ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

সম্পর্ক মজবুত করতে পছন্দের মানুষ হওয়ার ৮ উপায়

ছোট বেলা থেকেই আমরা শিশুদের ভদ্রতার ভাষা শেখাই। কেউ কিছু দিলে ধন্যবাদ বলা শেখাই আবার ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া শেখাই। খেলতে গিয়ে কারও কষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে ‘সরি’ বলাতে অভ্যস্ত করি। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শিশুই এমন এক বাস্তবতায় ঢুকে পড়ে, যেখানে সামান্য কারণেই রূঢ় আচরণ, গালাগাল বা বিদ্রূপকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। শৈশবে শেখানো সৌজন্যবোধ যেন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়, আর আচরণে জায়গা নেয় অসহিষ্ণুতা ও উদাসীনতা।ভদ্র, বিনয়ী বা ভালো মানুষ হওয়া মানে কী? ভদ্রতা বা ভালো মানুষ হওয়ার অর্থটাই যেন আজ অনেকের কাছে ঝাপসা হয়ে গেছে। সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রতার কোনো একক সংজ্ঞাও আর টিকে নেই। তবে কিছু মৌলিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিল আছে। ভদ্র হওয়া মানে কেবল শিষ্টাচার মানা নয়, বরং যাদের সঙ্গে আমাদের দেখা বা যোগাযোগ হচ্ছে, তাঁদের প্রতি আন্তরিক ও ইতিবাচক মনোভাব রাখা। অন্যকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার মানসিকতাই ভদ্রতার মূল ভিত্তি।ভদ্রতার মূল কথা হলো—অন্য মানুষ গুলোকেও নিজের মতো করেই ভাবা। যেমন মানুষ নিজের জীবনে আনন্দ, নিরাপত্তা আর পরিপূর্ণতা চায়, ঠিক তেমন ভাবেই বাকি মানুষরাও ঠিক সেটাই চায়। কেউই ইচ্ছে করে কষ্ট, ব্যথা বা বিপদের মধ্যে থাকতে চায় না। এই ভাবনাটা যখন মাথায় থাকে, তখন আচরণ আপনাতেই নরম হয়। গবেষকেরা বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে গড়া যে আমরা যখন কারও উপকার করি বা ভালো কিছু করি, তখন ভেতরে এক ধরনের আরামদায়ক ভালো লাগা তৈরি হয়। এতে আনন্দের সঙ্গে যুক্ত অংশগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই ভদ্র ব্যবহার শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়, এটা আমাদের নিজের মন ভালো রাখার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অন্যের প্রতি সদাচরণ মানুষকে ধীরে ধীরে আরও গ্রহণযোগ্য ও পছন্দনীয় করে তোলে।১. মিল খোঁজার চেষ্টা করুনঅন্যের প্রতি রূঢ় না হওয়ার একটি ভালো উপায় হলো—ইচ্ছা করে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে কোনো না কোনো মিল খোঁজা। সাইমন-টমাস বলেন, ‘হয়তো তাঁর সঙ্গে আপনার পোশাকে কিছু মিল আছে। কিংবা দাঁড়ানোর ভঙ্গি, হাতের নড়াচড়া, বা কণ্ঠস্বর। নিজেকে প্রশ্ন করুন—এমনটা কি আমিও করি? যেকোনো মানুষের সঙ্গেই মানবিক কোনো না কোনো মিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব।’ এতে আমরা আরও সহানুভূতিশীল হই। এভাবে একেবারে আলাদা জগতের মানুষের সঙ্গেও ভদ্র ব্যবহার করা সহজ হয়ে যায়।২. অন্যের উপকার করুনঅন্যের কাজে লাগে এমন কিছু করলে যে ভালো লাগে, সেটা শুধু অনুভূতি নয়, বিজ্ঞানেরও কথা। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবী কাজ বা দান মানুষের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে সাহায্য মানেই বড় কিছু হতে হবে, এমন নয়। রক্ত দেওয়া, কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানো, কিংবা নিজের হাতে কারও জন্য খাবার বানানো। এসব ছোট কাজও গভীর অর্থ বহন করে। আমার কাছে এসবই সত্যিকারের মানবিকতা। কারণ এতে শুধু অন্যের উপকার হয় না, নিজের ভেতরেও এক ধরনের তৃপ্তি ও শান্তি তৈরি হয়, যা অন্য ভাবে পাওয়া কঠিন।৩. আপনি শুনছেন—বুঝিয়ে দিনকারও কাছে পছন্দনীয় হয়ে ওঠার অন্যতম সহজ উপায় হলো তাঁর কথা মন দিয়ে শোনা হচ্ছে, এমন অনুভূতি তৈরি করা। শুনতে সহজ মনে হলেও, সত্যিকারের শোনা আসলে পরিশ্রমের কাজ। এতে শুধু কান নয়, মনোযোগ আর মানসিক উপস্থিতিও দরকার হয়। কাউকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হলে নিজের ভেতরে একটু জায়গা করে দিতে হয়। চোখে চোখ রেখে কথা বলা, শরীর সামান্য সামনে ঝুঁকিয়ে রাখা—এগুলো খুব সাধারণ হলেও শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয় যে আপনি আগ্রহী। একই সময়ে অনেক কাজ করার চেষ্টা করলে সেই মনোযোগ নষ্ট হয়। আমরা অনেকেই ভাবি, ফোনে চোখ রেখেও কথা শোনা যায়। কিন্তু সামনে থাকা মানুষটি বিষয়টা ভিন্নভাবে নিতে পারেন। কথার মাঝখানে ফোন হাতে নিলেই তাঁর মনে হতে পারে, তিনি আপনার কাছে অগ্রাধিকার নন। আমার অভিজ্ঞতায়, মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না—শুধু চায়, তাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা হোক। সেই অনুভূতিটাই সম্পর্ককে কাছাকাছি আনে।৪. ভালো প্রশ্ন করুন, আরও জানতে চানভালো প্রশ্ন করুন যেমন এমন প্রশ্ন করুন, যার উত্তর আপনি আগে জানতেন না। এতে উল্টো দিকের মানুষটা বুঝবে, আপনি তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অপরজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের গল্প বলতে যাবেন না। বরং তাঁকে উৎসাহ দিন, আরও বলার সুযোগ দিন। তাঁকে বোঝান—আপনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।৫. মন থেকে হাসুনভদ্রতার প্রকাশ অনেক সময় খুব ছোট একটি বিষয় দিয়েই হয়—একটা আন্তরিক হাসি। তবে সেই হাসি যদি কৃত্রিম হয়, মানুষ সহজেই তা বুঝে ফেলে, আর তখন তার কোনো মূল্য থাকে না। খাঁটি হাসি মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি করে। আমরা অজান্তেই একে অপরের অনুভূতি অনুকরণ করি—একজন হাসলে অন্যজনের মুখেও হাসি চলে আসে। বিশেষ করে অপরিচিত কারও সঙ্গে হাসি বিনিময় হলে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের স্বস্তি আর বিশ্বাস জন্ম নেয়। মনে হয়, পরিস্থিতি নিরাপদ, আমরা একে অপরের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নই। আমার কাছে মনে হয়, এই ছোট্ট হাসিটাই অনেক সময় অচেনা দূরত্ব ভাঙার প্রথম ধাপ হয়ে ওঠে।৬. বিরক্তিকর মুহূর্তে হালকা থাকুনকোনো বিব্রতকর পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করুন। ধরুন, দোকানে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, সবাই বিরক্ত। আপনি বিরক্ত না হয়ে পেছনের জনের সঙ্গে গল্প করার চেষ্টা করুন, রসিকতা করুন। তাঁকে মন হালকা করার সুযোগ দিন। অচেনা মানুষের সঙ্গেও অল্প সময়ের এমন সংযোগ মন ভালো করতে পারে।৭. মানুষের নাম ব্যবহার করুনকারও নাম মনে রাখা আর সুযোগ পেলেই তা ব্যবহার করা আমার কাছে খুব সাধারণ কিন্তু গভীরভাবে প্রভাবশালী এক ধরনের ভদ্রতা। মানুষ নিজের নাম শুনলে স্বাভাবিকভাবেই আলাদা গুরুত্ব অনুভব করে। নাম ধরে ডাকলে যেন নীরবে বলা হয়—আপনি আমার কাছে অচেনা নন, আপনাকে আমি লক্ষ্য করি। এই ছোট্ট আচরণটাই সম্পর্কের দূরত্ব কমিয়ে আনে। শুধু সহকর্মী বা প্রতিবেশীর নাম নয়, তাঁদের সন্তান বা পোষা প্রাণীর নাম জানলেও মানুষের মনে ভালো লাগা তৈরি হয়। এতে বোঝা যায়, আপনি কেবল সৌজন্যের জন্য নয়, সত্যিই আগ্রহ নিয়ে তাদের জীবনটা দেখছেন। আমার অভিজ্ঞতায়, নাম মনে রাখার এই অভ্যাস মানুষকে দ্রুত কাছের করে তোলে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য ইতিবাচক ছাপ রেখে যায়।৮. আপনার চেয়ে যাঁরা আলাদা, তাঁদের জন্য জায়গা রাখুনরাজনৈতিক বা অন্য মতের পার্থক্যের কারণে সবাইকে এড়িয়ে চলতে হবে—এমন নয়। চাইলে সেতু তৈরি করা যায়। এটা সহজ নয়, তাই এ প্রসঙ্গে সাইমন-টমাসের মত, ‘এটিই ভদ্রতার সবচেয়ে উন্নত স্তর।’ অর্থাৎ যাঁর সঙ্গে আপনার মতের মিল নেই, তাঁর সঙ্গে আপনি কেমন ব্যবহার করছেন, সেটিই আদতে প্রমাণ করে আপনি মানুষ হিসেবে কেমন। প্রথমে মিল আছে—এমন বিষয় নিয়ে সুন্দরভাবে কথা বলুন। এতে মতবিরোধ অস্বীকার করা হয় না, বরং ভবিষ্যতে গঠনমূলক আলোচনার ভিত্তি তৈরি হয়। মতভেদ থাকতেই পারে। একই বিশ্বাস না থাকলেও একসঙ্গে সময় উপভোগ করা সম্ভব। সাইমন টমাস বলেন, ‘জোর করে কাউকে এক ঘরে ঢোকানো ঠিক নয়। কিন্তু মানুষ চাইলে একটু থেমে, নিজের বিশ্বাসকে সম্মান করেও ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও উদারতা দেখাতে পারে।’ সূত্র: টাইমডটকম  এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

সম্পর্ক মজবুত করতে পছন্দের মানুষ হওয়ার ৮ উপায়