ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলা ভাষার সক্ষমতা: একটি পর্যালোচনা
প্রায় ২০০
বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের পরও বাংলা ভাষা টিকে আছে। অথচ লাতিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর
বিভিন্ন অঞ্চলে বাইরের ভাষার প্রভাবে স্থানীয় ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে কিংবা পরিসর
কমে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা ছোট কোনো ভাষায় পরিণত হয়েছে।হাজার বছরের
ঐতিহ্য আর বিশাল জনগোষ্ঠীর মুখে টিকে থাকা বাংলা ভাষা নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। তবে বিশ্বায়নের
এই যুগে ইংরেজি ভাষার প্রবল আধিপত্য আমাদের মনে একটি সংশয় তৈরি করেছে। আমরা প্রায়ই
ভাবি, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলা ভাষা টিকে থাকতে পারবে তো? অর্থাৎ
ইংরেজির দোর্দণ্ড প্রতাপের মধ্যে বাংলা টিকে থাকবে কি না কিংবা যেভাবে বাংলা ভাষার
‘অশুদ্ধ রূপ’ ও ‘অপপ্রয়োগ’ বিস্তার লাভ করছে, তাতে এ ভাষা ব্যবহারযোগ্যতা হারাবে
কি না।আবার অনেকে
এমনও বলেন, বাংলা ভাষা ‘সহজ’ করার জন্য একে সংস্কার করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে বাংলা
ভাষার সক্ষমতা ও এর ধরন-বৈশিষ্ট্যকে তাঁরা বিবেচনাতেই নেন না।ইংরেজি ভাষার প্রভাবভাষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান
এবং সাম্প্রতিক সময়ের ভাষাগবেষণা বলছে, আগামী ১০০ বছরে বিশ্বজুড়ে ইংরেজি ভাষার
আধিপত্য প্রায় নিরঙ্কুশ হবে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইংরেজি এখনই প্রধান
মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সামনের দিনগুলোতে বিভিন্ন দেশের মানুষ স্থানীয় যোগাযোগের
ক্ষেত্রেও অন্তত দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যাপকভাবে ইংরেজি ব্যবহার করবেন।বাংলাদেশের শিক্ষা ও যোগাযোগের ভাষা হিসেবে গত কয়েক
দশকে সরকারি-বেসরকারি ক্ষেত্রে ইংরেজির প্রভাব বেড়েছে। এখন শুধু উচ্চশিক্ষায়
ইংরেজি ব্যবহৃত হচ্ছে না, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও ‘ইংরেজি
ভার্সনের’ পাঠ্যবই জনপ্রিয় হচ্ছে।অফিস-আদালতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একক ভাষা হিসেবে
ইংরেজি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিসিএসসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরির
পরীক্ষায় ইংরেজিতে উত্তর দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।বাংলা
ভাষার জটিলতাবাংলা বর্ণমালার
জটিলতা কমাতে অনেকেই স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জনবর্ণ ছাঁটাইয়ের কথা বলেন, যা আদতে ভাষার নিজস্ব বৈচিত্র্যকে নষ্ট করতে পারে।
তাঁদের মতে, এত
বর্ণবৈচিত্র্য থাকার কারণে বানানেও দ্বিধা তৈরি হয়। তাঁদের যুক্তি, ইংরেজি ভাষা
২৬টি বর্ণ নিয়ে ভালোভাবেই চলছে, তাহলে বাংলাতে এত বর্ণের প্রয়োজন কী।মজার ব্যাপার হলো কোনো কোনো ধ্বনিবিজ্ঞানীও বাংলা
বর্ণমালা থেকে বর্ণ হ্রাসের প্রস্তাব করেছেন। জ-য, ঙ–ং থেকেও একটি বাদ দেওয়ার
সুপারিশ আছে কারও কারও প্রস্তাবে।তবে আমাদের খেয়াল রাখা দরকার, বর্ণ কম বা বেশি থাকা
কোনো ভাষার মূল সমস্যা নয়। উচ্চারণ-পার্থক্য আলাদা করার জন্য উনিশ শতকের গোড়ার
দিকে বাংলা ভাষায় য়, ড়, ঢ়, ৎ বর্ণের সংযুক্তিও ঘটেছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এসব
বর্ণকে তাঁর বর্ণপরিচয় (১৮৫৫) গ্রন্থে জায়গাও দিয়েছেন।তা ছাড়া একই উচ্চারণের একাধিক বর্ণ থাকা কিংবা একই
বর্ণের একাধিক উচ্চারণ থাকা কেবল বাংলার বৈশিষ্ট্য নয়, ইংরেজিসহ প্রধান সব ভাষাতেই
এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এখন যদি বাংলা থেকে বর্ণ কমানো হয়, তবে এ ভাষা তার নিজের
বৈশিষ্ট্য ও চেহারাই হারিয়ে ফেলবে।আমাদের
হীনম্মন্যতাবাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ পৃথিবীর
বিভিন্ন অঞ্চলে ৩০ কোটির বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে। কালের প্রবাহে এ ভাষা নিজস্ব
কিছু ধরন ও বিশেষত্ব তৈরি করেছে। যেমন বাংলা ভাষায় তারিখবাচক শব্দে ই, শে ইত্যাদি
শব্দাংশ ব্যবহার করে ১৬ই, ২১শে এভাবে লেখা হয়।আবার আমাদের স্ত্রীবাচক শব্দ তৈরির ক্ষেত্রে
প্রত্যয়সহ কয়েক রকম পদ্ধতি আছে। ফলে জেলে–জেলেনী বা জেলে–জেলে বউ—এ ধরনের
স্ত্রীবাচক শব্দ পাওয়া যায়। শব্দসংক্ষেপের জন্য তাং, নং, মোঃ লেখার প্রবণতা আছে।এ ধরনের প্রয়োগবৈচিত্র্যকে বিবেচনায় না নেওয়ার
কারণে এবং আমরা অনেক সময় ইংরেজিকে মানদণ্ড ধরি বলে বাংলার অনেক নিয়মকে ভুল বা অপ্রাসঙ্গিক মনে করি, যা আমাদের হীনম্মন্যতারই বহিঃপ্রকাশ।তা
ছাড়া মানতে দ্বিধা নেই, বর্তমান পৃথিবীতে বহুভাষিক মানুষের কাছাকাছি অবস্থানের
দরুন কিংবা সামাজিক চিন্তা বদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যবহৃত ভাষাতেও দ্রুত
রূপান্তর ঘটছে।সাহিত্যের অনুবাদবাংলা ভাষায় প্রচুর বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যক্রমেও অনূদিত বিদেশি সাহিত্য গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়।
কিন্তু বাংলা সাহিত্যকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রম
প্রায় দেখাই যায় না। অথচ বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ ভান্ডার ইংরেজসহ
বিভিন্ন জাতির মানুষকে মুগ্ধ করেছে।মধ্যযুগের হাতে লেখা পুঁথির গুরুত্ব অনুধাবন করে
ইংরেজরা এ দেশ থেকে অনেক পুরোনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেছে কিংবা সেগুলোর অনুলিপি তৈরি
করেছে। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অনেক
লেখকের রচনাই বিভাষী মানুষের কাছে আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু এ জন্য আমাদের
তরফ থেকে যে উদ্যোগের দরকার ছিল, তার ঘাটতি রয়ে গেছে মারাত্মকভাবে। বিদেশিদের
জন্য এ দেশে এসে ভাষা শিক্ষার ভালো সুযোগও আমরা তৈরি করতে পারিনি। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ
সাহিত্য অনুবাদ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ এবং বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের
সামনে হাজির করা দরকার।ভাষা গবেষণায় অনাগ্রহবাংলাদেশে উচ্চতর গবেষণায় বিষয় হিসেবে বাংলা ভাষা
একেবারেই অবহেলিত। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতাসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় যথেষ্ট
গবেষণা হচ্ছে; কিন্তু বাংলা ভাষা নিয়ে তেমন গবেষণা হচ্ছে না। তা
ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ-আগ্রহেই চর্যাপদসহ অসংখ্য পুরোনো পুঁথি আবিষ্কার
করা সম্ভব হয়েছিল। উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে ২০ শতকের প্রথম ভাগে বঙ্গীয় সাহিত্য
পরিষদ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, চন্দ্রকুমার দেসহ বিভিন্ন ব্যক্তির আগ্রহে বাংলা পুরোনো
পুঁথি এবং লোকসাহিত্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।২০ শতকের বিভিন্ন পর্যায়ে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ,
মুহম্মদ আবদুল হাই প্রমুখ ভাষাবিজ্ঞানী ও ধ্বনিবিজ্ঞানী বিদেশে গিয়ে বাংলা ভাষার
ওপর গবেষণা করেছেন। এখন ভাষা গবেষণায় আগ্রহ বাড়ানোর জন্য প্রতিষ্ঠানকেই মূল ভূমিকা
পালন করতে হবে। বাংলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটসহ
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগ নতুন প্রকল্প সামনে এনে শিক্ষার্থীদের আগ্রহী
করে তুলতে পারে।ভাষাদক্ষতায়
ঘাটতিপ্রাথমিক শিক্ষা থেকেই শিক্ষার্থীদের আশানুরূপ
ভাষাদক্ষতা অর্জিত হচ্ছে না। বিভিন্ন জরিপ বলে, বাংলাদেশের শিশুশিক্ষার্থীদের একটি
বড় অংশ পাঁচ-ছয় বছরের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেও বাংলা পড়তে পারে না; কিংবা পড়ে
বুঝতে পারে না।মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভাষাদক্ষতা
বাড়ানোর জন্য পাঠ্যবইয়ে কোনো কাজ বা অনুশীলন থাকে না। শিক্ষার্থীরা ব্যাকরণ পড়ে;
কিন্তু সেই ব্যাকরণ তাদের বাস্তব জীবনের প্রায়োগিক কাজে আসে না। আবার উচ্চ স্তরেও
বাংলা পাঠ্যক্রম এমন যে শিক্ষার্থীদের অর্জিত ভাষাদক্ষতা চাকরির বাজারে বাড়তি কোনো
সুযোগ তৈরি করে না।বর্তমানে কর্মক্ষেত্র ও চাহিদার দিকে তাকিয়ে
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে। এসব বিভাগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে
টিকে থাকতে হলে বাংলা বিষয়ের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রমে বড় ধরনের বদলের প্রয়োজন আছে।
সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংযোজিত কোর্স হিসেবে বাংলা পড়ানো হলে
সেখানেও প্রায়োগিক প্রয়োজনকে প্রধান বিবেচ্য করতে হবে।পাঠ্যবই
ও পরিভাষা প্রণয়নবাংলা ভাষার ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য
উচ্চশিক্ষা স্তরে বাংলা পাঠ্যবই বাড়াতে হবে। আইন, মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ জ্ঞান
ও কর্মের বিভিন্ন শাখায় ব্যাপকভাবে ইংরেজির ব্যবহার হচ্ছে। আদালতে রায় দেওয়ার
ক্ষেত্রে কিংবা মেডিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনার ক্ষেত্রে ইংরেজি ব্যবহারের মূল
কারণ বাংলা পাঠ্যবই না থাকা।বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, বাণিজ্য
অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে অনেক শিক্ষক লেকচার দেন ইংরেজিতে, অনেক শিক্ষার্থী
পরীক্ষার খাতায় উত্তরও লেখে ইংরেজিতে। বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ানোর জন্য উচ্চতর
শ্রেণিতে বাংলা পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই উদ্যোগী ভূমিকা নিতে
হবে।উচ্চতর পাঠ্যবই তৈরির প্রধান বাধা পরিভাষা। একেকটি
বিষয়ের পরিভাষা তৈরির জন্য বা হালনাগাদ করার জন্য বিষয়সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বাংলা
ভাষাপণ্ডিত—উভয়েরই প্রয়োজন হয়। পরিভাষা তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি
প্রধান দায়িত্ব নিতে পারে।শেষ
কথাকেবল সংবিধানে
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও কাঠামোগত সঠিক পরিকল্পনা।
বাংলা ভাষাকে
ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করে তোলার জন্য এর মর্যাদা পরিকল্পনার পাশাপাশি
কাঠামোগত পরিকল্পনায় জোর দেওয়া দরকার। এ জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগ
জরুরি।রাস্তার সাইনবোর্ডের লেখা থেকে শুরু করে
সরকারি-বেসরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়াতে হলে নতুন করে নীতিগত ও আইনগত
বিধি প্রণয়ন করতে হবে। শুধু আবেগ আর কথা দিয়ে সত্যিকার অর্থে বাংলা ভাষার মর্যাদা
বা প্রয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার স্বার্থেই বহুমুখী
কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। লেখক:
তারিক মনজুর (ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ