ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

১৮ মাসের দায়িত্ব শেষে বিদায় ড. ইউনূসের



১৮ মাসের দায়িত্ব শেষে বিদায় ড. ইউনূসের
ছবি: ড. ইউনূস

দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ১৮ মাসের দায়িত্ব পালন শেষে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন নি। পরিসংখ্যান বলছে, তাঁর আমলে দেশে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সৃষ্ট গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। ঠিকভাবে দায়িত্ব সামাল দিতে নিজের পছন্দমতো উপদেষ্টা পরিষদ বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেন। উপরন্তু বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক ছাত্র শক্তিগুলোর ব্যাপক সমর্থন ছিল তাঁর প্রতি। যে কারণে ঘুনে ধরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ব্যবসাবাণিজ্যসহ আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির ব্যাপক সুযোগ ছিল . ইউনূসের। তিনি সেই সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আবদুল বায়েস বলেন, তিনি একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিপর্যস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। অথচ তাঁর সময়ে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রবাসী আয় রিজার্ভ বৃদ্ধি ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই ছিল নিম্নমুখী। ব্যবসাবাণিজ্যে ছিল আস্থার সংকট। শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন ছিল নিম্নমুখী। না ছিল কোনো নতুন উদ্যোগ, না এসেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। উল্টো দেশে বেকারত্ব গরিব মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রায় ৩০ লাখ নতুন দরিদ্র্য হয়েছে . ইউনূসের আমলে।

ব্যক্তি খাতের গড় বিনিয়োগ চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন: ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের গড় বিনিয়োগ হার ছিল জিডিপির ২৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে তা কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে আসে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এক বছরে প্রায় দশমিক শতাংশ পয়েন্ট পতনের ঘটনাটি ছিল গত চার দশকের মধ্যে নজিরবিহীন।

সরকারি বিনিয়োগে গত ১০ বছরের রেকর্ড পতন: শুধু যে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে তা নয়, সরকারি বিনিয়োগ গত ১০ বছরের মধ্যে অনেক পতন হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়ন ছিল গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকারি বিনিয়োগ হিসেবে প্রচলিত এডিপি বাস্তবায়নের হার জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ। গত ১০ বছরে এর চেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের নজিরবিহীন বোঝা: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের স্থিতি লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আগের বছরের ডিসেম্বর শেষেও বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক শতাংশ খেলাপি ছিল। এর মধ্যেই ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে তা নজিরবিহীন। গবেষণা সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ।

বিদায়বেলায় বিশাল ঋণের বোঝা দেশ: নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা রেখে বিদায় নিলেন . ইউনূস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে ব্যাংকিং উৎস থেকে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা নিয়েছে . ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। ছাড়া আলোচ্য সময়ে আরও প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে।

মজুরি হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি: ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল দশমিক শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল দশমিক শতাংশের নিচে। দেখা যাচ্ছে, ভোক্তার মজুরি বাড়ার হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার এখনো বেশি। কারণে মানুষের আয়ের চেয়ে খরচ হচ্ছে বেশি। কমেছে ক্রয়ক্ষমতা। অথচ মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়ে রেখেছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বেড়েছে ব্যবসাবাণিজ্যে পরিচালন ব্যয়।

অর্থনীতির সব সূচকে যখন বিপর্যয় নেমে এসেছে তখন বেড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। . মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বিদায়ি ভাষণে রিজার্ভ বৃদ্ধির বিষয়টি গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যাওয়ার সময় স্বস্তি পাচ্ছি যে, আমরা অবস্থার মোকাবিলা করতে পেরেছি।

আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের টাকায় রিজার্ভ বাড়ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

. ইউনূসের রিজার্ভ রাজনীতির সমালোচনা করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত শিক্ষক গবেষক . লুবনা তুরীন তার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, রিজার্ভ কোনো রাষ্ট্রের লক্ষ্য না, এটা একটা উপকরণ। লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, খাদ্য জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি নীতিগত স্বাধীনতা। রিজার্ভ বাড়ছে কি না প্রশ্নের চেয়েও কনসার্নিং হচ্ছে, রিজার্ভ কোন দামে তৈরি হচ্ছে, কার ক্ষতির বিনিময়ে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকে কোন কাঠামোয় আটকে রেখে। গবেষকের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে, আমদানি সংকুচিত করে, শিল্প খাতকে চাপে ফেলে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে রাষ্ট্রকেশক্তদেখানের জন্যই রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে মনোযোগী ছিলেন . ইউনূস।

প্রতিশ্রুতি, দায় সুবিধা গ্রহণ: দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে . ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করবেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে সফল পরিণতি দিতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনি ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা খাত এবং তথ্যপ্রবাহে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণ করে অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করবেন, যার লক্ষ্য হবে দুর্নীতি, লুটপাট গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া তিনি তাঁর দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। তাঁর  আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর সরকারের উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করাও হয়েছে। দুদক অভিযোগ তদন্ত করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা যে সম্পদের হিসাব দিয়েছেন তা নিয়েও রয়েছে জনমনে সন্দেহ বিস্তর প্রশ্ন। এমনকি তিনি প্রধান উপদেষ্টা পদে আসীন থেকে তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কর ছাড়াসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। . ইউনূসের বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন অর্থ পাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ সরকারিভাবে ব্যাংকে শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ছাড়া গ্রামীণ গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দ্রুত সরকারি অনুমোদন বিশেষ সুবিধা পায়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা শহরে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি।

সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের দায়িত্বে . ইউনূস অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও তার সবগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বিশেষ করে তাঁর আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা এবং গণমাধ্যমের ওপর মব সৃষ্টি করে হামলার মতো ঘটনাগুলো ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। যদিও তিনি তাঁর বিদায়ী ভাষণে অনেকগুলো সংস্কার পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ সুবিধা পাওয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব মেলেনি।

পরিশেষে, তিনি বিশ্বব্যাপী যেতিন শূন্য’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব শূন্য কার্বন নিঃসরণ) তত্ত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে তা অর্জন করতে তিনি পারেন নি। ড. ইউনূস আবারও তাঁর পুরনো কর্মস্থলে ফিরে গেলেও তাঁর এই ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড এবং অর্থনীতির বর্তমান চিত্রটিই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় মূল্যায়িত হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

বিষয় : দায়িত্ব ড. ইউনূস শেষে বিদায় ১৮ মাস

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


১৮ মাসের দায়িত্ব শেষে বিদায় ড. ইউনূসের

প্রকাশের তারিখ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ১৮ মাসের দায়িত্ব পালন শেষে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন নি। পরিসংখ্যান বলছে, তাঁর আমলে দেশে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সৃষ্ট গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। ঠিকভাবে দায়িত্ব সামাল দিতে নিজের পছন্দমতো উপদেষ্টা পরিষদ বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেন। উপরন্তু বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক ছাত্র শক্তিগুলোর ব্যাপক সমর্থন ছিল তাঁর প্রতি। যে কারণে ঘুনে ধরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ব্যবসাবাণিজ্যসহ আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির ব্যাপক সুযোগ ছিল . ইউনূসের। তিনি সেই সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আবদুল বায়েস বলেন, তিনি একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিপর্যস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। অথচ তাঁর সময়ে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রবাসী আয় রিজার্ভ বৃদ্ধি ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই ছিল নিম্নমুখী। ব্যবসাবাণিজ্যে ছিল আস্থার সংকট। শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদন ছিল নিম্নমুখী। না ছিল কোনো নতুন উদ্যোগ, না এসেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। উল্টো দেশে বেকারত্ব গরিব মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রায় ৩০ লাখ নতুন দরিদ্র্য হয়েছে . ইউনূসের আমলে।

ব্যক্তি খাতের গড় বিনিয়োগ চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন: ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের গড় বিনিয়োগ হার ছিল জিডিপির ২৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে তা কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে আসে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এক বছরে প্রায় দশমিক শতাংশ পয়েন্ট পতনের ঘটনাটি ছিল গত চার দশকের মধ্যে নজিরবিহীন।

সরকারি বিনিয়োগে গত ১০ বছরের রেকর্ড পতন: শুধু যে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে তা নয়, সরকারি বিনিয়োগ গত ১০ বছরের মধ্যে অনেক পতন হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়ন ছিল গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকারি বিনিয়োগ হিসেবে প্রচলিত এডিপি বাস্তবায়নের হার জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ। গত ১০ বছরে এর চেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়নি।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের নজিরবিহীন বোঝা: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের স্থিতি লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আগের বছরের ডিসেম্বর শেষেও বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক শতাংশ খেলাপি ছিল। এর মধ্যেই ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে তা নজিরবিহীন। গবেষণা সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ।

বিদায়বেলায় বিশাল ঋণের বোঝা দেশ: নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা রেখে বিদায় নিলেন . ইউনূস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে ব্যাংকিং উৎস থেকে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা নিয়েছে . ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। ছাড়া আলোচ্য সময়ে আরও প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে।

মজুরি হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি: ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল দশমিক শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল দশমিক শতাংশের নিচে। দেখা যাচ্ছে, ভোক্তার মজুরি বাড়ার হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার এখনো বেশি। কারণে মানুষের আয়ের চেয়ে খরচ হচ্ছে বেশি। কমেছে ক্রয়ক্ষমতা। অথচ মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়ে রেখেছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বেড়েছে ব্যবসাবাণিজ্যে পরিচালন ব্যয়।

অর্থনীতির সব সূচকে যখন বিপর্যয় নেমে এসেছে তখন বেড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। . মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বিদায়ি ভাষণে রিজার্ভ বৃদ্ধির বিষয়টি গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন যাওয়ার সময় স্বস্তি পাচ্ছি যে, আমরা অবস্থার মোকাবিলা করতে পেরেছি।

আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের টাকায় রিজার্ভ বাড়ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

. ইউনূসের রিজার্ভ রাজনীতির সমালোচনা করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত শিক্ষক গবেষক . লুবনা তুরীন তার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, রিজার্ভ কোনো রাষ্ট্রের লক্ষ্য না, এটা একটা উপকরণ। লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, খাদ্য জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি নীতিগত স্বাধীনতা। রিজার্ভ বাড়ছে কি না প্রশ্নের চেয়েও কনসার্নিং হচ্ছে, রিজার্ভ কোন দামে তৈরি হচ্ছে, কার ক্ষতির বিনিময়ে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকে কোন কাঠামোয় আটকে রেখে। গবেষকের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে, আমদানি সংকুচিত করে, শিল্প খাতকে চাপে ফেলে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে রাষ্ট্রকেশক্তদেখানের জন্যই রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে মনোযোগী ছিলেন . ইউনূস।

প্রতিশ্রুতি, দায় সুবিধা গ্রহণ: দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে . ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করবেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে সফল পরিণতি দিতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনি ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা খাত এবং তথ্যপ্রবাহে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণ করে অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করবেন, যার লক্ষ্য হবে দুর্নীতি, লুটপাট গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া তিনি তাঁর দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। তাঁর  আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর সরকারের উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করাও হয়েছে। দুদক অভিযোগ তদন্ত করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা যে সম্পদের হিসাব দিয়েছেন তা নিয়েও রয়েছে জনমনে সন্দেহ বিস্তর প্রশ্ন। এমনকি তিনি প্রধান উপদেষ্টা পদে আসীন থেকে তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কর ছাড়াসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। . ইউনূসের বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন অর্থ পাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হয়ে যাওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ সরকারিভাবে ব্যাংকে শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ছাড়া গ্রামীণ গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দ্রুত সরকারি অনুমোদন বিশেষ সুবিধা পায়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা শহরে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি।

সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের দায়িত্বে . ইউনূস অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও তার সবগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বিশেষ করে তাঁর আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা এবং গণমাধ্যমের ওপর মব সৃষ্টি করে হামলার মতো ঘটনাগুলো ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। যদিও তিনি তাঁর বিদায়ী ভাষণে অনেকগুলো সংস্কার পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ সুবিধা পাওয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব মেলেনি।

পরিশেষে, তিনি বিশ্বব্যাপী যেতিন শূন্য’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব শূন্য কার্বন নিঃসরণ) তত্ত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে তা অর্জন করতে তিনি পারেন নি। ড. ইউনূস আবারও তাঁর পুরনো কর্মস্থলে ফিরে গেলেও তাঁর এই ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড এবং অর্থনীতির বর্তমান চিত্রটিই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় মূল্যায়িত হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত