চাকরি-সংকটে স্যান্ডউইচ জেনারেশন: ক্যারিয়ার বাঁচানোর কার্যকর উপায়
বিভিন্ন পত্রিকা বা লিঙ্কডইন খুললেই এখন চোখে পড়ে 'এন্ট্রি লেভেল' বা 'তরুণ প্রতিভা'র জয়গান। যেখানে অভিজ্ঞতার মাপকাঠি আটকে থাকে বড়জোর ৫-৭ বছরে। কিন্তু আপনি যখন ৪৫ বা ৫০ ছুঁই ছুঁই একজন পেশাজীবী, যার ঝুলিতে ২০-২৫ বছরের অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার—তখন এই বিজ্ঞাপনগুলো আপনার কাছে এক নিষ্ঠুর প্রহসনের মতো মনে হয়। চাকরি ছাড়ার সময় এখনো আসেনি, অথচ নতুন চাকরির দুয়ারগুলো আপনার অভিজ্ঞতার ওজনেই যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।একেই বলা হয় 'স্যান্ডউইচ জেনারেশন'-এর ক্যারিয়ার ফাঁদ। একদিকে পারিবারিক দায়িত্বের পাহাড়, অন্যদিকে কর্পোরেট জগতের 'বয়স বৈষম্য'। প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় আপনার অভিজ্ঞতাকে 'ওভার কোয়ালিফাইড' বা 'অধিক ব্যয়বহুল' মনে করে পাশ কাটিয়ে যায়। এটি কেবল একজন ব্যক্তির সংকট নয়, বরং মেধা ও অভিজ্ঞতার এক অপচয়।কিন্তু মনে রাখবেন, বয়স আপনার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই বয়সে আপনি সংকটে স্থির থাকতে জানেন, যা একজন ফ্রেশার পারবে না। বর্তমানের এই 'এজ-বায়াস' বা বয়স-কেন্দ্রিক মানসিকতা ভাঙতে আপনার নেটওয়ার্কিং এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা জরুরি। ক্যারিয়ারের এই মধ্যগগনে থমকে না দাঁড়িয়ে, নিজের অভিজ্ঞতাকে মেন্টরশিপ বা কনসালটেন্সির মতো নতুন মাত্রায় রূপান্তর করার সময় এখনই। কারণ, অবসরের আগেই থেমে যাওয়া আপনার জন্য কোনো সমাধান নয়।বাস্তবতা কতটা কঠিন?আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও গবেষণা এই বিষণ্ণ চিত্রটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ২০২৫ সালে প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ফোর্বস’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের কর্মীদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ তাঁদের অবসরের স্বাভাবিক সময়ের আগেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চাকরি হারাচ্ছেন। ছাঁটাইয়ের শিকার হওয়া এই অভিজ্ঞ মানুষদের বড় একটি ট্র্যাজেডি হলো—তাঁদের অধিকাংশেরই পরবর্তীতে আর আগের মতো সম্মানজনক বেতন বা উচ্চপদে ফেরার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।এই সংকটের ঢেউ এখন কেবল উন্নত দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বৈশ্বিক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তি খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে বড় বড় ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পেশাজীবীরা।জীবনচক্রের এই সন্ধিক্ষণটিই মূলত মানুষের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সময়। একদিকে সন্তানের উচ্চশিক্ষার খরচ, অন্যদিকে বাড়ি বা গাড়ির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি; তার ওপর বয়স্ক বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও দেখাশোনার গুরুভার—সব মিলিয়ে এক অস্থির স্যান্ডউইচ পরিস্থিতি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বেসরকারি খাতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের বড় একটি অংশ এখন এই অদৃশ্য কিন্তু প্রকট মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।কেন এই ফাঁদ এখন এসে চেপে বসছে?অদৃশ্য বৈষম্য ও প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ কর্মক্ষেত্রে বয়সজনিত বৈষম্য এখন এক নিরব ঘাতক। ছাঁটাইয়ের খাঁড়া সবার আগে পড়ে উচ্চ বেতনভোগী ‘সিনিয়র’দের ওপর; ৪০ পেরোলেই যাদের নাম উঠে যায় ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) তরুণদের কাজ সহজ করে দিচ্ছে, অন্যদিকে মাঝামাঝি পর্যায়ের অভিজ্ঞ পেশাজীবীরা হারাচ্ছেন দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা। 'এসএইচআরএম'-এর তথ্যমতে, ৫০ ঊর্ধ্ব ২৬ শতাংশ কর্মী কর্মস্থলে বয়স নিয়ে কটাক্ষের শিকার হন। আবার 'এএআরপি' জানাচ্ছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রবীণ কর্মী কোনো না কোনোভাবে এই বৈষম্যের ভুক্তভোগী। এর সাথে যুক্ত হওয়া ‘স্যান্ডউইচ দায়িত্ব’—অর্থাৎ সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দ্বিমুখী ভরণপোষণ—একজন অভিজ্ঞ মানুষের মানসিক ও শারীরিক শক্তিকে দ্রুত নিঃশেষ করে দিচ্ছে।বেরোনোর পথ কি একেবারেই নেই?এই বাস্তবতা যতই কঠিন হোক, একেবারেই যে বেরোনোর পথ নেই, তা নয়। আপনাকে নতুন করে ভাবতে হবে। খুঁজে দেখুন কীভাবে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়।ডিজিটাল আপস্কিলিংঅনলাইন কোর্স, সার্টিফিকেট—এসব এখন বয়স নয়, দক্ষতাই প্রমাণ করে। নতুন টুল শেখা মানে ‘আউটডেটেড’ তকমাটা ঝেড়ে ফেলা।ফ্রিল্যান্সিং ও সাইড গিগপুরো চাকরি বদলানো সম্ভব না হলেও, নিজের দক্ষতা দিয়ে ছোট কাজ, পরামর্শ বা প্রজেক্ট নেওয়া যেতে পারে। এখানে বয়স নয়, কাজটাই মুখ্য।নেটওয়ার্কিংটা নতুন করে ভাবুনপুরোনো সহকর্মী, অ্যালামনাই গ্রুপ, ৪০+ পেশাজীবীদের লিংকডইন কমিউনিটি—এসব এখন আগের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।পরামর্শক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করুনআপনার অভিজ্ঞতাই আপনার মূল শক্তি। সেটাকে কনসালটিং বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আয় হিসেবে রূপ দিতে পারেন।অর্থনৈতিক প্রস্তুতিবড় বিনিয়োগ নয়, বরং দৈনন্দিন খরচ ও জরুরি স্বাস্থ্যব্যয়ের জন্য সঞ্চয়—এই সময়ে সেটাই বেশি জরুরি।আপনার কী মনে হয়?এই ‘স্যান্ডউইচ জেনারেশন’-এর ক্যারিয়ার সংকট কি বাংলাদেশেও আরও বাড়ছে? আপনি বা আপনার আশপাশের কেউ কি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন? আপনার অভিজ্ঞতা ও মতামত জানাতে পারেন মন্তব্যে।সূত্র: ফোর্বস, এসএইচআরএম ও এএআরপিএনএম/ধ্রুবকন্ঠ