২০২৪ সালের জুলাই
সনদ বাস্তবায়নে
গত ১২ই
ফেব্রুয়ারি
ত্রয়োদশ জাতীয়
সংসদ নির্বাচনের
সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত
হয়েছে। গণভোটে
১২ কোটি
৭৭ লাখ
ভোটারের মধ্যে
৭ কোটি
৭৬ লাখ
৯৫ হাজার
ভোটার ভোট দিয়েছে।
'হ্যাঁ' ভোটে
৬২ শতাংশের
বেশি ভোটার
ভোট দেওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে
কার্যকর হওয়ার পথে জুলাই সনদ।
জুলাই
জাতীয় সনদ
(সংবিধান সংস্কার)
বাস্তবায়ন আদেশ
অনুযায়ী, নির্বাচিত
সংসদ সদস্যরা
একই সঙ্গে
সংবিধান সংস্কার
পরিষদের দায়িত্ব
পালন করবেন।
জাতীয় সংসদের
প্রথম অধিবেশন
থেকে ১৮০
কার্যদিবসের
মধ্যে জুলাই
জাতীয় সনদে
বর্ণিত সংবিধানসম্পর্কিত
প্রস্তাবগুলো
অনুযায়ী সংস্কার
আনবেন তাঁরা।
সংস্কার
কমিশনের রিপোর্ট
নিয়ে দফায়
দফায় রাজনৈতিক
দলগুলোর সাথে
বৈঠকের পর
গণভোটে মোট
৮৪টি সংস্কার
প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত
রয়েছে। এর
মধ্যে ৪৭টি
প্রস্তাবনা
ছিল সাংবিধানিক।
বেশ কয়েকটি
সাংবিধানিক
সংস্কার প্রস্তাবনায়
বিএনপিসহ অন্যান্য
দলের ভিন্নমত
বা আপত্তি
ছিল।
সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেছে বিএনপি। ফলে জুলাই সনদের যে সব বিষয়ে ভিন্নমত নেই, সে সব প্রশ্নে সংস্কারগুলো নিয়ে তেমন কোন সংকট দেখছেন না সংবিধান বিশ্লেষকরা।
তবে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত কীভাবে হবে, তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে আলোচনার
সূত্রপাত হয়েছে। কারণ বিএনপি তাদের ইশতেহারে সংসদের আসন সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করার বলেছে। এর বিপরীতে গণভোটের প্রশ্নে সরাসরি সংসদের উচ্চকক্ষের গঠনের কথা বলা হয়েছে আনুপাতিক হারে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার মনে করেন, বিএনপির ইশতেহারটি সরাসরি জনগণের
ভোটে অনুমোদিত নয়, যা গণভোটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে সংসদের
উচ্চকক্ষ আনুপাতিক ভোটের হারে গঠনের বিষয়টিতে সরাসরি মানুষ ভোট দিয়েছে।
এছাড়াও জুলাই সনদের বেশ কিছু সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত
থাকায় গণভোটের
হ্যাঁ জয়লাভ করার পরও সেগুলো বাস্তবায়ন হবে না বলেও বিশ্লেষকরা
মনে করছেন।
উচ্চকক্ষ
কেমন হবে? গঠন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানামুখী প্রশ্ন
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয় যুক্ত করেছে। কিন্তু চারটি প্রশ্ন থাকলেও সেখানে 'হ্যাঁ' অথবা 'না' একটিতে ভোট দিতে হয়েছে ভোটারদের। যে কারণে শুরু থেকেই এটি নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা ছিল।
গণভোটের
ওই চারটি প্রশ্নের 'খ' প্রস্তাবে আনুপাতিক উচ্চকক্ষের বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
পরের
প্রশ্নে আবার বলা হয়েছে, সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
সর্বশেষ
প্রশ্নে বলা হয়েছে, জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহার অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে বিএনপি এককভাবে ২৯০ আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৪৯.৯৭ শতাংশ, জামায়াত এককভাবে ২২৭ আসনে নির্বাচন করে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
তবে জোটবদ্ধ ভোটের হিসেবে বিএনপি ৫১ শতাংশের বেশি ও জামায়াত-এনসিপি জোট ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আবার আসন সংখ্যার হিসেবে বিএনপি জোট ২১২টি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট জিতেছে ৭৭টি আসন।
এখন আসন সংখ্যার হিসেবে যদি জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে বিএনপি জোট ১০০টির মধ্যে ৭০টি, জামায়াতে ইসলামী অন্তত ২৬টি, এনসিপি ২টি আসন পেতে পারে। এর বিপরীতে ভোটের আনুপাতিক হারের বিবেচনায় উচ্চকক্ষ গঠন হলে বিএনপি জোটের আসন কমে হবে ৫২ থেকে ৫৩ টি, আর জামায়াত জোটের অন্তত ৩৮টি।
জুলাই
সনদে ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়ে বলা হলেও এ নিয়ে আপত্তি ছিল। এর বিপরীতে বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে তারা ক্ষমতায় গেলে উচ্চকক্ষ গঠন করবে আসন সংখ্যার ভিত্তিতে।
এই ধোঁয়াশা নিয়ে নির্বাচনের দিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ‘গণভোটের ব্যালটে চারটি ক্যাটাগরি ছিল। সেখানে উচ্চকক্ষের গঠন যে ভোটের আনুপাতিক হারে হবে, সেটার ওপর সরাসরি ভোট হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।’
মি. হায়দার বলছেন, ‘উচ্চকক্ষ বিষয়ে ব্যালটে সরাসরি ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। আর বিএনপির ইশতেহার গণভোটে পাশ হয়নি।’
তিনি
প্রশ্ন রাখেন, ‘গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপিত একটা ইস্যু ডাইরেক্টলি (প্রত্যক্ষভাবে) অ্যাপ্রুভ হইছে, আরেক ইস্যু ইনডাইরেক্টলি (পরোক্ষভাবে) ঘোষণা হয়েছে দলের পক্ষ থেকে, তাহলে কোনটা প্রাধান্য পাবে’?
তবে, এটি নিয়ে যে পরবর্তী আলোচনা বির্তক চলবে সেটি একবাক্যে বলেছে অন্তর্বর্তী সরকার ও সংবিধান বিশ্লেষকদের অনেকেই।
গণভোটের মাধ্যমে খুলেছে সংস্কারের পথ
১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন
ও গণভোটে ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছেন চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন এবং 'না' ভোট
দিয়েছেন দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।
অর্থাৎ
প্রদত্ত ভোটের ৬০ শতাংশের বেশি 'হ্যাঁ' এর পক্ষে ভোট দেওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নিয়ে যে সংকট ছিল, সেটি কেটে গেছে।
মূলত সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি। গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি।
বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে বলা হয়েছে গণভোটের কথা। এই গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে।
জুলাই
সনদ স্বাক্ষরের পর এর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা মতপার্থক্য
তৈরি হয়।
সেই মতপার্থক্য রাজপথ পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবির মুখে সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সিদ্ধান্তের কথা জানান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস।
১২ই
ফেব্রুয়ারির গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হওয়ায় এখন জুলাই সনদ সংস্কার বাস্তবায়নের তৃতীয় স্তর শুরু হবে। আগামী মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। এক্ষেত্রে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে।
সংসদ
সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে।
শনিবার
এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা দুটি শপথ গ্রহণ করবেন একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই পরিষদের মেয়াদ হবে ১৮০ দিন।’
এই সংবিধানে কি কি পরিবর্তন আসবে?
জুলাই সনদের ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর একমত
হয়েছে।
গণভোটের 'হ্যাঁ' জয়ের ফলে যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নের পথ খুলেছে, তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব হলো প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে।
এছাড়া
সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী।
তাছাড়া
কোনো বিষয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে। এ বিষয়গুলোতে বিএনপির আপত্তি নেই।
জুলাই
সনদে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। এই প্রস্তাবে বিএনপির প্রথমে আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাজী হয়।
যে কারণে বিএনপি নির্বাচনের আগে তাদের ইশতেহারে বিষয়টি স্পষ্টও করেছে। বিএনপির ইশতেহারেও বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদই হোক তিনি সর্বোচ্চ দশ বছরের বেশি আসীন থাকতে পারবেন না। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন না, এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল। যে কারণে তারা সেই বিষয়টি ইশতেহারেও যুক্ত করেছে।
ফলে দলীয় প্রধান আর প্রধানমন্ত্রী একই পদে থাকা নিয়ে জুলাই সনদে সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
আইনজীবী বলেন, ‘সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশেই বলা হয়েছে যে রাজনৈতিক দল বিজয় লাভ করবে তার ইশতেহার অনুযায়ী সুবিধামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। যে কারণে বিএনপির যেগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেগুলো তারা বাস্তবায়নে বাধ্য নয়। সেগুলো তারা ইশতেহারেও উল্লেখ করেছে।’
এখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতিকে কাজ করতে হয়। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।
বিএনপি
তাদের ইশতেহারে উল্লেখ করেছে, সংবিধানে একজন উপ-রাষ্ট্রপতির পদও সৃষ্টি করা হবে। তিনি রাষ্ট্রপতির মতোই নির্বাচিত হবেন। যদিও সেটি জুলাই সনদে নেই। যেহেতু বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে সংশোধনের পর নতুন সংবিধানে যুক্ত হতে পারে বিষয়টি।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
আপনার মতামত লিখুন