আসন্ন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ধর্মীয় ও জাতিগত নির্বাচনী
লড়াইয়ে থাকা সংখ্যালঘু প্রার্থীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই উচ্চতর ডিগ্রিধারী। তাঁদের মধ্যে কেউ স্নাতক, আবার
কেউ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এমন প্রার্থীও রয়েছেন যারা পিএইচডি করেছেন।
পেশার
দিক থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৩৪ শতাংশই হচ্ছে ব্যবসায়ী। এরপর
১৬ শতাংশ প্রার্থী আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া
প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা যায়।
এবারের
জাতীয় নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এক ভিন্ন মাত্রা
যোগ করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে এবার মোট ৭৯ জন সংখ্যালঘু
প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এবার নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ২২টি দল থেকে ৬৭ জন
প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন, আর স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ১২ জন।
প্রার্থী
মনোনয়নের ক্ষেত্রে এবার সবাইকে অবাক করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
(সিপিবি)। তারা সর্বোচ্চ ১৭ জন সংখ্যালঘু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যদিকে,
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি থেকে লড়ছেন ৬ জন। তবে এবারের নির্বাচনে
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন; দলটি প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু
সম্প্রদায় থেকে একজনকে প্রার্থী করেছে। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও
একজন সংখ্যালঘু প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নারীদের
অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ৭৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০
জন নারী, যা মোট সংখ্যালঘু প্রার্থীর প্রায় ১২.৬৬ শতাংশ। গত ২০১৮ সালের নির্বাচনে
নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ জন। যদিও ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই সম্প্রদায়ের
প্রার্থী সংখ্যা ছিল ৮১ জন, তবে এবারের নির্বাচনে প্রার্থীর বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন
দলের মনোনয়ন প্রদানের বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। যোগ্যতার নিরিখে এই প্রার্থীদের
৭৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত, যা নির্বাচনী লড়াইয়ে তাদের শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত
দেয়।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের
প্রার্থীদের মধ্যে ‘রাজনীতি’কে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাত্র চারজন। তাঁরা হলেন
মাগুরা–১ আসনে বাসদের প্রার্থী শম্পা বসু, ঢাকা–১২ আসনে সিপিবির প্রার্থী কল্লোল
বনিক, নোয়াখালী–৪ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত প্রার্থী বিটুল চন্দ্র তালুকদার
ও চট্টগ্রাম–১১ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত প্রার্থী দীপা মজুমদার।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তিনজন প্রার্থী বলেছেন,
তাঁদের পেশা ‘টিউশনি’। তিনজনই বাসদ (মার্ক্সবাদী) দলের প্রার্থী। তাঁরা হলেন
রংপুর–৪ আসনের প্রগতি বর্মণ, গাইবান্ধা–১ আসনের পরমানন্দ দাস ও সিলেট–১ আসনের
সঞ্জয় কান্ত দাস।
একজন প্রার্থী বলেছেন, তাঁর পেশা ‘কণ্ঠশিল্পী’।
তাঁর নাম চম্পা রানী সরকার। তিনি নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির
প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয়জন প্রার্থী তাঁদের পেশা
হিসেবে কৃষির কথা উল্লেখ করেছেন।
চারজন
প্রার্থী পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও ব্যাংক কর্মকর্তা।
তিনজন প্রার্থীর পেশা শিক্ষকতা। বেসরকারি চাকরিজীবী দুজন, পরামর্শক দুজন এবং পেশা
হিসেবে সাংবাদিকতার কথা বলেছেন একজন প্রার্থীর পেশা। অন্যরা অন্যান্য পেশার।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামা বিশ্লেষণ করলে তাদের প্রার্থীদের অর্থ-সম্পদের পরিসংখ্যান। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি প্রার্থীকে তাদের হাতে থাকা নগদ অর্থ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা সম্পদের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করতে হয়। এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু প্রার্থীদের মধ্যে আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন খুলনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী।
খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কৃষ্ণ নন্দীর হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর কাছে নগদ অর্থের পরিমাণ ১৮ কোটি ৫৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৪ টাকা। তবে এই বিশাল অংকের টাকার উৎস হিসেবে তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন যে, এর একটি বড় অংশ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ
তাঁকে সংখ্যালঘু
প্রার্থীদের মধ্যে শীর্ষ ধনীর তালিকায় নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে, নগদ টাকার অংকে কোটিপতির তালিকায় নাম লিখিয়েছেন আরও দুই প্রার্থী। রাঙামাটি আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন দীপেন দেওয়ান, যাঁর হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ১৩৫ টাকা। একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এন তরুন দে-ও কোটিপতিদের কাতারে আছেন; তাঁর কাছে নগদ গচ্ছিত আছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫ হাজার ৯৩ টাকা। এই তিনজন বাদে অন্য কোনো সংখ্যালঘু প্রার্থীর হলফনামায় কোটি টাকার নগদ হিসাব পাওয়া যায়নি।
তবে কেবল হাতে থাকা নগদ টাকা নয়, ব্যাংকে জমানো অর্থের দিক দিয়েও প্রার্থীরা তাঁদের সামর্থ্য প্রকাশ করেছেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছেন মাদারীপুর-২ আসনের বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী সুবল চন্দ্র মজুমদার। তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা আছে ২৯ লাখ টাকা। এছাড়া ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যাংক ব্যালেন্স রয়েছে খুলনা-১ আসনের প্রবীর গোপাল রায় এবং বাগেরহাট-১ আসনের কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলের।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও অনেক প্রার্থীই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের মাধ্যমে নির্বাচনে নিজেদের আর্থিক ভিত্তি মজবুত রেখেছেন। এই সম্পদের হিসাব ভোটারদের কাছে প্রার্থীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে সহায়তা করছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
নির্বাচন
কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে মনোনয়ন
পাওয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয় প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই উচ্চশিক্ষিত। তাঁরা হলেন
ঢাকা–৩ আসনের গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মাগুরা–২ আসনের নিতাই রায় চৌধুরী, বাগেরহাট–১
আসনের কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, বাগেরহাট–৪ আসনের সোম নাথ দে ও রাঙামাটি আসনের দীপেন
দেওয়ান। দলটির আরেক প্রার্থী বান্দরবান আসনের সাচিং প্রু এইচএসসি পাস।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে মাধ্যমিক
বা এইচএসসি পাস পাঁচজন। তাঁদের মধ্যে খুলনা–১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী
কৃষ্ণ নন্দী এসএসসি পাস।
উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পাস প্রার্থী রয়েছেন ছয়জন।
তাঁদের মধ্যে মৌলভীবাজার–৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী প্রীতম
দাশ এইচএসসি পাস। এ ছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে দুজন অষ্টম
শ্রেণি পাস ও চারজন স্বশিক্ষিত।
ইসির
ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের যে হলফনামা রয়েছে, তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাঁচজনের
শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। বাকি ৭৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৭
জনই উচ্চ শিক্ষিত, যার হার ৭৭ শতাংশ।
এক
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৭ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত,
যা ইতিবাচক। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা রাজনীতিতে এলে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হওয়ার
সুযোগ থাকে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে
বেশি বয়স নিতাই রায় চৌধুরীর। তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, নির্বাচন করছেন
মাগুরা-২ আসন থেকে।
নিতাই রায় চোধুরী যেদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, সেদিন তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর ১১ মাস ২২ দিন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে বয়সের দিক
থেকে নিতাই রায়ের পরেই আছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির
সদস্য। মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন তাঁর বয়স ছিল ৭৪ বছর ১ মাস ২৮ দিন। তিনি নির্বাচন
করছেন ঢাকা-৩ আসন থেকে।
নিতাই ও গয়েশ্বর আত্মীয়তার দিক থেকে ‘পারিবারিক
আত্মীয়তা’। তাঁরা দুজনসহ সংখ্যালঘু
সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৭০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী প্রার্থী মোট ছয়জন।
অন্য চারজন হলেন বান্দরবান আসনের প্রার্থী বিএনপি নেতা সাচিং প্রু, নারায়ণগঞ্জ–৫
আসনে সিপিবির প্রার্থী মন্টু চন্দ্র ঘোষ, খুলনা–৫ আসনের সিপিবির প্রার্থী চিত্ত
রঞ্জন গোলদার এবং চট্টগ্রাম–৭ আসনে সিপিবির প্রার্থী প্রমোদ বরন বড়ুয়া।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম
বয়সী নিমাই চন্দ্র রায়। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩০ বছর। লালমনিরহাট–২
আসনে তিনি সিপিবির প্রার্থী হিসেবে প্রতিন্দ্বিতা করছেন। স্নাতক করে তিনি কৃষি
পেশায় যুক্ত রয়েছেন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৩০ থেকে
৩৯ বছর বয়সী আছেন ১৫ জন। ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রার্থী ৩১ জন। ৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী
১৭ জন এবং ৬০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রার্থী ৮ জন। আরেকজন প্রার্থীর বয়সের বিষয়টি
হলফনামায় স্পষ্ট বোঝা যায় না। ইসির ওয়েবসাইটে হলফনামার ওই অংশটুকু কালো হয়ে আছে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
বিষয় : প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত সংখ্যালঘু
.png)
বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আসন্ন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ধর্মীয় ও জাতিগত নির্বাচনী
লড়াইয়ে থাকা সংখ্যালঘু প্রার্থীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই উচ্চতর ডিগ্রিধারী। তাঁদের মধ্যে কেউ স্নাতক, আবার
কেউ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এমন প্রার্থীও রয়েছেন যারা পিএইচডি করেছেন।
পেশার
দিক থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৩৪ শতাংশই হচ্ছে ব্যবসায়ী। এরপর
১৬ শতাংশ প্রার্থী আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া
প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানা যায়।
এবারের
জাতীয় নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এক ভিন্ন মাত্রা
যোগ করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে এবার মোট ৭৯ জন সংখ্যালঘু
প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এবার নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ২২টি দল থেকে ৬৭ জন
প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন, আর স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ১২ জন।
প্রার্থী
মনোনয়নের ক্ষেত্রে এবার সবাইকে অবাক করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
(সিপিবি)। তারা সর্বোচ্চ ১৭ জন সংখ্যালঘু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যদিকে,
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি থেকে লড়ছেন ৬ জন। তবে এবারের নির্বাচনে
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন; দলটি প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু
সম্প্রদায় থেকে একজনকে প্রার্থী করেছে। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও
একজন সংখ্যালঘু প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নারীদের
অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ৭৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০
জন নারী, যা মোট সংখ্যালঘু প্রার্থীর প্রায় ১২.৬৬ শতাংশ। গত ২০১৮ সালের নির্বাচনে
নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ জন। যদিও ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই সম্প্রদায়ের
প্রার্থী সংখ্যা ছিল ৮১ জন, তবে এবারের নির্বাচনে প্রার্থীর বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন
দলের মনোনয়ন প্রদানের বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। যোগ্যতার নিরিখে এই প্রার্থীদের
৭৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত, যা নির্বাচনী লড়াইয়ে তাদের শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত
দেয়।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের
প্রার্থীদের মধ্যে ‘রাজনীতি’কে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন মাত্র চারজন। তাঁরা হলেন
মাগুরা–১ আসনে বাসদের প্রার্থী শম্পা বসু, ঢাকা–১২ আসনে সিপিবির প্রার্থী কল্লোল
বনিক, নোয়াখালী–৪ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত প্রার্থী বিটুল চন্দ্র তালুকদার
ও চট্টগ্রাম–১১ আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত প্রার্থী দীপা মজুমদার।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তিনজন প্রার্থী বলেছেন,
তাঁদের পেশা ‘টিউশনি’। তিনজনই বাসদ (মার্ক্সবাদী) দলের প্রার্থী। তাঁরা হলেন
রংপুর–৪ আসনের প্রগতি বর্মণ, গাইবান্ধা–১ আসনের পরমানন্দ দাস ও সিলেট–১ আসনের
সঞ্জয় কান্ত দাস।
একজন প্রার্থী বলেছেন, তাঁর পেশা ‘কণ্ঠশিল্পী’।
তাঁর নাম চম্পা রানী সরকার। তিনি নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির
প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয়জন প্রার্থী তাঁদের পেশা
হিসেবে কৃষির কথা উল্লেখ করেছেন।
চারজন
প্রার্থী পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও ব্যাংক কর্মকর্তা।
তিনজন প্রার্থীর পেশা শিক্ষকতা। বেসরকারি চাকরিজীবী দুজন, পরামর্শক দুজন এবং পেশা
হিসেবে সাংবাদিকতার কথা বলেছেন একজন প্রার্থীর পেশা। অন্যরা অন্যান্য পেশার।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামা বিশ্লেষণ করলে তাদের প্রার্থীদের অর্থ-সম্পদের পরিসংখ্যান। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি প্রার্থীকে তাদের হাতে থাকা নগদ অর্থ এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা সম্পদের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করতে হয়। এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু প্রার্থীদের মধ্যে আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন খুলনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী।
খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কৃষ্ণ নন্দীর হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর কাছে নগদ অর্থের পরিমাণ ১৮ কোটি ৫৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৪ টাকা। তবে এই বিশাল অংকের টাকার উৎস হিসেবে তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন যে, এর একটি বড় অংশ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ
তাঁকে সংখ্যালঘু
প্রার্থীদের মধ্যে শীর্ষ ধনীর তালিকায় নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে, নগদ টাকার অংকে কোটিপতির তালিকায় নাম লিখিয়েছেন আরও দুই প্রার্থী। রাঙামাটি আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন দীপেন দেওয়ান, যাঁর হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ১৩৫ টাকা। একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এন তরুন দে-ও কোটিপতিদের কাতারে আছেন; তাঁর কাছে নগদ গচ্ছিত আছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫ হাজার ৯৩ টাকা। এই তিনজন বাদে অন্য কোনো সংখ্যালঘু প্রার্থীর হলফনামায় কোটি টাকার নগদ হিসাব পাওয়া যায়নি।
তবে কেবল হাতে থাকা নগদ টাকা নয়, ব্যাংকে জমানো অর্থের দিক দিয়েও প্রার্থীরা তাঁদের সামর্থ্য প্রকাশ করেছেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছেন মাদারীপুর-২ আসনের বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী সুবল চন্দ্র মজুমদার। তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা আছে ২৯ লাখ টাকা। এছাড়া ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যাংক ব্যালেন্স রয়েছে খুলনা-১ আসনের প্রবীর গোপাল রায় এবং বাগেরহাট-১ আসনের কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলের।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও অনেক প্রার্থীই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের মাধ্যমে নির্বাচনে নিজেদের আর্থিক ভিত্তি মজবুত রেখেছেন। এই সম্পদের হিসাব ভোটারদের কাছে প্রার্থীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে সহায়তা করছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
নির্বাচন
কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে মনোনয়ন
পাওয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছয় প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই উচ্চশিক্ষিত। তাঁরা হলেন
ঢাকা–৩ আসনের গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মাগুরা–২ আসনের নিতাই রায় চৌধুরী, বাগেরহাট–১
আসনের কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, বাগেরহাট–৪ আসনের সোম নাথ দে ও রাঙামাটি আসনের দীপেন
দেওয়ান। দলটির আরেক প্রার্থী বান্দরবান আসনের সাচিং প্রু এইচএসসি পাস।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে মাধ্যমিক
বা এইচএসসি পাস পাঁচজন। তাঁদের মধ্যে খুলনা–১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী
কৃষ্ণ নন্দী এসএসসি পাস।
উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পাস প্রার্থী রয়েছেন ছয়জন।
তাঁদের মধ্যে মৌলভীবাজার–৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী প্রীতম
দাশ এইচএসসি পাস। এ ছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে দুজন অষ্টম
শ্রেণি পাস ও চারজন স্বশিক্ষিত।
ইসির
ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের যে হলফনামা রয়েছে, তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাঁচজনের
শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। বাকি ৭৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৭
জনই উচ্চ শিক্ষিত, যার হার ৭৭ শতাংশ।
এক
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৭ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত,
যা ইতিবাচক। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা রাজনীতিতে এলে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হওয়ার
সুযোগ থাকে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে
বেশি বয়স নিতাই রায় চৌধুরীর। তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, নির্বাচন করছেন
মাগুরা-২ আসন থেকে।
নিতাই রায় চোধুরী যেদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, সেদিন তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর ১১ মাস ২২ দিন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে বয়সের দিক
থেকে নিতাই রায়ের পরেই আছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির
সদস্য। মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন তাঁর বয়স ছিল ৭৪ বছর ১ মাস ২৮ দিন। তিনি নির্বাচন
করছেন ঢাকা-৩ আসন থেকে।
নিতাই ও গয়েশ্বর আত্মীয়তার দিক থেকে ‘পারিবারিক
আত্মীয়তা’। তাঁরা দুজনসহ সংখ্যালঘু
সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৭০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী প্রার্থী মোট ছয়জন।
অন্য চারজন হলেন বান্দরবান আসনের প্রার্থী বিএনপি নেতা সাচিং প্রু, নারায়ণগঞ্জ–৫
আসনে সিপিবির প্রার্থী মন্টু চন্দ্র ঘোষ, খুলনা–৫ আসনের সিপিবির প্রার্থী চিত্ত
রঞ্জন গোলদার এবং চট্টগ্রাম–৭ আসনে সিপিবির প্রার্থী প্রমোদ বরন বড়ুয়া।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম
বয়সী নিমাই চন্দ্র রায়। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩০ বছর। লালমনিরহাট–২
আসনে তিনি সিপিবির প্রার্থী হিসেবে প্রতিন্দ্বিতা করছেন। স্নাতক করে তিনি কৃষি
পেশায় যুক্ত রয়েছেন।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীদের মধ্যে ৩০ থেকে
৩৯ বছর বয়সী আছেন ১৫ জন। ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রার্থী ৩১ জন। ৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী
১৭ জন এবং ৬০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রার্থী ৮ জন। আরেকজন প্রার্থীর বয়সের বিষয়টি
হলফনামায় স্পষ্ট বোঝা যায় না। ইসির ওয়েবসাইটে হলফনামার ওই অংশটুকু কালো হয়ে আছে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন