ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জাকাত প্রদানের বিধান ও সার্ভিস চার্জের মাসআলা

বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা মানুষের লেনদেন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আসছে। সেই পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ‘ক্যাশলেস’ বা নগদবিহীন অর্থব্যবস্থা। এখন আর হাতে টাকা না থাকলেও কেনাকাটা থেমে থাকে না; মোবাইল ফোন, কার্ড কিংবা ডিজিটাল ওয়ালেটই হয়ে উঠেছে লেনদেনের প্রধান মাধ্যম।ফলে এর প্রভাব জাকাত, সদকা ইত্যাদি আদায়ের মধ্যেও পড়ছে। বর্তমান যুগে অনেকেই জাতাক-সদকা আদায়ে ‘ক্যাশলেস’ বা নগদবিহীন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এতে একদিকে যেমন সময় বাঁচছে, তেমনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থেকে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছে জাকাত-সদকা পৌঁছে দেওয়া সহজ হচ্ছে।তবে এই পদ্ধতিতে জাকাত-সদকা আদায় করতে গেলে কিছু সার্ভিস চার্জ প্রযোজ্য হয়, সেই সার্ভিজ চার্জ কি জাকাত-সদকার অংশ হবে, নাকি হবে না—এ নিয়ে অনেকের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।আজকের এই প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আমরা জানার চেষ্টা করব। তবে এর আগে আমাদের ক্যাশলেস লেনদেন ও জাকাতের মৌলিক বিধান সম্পর্কে জানতে হবে।ক্যাশলেস ব্যবস্থা কী?ক্যাশলেস অর্থনীতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে লেনদেন সম্পন্ন হয় নগদ টাকার ব্যবহার ছাড়াই ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ট্রান্সফার, কিউআর কোড কিংবা ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে। এতে অর্থ স্থানান্তর হয় ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে, দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে।জাকাত কী?ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন বা স্তম্ভের একটি জাকাত। দ্বিতীয় হিজরিতে রোজা ফরজ হওয়ার পরপরই শাওয়াল মাসে জাকাত ফরজ হয় এবং নবম হিজরিতে এটি পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর করা হয়। মহান আল্লাহ তাঁর বিত্তশালী বান্দাদের ওপর নির্দিষ্ট হারে জাকাত ফরজ করেছেন। আর জাকাতকে বলা হয়েছে গরিবের অধিকার। এটা কোনোক্রমেই গরিবের প্রতি ধনীর দয়া বা অনুগ্রহ নয়।পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের (ধনীদের) সম্পদে অধিকারবঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার আছে।’ (সুরা : আল-মাআরিজ, আয়াত : ২৪)জাকাত কাদের ওপর ফরজ?সুস্থ মস্তিষ্ক, স্বাধীন, বালেগ মুসলমান নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে জাকাত আদায় করা তার ওপর ফরজ হয়ে যায়। (আদ্দুররুল মুখতার : ২/২৫৯, বাদায়েউস সানায়ে : ২/৭৯, ৮২)উল্লেখ্য, উক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ তার কাছে পূর্ণ এক বছর থাকতে হবে।জাকাতের নিসাবক. সোনা ৭.৫ তোলা=৯৫.৭৪৮ গ্রাম প্রায়। খ. রুপা ৫২.৫ তোলা=৬৭০.২৪ গ্রাম প্রায়। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৩৯৪, আল ফিকহুল ইসলামী : ২/৬৬৯)দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও ব্যাবসায়িক পণ্যের নিসাব নির্ধারণে সোনা-রুপা হলো পরিমাপক। এ ক্ষেত্রে ফকির-মিসকিনদের জন্য যেটি বেশি লাভজনক হবে, সেটিকে পরিমাপক হিসেবে গ্রহণ করাই শরিয়তের নির্দেশ। তাই মুদ্রা ও পণ্যের বেলায় বর্তমানে রুপার নিসাবই পরিমাপক হিসেবে গণ্য হবে। তাই যার কাছে ৫২.৫ তোলা সমমূল্যের দেশি-বিদেশি মুদ্রা বা ব্যাবসায়িক পণ্য মজুদ থাকবে, তার ওপর জাকাত ওয়াজিব হবে।যে সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ, তার ৪০ ভাগের এক ভাগ বা ২.৫০ শতাংশ জাকাত দিতে হবে।সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করে শতকরা আড়াই টাকা বা হাজারে ২৫ টাকা হারে নগদ অর্থ কিংবা ওই পরিমাণ টাকার কাপড়চোপড় বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দিলেও জাকাত আদায় হবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৭২; সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৬২৩)জাকাত আদায়ের শর্তজাকাতের রুকন বা স্তম্ভ হলো, নিসাব পরিমাণ সম্পদ থেকে একটি অংশ আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে বের করে দেওয়া। আর সেটি এমনভাবে হস্তান্তর করা, যাতে মালিক সেই সম্পদের ওপর নিজের কর্তৃত্ব বিচ্ছিন্ন করে জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দেয় এবং তা তার হাতে পৌঁছে দেয়, অথবা তার প্রতিনিধির হাতে প্রদান করে। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/৩৯)সহজে বলতে গেলে, জাকাত আদায় হওয়ার জন্য শর্ত হলো জাকাতের অর্থ জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তির মালিকানায় চলে যেতে হবে।ক্যাশলেস প্রযুক্তির মাধ্যমে জাকাতএখন প্রশ্ন হলো, ক্যাশলেস পদ্ধতিতে জাকাত দিলে তা আদায় হবে কি না? আর যদি হয়, তবে এর সার্ভিস চার্জ কি জাকাতের টাকা থেকে কাটা যাবে?এর সহজ উত্তর হলো, ক্যাশলেস প্রযুক্তির মাধ্যমেও যেহেতু জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তির মালিকানায় অর্থ হস্তান্তর করা যায়, তাই এই পদ্ধতিতেও জাকাত আদায় হয়ে যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে, জাকাত উপযুক্ত ব্যক্তি পুরো টাকার মালিক হচ্ছে কি না, পুরো টাকার ওপর তার কর্তৃত্ব এসেছে কি না?কারণ উপরোক্ত বিধানগুলো দ্বারা বোঝা যায়, জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তি যতটুকু সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব পাবে, ঠিক ততটুকু সম্পদই জাকাত হিসেবে ধর্তব্য হবে। এর বাইরে সার্ভিস চার্জ হিসেবে যা কেটে নেওয়া হবে, তা জাকাত হিসেবে আদায় হবে না।বর্তমানে আমাদের দেশে এ ধরনের কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় মোবাইল ব্যাংকিং। এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যদি কোনো জাকাত উপযুক্ত ব্যক্তিকে জাকাতের টাকা পাঠানো হয়—সেখানে দুটি পরিস্থিতি হতে পারে। এক. সরাসরি জাকাত উপযুক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছে। দুই. কোনো দোকান ইত্যাদি বা অন্য তৃতীয় কোনো ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে। এই দুই পরিস্থিতিতে জাকাত আদায়ের মাসআলা দুই ধরনের হবে।উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ সরাসরি জাকাত উপযুক্ত ব্যক্তির মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে জাকাতের দুই হাজার টাকা পাঠায়, সে ক্ষেত্রে জাকাত উপযুক্ত ব্যক্তি পুরো দুই হাজার টাকার কর্তৃত্ব লাভ করে। সে ওই টাকা ক্যাশ আউট না করে পেমেন্ট অপশনের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করে জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারে। এতে সে পুরো টাকাই ভোগ করার সুবিধা পায়। তাহলে বোঝা গেল, এখানে জাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তি পুরো দুই হাজার টাকার কর্তৃত্ব লাভ করায় জাকাতদাতার পূর্ণ দুই হাজার টাকাই জাকাত হিসেবে আদায় হবে।আর এর বিপরীতে যদি জাকাত গ্রহীতার অ্যাকাউন্টে সরাসরি না পাঠিয়ে তৃতীয় পক্ষ কিংবা দোকান ইত্যাদির অ্যাকাউন্টে জাকাতের টাকা পাঠানো হয়, তখন জাকাত গ্রহীতা পূর্ণ টাকার ওপর কর্তৃত্ব লাভ করতে পারে না; বরং তাকে নির্দিষ্ট হারে সার্ভিস চার্জ দিয়ে ক্যাশআউটের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে জাকাত গ্রহীতা সার্ভিস চার্জ আদায়ের পর যতটুকু সম্পদের মালিক হবে, ততটুকুই জাকাত হিসেবে গণ্য হবে। যেমন—এই জাকাত গ্রহীতাকে দুই হাজার টাকা পাঠানোর পর যদি তা তুলতে তার ৪০ টাকা খরচ হয়ে যায়, তাহলে সে ৪০ টাকা জাকাত হিসেবে আদায় হবে না। বাকি ১৯৬০ টাকাই জাকাত হিসেবে আদায় হবে।তাই মোবাইল ব্যাংকিং বা অন্য কোনো ক্যাশলেস মাধ্যমে জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো লক্ষ রাখা বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ তায়ালা সবার দান-সদকা কবুল করুন। আমিন।   এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জাকাত প্রদানের বিধান ও সার্ভিস চার্জের মাসআলা