেন আসছেন না? কবে আসবেন? আসলেই কি আসবেন? কেন একক সিদ্ধান্তে তিনি দেশে আসতে পারছেন না বলে জানালেন ইত্যাদি।
নভেম্বর গড়িয়ে ডিসেম্বর এলো। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে ১৬ ই ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল বিধায় জাতীয় জীবনে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন এবং এই দিনটির কারণে ডিসেম্বর অতি গুরুত্বপূর্ণ মাস। একাত্তরের ১৪ই ডিসেম্বর এদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার যুদ্ধে ডিসেম্বর মাস জুড়ে বহু মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ বাঙালি শাহাদাত বরণ করেন বলে এই মাসে দেশবাসী বিজয়ের সাথে স্বজন হারানোর বেদনাও অনুভব করে। এবছর এই বেদনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে জুলাই বিপ্লবের সম্মুখ সারীর অগ্রসৈনিক শহীদ ওসমান শরীফ হাদীর শাহাদাত বারণ। ১২ই ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পর তার মাথায় গুলি করে কিছুদিন আগে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া এক চিহ্নিত ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। ৭ দিন পর ১৯ ডিসেম্বর তারিখে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় ওসমান শরীফ হাদী শাহাদাত বরণ করেন। পরদিন ২০শে ডিসেম্বর তারিখে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বীরউত্তমের নীরব মৃত্যু। ১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি রূপে উপস্থিত ছিলেন। তবে তার দেওয়া কিছু বক্তব্য এবং তার লেখা বইয়ের কিছু অংশের সাথে একমত না হওয়ায় বিগত সরকারের আমলে তাকে কোণঠাসা করা হয় এবং কেবল আওয়ামী লীগই নয়, রাজনীতি থেকেই একপ্রকার নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। অন্যদিকে সুদানে কর্মরত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে কর্মরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ জন সদস্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আচমকা ড্রোন আক্রমণে প্রাণ হারায়।
এমন বেদনাবিধূর ঘটনাসমূহের পর ২৫ ডিসেম্বর তারিখে সপরিবারে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরেন বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার তার দেওয়া বক্তব্য এবং আই হ্যাভ এ প্ল্যান শীর্ষক স্লোগান কেবল দলীয় নেতাকর্মীদের নয়, সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক আসার সঞ্চার করে।
অনেকেই তারেক জিয়ার নিরাপত্তার জন্য যাবতীয় আয়োজন নিয়ে কথা তুলেছেন। তবে তাদের মনেরাখতে হবে ২০০৭ সালের এমন ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে নির্বাসন থেকে ফিরে আসা পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনীতিবিদ বেনজির ভুট্টো রাওয়াল পিন্ডিতে নির্বাচনী জনসভা শেষে গাড়িতে ফেরার মুহূর্তে বোমা হামলায় তাৎক্ষণিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ১৯৮৩ সালের ২১ শে আগস্ট ফিলিপাইনের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ফারদিনান্দ মার্কোসের আমলে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরা তার প্রতিদ্বন্দ্বী বেনিগ্নো নিনয় একুইনো জুনিয়র বিমান থেকে নামামাত্র বিমানবন্দরেই সরকারি এজেন্টদের গুলির আঘাতে প্রাণ হারান। রোমকে ধরা হয় প্রাচীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার আঁতুড়ঘর। ৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রোম সাম্রাজ্যের ৮ জন সম্রাট এই ডিসেম্বর মাসেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এছাড়াও নরওয়ের রাজা হোরাল্ড গিল, সুইডেনের রাজা প্রথম সেভারকার, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী জন প্রিম, পর্তুগালের রাষ্ট্রপতি সিন্দনিয়া পেইজ, পোল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি গ্যাব্রিল নারুতোউজ, মিশরের প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ নকরাশী পাশা, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবিবি আরিজাল, স্পেনের আরেক প্রধানমন্ত্রী লুইস কারিরো ব্লেমকো এবং কারগিজস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইব্রাহিম সুলতান ইব্রাহিমভ বিভিন্ন বছরে এই ডিসেম্বর মাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাই বছরের শেষ মাসটি কেটেছে অজানা আশঙ্কা নিয়ে।
বছরটি শেষ হতে যখন ৪৮ ঘণ্টা বাকি, তখন সবার হৃদয় বিদীর্ণ করে খবর এলো ৩০ ডিসেম্বর সকাল ছটায় সবাইকে কাঁদিয়ে এক গৌরবময় জীবনের ইতি টেনেছেন বেগম খালেদা জিয়া। যে মানুষটিকে এতিমের টাকা আত্মসাৎ কারী বলে অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা চলেছিল ১৫ বছর ধরে, সেই মানুষটিকে আদত একজন সৎ ও খাঁটি দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ হিসেবে মানুষ কতটা শ্রদ্ধাভরে ভালবাসে তা দেখানোর জন্যই স্রষ্টা যেন তাকে এই আটটি দশক বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাকে সরাসরি জেলখানায় হত্যা করা না হলেও উপযুক্ত চিকিৎসা বঞ্চিত করে এবং পরিবার-পরিজন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রেখে তিলে তিলে তাকে হত্যার সব প্রচেষ্টায় চালিয়েছিল বিগত সরকার। এই মহীয়সী নারী সম্পর্কে আরেক নারী রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা যে কদর্য ভাষায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেছে সর্বমহল। অন্যদিকে ৫ ই আগস্টে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল বেগম খালেদা জিয়া তার সম্পর্কে কোন প্রকার কটুক্তি করেননি। এই ঘটনা এমনকি তার সুযোগ্য উত্তরসূরী তারেক জিয়া জানাযা পূর্ববর্তী সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে একজন খাঁটি মুসলমান ও পুত্র রূপে কেবল তার মার পক্ষে ক্ষমা চেয়েছেন এবং কোন ঋণ থাকলে তা পরিশোধের ওয়াদা করেছেন। একটি বারও তিনি শেখ হাসিনার কূটকচাল কিংবা তার মার প্রতি অবিচারের কথা প্রকাশ করেননি। এভাবেই যোগ্য পিতামাতার যোগ্য সন্তান রূপেই তারেক জিয়া আবির্ভূত হলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং সব লোভ লালসা ও ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে বেগম জিয়ার সেবায় নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে উজাড় করে দিয়ে একজন ফাতেমা মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার এক নতুন উদাহরণ তৈরি করেছেন। আর সেই উদাহরণকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে তারেক জিয়া ও তার পরিবার ফাতেমাকে নিজেদের পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন আরেক মহান উদাহরণ।
বেগম খালেদা জিয়ার জানাযায় কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতি ও স্মরণকালের বৃহত্তর সমাবেশ প্রমাণ করেছে যে দেশপ্রেমিক এবং সৎ মানুষকে এদেশের মানুষ এবং বিশ্ব সমাজ শ্রদ্ধা করতে জানে। এ থেকে আগামীদিনের রাজনীতিবিদরা যথাযথ শিক্ষা নেবেন বলেই প্রত্যাশিত।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে "যায় দিন ভালো"। নানা কারণে ডিসেম্বর মাস আমাদের জন্য সুখকর হয়েছে বলে দাবি করা যায় না। একসময় শীত মৌসুমকে কেন্দ্র করে মেলা, যাত্রা, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সার্কাস, পুতুল নাচ প্রভৃতির আসর বসতো। জোরেসোরে চলতো পীর আউলিয়ার স্মরণে মাজারকেন্দ্রিক ওরস ও মেলা, কাওয়ালির আসর, ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিল, দলবদ্ধ জিকির আসকার প্রভৃতি। বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে তাবলীগ প্রিয় দেশ-বিদেশের লাখো মুসল্লির সমাবেশ করত ঢাকার অদূরে টঙ্গীতে। বছর শেষে এসব আয়োজনে এবছর ভাটা পড়েছিল। কারণ যাই হোক, মানুষ একসাথে হয়ে কোন কিছু উপভোগ করার আগ্রহ যেন হারিয়ে ফেলেছে। তার বিপরীতে লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল ১৭ বছর পর তারেক জিয়ার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে। অথচ বেগম খালেদা জিয়া যখন দুটি বালু ট্রাক এর কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছিলেন না, তখন তা সরাতে কোন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাজনীতির এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই তারেক জিয়া দেশ ও জনগণের জন্য তার পরিকল্পনা সাজিয়েছেন এমনটাই প্রত্যাশা করছি। আরো প্রত্যাশা করছি সততা ও দেশপ্রেমের যে মশাল বেগম খালেদা জিয়া জ্বালিয়ে গেছেন, তা অনির্বাণ শিখা হয়ে প্রজ্জ্বলিত থাকুক সেই মশাল। ২০২৬ হোক বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল একটি বছর এবং বিশ্বের দরবারে এবং গণতন্ত্রের ইতিহাসে বাংলাদেশের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখারমতো একটি উপলক্ষ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর, গবেষক, বিশ্লেষক ও কালামিস্ট
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন