ব্যবসা
এবং
বাণিজ্যের
ভিতর
পার্থক্য
আছে।
বাংলাদেশের
লোক
ব্যবসাই
করে,
বাণিজ্য
করে
খুবই
অল্প।
আমদানির
তুলনায়
রপ্তানি
কম।
রপ্তানির
ক্ষেত্রে
অবশ্য
তারা
বাছবিচার
করে
না।
খনিজ সম্পদ, প্রত্নসম্পদ যা কিছু আছে
পাচার করে দিতে
তাদের উৎসাহের কোনো
ঘাটতি নেই। জাতীয়
স্বার্থপরিপন্থি আমাদের
লাভজনক বন্দর পর্যন্ত বিদেশিদের কাছে
ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারার কথা শোনা যাচ্ছে। অতীতে দেশে এক
স্পিকার বলেছিলেন, সংসদে যত ব্যবসায়ী দেখা যাচ্ছে, তত
আইনজীবী দেখা
যাচ্ছে না, অথচ
সংসদ হচ্ছে আইন
প্রণয়নেরই সংস্থা। কিন্তু আইনজীবীদের যে
ব্যবসার বাইরে
রাখবেন, তা-ও
তো সম্ভব হচ্ছে
না।
কেননা আইনও তো এখন ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিল্পী সবারই প্রবণতা ব্যবসামুখী। পারলে আপনি-আমিও করতাম। সরাসরি না হোক, সাইড বিজনেসে কিছু এলে মন্দ কী?
তবে
হ্যাঁ,
ব্যবসা
জিনিসটা
সব
বিচারে,
সব
ক্ষেত্রে,
সবার
হাতে-বিশেষ ভালো নয়।
বাণিজ্য আরও
খারাপ। কারণ যাকে
উপনিবেশবাদ বলি,
সে তো নৌ-বাণিজ্যেরই আরেক রূপ। তথাকথিত বণিকরা জাহাজে করে
নতুন নতুন দেশে
গেছেন। সেখানে গিয়ে
রঙিন কাচের বিনিময়ে হীরা সংগ্রহ করেছে।
চালান দিয়েছে মানুষ।
সে তো আসলে
দস্যুতাই। ব্যবসাতেও কল্যাণ আকাঙ্ক্ষার কিছু
নেই, মুনাফা করা
ছাড়া। ঠকবে অথবা
ঠকাবে। ক্রেতাই ঠকে
সাধারণত, যেজন্য
ব্যবসা চলে, নইলে
উঠে যেত। আর
পুঁজিহীন ব্যবসার কথা বললে সেটা
বিমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ ব্যবসায় আমাদের
আপত্তি থাকার কথা
নয়। কিন্তু পুঁজির
প্রয়োজনবিহীন আরেকটি
ব্যবসা আছে, যেটা
ভয়ংকর। এটি হলো
ধর্ম ব্যবসা। এ
ব্যবসা নানা রকমের
হয়। ভণ্ড পীরেরা
করে থাকেন। তাদের
কায়দাকানুন নানা
প্রকারের; কিন্তু
সেটা সামান্য ব্যাপার। রাজনীতির ব্যবসায়ীরা যখন ধর্মকে ব্যবহার করেন, তার তুলনায়
ভয়ংকর।
রাজনীতিকদের ধর্ম
ব্যবসাতেও পুঁজি
লাগে না, উল্টো
তারা সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে কাজে
লাগিয়ে ব্যবসা করেন।
মূল পুঁজিটা অন্যের
ধর্মানুভূতি, কিন্তু
মুনাফার সবটাই
রাজনীতিকদের। কোনো
প্রকার ঝুঁকি নেই।
ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করার কাজটা ইংরেজ
আমলেই শুরু হয়।
এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই ধর্মের এই
রাজনৈতিক ব্যবহার রূপ নেয় সাম্প্রদায়িকতার, যার দুর্ধর্ষ তৎপরতার জন্য
ভাগ হয়ে যায়
ভারতবর্ষ।
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী
জিন্নাহ নিজে
ধর্মকর্মের ধার
ধারতেন না। কিন্তু
তিনিও শেষ পর্যন্ত রাজনীতির প্রয়োজনে ধর্মকে ব্যবহার করা
সুবিধাজনক দেখে
ওই ব্যবসায় লিপ্ত
হয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িকভাবে দেশ ভাগ
করার ব্যাপারে তাঁর
দায়িত্বটা কম
নয়। নতুন রাষ্ট্রের জন্ম মুহূর্তেই অবশ্য
তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, পাকিস্তান ধর্মীয়
রাষ্ট্র হবে
না, হবে ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু ধর্ম
ব্যবসায়ীরা তাঁর
কথা শুনবে কেন?
তাদের সামনে তখন
মুনাফা লাভের বিশাল
ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়েছে। তারা সেটির
সদ্ব্যবহার করবে
না, এমন তো
হতে পারে না।
পাকিস্তানের সামরিক
ও অসামরিক আমলাতন্ত্রের সদস্যরা মানুষ
হিসেবে ধার্মিক ছিল,
এমন কথা তাদের
মিত্রদের পক্ষেও
বলা সম্ভব নয়।
কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে তারা ধর্মকে ব্যবহার করার ব্যাপারে কোনো
রকম কার্পণ্য করেনি।
পশ্চিম পাকিস্তানকে তারা
প্রথম সুযোগেই বিধর্মীশূন্য করেছে এবং তারপরে
একাত্তরে বিধর্মীদের খোঁজে পূর্ব বঙ্গে
এসে হানা দিয়েছে। যাদেরই হাতের কাছে
পেয়েছে হত্যা করেছে,
অন্যদের তাড়িয়ে
সীমান্তের অন্য
পারে পাঠিয়ে দিয়েছে,
কিংবা বাধ্য করেছে
পালিয়ে গিয়ে প্রাণ
বাঁচাতে। পরে
যখন দেখল যে
বিধর্মীরা নয়,
স্বধর্মীরাই তাদের
বিরুদ্ধে লড়ছে,
তখন ক্রমেই বুঝতে
পারল যে পারবে
না, পালাতে হবে
এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে
পাততাড়ি গোটাল।
একাত্তরে বিশেষভাবে মুশকিলে পড়েছিল
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পূর্ববঙ্গে তারা
এসেছিল ধর্মযুদ্ধ করবে
বলে। এখন নিজের
দেশই তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক মাত্রায় তথাকথিত ‘ধর্মপ্রাণ’ ধর্মযোদ্ধাদের অস্ত্রাঘাতে জর্জরিত হচ্ছে।
রাস্তাঘাটে তো
অবশ্যই, এমনকি নিজেদের সন্তানদের স্কুলে-সদর
দপ্তরেও তারা
আক্রান্ত হচ্ছে।
ধর্ম নিয়ে যে
ব্যবসা শুরু করেছিল,
তার ফল এখন
পাকিস্তানি শাসকরা
হাতেনাতে পেতে
শুরু করেছে। পূর্ব
বঙ্গে (আজকের বাংলাদেশ) তাদের যে শিক্ষালাভ ঘটেছিল, তারপরও কিছু
প্রাপ্য ছিল
বৈকি। সেই শিক্ষাটা এখন লাভ করছে।
কিন্তু যতই শিক্ষা
পাক, তাদের পক্ষে
ধর্ম ব্যবসা পরিত্যাগ করা কিছুতেই সম্ভব
নয়। পাকিস্তান একটি
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে-এমন কথা
তারা কিছুতেই বলতে
পারবে না। কারণ
সেটা বলতে গেলে
তাদের রাষ্ট্রের ভিতটাই
ভেঙে পড়বে। তখন
সিন্ধি, বেলুচ, পাঠান
ও মোহাজেরদের ওপর
যে কর্তৃত্ব তারা
করেছে, সেটা করার
মূল যুক্তিটাই আর
অবশিষ্ট থাকবে
না।
যা প্রয়োজন, তা
হলো সত্যিকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে
নিয়ে যাওয়া। যে
আন্দোলনের লক্ষ্য
হবে সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার
ও সুযোগের সাম্য
প্রতিষ্ঠা এবং
দারিদ্র্য দূর
করা। রাজনীতির স্বচ্ছতা আরও জরুরি বিষয়।
দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির মতো জরুরি বিষয়গুলো রাজনীতিতে নিশ্চিত না থাকলে, রাজনীতি জনকল্যাণকর হতে
পারে না
কিন্তু বাংলাদেশে তো
ঘটনা ভিন্ন হওয়ার
কথা ছিল। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে তো
বাঙালিরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে
সঙ্গেই ত্যাগ করে।
এ ক্ষেত্রে জিন্নাহর কাজের সঙ্গে বাঙালিদের কাজের একটা মিল
দেখা যাচ্ছে। জিন্নাহও ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ পরিত্যাগের কথা
বলেছিলেন। কিন্তু
ওই একবারই। তারপর
তিনি ইসলাম ও
মুসলমানদের ঐক্য
বিষয়ে বলার কোনো
ঘাটতি রাখেননি। তার
চেয়ে বড় ব্যাপার এই যে পূর্ব
বঙ্গের ওপর পশ্চিম
পাকিস্তানের স্থায়ী
আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি
উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা
করতে চেয়েছিলেন। যুক্তি
ছিল উর্দু মুসলমানদের ভাষা। বাঙালিদের পদানত
করার উদ্দেশ্যে ধর্মের
জায়গায় নতুন একটি
অস্ত্র ব্যবহারে উদ্যত
হয়েছিলেন তিনি,
সেটি ভাষার।
বাংলাদেশ যে
স্বাধীন হয়েছে
তা ধর্মকে অস্ত্র
ও পুঁজি হিসেবে
ব্যবহারকারীদের তৎপরতা
নস্যাৎ করে দিয়ে,
তবেই। কিন্তু পরে
দেখা গেল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পাকিস্তানি জমানার চেয়েও জোরেশোরে শুরু হয়ে যায়।
এসব ঘটা শুরু
হলো পঁচাত্তরের মধ্য-আগস্টের পর থেকে। রাষ্ট্রক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখার
অভিপ্রায়ে কোনো
শাসকই ওই কাজে
বিরাম দেয়নি। ভোটের
রাজনীতির নিয়ামক
হিসেবেই ধর্ম
ব্যবসায়ীদের আশকারা
দিয়েছে, পাশে রেখেছে। ক্ষমতায় টিকে
থাকতে এবং ওই
উদ্দেশ্যেই ধর্মকে
রাজনীতিতে ব্যবহার করার পুরোনো কাজ
আবার শুরু করে।
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর একাত্তরে যে
ভূমিকা ছিল, তাতে
বাংলাদেশ থেকে
তাদের হারিয়ে যাওয়ার
কথা। কিন্তু তা
হয়নি। বরং দেশিবিদেশি তহবিল ও রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে তারা
দ্রুতই বেড়ে ওঠে।
সুসংগঠিতও বটে।
ব্যাপারটা কিন্তু
ব্যবসাই, অন্য
কিছু নয়। ইহকালে
মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে,
পরকালেও পাওয়া
যাবে বলে আশা
করা যায়। এর
সঙ্গে ধর্মকর্মের যেটুকু
সম্পর্ক, তা
প্রদর্শনের বটে,
আদর্শের নয়।
কিন্তু প্রতিকার কী?
যা প্রয়োজন, তা
হলো সত্যিকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে
নিয়ে যাওয়া। যে
আন্দোলনের লক্ষ্য
হবে সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার
ও সুযোগের সাম্য
প্রতিষ্ঠা এবং
দারিদ্র্য দূর
করা।
রাজনীতির স্বচ্ছতা আরও জরুরি বিষয়।
দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির মতো জরুরি বিষয়গুলো রাজনীতিতে নিশ্চিত না থাকলে, রাজনীতি জনকল্যাণকর হতে
পারে না।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬
ব্যবসা
এবং
বাণিজ্যের
ভিতর
পার্থক্য
আছে।
বাংলাদেশের
লোক
ব্যবসাই
করে,
বাণিজ্য
করে
খুবই
অল্প।
আমদানির
তুলনায়
রপ্তানি
কম।
রপ্তানির
ক্ষেত্রে
অবশ্য
তারা
বাছবিচার
করে
না।
খনিজ সম্পদ, প্রত্নসম্পদ যা কিছু আছে
পাচার করে দিতে
তাদের উৎসাহের কোনো
ঘাটতি নেই। জাতীয়
স্বার্থপরিপন্থি আমাদের
লাভজনক বন্দর পর্যন্ত বিদেশিদের কাছে
ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারার কথা শোনা যাচ্ছে। অতীতে দেশে এক
স্পিকার বলেছিলেন, সংসদে যত ব্যবসায়ী দেখা যাচ্ছে, তত
আইনজীবী দেখা
যাচ্ছে না, অথচ
সংসদ হচ্ছে আইন
প্রণয়নেরই সংস্থা। কিন্তু আইনজীবীদের যে
ব্যবসার বাইরে
রাখবেন, তা-ও
তো সম্ভব হচ্ছে
না।
কেননা আইনও তো এখন ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিল্পী সবারই প্রবণতা ব্যবসামুখী। পারলে আপনি-আমিও করতাম। সরাসরি না হোক, সাইড বিজনেসে কিছু এলে মন্দ কী?
তবে
হ্যাঁ,
ব্যবসা
জিনিসটা
সব
বিচারে,
সব
ক্ষেত্রে,
সবার
হাতে-বিশেষ ভালো নয়।
বাণিজ্য আরও
খারাপ। কারণ যাকে
উপনিবেশবাদ বলি,
সে তো নৌ-বাণিজ্যেরই আরেক রূপ। তথাকথিত বণিকরা জাহাজে করে
নতুন নতুন দেশে
গেছেন। সেখানে গিয়ে
রঙিন কাচের বিনিময়ে হীরা সংগ্রহ করেছে।
চালান দিয়েছে মানুষ।
সে তো আসলে
দস্যুতাই। ব্যবসাতেও কল্যাণ আকাঙ্ক্ষার কিছু
নেই, মুনাফা করা
ছাড়া। ঠকবে অথবা
ঠকাবে। ক্রেতাই ঠকে
সাধারণত, যেজন্য
ব্যবসা চলে, নইলে
উঠে যেত। আর
পুঁজিহীন ব্যবসার কথা বললে সেটা
বিমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ ব্যবসায় আমাদের
আপত্তি থাকার কথা
নয়। কিন্তু পুঁজির
প্রয়োজনবিহীন আরেকটি
ব্যবসা আছে, যেটা
ভয়ংকর। এটি হলো
ধর্ম ব্যবসা। এ
ব্যবসা নানা রকমের
হয়। ভণ্ড পীরেরা
করে থাকেন। তাদের
কায়দাকানুন নানা
প্রকারের; কিন্তু
সেটা সামান্য ব্যাপার। রাজনীতির ব্যবসায়ীরা যখন ধর্মকে ব্যবহার করেন, তার তুলনায়
ভয়ংকর।
রাজনীতিকদের ধর্ম
ব্যবসাতেও পুঁজি
লাগে না, উল্টো
তারা সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে কাজে
লাগিয়ে ব্যবসা করেন।
মূল পুঁজিটা অন্যের
ধর্মানুভূতি, কিন্তু
মুনাফার সবটাই
রাজনীতিকদের। কোনো
প্রকার ঝুঁকি নেই।
ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করার কাজটা ইংরেজ
আমলেই শুরু হয়।
এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই ধর্মের এই
রাজনৈতিক ব্যবহার রূপ নেয় সাম্প্রদায়িকতার, যার দুর্ধর্ষ তৎপরতার জন্য
ভাগ হয়ে যায়
ভারতবর্ষ।
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী
জিন্নাহ নিজে
ধর্মকর্মের ধার
ধারতেন না। কিন্তু
তিনিও শেষ পর্যন্ত রাজনীতির প্রয়োজনে ধর্মকে ব্যবহার করা
সুবিধাজনক দেখে
ওই ব্যবসায় লিপ্ত
হয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িকভাবে দেশ ভাগ
করার ব্যাপারে তাঁর
দায়িত্বটা কম
নয়। নতুন রাষ্ট্রের জন্ম মুহূর্তেই অবশ্য
তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, পাকিস্তান ধর্মীয়
রাষ্ট্র হবে
না, হবে ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু ধর্ম
ব্যবসায়ীরা তাঁর
কথা শুনবে কেন?
তাদের সামনে তখন
মুনাফা লাভের বিশাল
ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়েছে। তারা সেটির
সদ্ব্যবহার করবে
না, এমন তো
হতে পারে না।
পাকিস্তানের সামরিক
ও অসামরিক আমলাতন্ত্রের সদস্যরা মানুষ
হিসেবে ধার্মিক ছিল,
এমন কথা তাদের
মিত্রদের পক্ষেও
বলা সম্ভব নয়।
কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে তারা ধর্মকে ব্যবহার করার ব্যাপারে কোনো
রকম কার্পণ্য করেনি।
পশ্চিম পাকিস্তানকে তারা
প্রথম সুযোগেই বিধর্মীশূন্য করেছে এবং তারপরে
একাত্তরে বিধর্মীদের খোঁজে পূর্ব বঙ্গে
এসে হানা দিয়েছে। যাদেরই হাতের কাছে
পেয়েছে হত্যা করেছে,
অন্যদের তাড়িয়ে
সীমান্তের অন্য
পারে পাঠিয়ে দিয়েছে,
কিংবা বাধ্য করেছে
পালিয়ে গিয়ে প্রাণ
বাঁচাতে। পরে
যখন দেখল যে
বিধর্মীরা নয়,
স্বধর্মীরাই তাদের
বিরুদ্ধে লড়ছে,
তখন ক্রমেই বুঝতে
পারল যে পারবে
না, পালাতে হবে
এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে
পাততাড়ি গোটাল।
একাত্তরে বিশেষভাবে মুশকিলে পড়েছিল
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পূর্ববঙ্গে তারা
এসেছিল ধর্মযুদ্ধ করবে
বলে। এখন নিজের
দেশই তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক মাত্রায় তথাকথিত ‘ধর্মপ্রাণ’ ধর্মযোদ্ধাদের অস্ত্রাঘাতে জর্জরিত হচ্ছে।
রাস্তাঘাটে তো
অবশ্যই, এমনকি নিজেদের সন্তানদের স্কুলে-সদর
দপ্তরেও তারা
আক্রান্ত হচ্ছে।
ধর্ম নিয়ে যে
ব্যবসা শুরু করেছিল,
তার ফল এখন
পাকিস্তানি শাসকরা
হাতেনাতে পেতে
শুরু করেছে। পূর্ব
বঙ্গে (আজকের বাংলাদেশ) তাদের যে শিক্ষালাভ ঘটেছিল, তারপরও কিছু
প্রাপ্য ছিল
বৈকি। সেই শিক্ষাটা এখন লাভ করছে।
কিন্তু যতই শিক্ষা
পাক, তাদের পক্ষে
ধর্ম ব্যবসা পরিত্যাগ করা কিছুতেই সম্ভব
নয়। পাকিস্তান একটি
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে-এমন কথা
তারা কিছুতেই বলতে
পারবে না। কারণ
সেটা বলতে গেলে
তাদের রাষ্ট্রের ভিতটাই
ভেঙে পড়বে। তখন
সিন্ধি, বেলুচ, পাঠান
ও মোহাজেরদের ওপর
যে কর্তৃত্ব তারা
করেছে, সেটা করার
মূল যুক্তিটাই আর
অবশিষ্ট থাকবে
না।
যা প্রয়োজন, তা
হলো সত্যিকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে
নিয়ে যাওয়া। যে
আন্দোলনের লক্ষ্য
হবে সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার
ও সুযোগের সাম্য
প্রতিষ্ঠা এবং
দারিদ্র্য দূর
করা। রাজনীতির স্বচ্ছতা আরও জরুরি বিষয়।
দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির মতো জরুরি বিষয়গুলো রাজনীতিতে নিশ্চিত না থাকলে, রাজনীতি জনকল্যাণকর হতে
পারে না
কিন্তু বাংলাদেশে তো
ঘটনা ভিন্ন হওয়ার
কথা ছিল। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে তো
বাঙালিরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে
সঙ্গেই ত্যাগ করে।
এ ক্ষেত্রে জিন্নাহর কাজের সঙ্গে বাঙালিদের কাজের একটা মিল
দেখা যাচ্ছে। জিন্নাহও ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ পরিত্যাগের কথা
বলেছিলেন। কিন্তু
ওই একবারই। তারপর
তিনি ইসলাম ও
মুসলমানদের ঐক্য
বিষয়ে বলার কোনো
ঘাটতি রাখেননি। তার
চেয়ে বড় ব্যাপার এই যে পূর্ব
বঙ্গের ওপর পশ্চিম
পাকিস্তানের স্থায়ী
আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি
উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা
করতে চেয়েছিলেন। যুক্তি
ছিল উর্দু মুসলমানদের ভাষা। বাঙালিদের পদানত
করার উদ্দেশ্যে ধর্মের
জায়গায় নতুন একটি
অস্ত্র ব্যবহারে উদ্যত
হয়েছিলেন তিনি,
সেটি ভাষার।
বাংলাদেশ যে
স্বাধীন হয়েছে
তা ধর্মকে অস্ত্র
ও পুঁজি হিসেবে
ব্যবহারকারীদের তৎপরতা
নস্যাৎ করে দিয়ে,
তবেই। কিন্তু পরে
দেখা গেল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পাকিস্তানি জমানার চেয়েও জোরেশোরে শুরু হয়ে যায়।
এসব ঘটা শুরু
হলো পঁচাত্তরের মধ্য-আগস্টের পর থেকে। রাষ্ট্রক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখার
অভিপ্রায়ে কোনো
শাসকই ওই কাজে
বিরাম দেয়নি। ভোটের
রাজনীতির নিয়ামক
হিসেবেই ধর্ম
ব্যবসায়ীদের আশকারা
দিয়েছে, পাশে রেখেছে। ক্ষমতায় টিকে
থাকতে এবং ওই
উদ্দেশ্যেই ধর্মকে
রাজনীতিতে ব্যবহার করার পুরোনো কাজ
আবার শুরু করে।
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর একাত্তরে যে
ভূমিকা ছিল, তাতে
বাংলাদেশ থেকে
তাদের হারিয়ে যাওয়ার
কথা। কিন্তু তা
হয়নি। বরং দেশিবিদেশি তহবিল ও রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে তারা
দ্রুতই বেড়ে ওঠে।
সুসংগঠিতও বটে।
ব্যাপারটা কিন্তু
ব্যবসাই, অন্য
কিছু নয়। ইহকালে
মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে,
পরকালেও পাওয়া
যাবে বলে আশা
করা যায়। এর
সঙ্গে ধর্মকর্মের যেটুকু
সম্পর্ক, তা
প্রদর্শনের বটে,
আদর্শের নয়।
কিন্তু প্রতিকার কী?
যা প্রয়োজন, তা
হলো সত্যিকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে
নিয়ে যাওয়া। যে
আন্দোলনের লক্ষ্য
হবে সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের অধিকার
ও সুযোগের সাম্য
প্রতিষ্ঠা এবং
দারিদ্র্য দূর
করা।
রাজনীতির স্বচ্ছতা আরও জরুরি বিষয়।
দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির মতো জরুরি বিষয়গুলো রাজনীতিতে নিশ্চিত না থাকলে, রাজনীতি জনকল্যাণকর হতে
পারে না।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন