দেশের সংস্কার উদ্যোগে এখন মূল আলোচনায় ‘গণভোট’। ইংরেজি ‘রেফারেন্ডাম’–এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘গণভোট’। এটি
মূলত জনগনের মতামত
যাচাইয়ের এমন এক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। এটি মূলত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ
কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া।
সংবিধান সংশোধন হোক বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও গণভোটের আয়োজন করা হয়। সবক্ষেত্রেই চূড়ান্ত রায় থাকে সাধারণ মানুষের হাতে।"
বাংলাদেশে গণভোটের ইতিহাস
প্রথম
গণভোট হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে। দ্বিতীয় গণভোট হয়েছিল রাষ্ট্রপতি
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে এবং সবশেষ গণভোট ১৯৯১ সালের ১৫
সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে এক ভাষণে জিয়াউর রহমান এই গণভোটের ঘোষণা দেন। ১৯৭৭ সালের ৩১ মে সংবাদপত্র
‘দৈনিক ইত্তেফাক’ খবরে জানা যায়, সারা
দেশের ২১ হাজার ৬৮৫টি কেন্দ্রে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। সেই সময় দেশে মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখের কিছু বেশি।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, প্রায়
৮৮.১ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল, যার মধ্যে ৯৮.৯ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দিয়েছিল। বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছিল মাত্র ১.১ শতাংশ।
দ্বিতীয়
গণভোট:
বাংলাদেশে
দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক
আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচি এবং
স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব
পালনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ওই গণভোটের আয়োজন হয়েছিল।
আগের মতোই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এই পদ্ধতিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জনগণের আস্থা থাকলে
জেনারেল এরশাদের ছবিসহ ‘হ্যাঁ’ বাক্সে এবং আস্থা না থাকলে ‘না’ বাক্সে ভোট দেওয়ার
ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
তৃতীয় গণভোট:
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পদত্যাগের পর, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বদলে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার লক্ষ্যে ওই বছরের ৬ আগস্ট মধ্যরাতে সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে বিল পাস হয়। তৎকালীন 'তিন জোটের রূপরেখা' অনুযায়ী, শাসনব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তন এবং সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর ওপর জনগণের চূড়ান্ত রায় নিতে ১৫ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে গণভোটের আয়োজন করা হয়।
তৎকালীন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, সেই ভোটে ৩৫.২ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল। সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৮৪.৩৮ শতাংশ। বিপরীতে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার পক্ষে ‘না’ ভোট দেন ১৫.৬২ শতাংশ ভোটার। শেষ পর্যন্ত বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। এই ঐতিহাসিক জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমেই বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী সরকারের অধীনে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তন বৈধতা পায়।
কেন এবারের গণভোট
ছাত্র-জনতার
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে পুনরায় সামনে আসে গণভোট। জাতীয় ঐকমত্য
কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের বৈধতা দিতে
গণভোট আয়োজনে মতৈক্য হয়েছে। তবে এর সময়কাল নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে। বাংলাদেশ
জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজনের দাবি
তুলেছে। অন্যদিকে বিএনপিসহ অন্যান্য দল বলছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে
আয়োজন করতে।
জুলাই
জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এবার গণভোটের লক্ষ্য
বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ
ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে
এবার গণভোট আলাদা হবে কি? নাকি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত
নেওয়ার ভার অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছে ঐকমত্য কমিশন।
১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক তৃতীয় গণভোটের আগে একটি গণভোট
আইন করা
হয়েছিল। সেই আইনের মূল লক্ষ্য ছিল সংবিধানের মৌলিক কিছু অনুচ্ছেদ (যেমন—৮, ৪৮, ৮০ বা ১৪২) সংশোধনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে সরাসরি জনগণের রায় নেওয়া। মূলত সংবিধানের ১৪২(১ক) অনুচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
২০ বছর পর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের এই বিধানটি সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায় ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর। একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে এক যুগান্তকারী রায় দেয়। এই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরার পাশাপাশি গণভোটের বিধানটিও পুনরায় সচল হয়। উচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ না হওয়ায় বর্তমানে নতুন করে গণভোট আয়োজনে আর কোনো আইনি জটিলতা নেই।
লোকপ্রশাসন–বিশেষজ্ঞ ও সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ড.
নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গণভোট যদি করতেই হয়, তাহলে আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে
কেন?’ ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতানুসারে, এতে খরচ অনেক বাড়বে। গণভোট
আয়োজনে সরকারের কয়েক শ কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
অধিকাংশ দেশে পার্লামেন্ট নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট
হয় জানিয়ে ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আগামী সংসদ
নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন করা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের সেই শক্তি ও
সামর্থ্য নেই। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্টের ঘাটতি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের
রয়েছে। সুতরাং তাদের কাছ থেকে গণভোট আয়োজন আশা করা সম্ভব নয়।
গণভোটের
আয়োজন করলে সারা দেশে ভোট করতে হবে। ব্যালট পেপার ছাপাতে হবে। প্রিসাইডিং অফিসার,
পোলিং অফিসার থেকে শুরু করে নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী নিযুক্ত করতে
হবে। মারামারি, হানাহানি ও রাজনৈতিক সংঘাত রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের
দেশব্যাপী মোতায়েন করতে হবে। সব মিলিয়ে গণভোটের জন্য প্রচুর অর্থ খরচ হবে।
সংসদ নির্বাচনের আগে যেসব রাজনৈতিক দল গণভোটের দাবি
করেছে, তা ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করেন অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দুটি
নির্বাচন করার মতো সময় নির্বাচন কমিশনের হাতে এখন নেই। কারণ, ২০২৬ সালের
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে হাতে সময় মাত্র তিন মাস।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এই
অধ্যাপকের মতানুসারে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনের আগে যদি গণভোট করতে সর্বদলীয় সিদ্ধান্ত হয়ও, তাহলে তা আগামী
ফেব্রুয়ারির কমপক্ষে দুই মাস আগে করতে হবে।
আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন, একসঙ্গে দুটি নির্বাচনের
ব্যালট পেপার ভোটকেন্দ্রে দেওয়া হলে ভোটাররা তালগোল পাকিয়ে ফেলতে পারেন। তবে এটি
হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন অধ্যাপক নিজাম আহমেদ।
নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে
জনগণ তিনটি ব্যালট পেপারে ভোট দেন। এগুলো হলো চেয়ারম্যান, নারী সদস্য ও সাধারণ
সদস্য। সুতরাং গণভোট ও সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ভোটারদের দুই ব্যালটে ভোট দিতে কোনো
সমস্যা হওয়ার কথা নয়।‘
গণভোট প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্যের ওপর জোর
দিয়ে ড. নিজাম বলেন, ‘যদি একদল অন্য দলের প্রতি এতটুকু বিশ্বাস করতে না পারে,
তাহলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।’
এদিকে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শ ম আলী রেজা বলেন,
আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো বিগত আট মাসে অনেক বিষয়েই মতৈক্যে পৌঁছেছে।
তাঁর বিশ্বাস, গণভোট অনুষ্ঠানের দিনক্ষণের বিষয়েও দলগুলো মতৈক্যে পৌঁছাতে পারবে।
এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার
আকাঙ্ক্ষা।
শ ম আলী রেজা বলেন, গণভোটে যাওয়ার আগে এ দেশের
সাধারণ ভোটারদের গণভোট ও জুলাই সনদ বিষয়ে রাজনৈতিক দীক্ষার প্রয়োজন আছে। আবার
ভিন্ন সময়ে গণভোট আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য অংশীজন, বিশেষত
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাও গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
অধ্যাপক
আলী রেজার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো একমত ও পরস্পরের প্রতি আস্থাশীল হলে জুলাই সনদ
বাস্তবায়নের বিষয়টি তারা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দিতে পারে। সে
ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে না।
এরশাদকে হটাতে ১৯৯০–এর গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে
দেশবাসী এমনটি দেখেছেন বলেও জানান এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে,
মতপার্থক্য ভুলে সব রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলে সব মিলিয়ে সামনে দেশে আরও দুটি
গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে।
নিজাম উদ্দিন আহমেদে বলেন ‘একটি জুলাই চার্টার বা
জুলাই সনদ বিষয়ে নেওয়া ঐকমত্য কমিশনের নেওয়া সিদ্ধান্ত যাচাইয়ের জন্য। দ্বিতীয়টি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন একটি দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর
জাতীয় সংসদের মাধ্যমে ৭২-এর সংবিধান পরিবর্তন, সংশোধন বা বাতিল করা হলে সেটির
বিষয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিতে গণভোটের আয়োজন করতে হবে।‘
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
রোববার, ২৯ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দেশের সংস্কার উদ্যোগে এখন মূল আলোচনায় ‘গণভোট’। ইংরেজি ‘রেফারেন্ডাম’–এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘গণভোট’। এটি
মূলত জনগনের মতামত
যাচাইয়ের এমন এক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। এটি মূলত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ
কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া।
সংবিধান সংশোধন হোক বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও গণভোটের আয়োজন করা হয়। সবক্ষেত্রেই চূড়ান্ত রায় থাকে সাধারণ মানুষের হাতে।"
বাংলাদেশে গণভোটের ইতিহাস
প্রথম
গণভোট হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে। দ্বিতীয় গণভোট হয়েছিল রাষ্ট্রপতি
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে এবং সবশেষ গণভোট ১৯৯১ সালের ১৫
সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে এক ভাষণে জিয়াউর রহমান এই গণভোটের ঘোষণা দেন। ১৯৭৭ সালের ৩১ মে সংবাদপত্র
‘দৈনিক ইত্তেফাক’ খবরে জানা যায়, সারা
দেশের ২১ হাজার ৬৮৫টি কেন্দ্রে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। সেই সময় দেশে মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখের কিছু বেশি।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, প্রায়
৮৮.১ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল, যার মধ্যে ৯৮.৯ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় দিয়েছিল। বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছিল মাত্র ১.১ শতাংশ।
দ্বিতীয়
গণভোট:
বাংলাদেশে
দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক
আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচি এবং
স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব
পালনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ওই গণভোটের আয়োজন হয়েছিল।
আগের মতোই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এই পদ্ধতিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জনগণের আস্থা থাকলে
জেনারেল এরশাদের ছবিসহ ‘হ্যাঁ’ বাক্সে এবং আস্থা না থাকলে ‘না’ বাক্সে ভোট দেওয়ার
ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
তৃতীয় গণভোট:
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পদত্যাগের পর, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বদলে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার লক্ষ্যে ওই বছরের ৬ আগস্ট মধ্যরাতে সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে বিল পাস হয়। তৎকালীন 'তিন জোটের রূপরেখা' অনুযায়ী, শাসনব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তন এবং সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর ওপর জনগণের চূড়ান্ত রায় নিতে ১৫ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে গণভোটের আয়োজন করা হয়।
তৎকালীন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, সেই ভোটে ৩৫.২ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল। সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৮৪.৩৮ শতাংশ। বিপরীতে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার পক্ষে ‘না’ ভোট দেন ১৫.৬২ শতাংশ ভোটার। শেষ পর্যন্ত বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। এই ঐতিহাসিক জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমেই বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী সরকারের অধীনে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তন বৈধতা পায়।
কেন এবারের গণভোট
ছাত্র-জনতার
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে পুনরায় সামনে আসে গণভোট। জাতীয় ঐকমত্য
কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের বৈধতা দিতে
গণভোট আয়োজনে মতৈক্য হয়েছে। তবে এর সময়কাল নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে। বাংলাদেশ
জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজনের দাবি
তুলেছে। অন্যদিকে বিএনপিসহ অন্যান্য দল বলছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে
আয়োজন করতে।
জুলাই
জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এবার গণভোটের লক্ষ্য
বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ
ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে বলেও তিনি জানান।
তবে
এবার গণভোট আলাদা হবে কি? নাকি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত
নেওয়ার ভার অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছে ঐকমত্য কমিশন।
১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক তৃতীয় গণভোটের আগে একটি গণভোট
আইন করা
হয়েছিল। সেই আইনের মূল লক্ষ্য ছিল সংবিধানের মৌলিক কিছু অনুচ্ছেদ (যেমন—৮, ৪৮, ৮০ বা ১৪২) সংশোধনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে সরাসরি জনগণের রায় নেওয়া। মূলত সংবিধানের ১৪২(১ক) অনুচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
২০ বছর পর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের এই বিধানটি সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায় ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর। একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে এক যুগান্তকারী রায় দেয়। এই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরার পাশাপাশি গণভোটের বিধানটিও পুনরায় সচল হয়। উচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ না হওয়ায় বর্তমানে নতুন করে গণভোট আয়োজনে আর কোনো আইনি জটিলতা নেই।
লোকপ্রশাসন–বিশেষজ্ঞ ও সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ড.
নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গণভোট যদি করতেই হয়, তাহলে আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে
কেন?’ ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতানুসারে, এতে খরচ অনেক বাড়বে। গণভোট
আয়োজনে সরকারের কয়েক শ কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
অধিকাংশ দেশে পার্লামেন্ট নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট
হয় জানিয়ে ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আগামী সংসদ
নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন করা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের সেই শক্তি ও
সামর্থ্য নেই। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্টের ঘাটতি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের
রয়েছে। সুতরাং তাদের কাছ থেকে গণভোট আয়োজন আশা করা সম্ভব নয়।
গণভোটের
আয়োজন করলে সারা দেশে ভোট করতে হবে। ব্যালট পেপার ছাপাতে হবে। প্রিসাইডিং অফিসার,
পোলিং অফিসার থেকে শুরু করে নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী নিযুক্ত করতে
হবে। মারামারি, হানাহানি ও রাজনৈতিক সংঘাত রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের
দেশব্যাপী মোতায়েন করতে হবে। সব মিলিয়ে গণভোটের জন্য প্রচুর অর্থ খরচ হবে।
সংসদ নির্বাচনের আগে যেসব রাজনৈতিক দল গণভোটের দাবি
করেছে, তা ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করেন অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দুটি
নির্বাচন করার মতো সময় নির্বাচন কমিশনের হাতে এখন নেই। কারণ, ২০২৬ সালের
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে হাতে সময় মাত্র তিন মাস।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত এই
অধ্যাপকের মতানুসারে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনের আগে যদি গণভোট করতে সর্বদলীয় সিদ্ধান্ত হয়ও, তাহলে তা আগামী
ফেব্রুয়ারির কমপক্ষে দুই মাস আগে করতে হবে।
আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন, একসঙ্গে দুটি নির্বাচনের
ব্যালট পেপার ভোটকেন্দ্রে দেওয়া হলে ভোটাররা তালগোল পাকিয়ে ফেলতে পারেন। তবে এটি
হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন অধ্যাপক নিজাম আহমেদ।
নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে
জনগণ তিনটি ব্যালট পেপারে ভোট দেন। এগুলো হলো চেয়ারম্যান, নারী সদস্য ও সাধারণ
সদস্য। সুতরাং গণভোট ও সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ভোটারদের দুই ব্যালটে ভোট দিতে কোনো
সমস্যা হওয়ার কথা নয়।‘
গণভোট প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্যের ওপর জোর
দিয়ে ড. নিজাম বলেন, ‘যদি একদল অন্য দলের প্রতি এতটুকু বিশ্বাস করতে না পারে,
তাহলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।’
এদিকে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শ ম আলী রেজা বলেন,
আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো বিগত আট মাসে অনেক বিষয়েই মতৈক্যে পৌঁছেছে।
তাঁর বিশ্বাস, গণভোট অনুষ্ঠানের দিনক্ষণের বিষয়েও দলগুলো মতৈক্যে পৌঁছাতে পারবে।
এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার
আকাঙ্ক্ষা।
শ ম আলী রেজা বলেন, গণভোটে যাওয়ার আগে এ দেশের
সাধারণ ভোটারদের গণভোট ও জুলাই সনদ বিষয়ে রাজনৈতিক দীক্ষার প্রয়োজন আছে। আবার
ভিন্ন সময়ে গণভোট আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য অংশীজন, বিশেষত
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাও গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
অধ্যাপক
আলী রেজার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো একমত ও পরস্পরের প্রতি আস্থাশীল হলে জুলাই সনদ
বাস্তবায়নের বিষয়টি তারা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দিতে পারে। সে
ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে না।
এরশাদকে হটাতে ১৯৯০–এর গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে
দেশবাসী এমনটি দেখেছেন বলেও জানান এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদের মতে,
মতপার্থক্য ভুলে সব রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলে সব মিলিয়ে সামনে দেশে আরও দুটি
গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে।
নিজাম উদ্দিন আহমেদে বলেন ‘একটি জুলাই চার্টার বা
জুলাই সনদ বিষয়ে নেওয়া ঐকমত্য কমিশনের নেওয়া সিদ্ধান্ত যাচাইয়ের জন্য। দ্বিতীয়টি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন একটি দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর
জাতীয় সংসদের মাধ্যমে ৭২-এর সংবিধান পরিবর্তন, সংশোধন বা বাতিল করা হলে সেটির
বিষয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিতে গণভোটের আয়োজন করতে হবে।‘
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন