ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

নির্বাচনী প্রচারে কেন উপেক্ষিত মৌলিক ইস্যু

নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রচার এখন তুঙ্গে। একে অপরকে আক্রমণ করছে, সমালোচনা করছে তীব্র ভাষায়। অনেক সময় এসব সমালোচনা হচ্ছে আক্রমণাত্মক। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারের কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা প্রচারে অন্তত ৫০ শতাংশ সময় ব্যয় করেছেন অতীত নিয়ে আলোচনায়।এক পক্ষ অন্য পক্ষকে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করছে। তাদের ’৭১ ভূমিকাকে সমালোচনার প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে। আরেক পক্ষের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতি নিয়ে। তারা অপর পক্ষকে ঘায়েল করতে চাইছে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি আর চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে।সবই অতীত ঘেঁটে সমালোচনা। সেই পুরনো বৃত্তেই বন্দি যেন বাংলাদেশের রাজনীতি।নির্বাচনী প্রচারে আরেকটি আলোচিত ইস্যু হলো, নারীর অধিকার। এ নিয়েও চলছে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ।এর বাইরে বেকারত্বের অবসান ঘটানোর আশ্বাস দিচ্ছে প্রধান দুই দলই। বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের অঙ্গীকার করা হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার সংকল্পের বাণী শোনাচ্ছে সব দলই। কিন্তু এসব দাবি নির্বাচনে সব দলই সবসময় করে। এবারের নির্বাচন হচ্ছে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা থেকে।একটি নতুন বাস্তবতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। এ দেশের জনগণ নতুন রাজনীতি চায়, নতুন কথা শুনতে চায়। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারে নতুনত্ব নেই। নেই অনেক প্রশ্নের উত্তর। সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে খুব কম। প্রধান দুই দলের নির্বাচনী আশ্বাসে নেই দেশের মৌলিক সমস্যা সমাধানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।একটি নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ। বিএনপি এবং জামায়াত, দুই দলেরই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মুখ্য বিষয় হলো কর্মসংস্থান। দুই দলই নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলছে। বিএনপি বাড়তি ফ্যামিলি কার্ডের ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত, এ ধরনের কার্ডের তীব্র সমালোচনা করছে। কিন্তু বেকারত্ব দূর করা বা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দরকার টাকা। অর্থনৈতিক পরিকাঠামো সঠিক না হলে টাকা আসবে কীভাবে? কর্মসংস্থান হবে কেমন করে?বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৪ ভাগই আসে বেসরকারি খাত থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক শিল্প কারখানা আগুন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় বহু শিল্প কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন মালিকরা। মবের শিকার হয়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা, তাদের দোসর বানিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে অনেকে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ রেখেছেন। ঢালাওভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে বেসরকারি খাতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে এক বৈরী পরিবেশ। তার ওপর চলছে নীরব চাঁদাবাজি। ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, আগে যেখানে ১ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হতো, এখন দিতে হয়, ১০ লাখ টাকা। বেসরকারি উদ্যোক্তারা হাত-পা গুটিয়ে অপেক্ষায় আছেন। অন্তর্র্বর্তী সরকারের বেসরকারি খাতে সমস্যা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশি-বিদেশি অনেক বিনিয়োগকারীই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখে ‘অপেক্ষা করো-দেখো’ নীতি অনুসরণ করছেন। এই পরিস্থিতিতে শিল্প উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলগুলোর আগামীর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা শুনতে চান ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এক্ষেত্রে এখনো কোনো আশার বাণী আসেনি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে।বাংলাদেশের জন্য এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো আমাদের বৈদেশিক নীতি। গত ১৮ মাসে বাংলাদেশের কূটনীতিতে অনেকগুলো নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। এটা কেবল অমর্যাদাকর নয়, বাংলাদেশের জনগণের জন্য হতাশাজনক। রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও বাংলাদেশ এখন পরিকল্পনাহীন। নতুন সরকারের জন্য তাই একটি কার্যকর কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সেটা কী?সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতি যেমন দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানও নানা প্রশ্ন ও চাপে পড়েছে। ফলে নির্বাচনের পর নতুন সরকারের জন্য পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি হবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও কূটনৈতিক মর্যাদার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এ সম্পর্কে জনগণকে বিস্তারিত জানানো উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারে এসব বিষয় উপেক্ষিত।বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক-সব ক্ষেত্রেই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী শক্তি। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান বাজার। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি যদি কোনো এক পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তাহলে অন্য পক্ষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।নির্বাচনী প্রচারে এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলই সুনির্দিষ্টভাবে বৈদেশিক নীতির পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা জাতির কাছে তুলে ধরেনি। যেমন-ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে?রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে তাদের পরিকল্পনা কী?বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যে বাংলাদেশকে ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে, এ নিয়ে তারা কী করবে?জনশক্তি রপ্তানির কূটনীতি কী হবে? -ইত্যাদি বিষয়গুলো নির্বাচনী প্রচারে উপেক্ষিত।বাংলাদেশের জনগণ জানতে চায়, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে মব সন্ত্রাস কীভাবে বন্ধ করবে, তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার। হাজার হাজার মিথ্যা মামলার ব্যাপারে তাদের অবস্থান কী? এসব মামলা দিয়ে হয়রানি কি অব্যাহত থাকবে না বন্ধ হবে।জনগণ জানতে চায়, শিক্ষাঙ্গনে কি শান্তি ফেরবে? নতুন সরকার কি শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কক্ষে ফেরাতে পারবে? বিদেশি কম্পানির হাতে চট্টগ্রাম বন্দর তুলে দেওয়া নিয়ে চলছে আন্দোলন। চট্টগ্রাম বন্দরে এখন অচলাবস্থা বিরাজ করছে। কোনো রাজনৈতিক দলের এ নিয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নেই কেন?অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় বেলায় যেসব গোপন এবং প্রকাশ্য চুক্তি করছে রাজনৈতিক দলগুলোর এসব চুক্তির ব্যপারে অবস্থান কী? অন্তর্র্বর্তী সরকারের তড়িঘড়ি করে করা বিভিন্ন সামরিক চুক্তি কি রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় এলে বহাল রাখবে? নির্বাচনী প্রচারে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। কারণ এসব প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে আগামীর বাংলাদেশের পথ নকশা।সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন। এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

নির্বাচনী প্রচারে কেন উপেক্ষিত মৌলিক ইস্যু