ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে ভারত থেকে ভুয়া খবরের স্রোত



বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে ভারত থেকে ভুয়া খবরের স্রোত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে হাটছে। নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেছে। এর পরই নির্বাচনকে সামনে রেখে অপতথ্যের বড় উৎস হয়ে উঠেছে ভারতীয় গণমাধ্যম এবং ভারতীয় সামাজিক মাধ্যম।

তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ৬০ দিনে ভারত থেকে বহুল প্রচারিত  ৩৯ টি অসত্য বা  অপ-তথ্য শনাক্ত করে দ্য ডিসেন্ট। বাংলাদেশের চারটি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট, রিউমার স্ক্যানার, বাংলা ফ্যাক্ট এবং ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে এবং ফেসবুক, টুইটার (এক্স) এর মাধ্যমে প্রচারিত দাবী বিশ্লেষণ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। 

গত ৬০ দিনে প্রাপ্ত ৩৯ টি অপতথ্যের মধ্যে ৯ টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়েছে এবং ৩০টি ভারত থেকে পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ছড়ানো যত গুজব

২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জিলা স্কুলে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী জেমসের কনসার্টে ইসলামপন্থী উগ্রপন্থীরা হামলা পণ্ড করে দিয়েছে দাবিতে একযোগে প্রচার করে ভারতীয় মিডিয়াগুলো।

এরূপ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ প্রতিবেদন: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা, এই সময়, রিপাবলিক বাংলা, নিউজ১৮ বাংলা , দ্যা টাইমস অফ ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, ফ্রি প্রেস জার্নাল, এবিপি লাইভ, ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস নাউ, ওয়ান ইন্ডিয়া হিন্দি, এখন কলকাতা, রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড, দ্যা স্টেটসম্যান , ক্যাপিটাল টিভি, নিউজএক্স লাইভ 

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে,  ‘ইসলামপন্থী’ কিংবা ‘তৌহিদি জনতা’ হামলা করেনি বরং অতিরিক্ত দর্শকের চাপে অব্যবস্থাপনায় টিকেট না পেয়ে সংঘর্ষে কনসার্ট পন্ড হয়।

তারপরের সপ্তাহে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হামলার স্বীকার হন শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার খোকন চন্দ্র দাস। পরে ৩ জানুয়ারিচিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

খোকন দাসের মৃত্যুর পর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশিমবঙ্গের এক্স ও ইন্সটাগ্রাম একাউন্ট এবং ফেসবুক পেইজ দাবি করা হয়, ‘‘ইসলামপন্থী উন্মত্ত জনতার নৃশংস হামলায় তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়-এটি পরিকল্পিত বর্বরতার ফল।’’ পোস্ট ৩টি দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

ভারতীয় একাধিক মিডিয়াও ঘটনাটিকে ‘ইসলামিস্ট মব’ ও ‘মব’ এর দ্বারা সংগঠিত বলে প্রচার করেছে।  দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

তবে পুলিশ এবং নিহতের পরিবার এবং মামলার এজহারের সূত্রে দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, দাবিটি সঠিক নয়। মূলত, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে খোকন দাসকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে এবং পরে চিনে ফেলাতে আগুন দিয়ে পোড়ানোর চেষ্টা করা করেছে। খোকনের বাবা পরেশ চন্দ্র দাসের দায়ের করা মামলার এজাহারে ‘দস্যুতা সংগঠনকালে গুরুতর আঘাত ও হত্যাচেষ্ঠা’ উল্লেখ করা হয়েছে। 

একই মাসে ২৩ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ জেলায় পুকুর থেকে কামদেব দাস নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মৃত্যুর পর ভারতীয় একাধিক টুইটার দাবি করা হয় কামদেব দাসকে ‘ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা’ পিটিয়ে হত্যা করেছে। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে 

তবে এমন দাবির সত্যতা পায়নি দ্য ডিসেন্ট। প্রকৃতপক্ষে, কামদেব দাসকে হত্যার তদন্ত শেষ না হলেও তার পরিবার ও পুলিশ বলছে, প্রেমের সম্পর্কের জেরে এই হতাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।  গণমাধ্যমে প্রচারিত এ সংক্রান্ত দু’টি প্রতিবেদন দেখুন এখানে এবং এখানে 

এই হত্যাকান্ডে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও মামলায় কোনো মুসলিম অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ নেই।’

একি মাসের ২৫ তারিখ রাজবাড়ী জেলায় অমৃত মণ্ডল নামে এক যুবককে ‘চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী’ কার্যক্রমে জড়িত থাকার সময় স্থানীয় জনতা পিটিয়ে হত্যা করে।

এই হত্যাকান্ডকে সাম্প্রদায়িক এবং একের পর এক হিন্দু হত্যা হিসেবে দেখিয়েছে ভারতীয় মিডিয়া। দেখুন,এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে। 

তবে বিবিসি বাংলা এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে হত্যাকান্ডের পিছনে চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে উল্লেখ করেছে। তার হত্যাকান্ডে সাম্প্রদায়িকতার যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

একইভাবে পরের মাসে গত ৫ জানুয়ারি রাতে নরসিংদীর পলাশে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে খুন হন শরৎ মণি চক্রবর্তী নামের এক ব্যবসায়ী। তার মৃত্যুকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক আবহে অপতথ্য ছড়ায় অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া  এবং ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যা করে লাশের উপর বর্বরতা চালানোয় অভিযুক্ত বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু এবং প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট উইকলি ব্লিটজ- এর সম্পাদক বিতর্কিত সাংবাদিক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী।

তারা কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, জিজিয়া কর না দেওয়ায়  শরৎ মণি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। দেখুন এখানে  এখানে 

তাদের সূত্র ধরে একই দাবিতে খবর প্রকাশ করে ভারতের গণমাধ্যম এবিপি আনন্দ, টাইমস নাউ, নিউজ ১৮ । দেখুন, এখানে, এখানে, এবং এখানে

এবিপি আনন্দ প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘‘বাপ্পাদিত্য সাফ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের মদতেই সংখ্যালঘু হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে হিন্দু হলেই মেরে ফেলা হতে পারে। শরৎকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন বাপ্পাদিত্য। তিনি জানিয়েছেন, দুষ্কৃতীরা শরতের থেকে মোটা টাকা দাবি করছিল। বাংলাদেশে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল তাঁকে। 'জিজিয়া' দিতে বলা হয় শরৎকে। পুলিশের কাছে গেলে স্ত্রীকে অপহরণ করার হুমকিও দেওয়া হয়। বাপাদিত্য বলেন, "দুষ্কৃতীরা বলে, 'চুপচাপ টাকা দিয়ে দে। বেশি চিৎকার করিস না। তোর ভারত বা তোর বাবা নরেন্দ্র মোদি এলেও জিজিয়া আদায় করা আটকাতে পারবে না'।’’

তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে এসব দাবির কোনো সত্যতা নেই। নিহত শরৎ চক্রবর্তীর স্ত্রী অন্তরা মূখ্যার্জি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘আমার স্বামীর কাছে কেউ কখনও চাঁদা বা ‘জিজিয়া কর’ এমন কোনোকিছু কখনই চায়নি। এসব মিথ্যা। আমাদের অনুমান, জমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই তাকে হত্যা করা হতে পারে।’’

নিহত মনির ভাই রনি চক্রবর্তীও একইভাবে দ্য ডিসেন্টের কাছে চাঁদা বা জিজিয়া চাওয়া বা হিন্দু হিসেবে আক্রমণের কথা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘‘আমার কাছে বা ভাইয়ের কাছে কেউ কখনও চাঁদা দাবি করেনি। ভাইয়ের সাথে সবারই বেশ ভালো সম্পর্ক। সবাই উনাকে পছন্দ করতো।’’ নরসিংদীর পলাশ থানার ওসি শাহেদ আল মামুনও দ্য ডিসেন্টকে নিশ্চিত করেন যে এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু ছিল না। 

একই দিনে অর্থাৎ  গত ৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক বরফকল ব্যবসায়ী ও সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। 

এই ঘটনায় ভারতীয় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আজতাক বাংলা একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনামে তাঁরা লিখেছে, ‘ভারতীয় এজেন্ট বদনাম দিয়ে Bangladeshi Hindu Journalist Rana Pratap Bairagi কে নলি কেটে তারপর গুলি।’ সংবাদ প্রতিবেদনের ভেতরের অংশে বলা হয়েছে, ‘Hindu ব্যক্তির আবার দাম কী? যেখানে পাও সেখানেই মারো, এই নীতিতে চলছে Bangladesh এ। Jessore র Monirampur এ প্রকাশ্যে গুলি করে এক হিন্দু যুবককে হত্যা করা হলো এবার।…’

প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, রানা প্রতাপ বৈরাগী হিন্দু ধর্মের অনুসারী হওয়ার কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

ভারতের গণমাধ্যম TV 9 Bangla এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, “ ইউনুসের বাংলায় ফের হিন্দু খুন। ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে হিংসার আগুনে জ্বলছে বাংলাদেশ। মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলেও হিংসার ঘটনায় লাগাম টানা যায়নি। “ 

দেখুন এখানে। 

তবে যাচাইয়ে দেখা গিয়েছে, যশোরের মনিরামপুরে বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ধর্মীয় কোনো বিষয় বা সাম্প্রদায়িক ইস্যু নেই। এটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার সম্পর্কিত ঘটনা। 

এই বিষয়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দ্য ডেইলি স্টার  দৈনিক প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে ৩ জানুয়ারি  প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে করে এসে রানা প্রতাপ বৈরাগীর মাথায় কয়েকবার গুলি করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তবে এসব প্রতিবেদনে তাঁর হত্যাকাণ্ড ধর্মীয় কারণে হওয়ার তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, রানা প্রতাপ পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকান্ডে সাম্প্রদায়িক বিষয় নেই। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–কে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ তুলে ময়মনসিংহের পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে দীপু চন্দ্র দাসকে পুলিশ মবের হাতে তুলে দিয়েছে—এমন দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যম,  এক্স ও ইন্সটাগ্রাম প্রোপাগান্ডা অ্যাকাউন্টগুলো থেকে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

একই দাবির ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখুন টাইমস অফ ইন্ডিয়া, নিউজ১৮ বাংলা, রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড, আজতক বাংলা, ফ্রি প্রেস জার্নাল, সিএনএন নিউজ১৮, আর প্লাস নিউজ 

তবে যাচাই করে দেখা যায় প্রচারিত দাবিটি অসত্য। প্রকৃতপক্ষে, গত নভেম্বরে শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকায় ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থীকে পুলিশ কর্তৃক ধরে নিয়ে যাওয়ার পুরোনো ভিডিওকে উক্ত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। 

একইভাবে বাংলাদেশ সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি, মে দিবস, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজার ছুটি, বাতিল করেছে- শীর্ষক দাবি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। দেখুন: কলকাতা টিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, দৃষ্টিভঙ্গি, আনন্দবাজার, টিভি নাইন, ওঙ্কার বাংলা, জি নিউজ, নিউজ ব্যানগার্ড, নিউজ ১৮ বাংলা, রিপাবলিক বাংলা, এই মুহূর্তে, বিশ্ব বাংলা সংবাদ, নজর বন্দি, স্যন্দন পত্রিকা, আজতক বাংলা, বর্তমান, কলকাতা নিউজ

তবে, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজার ছুটি বাতিলের দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, সংশ্লিষ্ট পূজার দিনগুলো সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়ায় সেগুলো আলাদাভাবে ছুটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি।

এছাড়াও, শহীদ ওসমান হাদির জানাজায় জিহাদিরা সংসদ ভবন দখল করে লুটপাট ও খেলাফর প্রতিষ্ঠার দাবি করা হয়েছে যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। 

এই দাবিটিও সত্য নয়। মূলত, ওসমান হাদির জানাজার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল করা হলে কিছু উশৃঙ্খল জনতা সংসদ ভবন চত্তরে ঢুকে পড়ে এবং ছবি তুলতে থাকে, পরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সরিয়ে দেয়। সংসদ ভবনে কোনো লুটপাট বা খেলাফত প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

একইভাবে, ১৫ জানুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী একটি পরিবারের এই বাড়িতে আগুন লাগে। দুপুর বেলা বাড়িটিতে আগুন ধরার সময় পরিবারের সদস্যরা বাইরে ছিলেন। এতে কেউ হতাহত না হলেও বাড়িটির যাবতীয় আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের বাহার গ্রামে।

এই ঘটনাকে ভারতের একাধিক শীর্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এবং অগ্নিকাণ্ডের পেছনে “ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা” জড়িত বলেও প্রচার করেছে।

এ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখুন: এনডিটিভি, দ্য লজিক্যাল ইন্ডিয়ান, সিএনএন নিউজ ১৮ , সিএনবিসি টিভি১৮, লেটেস্টলি, নিউজএক্স লাইভ, টাইমস নাউ, ইন্ডিয়া টুডে, অপি ইন্ডিয়া, রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড, জি নিউজ, এবিপি লাইভ, জাগরণ, নিউজ১৮, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডিএনএ ইন্ডিয়া, নিউজ নাইন, ফ্রি প্রেস জার্নাল, ভারত এক্সপ্রেস, টিভি নাইন, সংবাদ প্রতিদিন, আজতক বাংলা, এই সময়, কলকাতা ২৪×৭, ওয়ান ইন্ডিয়া, কলকাতা টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, কলকাতা নিউজ, ইন্ডিয়া ডট কম 

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেটের প্রয়াত শিক্ষক বীরেন্দ্র কুমার দেব (ঝুনু মাস্টার)-এর বাড়িতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড। 

বাড়ির মালিকের ছেলে বিকাশ রঞ্জন দেব দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা বাড়িতে ছিলাম না ঘটনার সময়। আগুন লাগার পর গ্রামবাসীরা নিভিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসকেও তারাই ডেকে এনেছেন। আমাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। পরণের কাপড়টিও দিয়েছেন। আমাদের সাথে এখানকার কারো কোন সমস্যা নেই। কোন দাঙ্গা হাঙ্গামা নেই।” তিনি মনে করছেন, এটি দুর্ঘটনামূলক আগুন।

পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে জানিয়েছে, আগুন বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে লেগেছে। বিকাশ রঞ্জন জানান, আগেও তার বাড়িতে শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটেছিল। ১৫ জানুয়ারির ঘটনায় বিকাশ কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেননি।

সামাজিক মাধ্যমে ভারত থেকে যেসব অপতথ্য ছড়ানো হয়

২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী এলাকার নিজ বাড়িতে শ্রাবন্তী ঘোষ নামের ১২ বছরের এক হিন্দু শিশুর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর প্রেক্ষিতে, একাধিক ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে উক্ত শিশুর ছবি প্রচার করে দাবি হচ্ছে, মোহাম্মদ নামের ৪৯ বছর বয়স্ক একজন মুসলিম ব্যক্তির সাথে ওই শিশুকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেটি তার পরিবার প্রত্যাখ্যান করায় শিশুটিকে কয়েকজন কট্টরপন্থী মুসলিম ধর্ষণ করে। পরবর্তীতে হত্যা করে। 

দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

ফ্যাক্টচেক এ জানা যায়, শ্রাবন্তী ঘোষ নামের ওই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় প্রচারিত দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, নিহত শিশুর মা তার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ তুললেও উক্ত ঘটনার সাথে সাম্প্রদায়িকতার সংযোগ থাকার কথা বলেননি। বরং, তিনি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তারাও প্রত্যেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।  নিহতের পরিবারের অভিযোগ ও মামলার ভিত্তিতে তিনজনকে আটক করা হয় বলেন জানা যায়। তারা হলেন, বাড়ির মালিক প্রদীপ লাল ঘোষ ও প্রতিবেশী অজয় সিংহ। যারা প্রত্যেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এছাড়াও অজ্ঞাত আরও ৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন নিহতের মা রোজী ঘোষ। কিন্তু প্রতিবেদনের কোথাও উক্ত ঘটনার সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সংযোগের তথ্য পাওয়া যায়নি। 

নিহত শিশু শ্রাবন্তী ঘোষের মা রোজী ঘোষ জানান, এইটুকু বাচ্চার বিয়ের প্রস্তাব আসার দাবিটি অবান্তর। মুসলিম ব্যক্তির সাথে বিয়ের প্রস্তাব কিংবা ধর্মান্তরিত করার দাবিতে যে তথ্যগুলো প্রচারিত হয়েছে সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এর সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়াও তিনি বলেন, “আমার যাদের প্রতি সন্দেহ হয়েছে আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তারা কেউ মুসলিম নন।”

একইভাবে ১ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া শিক্ষার্থী অনন্য গাঙ্গুলীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই ভারতভিত্তিক একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট দাবি করে, বাংলাদেশে চলমান হিন্দু নিপীড়নের অংশ হিসেবে অনন্য গাঙ্গুলীকে হত্যা করা হয়েছে। এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। 

 তবে পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানানো হয়েছে, অনন্যকে হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। অনন্য দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং ভারত ও ঢাকায় তার চিকিৎসা চলছিল। কোটচাঁদপুর থানার ওসি মো. আসাদউজ্জামান জানান, অনন্য মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং কিছুটা সুস্থ হয়ে সম্প্রতি বাড়িতে আসেন। রাতে স্বাভাবিকভাবেই খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমাতে যান। পরদিন সকালে সাড়া না পেয়ে জানালা দিয়ে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।

এর আগে, ২৯ জানুয়ারিচট্টগ্রামের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে নিজরুমে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় উপমা দত্ত নামের এক ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় তাঁর রুমের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ পাওয়া যায়। 

তাঁর মৃত্যুর পর রুমের দরজা বন্ধ এবং শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন না পাওয়া গেলেও একাধিক ভারতীয় এক্স অ্যাাকাউন্ট থেকে তাঁর মৃত্যুকে ধারাবাহিক হিন্দু হত্যা বলে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হয়েছে। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে। 

এর আগে, ২৭ জানুয়ারি বরিশালের মুলাদী পৌরসদরে নিজগৃহ থেকে জৈতিমনি (১৫) নামের এক স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। 

জৈতিমনির পরিবারের সদস্যরা জানান, মোবাইল রেখে পড়তে বলায় মায়ের সঙ্গে অভিমান করে আত্মহত্যা করেছে। জৈতিমনির মা ঝুমা সরকার জানান, “তাকে মোবাইল রেখে পড়তে বসার জন্য বলা হয়। ওই সময় জৈতিমনি রাগ করে তার কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাকে খাবারের জন্য ডাকতে গিয়ে সাড়া না পাওয়ায় দরজার ফাঁক দিয়ে মেয়ের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পাওয়া যায়।” অথচ এ ঘটনায় ও একাধিক ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে হিন্দু হত্যা বলে প্রচারণা চালানো হয়। দেখুন এখানে, এবং এখানে। 

১১ ডিসেম্বর ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দুই তরুণকে মারধরের একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর ব্যপক নির্যাতন করা হচ্ছে।  দেখুন এখানে, এখানে, এবং এখানে। তবে , যাচাই এ দেখা যায়, মারধরের স্বীকার তরুণরা হিন্দু নন বরং চুরির দায়ে দুই মুসলিমকে হেনস্তা করা হয়েছে।

এছাড়াও, ২৯ ডিসেম্বর ভারত থেকে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে এক হিন্দু শিক্ষককে অবসরের পর জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। এই দাবিটিও সঠিক নয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ব্যক্তি মুসলিম এবং তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক।

১১ ডিসেম্বর ভারত থেকে ব্যবহৃত এক্স অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, এটি বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ভাঙার দৃশ্য। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়। এটি ২০২১ সালে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রহিম ইয়ার খান জেলার ভোং শহরে একটি মন্দির ভাঙার দৃশ্য। 

একইদিনে, বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য দাবিতে একটি ছবি সামাজিক মাধ্যম এক্সে প্রচার করে হিন্দু নিপীড়নের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে যাচাই এ দেখা যায়, প্রচারিত ছবিটি সাম্প্রতিক সময়ের নয় বরং ২০২২ সালের।

৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশে কথিত এক হিন্দু সন্ন্যাসীকে মারধরের দৃশ্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। প্রচারিত ভিডিওটিতে দেখা যায়, গেরুয়া পোশাক পরিহিত একজন সন্ন্যাসী বেশের ব্যক্তিকে কয়েকজন মিলে কিল-ঘুষি ও লাঠিসোটা দিয়ে মারধর করছেন। 

আলোচিত ভিডিওটি বাংলাদেশে কোনো হিন্দু সন্ন্যাসীকে মারধরের ঘটনার নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের পাঞ্জাবের তান্ডা রেলওয়ে স্টেশনে বাচ্চা চুরির অভিযোগে একজন কথিত সন্ন্যাসীকে মারধরের ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

২১ ডিসেম্বর অন্য একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে বাংলাদেশে হিন্দু ও তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হচ্ছে। 

তবে, দাবিটি সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, গত ৯ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। 

এছাড়াও,  বাংলাদেশে গান্ধীর “শরীর থেকে মুণ্ডু বিচ্ছিন্ন” করা হয়েছে দাবিতে ১৭ জানুয়ারিমহাত্মা গান্ধীর একটি ভাঙা মূর্তির ছবি ও ভিডিও একাধিক সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, মূল ঘটনা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের। 

‘তৌহিদি জনতা’, ‘ইসলামপন্থী’ নামে একের পর এক ভুয়া সংবাদ ছড়িয়েছে ভারতীয় সামাজিক মাধ্যমে। 

৬ জানুয়ারিসিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় শ্মশানের নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধে এক হিন্দু বৃদ্ধা নারীর মরদেহ সৎকারে সাময়িক জটিলতা সৃষ্টি হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি চাবি দিতে দেরি করায় স্বজনরা বিক্ষোভ করেন। পরে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে চাবির ব্যবস্থা হয় এবং সেদিনই মরদেহ সৎকার সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু এই বিক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে ভারতের একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে ‘জিহাদিরা, তৌহিদি জনতা’ হিন্দুদের সৎকারে বাঁধা দিচ্ছে, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে। দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে, এখানে এবং এখানে

তবে যাচাই করে দেখা যায়, এ ঘটনায় সাম্প্রদায়িকতার কোনো সংযোগ নেই। মূলত শ্মশানের নামকরণ নিয়ে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্বের ফলে সৎকারে জটিলতা দেখা দেয়।

২৪ ডিসেম্বর ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপর থেকে নিচের সড়কে ককটেল নিক্ষেপ করলে সিয়াম (২১) নামের এক পথচারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এই বিস্ফোরণের সাথে ‘ইসলামপন্থীরা’ ও ‘জামাতি উগ্রবাদীরা’ জড়িত বলে প্রচার করা হচ্ছে ভারত থেকে পরিচালিত বেশকিছু এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে।  

এরকম কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে    

প্রকৃতপক্ষে, এমন দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া  যায়নি। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

একই ঘটনায় নিহত ব্যক্তিকে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী দাবি করে কিছু পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। তবে, নিহত যুবক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নয়। প্রকৃতপক্ষে, নিহত ব্যক্তির নাম সিয়াম, যিনি মুসলিম ধর্মাবলম্বী।

একইভাবে, ২৩ ডিসেম্বরে একাধিক ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের সিলেটে ‘হিন্দু হওয়ার কারণেই হামলার শিকার’ একটি হিন্দু পরিবার। দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে প্রচারিত দাবিটি সত্য নয়  মূলত, জমিজমা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার স্বীকার ব্যক্তি নিজেই এই হামলায় সাম্প্রদায়িকতার যোগসূত্র অস্বীকার করেছেন।

২১ ডিসেম্বর অন্য একটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরায় এবং দাড়ি না রাখায় বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ছাত্রদের চুল কেটে দিচ্ছেন। দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

যাচাই করে দেখা যায়, এই দাবি সত্য নয়। সংস্কৃতিকর্মীদের অভিনয়ের একটি ভিডিওকে ভুয়া দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

১৯ ডিসেম্বর ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে ‘বোরকা ও হিজাব না পরার কারণে’ দুই মুসলিম মেয়েকে মুসলমানরাই হামলা করেছে। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে 

প্রকৃতপক্ষে, খাবার নিয়ে কথা কাটাকাটি্র জের ধরে এক পর্যায়ে সংঘাত হয়, সেটিকেই ভিন্ন দাবিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

২ ফেব্রুয়ারী সামাজিক মাধ্যমে এক্সে ভারতীয় একাধিক অ্যাকাউন্ট এবং ফেসবুকে একাধিক পোস্টে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুরে হিন্দু মালিকানাধীন বাদ্যযন্ত্রের দোকান ‘তাল তরঙ্গ’-এ আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও দাবি করা হচ্ছে, হামলাকারীরা বলেছে, “ইসলামে সঙ্গীত হারাম। যদি বাংলাদেশে থাকতে চাও, তাহলে এমন দোকান চলতে দেওয়া হবে না।”

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, এখানে কোনো হামলা বা হুমকির ঘটনা ঘটেনি। এবং ক্ষতিগ্রস্তরা শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী নন। ক্ষতিগ্রস্ত তিন দোকানের মালিকের মধ্যে ২ জন মুসলিম এবং একজন হিন্দু। তাদের সবার ধারণা, ঘটনাটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে হয়ে থাকতে পারে। 

ক্ষতিগ্রস্ত বাদ্যযন্ত্রের দোকান ‘তাল তরঙ্গ’ এর স্বত্বাধিকারী প্রদীপ কুমার মণিদাস হামলা বা কোনো রকম হুমকি পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। 

অপ-তথ্য ছড়াতে এ আই নির্মিত কন্টেন্টের ব্যবহার ও ছিলো লক্ষণীয়। 

২৫ ডিসেম্বর একটি ভিডিও ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, যেখানে আশপাশের কয়েকটি দোকানে আগুন জ্বলছে। তিনি বলছেন— “আমি বাংলাদেশে আছি। এখন রাত। ‘দীপু চাদার’-এর মতো আমাদেরও মেরে ফেলবে। এখানে কী হচ্ছে, আপনি দেখতে পাচ্ছেন। দয়া করে এই ভিডিওটি যত বেশি সম্ভব শেয়ার করুন, যাতে কেউ আমাদের বাঁচাতে পারে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ করে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে গেছে।” দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে:

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওটি সত্য নয়; বরং এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। এছাড়াও, ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের এক হিন্দু তরুণীর আর্তনাদের দৃশ্য দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। দেখুন এখানে , এখানে এবং এখানে 

তবে, এই ভিডিওটিও আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সহায়তায় আলোচিত দাবিতে প্রচারিত তৈরি করা হয়েছে। 

৬ জানুয়ারি খোকন চন্দ্র দাসের স্ত্রীর বক্তব্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। যেখানে তাকে সনাতন ধর্মালম্বিদের উপর নির্যাতন চলছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু, এই ভিডিওটিও আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।  

এছাড়াও, ভারত থেকে পরিচালিত ‘All Time Happy’ নামক ফেসবুক পেজ থেকে একের পর এক এ আই ভিডিওর মাধ্যমে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের অপ-প্রচার চালানো হচ্ছে। 

আলোচিত ফেসবুক পেজটিতে প্রকাশিত পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে পেজটি থেকে অন্তত ১৭টি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে হিন্দু হওয়ায় বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতায় থাকা, হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা না বলা, হিন্দু মেয়েদের বিয়ের জন্য জোর করা, দিপু চন্দ্র দাসের স্বজনদের বক্তব্যসহ (, ) নানা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এ সময়ে পেজটি থেকে শুধু দিপু চন্দ্র দাসকে কেন্দ্র করেই অন্তত ছয়টি (, , , , , ) ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যেগুলো সবই এআই ব্যবহার করে তৈরি। 

 

সোর্স: দ্য ডিসেন্ট

 

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে ভারত থেকে ভুয়া খবরের স্রোত

প্রকাশের তারিখ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে হাটছে। নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেছে। এর পরই নির্বাচনকে সামনে রেখে অপতথ্যের বড় উৎস হয়ে উঠেছে ভারতীয় গণমাধ্যম এবং ভারতীয় সামাজিক মাধ্যম।

তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ৬০ দিনে ভারত থেকে বহুল প্রচারিত  ৩৯ টি অসত্য বা  অপ-তথ্য শনাক্ত করে দ্য ডিসেন্ট। বাংলাদেশের চারটি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট, রিউমার স্ক্যানার, বাংলা ফ্যাক্ট এবং ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে এবং ফেসবুক, টুইটার (এক্স) এর মাধ্যমে প্রচারিত দাবী বিশ্লেষণ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। 

গত ৬০ দিনে প্রাপ্ত ৩৯ টি অপতথ্যের মধ্যে ৯ টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়েছে এবং ৩০টি ভারত থেকে পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ছড়ানো যত গুজব

২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জিলা স্কুলে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী জেমসের কনসার্টে ইসলামপন্থী উগ্রপন্থীরা হামলা পণ্ড করে দিয়েছে দাবিতে একযোগে প্রচার করে ভারতীয় মিডিয়াগুলো।

এরূপ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ প্রতিবেদন: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা, এই সময়, রিপাবলিক বাংলা, নিউজ১৮ বাংলা , দ্যা টাইমস অফ ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, ফ্রি প্রেস জার্নাল, এবিপি লাইভ, ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস নাউ, ওয়ান ইন্ডিয়া হিন্দি, এখন কলকাতা, রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড, দ্যা স্টেটসম্যান , ক্যাপিটাল টিভি, নিউজএক্স লাইভ 

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে,  ‘ইসলামপন্থী’ কিংবা ‘তৌহিদি জনতা’ হামলা করেনি বরং অতিরিক্ত দর্শকের চাপে অব্যবস্থাপনায় টিকেট না পেয়ে সংঘর্ষে কনসার্ট পন্ড হয়।

তারপরের সপ্তাহে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হামলার স্বীকার হন শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার খোকন চন্দ্র দাস। পরে ৩ জানুয়ারিচিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

খোকন দাসের মৃত্যুর পর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশিমবঙ্গের এক্স ও ইন্সটাগ্রাম একাউন্ট এবং ফেসবুক পেইজ দাবি করা হয়, ‘‘ইসলামপন্থী উন্মত্ত জনতার নৃশংস হামলায় তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়-এটি পরিকল্পিত বর্বরতার ফল।’’ পোস্ট ৩টি দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

ভারতীয় একাধিক মিডিয়াও ঘটনাটিকে ‘ইসলামিস্ট মব’ ও ‘মব’ এর দ্বারা সংগঠিত বলে প্রচার করেছে।  দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

তবে পুলিশ এবং নিহতের পরিবার এবং মামলার এজহারের সূত্রে দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, দাবিটি সঠিক নয়। মূলত, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে খোকন দাসকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে এবং পরে চিনে ফেলাতে আগুন দিয়ে পোড়ানোর চেষ্টা করা করেছে। খোকনের বাবা পরেশ চন্দ্র দাসের দায়ের করা মামলার এজাহারে ‘দস্যুতা সংগঠনকালে গুরুতর আঘাত ও হত্যাচেষ্ঠা’ উল্লেখ করা হয়েছে। 

একই মাসে ২৩ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ জেলায় পুকুর থেকে কামদেব দাস নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মৃত্যুর পর ভারতীয় একাধিক টুইটার দাবি করা হয় কামদেব দাসকে ‘ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা’ পিটিয়ে হত্যা করেছে। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে 

তবে এমন দাবির সত্যতা পায়নি দ্য ডিসেন্ট। প্রকৃতপক্ষে, কামদেব দাসকে হত্যার তদন্ত শেষ না হলেও তার পরিবার ও পুলিশ বলছে, প্রেমের সম্পর্কের জেরে এই হতাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।  গণমাধ্যমে প্রচারিত এ সংক্রান্ত দু’টি প্রতিবেদন দেখুন এখানে এবং এখানে 

এই হত্যাকান্ডে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও মামলায় কোনো মুসলিম অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ নেই।’

একি মাসের ২৫ তারিখ রাজবাড়ী জেলায় অমৃত মণ্ডল নামে এক যুবককে ‘চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী’ কার্যক্রমে জড়িত থাকার সময় স্থানীয় জনতা পিটিয়ে হত্যা করে।

এই হত্যাকান্ডকে সাম্প্রদায়িক এবং একের পর এক হিন্দু হত্যা হিসেবে দেখিয়েছে ভারতীয় মিডিয়া। দেখুন,এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে। 

তবে বিবিসি বাংলা এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে হত্যাকান্ডের পিছনে চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে উল্লেখ করেছে। তার হত্যাকান্ডে সাম্প্রদায়িকতার যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

একইভাবে পরের মাসে গত ৫ জানুয়ারি রাতে নরসিংদীর পলাশে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে খুন হন শরৎ মণি চক্রবর্তী নামের এক ব্যবসায়ী। তার মৃত্যুকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক আবহে অপতথ্য ছড়ায় অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া  এবং ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যা করে লাশের উপর বর্বরতা চালানোয় অভিযুক্ত বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু এবং প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট উইকলি ব্লিটজ- এর সম্পাদক বিতর্কিত সাংবাদিক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী।

তারা কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, জিজিয়া কর না দেওয়ায়  শরৎ মণি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। দেখুন এখানে  এখানে 

তাদের সূত্র ধরে একই দাবিতে খবর প্রকাশ করে ভারতের গণমাধ্যম এবিপি আনন্দ, টাইমস নাউ, নিউজ ১৮ । দেখুন, এখানে, এখানে, এবং এখানে

এবিপি আনন্দ প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘‘বাপ্পাদিত্য সাফ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের মদতেই সংখ্যালঘু হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে হিন্দু হলেই মেরে ফেলা হতে পারে। শরৎকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন বাপ্পাদিত্য। তিনি জানিয়েছেন, দুষ্কৃতীরা শরতের থেকে মোটা টাকা দাবি করছিল। বাংলাদেশে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল তাঁকে। 'জিজিয়া' দিতে বলা হয় শরৎকে। পুলিশের কাছে গেলে স্ত্রীকে অপহরণ করার হুমকিও দেওয়া হয়। বাপাদিত্য বলেন, "দুষ্কৃতীরা বলে, 'চুপচাপ টাকা দিয়ে দে। বেশি চিৎকার করিস না। তোর ভারত বা তোর বাবা নরেন্দ্র মোদি এলেও জিজিয়া আদায় করা আটকাতে পারবে না'।’’

তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে এসব দাবির কোনো সত্যতা নেই। নিহত শরৎ চক্রবর্তীর স্ত্রী অন্তরা মূখ্যার্জি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘আমার স্বামীর কাছে কেউ কখনও চাঁদা বা ‘জিজিয়া কর’ এমন কোনোকিছু কখনই চায়নি। এসব মিথ্যা। আমাদের অনুমান, জমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই তাকে হত্যা করা হতে পারে।’’

নিহত মনির ভাই রনি চক্রবর্তীও একইভাবে দ্য ডিসেন্টের কাছে চাঁদা বা জিজিয়া চাওয়া বা হিন্দু হিসেবে আক্রমণের কথা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘‘আমার কাছে বা ভাইয়ের কাছে কেউ কখনও চাঁদা দাবি করেনি। ভাইয়ের সাথে সবারই বেশ ভালো সম্পর্ক। সবাই উনাকে পছন্দ করতো।’’ নরসিংদীর পলাশ থানার ওসি শাহেদ আল মামুনও দ্য ডিসেন্টকে নিশ্চিত করেন যে এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু ছিল না। 

একই দিনে অর্থাৎ  গত ৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক বরফকল ব্যবসায়ী ও সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। 

এই ঘটনায় ভারতীয় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আজতাক বাংলা একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনামে তাঁরা লিখেছে, ‘ভারতীয় এজেন্ট বদনাম দিয়ে Bangladeshi Hindu Journalist Rana Pratap Bairagi কে নলি কেটে তারপর গুলি।’ সংবাদ প্রতিবেদনের ভেতরের অংশে বলা হয়েছে, ‘Hindu ব্যক্তির আবার দাম কী? যেখানে পাও সেখানেই মারো, এই নীতিতে চলছে Bangladesh এ। Jessore র Monirampur এ প্রকাশ্যে গুলি করে এক হিন্দু যুবককে হত্যা করা হলো এবার।…’

প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, রানা প্রতাপ বৈরাগী হিন্দু ধর্মের অনুসারী হওয়ার কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।

ভারতের গণমাধ্যম TV 9 Bangla এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, “ ইউনুসের বাংলায় ফের হিন্দু খুন। ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে হিংসার আগুনে জ্বলছে বাংলাদেশ। মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলেও হিংসার ঘটনায় লাগাম টানা যায়নি। “ 

দেখুন এখানে। 

তবে যাচাইয়ে দেখা গিয়েছে, যশোরের মনিরামপুরে বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ধর্মীয় কোনো বিষয় বা সাম্প্রদায়িক ইস্যু নেই। এটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার সম্পর্কিত ঘটনা। 

এই বিষয়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দ্য ডেইলি স্টার  দৈনিক প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে ৩ জানুয়ারি  প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে করে এসে রানা প্রতাপ বৈরাগীর মাথায় কয়েকবার গুলি করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তবে এসব প্রতিবেদনে তাঁর হত্যাকাণ্ড ধর্মীয় কারণে হওয়ার তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, রানা প্রতাপ পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যাকান্ডে সাম্প্রদায়িক বিষয় নেই। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–কে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ তুলে ময়মনসিংহের পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে দীপু চন্দ্র দাসকে পুলিশ মবের হাতে তুলে দিয়েছে—এমন দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যম,  এক্স ও ইন্সটাগ্রাম প্রোপাগান্ডা অ্যাকাউন্টগুলো থেকে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

একই দাবির ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখুন টাইমস অফ ইন্ডিয়া, নিউজ১৮ বাংলা, রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড, আজতক বাংলা, ফ্রি প্রেস জার্নাল, সিএনএন নিউজ১৮, আর প্লাস নিউজ 

তবে যাচাই করে দেখা যায় প্রচারিত দাবিটি অসত্য। প্রকৃতপক্ষে, গত নভেম্বরে শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে ঢাকায় ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থীকে পুলিশ কর্তৃক ধরে নিয়ে যাওয়ার পুরোনো ভিডিওকে উক্ত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। 

একইভাবে বাংলাদেশ সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি, মে দিবস, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজার ছুটি, বাতিল করেছে- শীর্ষক দাবি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। দেখুন: কলকাতা টিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, দৃষ্টিভঙ্গি, আনন্দবাজার, টিভি নাইন, ওঙ্কার বাংলা, জি নিউজ, নিউজ ব্যানগার্ড, নিউজ ১৮ বাংলা, রিপাবলিক বাংলা, এই মুহূর্তে, বিশ্ব বাংলা সংবাদ, নজর বন্দি, স্যন্দন পত্রিকা, আজতক বাংলা, বর্তমান, কলকাতা নিউজ

তবে, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজার ছুটি বাতিলের দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, সংশ্লিষ্ট পূজার দিনগুলো সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়ায় সেগুলো আলাদাভাবে ছুটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি।

এছাড়াও, শহীদ ওসমান হাদির জানাজায় জিহাদিরা সংসদ ভবন দখল করে লুটপাট ও খেলাফর প্রতিষ্ঠার দাবি করা হয়েছে যা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। 

এই দাবিটিও সত্য নয়। মূলত, ওসমান হাদির জানাজার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল করা হলে কিছু উশৃঙ্খল জনতা সংসদ ভবন চত্তরে ঢুকে পড়ে এবং ছবি তুলতে থাকে, পরে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সরিয়ে দেয়। সংসদ ভবনে কোনো লুটপাট বা খেলাফত প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

একইভাবে, ১৫ জানুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী একটি পরিবারের এই বাড়িতে আগুন লাগে। দুপুর বেলা বাড়িটিতে আগুন ধরার সময় পরিবারের সদস্যরা বাইরে ছিলেন। এতে কেউ হতাহত না হলেও বাড়িটির যাবতীয় আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের বাহার গ্রামে।

এই ঘটনাকে ভারতের একাধিক শীর্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এবং অগ্নিকাণ্ডের পেছনে “ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা” জড়িত বলেও প্রচার করেছে।

এ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখুন: এনডিটিভি, দ্য লজিক্যাল ইন্ডিয়ান, সিএনএন নিউজ ১৮ , সিএনবিসি টিভি১৮, লেটেস্টলি, নিউজএক্স লাইভ, টাইমস নাউ, ইন্ডিয়া টুডে, অপি ইন্ডিয়া, রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড, জি নিউজ, এবিপি লাইভ, জাগরণ, নিউজ১৮, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ডিএনএ ইন্ডিয়া, নিউজ নাইন, ফ্রি প্রেস জার্নাল, ভারত এক্সপ্রেস, টিভি নাইন, সংবাদ প্রতিদিন, আজতক বাংলা, এই সময়, কলকাতা ২৪×৭, ওয়ান ইন্ডিয়া, কলকাতা টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, কলকাতা নিউজ, ইন্ডিয়া ডট কম 

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেটের প্রয়াত শিক্ষক বীরেন্দ্র কুমার দেব (ঝুনু মাস্টার)-এর বাড়িতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড। 

বাড়ির মালিকের ছেলে বিকাশ রঞ্জন দেব দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা বাড়িতে ছিলাম না ঘটনার সময়। আগুন লাগার পর গ্রামবাসীরা নিভিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসকেও তারাই ডেকে এনেছেন। আমাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। পরণের কাপড়টিও দিয়েছেন। আমাদের সাথে এখানকার কারো কোন সমস্যা নেই। কোন দাঙ্গা হাঙ্গামা নেই।” তিনি মনে করছেন, এটি দুর্ঘটনামূলক আগুন।

পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে জানিয়েছে, আগুন বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে লেগেছে। বিকাশ রঞ্জন জানান, আগেও তার বাড়িতে শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটেছিল। ১৫ জানুয়ারির ঘটনায় বিকাশ কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেননি।

সামাজিক মাধ্যমে ভারত থেকে যেসব অপতথ্য ছড়ানো হয়

২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী এলাকার নিজ বাড়িতে শ্রাবন্তী ঘোষ নামের ১২ বছরের এক হিন্দু শিশুর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর প্রেক্ষিতে, একাধিক ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে উক্ত শিশুর ছবি প্রচার করে দাবি হচ্ছে, মোহাম্মদ নামের ৪৯ বছর বয়স্ক একজন মুসলিম ব্যক্তির সাথে ওই শিশুকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেটি তার পরিবার প্রত্যাখ্যান করায় শিশুটিকে কয়েকজন কট্টরপন্থী মুসলিম ধর্ষণ করে। পরবর্তীতে হত্যা করে। 

দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

ফ্যাক্টচেক এ জানা যায়, শ্রাবন্তী ঘোষ নামের ওই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় প্রচারিত দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, নিহত শিশুর মা তার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ তুললেও উক্ত ঘটনার সাথে সাম্প্রদায়িকতার সংযোগ থাকার কথা বলেননি। বরং, তিনি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তারাও প্রত্যেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।  নিহতের পরিবারের অভিযোগ ও মামলার ভিত্তিতে তিনজনকে আটক করা হয় বলেন জানা যায়। তারা হলেন, বাড়ির মালিক প্রদীপ লাল ঘোষ ও প্রতিবেশী অজয় সিংহ। যারা প্রত্যেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এছাড়াও অজ্ঞাত আরও ৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন নিহতের মা রোজী ঘোষ। কিন্তু প্রতিবেদনের কোথাও উক্ত ঘটনার সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সংযোগের তথ্য পাওয়া যায়নি। 

নিহত শিশু শ্রাবন্তী ঘোষের মা রোজী ঘোষ জানান, এইটুকু বাচ্চার বিয়ের প্রস্তাব আসার দাবিটি অবান্তর। মুসলিম ব্যক্তির সাথে বিয়ের প্রস্তাব কিংবা ধর্মান্তরিত করার দাবিতে যে তথ্যগুলো প্রচারিত হয়েছে সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এর সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়াও তিনি বলেন, “আমার যাদের প্রতি সন্দেহ হয়েছে আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তারা কেউ মুসলিম নন।”

একইভাবে ১ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া শিক্ষার্থী অনন্য গাঙ্গুলীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই ভারতভিত্তিক একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট দাবি করে, বাংলাদেশে চলমান হিন্দু নিপীড়নের অংশ হিসেবে অনন্য গাঙ্গুলীকে হত্যা করা হয়েছে। এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। 

 তবে পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানানো হয়েছে, অনন্যকে হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। অনন্য দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং ভারত ও ঢাকায় তার চিকিৎসা চলছিল। কোটচাঁদপুর থানার ওসি মো. আসাদউজ্জামান জানান, অনন্য মানসিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং কিছুটা সুস্থ হয়ে সম্প্রতি বাড়িতে আসেন। রাতে স্বাভাবিকভাবেই খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমাতে যান। পরদিন সকালে সাড়া না পেয়ে জানালা দিয়ে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।

এর আগে, ২৯ জানুয়ারিচট্টগ্রামের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে নিজরুমে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় উপমা দত্ত নামের এক ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় তাঁর রুমের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ পাওয়া যায়। 

তাঁর মৃত্যুর পর রুমের দরজা বন্ধ এবং শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন না পাওয়া গেলেও একাধিক ভারতীয় এক্স অ্যাাকাউন্ট থেকে তাঁর মৃত্যুকে ধারাবাহিক হিন্দু হত্যা বলে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হয়েছে। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে। 

এর আগে, ২৭ জানুয়ারি বরিশালের মুলাদী পৌরসদরে নিজগৃহ থেকে জৈতিমনি (১৫) নামের এক স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। 

জৈতিমনির পরিবারের সদস্যরা জানান, মোবাইল রেখে পড়তে বলায় মায়ের সঙ্গে অভিমান করে আত্মহত্যা করেছে। জৈতিমনির মা ঝুমা সরকার জানান, “তাকে মোবাইল রেখে পড়তে বসার জন্য বলা হয়। ওই সময় জৈতিমনি রাগ করে তার কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাকে খাবারের জন্য ডাকতে গিয়ে সাড়া না পাওয়ায় দরজার ফাঁক দিয়ে মেয়ের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পাওয়া যায়।” অথচ এ ঘটনায় ও একাধিক ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে হিন্দু হত্যা বলে প্রচারণা চালানো হয়। দেখুন এখানে, এবং এখানে। 

১১ ডিসেম্বর ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দুই তরুণকে মারধরের একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর ব্যপক নির্যাতন করা হচ্ছে।  দেখুন এখানে, এখানে, এবং এখানে। তবে , যাচাই এ দেখা যায়, মারধরের স্বীকার তরুণরা হিন্দু নন বরং চুরির দায়ে দুই মুসলিমকে হেনস্তা করা হয়েছে।

এছাড়াও, ২৯ ডিসেম্বর ভারত থেকে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে এক হিন্দু শিক্ষককে অবসরের পর জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। এই দাবিটিও সঠিক নয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ব্যক্তি মুসলিম এবং তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক।

১১ ডিসেম্বর ভারত থেকে ব্যবহৃত এক্স অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, এটি বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ভাঙার দৃশ্য। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়। এটি ২০২১ সালে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রহিম ইয়ার খান জেলার ভোং শহরে একটি মন্দির ভাঙার দৃশ্য। 

একইদিনে, বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য দাবিতে একটি ছবি সামাজিক মাধ্যম এক্সে প্রচার করে হিন্দু নিপীড়নের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে যাচাই এ দেখা যায়, প্রচারিত ছবিটি সাম্প্রতিক সময়ের নয় বরং ২০২২ সালের।

৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশে কথিত এক হিন্দু সন্ন্যাসীকে মারধরের দৃশ্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। প্রচারিত ভিডিওটিতে দেখা যায়, গেরুয়া পোশাক পরিহিত একজন সন্ন্যাসী বেশের ব্যক্তিকে কয়েকজন মিলে কিল-ঘুষি ও লাঠিসোটা দিয়ে মারধর করছেন। 

আলোচিত ভিডিওটি বাংলাদেশে কোনো হিন্দু সন্ন্যাসীকে মারধরের ঘটনার নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের পাঞ্জাবের তান্ডা রেলওয়ে স্টেশনে বাচ্চা চুরির অভিযোগে একজন কথিত সন্ন্যাসীকে মারধরের ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

২১ ডিসেম্বর অন্য একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে বাংলাদেশে হিন্দু ও তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হচ্ছে। 

তবে, দাবিটি সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, গত ৯ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। 

এছাড়াও,  বাংলাদেশে গান্ধীর “শরীর থেকে মুণ্ডু বিচ্ছিন্ন” করা হয়েছে দাবিতে ১৭ জানুয়ারিমহাত্মা গান্ধীর একটি ভাঙা মূর্তির ছবি ও ভিডিও একাধিক সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, মূল ঘটনা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের। 

‘তৌহিদি জনতা’, ‘ইসলামপন্থী’ নামে একের পর এক ভুয়া সংবাদ ছড়িয়েছে ভারতীয় সামাজিক মাধ্যমে। 

৬ জানুয়ারিসিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় শ্মশানের নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধে এক হিন্দু বৃদ্ধা নারীর মরদেহ সৎকারে সাময়িক জটিলতা সৃষ্টি হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি চাবি দিতে দেরি করায় স্বজনরা বিক্ষোভ করেন। পরে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে চাবির ব্যবস্থা হয় এবং সেদিনই মরদেহ সৎকার সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু এই বিক্ষোভকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে ভারতের একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে ‘জিহাদিরা, তৌহিদি জনতা’ হিন্দুদের সৎকারে বাঁধা দিচ্ছে, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে। দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে, এখানে এবং এখানে

তবে যাচাই করে দেখা যায়, এ ঘটনায় সাম্প্রদায়িকতার কোনো সংযোগ নেই। মূলত শ্মশানের নামকরণ নিয়ে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্বের ফলে সৎকারে জটিলতা দেখা দেয়।

২৪ ডিসেম্বর ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপর থেকে নিচের সড়কে ককটেল নিক্ষেপ করলে সিয়াম (২১) নামের এক পথচারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এই বিস্ফোরণের সাথে ‘ইসলামপন্থীরা’ ও ‘জামাতি উগ্রবাদীরা’ জড়িত বলে প্রচার করা হচ্ছে ভারত থেকে পরিচালিত বেশকিছু এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে।  

এরকম কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে    

প্রকৃতপক্ষে, এমন দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া  যায়নি। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

একই ঘটনায় নিহত ব্যক্তিকে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী দাবি করে কিছু পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। তবে, নিহত যুবক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নয়। প্রকৃতপক্ষে, নিহত ব্যক্তির নাম সিয়াম, যিনি মুসলিম ধর্মাবলম্বী।

একইভাবে, ২৩ ডিসেম্বরে একাধিক ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের সিলেটে ‘হিন্দু হওয়ার কারণেই হামলার শিকার’ একটি হিন্দু পরিবার। দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে 

দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে প্রচারিত দাবিটি সত্য নয়  মূলত, জমিজমা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্বে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার স্বীকার ব্যক্তি নিজেই এই হামলায় সাম্প্রদায়িকতার যোগসূত্র অস্বীকার করেছেন।

২১ ডিসেম্বর অন্য একটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরায় এবং দাড়ি না রাখায় বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা ছাত্রদের চুল কেটে দিচ্ছেন। দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

যাচাই করে দেখা যায়, এই দাবি সত্য নয়। সংস্কৃতিকর্মীদের অভিনয়ের একটি ভিডিওকে ভুয়া দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

১৯ ডিসেম্বর ভারত থেকে পরিচালিত একাধিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে ‘বোরকা ও হিজাব না পরার কারণে’ দুই মুসলিম মেয়েকে মুসলমানরাই হামলা করেছে। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে 

প্রকৃতপক্ষে, খাবার নিয়ে কথা কাটাকাটি্র জের ধরে এক পর্যায়ে সংঘাত হয়, সেটিকেই ভিন্ন দাবিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

২ ফেব্রুয়ারী সামাজিক মাধ্যমে এক্সে ভারতীয় একাধিক অ্যাকাউন্ট এবং ফেসবুকে একাধিক পোস্টে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের রংপুর জেলার মিঠাপুকুরে হিন্দু মালিকানাধীন বাদ্যযন্ত্রের দোকান ‘তাল তরঙ্গ’-এ আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও দাবি করা হচ্ছে, হামলাকারীরা বলেছে, “ইসলামে সঙ্গীত হারাম। যদি বাংলাদেশে থাকতে চাও, তাহলে এমন দোকান চলতে দেওয়া হবে না।”

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, এখানে কোনো হামলা বা হুমকির ঘটনা ঘটেনি। এবং ক্ষতিগ্রস্তরা শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী নন। ক্ষতিগ্রস্ত তিন দোকানের মালিকের মধ্যে ২ জন মুসলিম এবং একজন হিন্দু। তাদের সবার ধারণা, ঘটনাটি বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে হয়ে থাকতে পারে। 

ক্ষতিগ্রস্ত বাদ্যযন্ত্রের দোকান ‘তাল তরঙ্গ’ এর স্বত্বাধিকারী প্রদীপ কুমার মণিদাস হামলা বা কোনো রকম হুমকি পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। 

অপ-তথ্য ছড়াতে এ আই নির্মিত কন্টেন্টের ব্যবহার ও ছিলো লক্ষণীয়। 

২৫ ডিসেম্বর একটি ভিডিও ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, যেখানে আশপাশের কয়েকটি দোকানে আগুন জ্বলছে। তিনি বলছেন— “আমি বাংলাদেশে আছি। এখন রাত। ‘দীপু চাদার’-এর মতো আমাদেরও মেরে ফেলবে। এখানে কী হচ্ছে, আপনি দেখতে পাচ্ছেন। দয়া করে এই ভিডিওটি যত বেশি সম্ভব শেয়ার করুন, যাতে কেউ আমাদের বাঁচাতে পারে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ করে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে গেছে।” দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে:

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওটি সত্য নয়; বরং এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। এছাড়াও, ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের এক হিন্দু তরুণীর আর্তনাদের দৃশ্য দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। দেখুন এখানে , এখানে এবং এখানে 

তবে, এই ভিডিওটিও আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সহায়তায় আলোচিত দাবিতে প্রচারিত তৈরি করা হয়েছে। 

৬ জানুয়ারি খোকন চন্দ্র দাসের স্ত্রীর বক্তব্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। যেখানে তাকে সনাতন ধর্মালম্বিদের উপর নির্যাতন চলছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু, এই ভিডিওটিও আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।  

এছাড়াও, ভারত থেকে পরিচালিত ‘All Time Happy’ নামক ফেসবুক পেজ থেকে একের পর এক এ আই ভিডিওর মাধ্যমে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের অপ-প্রচার চালানো হচ্ছে। 

আলোচিত ফেসবুক পেজটিতে প্রকাশিত পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে পেজটি থেকে অন্তত ১৭টি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে হিন্দু হওয়ায় বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতায় থাকা, হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা না বলা, হিন্দু মেয়েদের বিয়ের জন্য জোর করা, দিপু চন্দ্র দাসের স্বজনদের বক্তব্যসহ (, ) নানা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এ সময়ে পেজটি থেকে শুধু দিপু চন্দ্র দাসকে কেন্দ্র করেই অন্তত ছয়টি (, , , , , ) ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যেগুলো সবই এআই ব্যবহার করে তৈরি। 

 

সোর্স: দ্য ডিসেন্ট

 


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত