ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

মুসলিম শিশুদের নামাজ ও ইবাদত সংক্রান্ত জরুরি কিছু মাসআলা

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে কিছু মাসআলার প্রয়োগ দেখা যায়। অনেক সময় বড়রা শিশুদের নামাজের কাতার থেকে সরিয়ে পেছনে পাঠিয়ে দেন, যা তাদের মনে মসজিদের প্রতি অনিচ্ছা তৈরি করে। শরিয়তের বিধান হলো, শিশুরা নামাজের নিয়ম বুঝলে তাদের বড়দের কাতারেই জায়গা দেওয়া উচিত।কোনো শিশু যদি নামাজের প্রাথমিক নিয়মাবলি বোঝে, তবে তাকে কাতার থেকে বের না করে বড়দের মাঝেই জায়গা দেওয়া। এতে তারা বড়দের দেখে ইবাদতের প্রতি আগ্রহী ও সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। মূলত সঠিক জ্ঞানের অভাবের কারণেই শিশুদের মসজিদের প্রতি অনিচ্ছা তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদী ধর্মীয় বিকাশে তাদের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।আজকের এই প্রতিবেদনে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো—কিবলার দিক করে ইস্তেঞ্জা করানো: কিবলার দিকে মুখ করে কিংবা পিঠ করে মলমূত্র ত্যাগ করার বিষয়ে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এতে কিবলার অসম্মান করা হয়। ফিকহবিদরা একে মাকরুহ বলেছেন। এ ক্ষেত্রে একটি ভ্রান্তি এই দেখা দেয় যে অনেকেই এ হুকুম শুধু বড়দের জন্য নির্ধারিত মনে করেন। তাই শিশুদের মলমূত্র ত্যাগ করার সময় এ বিষয়ে লক্ষ রাখেন না। আসল কথা হচ্ছে, তাকে ওইভাবে যিনি ইস্তেঞ্জা করাবেন তিনি দোষী হবেন। (রদ্দুল মুহতার ১/৬৫৫)কিবলার দিকে পা করে শোয়ানো: কিবলার দিকে পা করে না শোয়ার বিধান শুধু বড়দের জন্য মনে করা হয়। ফলে ছোট বাচ্চাদের নির্দ্বিধায় কিবলার দিকে পা দিয়ে শোয়াতে দেখা যায়। এটা ঠিক নয়। এভাবে শোয়ালে যিনি শোয়ালেন ত্রুটি তাঁর। (রদ্দুল মুহতার ১/৬৫৫)স্বর্ণ ও মেহেদির ব্যবহার: পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার করা হারাম। আর চুল-দাড়ি ছাড়া অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মেহেদি লাগানো জায়েজ নয়। অনেকে মনে করেন, এ বিধান শুধু বড়দের জন্য। তাই নাবালেগ বাচ্চাদের স্বর্ণের আংটি পরানো, মেহেদি লাগানোকে দোষের মনে করা হয় না। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ছেলেশিশুদের জন্যও স্বর্ণ ব্যবহার করা, মেহেদি লাগানো নিষিদ্ধ। (ফাতাওয়া শামি ৬/৩৬২)কোরআন মাজিদ স্পর্শ করার ক্ষেত্রে পবিত্রতা বিষয়ে অবহেলা: শিশুর কষ্টের দিকে লক্ষ করে হিফজ ও কোরআন-শিক্ষার্থী শিশুদের অজুর ব্যাপারে শিথিলতার কথা কিতাবাদিতে পাওয়া যায়। কিন্তু অনেকে এ মাসআলার ওপর ব্যাপকতার ভিত্তিতে আমল করতে গিয়ে শিশুদের পবিত্রতার বিষয়ে মোটেও গুরুত্ব দেয় না। এটা ঠিক নয়। বরং কোরআনের সম্মান ও আদবের দাবি হলো, যে শিশু বুঝমান, সে বালেগ না হলেও তাকে অজুর সঙ্গেই কোরআন স্পর্শ করার ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে। শিশুদের এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা বড়দেরই দায়িত্ব। (জামিউ আহকামিসি্সগার ১/৩৪)শিশুদের প্রস্রাব নিয়ে ভ্রান্তি ও বিড়ম্বনা: কেউ কেউ মনে করে যে বাচ্চা যত দিন দুধ পান করবে তত দিন তার প্রস্রাব নাপাক নয়। কারণ যত দিন শুধু দুধ পান করে তত দিন বাচ্চার প্রস্রাব বেশি দুর্গন্ধ হয় না। এ ধারণা ভুল। হাদিস শরিফে এ ধরনের শিশুর প্রস্রাবও যে নাপাক তার বর্ণনা রয়েছে। আর প্রস্রাব দুর্গন্ধময় হোক বা না হোক সর্বাবস্থায় তা নাপাক। দুর্গন্ধ না হলে নাপাক হবে না এ ধারণা ভুল। (সহিহ বুখারি ১/৩৫; জামে তিরমিজি ১/২১)দুধের শিশুর বমি নিয়ে ভ্রান্তি: অনেকে দুধের শিশুর বমিকে নাপাক মনে করে না। বিশেষ করে দুধ পান করার পরক্ষণে যদি বমি করে আর ওই বমি দুর্গন্ধযুক্ত না হয়, তাহলে ওই বমিকে নাপাক মনে করা হয় না। এটা সম্পূর্ণ ভুল। এ ব্যাপারে সঠিক মাসআলা হলো, শিশুর দুধবমির হুকুম বড়দের বমির মতোই। মুখভরে বমি হলে সেই বমি নাপাক। চাই দুধপানের পরক্ষণেই বমি করুক বা পরে, বমি দুর্গন্ধযুক্ত হোক বা না হোক। আর মুখভরে না হলে ওই বমি নাপাক নয়। (আদ্দুররুল মুখতার  ১/১৩৮; রদ্দুল মুহতার ১/১৩৮)অল্প বমিকেও নাপাক মনে করা: অনেকে শিশুর অল্প বমিকেও নাপাক মনে করে। কাপড়ে-শরীরে লাগলে তা নাপাক হয়ে গেছে, ভাবে। অথচ অল্প বমি নাপাক নয়। বমি যতই দুর্গন্ধপূর্ণ হোক না কেন। সুতরাং ওই বমি কোনো কিছুতে লাগলে সেটি নাপাক হবে না। (আদ্দুররুল মুখতার ১/১৪০; সিয়ায়া ১/২২১)শিশুর পোশাক নিয়ে ভ্রান্তি : তিন-চার বছর বয়সী শিশুর ওপর সতরের বিষয় নেই ঠিকই, কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন ছাড়াও তাদের উলঙ্গ করে রাখতে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে। হ্যাঁ, এক-দেড় বছর বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এতে তেমন একটা দোষ নেই। কিন্তু এর চেয়ে বেশি বয়সী বাচ্চার প্রয়োজন ছাড়া সতর খুলে রাখা ঠিক নয়। আর বাচ্চার বয়স চার বা তার বেশি হলে তার সামনে ও পেছনের সতরের অংশ ঢেকে রাখা জরুরি। এ বয়সের পরও তাদের সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন রাখা গুনাহ। এরপর বাচ্চার শারীরিক গড়ন স্পষ্ট হয়ে উঠছে এমন বয়সে উপনীত হলে সতরসহ আশপাশের অঙ্গ যথা ঊরু ইত্যাদি ঢেকে রাখা জরুরি। এ বয়স থেকেই বাচ্চাকে পূর্ণ পোশাক, যথা পায়জামা পরানো ভালো। যেন সাত বছর থেকেই পূর্ণ পোশাকে শিশু অভ্যস্ত হয়ে যায়। আর ৯-১০ বছর থেকে বাচ্চার সতর বালেগদের মতোই, একই হুকুম। আজকাল ছয়-সাত বছর বয়সী বাচ্চাদের হাফপ্যান্ট পরানো হয়, যা আদৌ সমীচীন নয়। আর ৯-১০ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে তো হাফপ্যান্ট পরানো নাজায়েজ। (রদ্দুল মুহতার ১/৪০৭-৪০৮; ইলাউস্ সুনান ২/১৭১-১৭২)সাত বছর বয়স  হয়ে  যাওয়ার  পরও সন্তানের নামাজের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া : হাদিসের সুস্পষ্ট হুকুম—‘সন্তানের বয়স সাত  হলে তাদের নামাজের নির্দেশ দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী, নামাজের আদেশ দেওয়ার অন্তত তিন বছর আগে থেকেই শিশুকে প্রয়োজনীয় সুরা-কেরাত ও নিয়মাবলি শেখানো উচিত। এর উদ্দেশ্য হলো সাত বছর বয়সে পা রাখার আগেই যেন সে ইবাদতের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, দশ বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক শিশু শুদ্ধভাবে নামাজ পড়ার ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করে না। ১০ বছরেও সন্তানের নামাজ শুদ্ধ হওয়ার মতো সুরা-কিরাত অধিকাংশ পরিবারে শেখানো হয় না। অনেক পরিবারে শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পেছনে যতটা শ্রম দেওয়া হয়, নামাজের মতো মৌলিক ইবাদত শেখানোর ক্ষেত্রে ততটাই উদাসীনতা কাজ করে। এই অবহেলা মূলত আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি চরম গাফিলতিরই বহিঃপ্রকাশ।নাবালেগের পেছনে তারাবি নামাজ : নাবালেগের পেছনে বালেগের ইকতিদা সহিহ নয়। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে অনেক মসজিদে এবং ঘরে-বাড়িতে নাবালেগ হাফেজের পেছনে তারাবির নামাজ পড়া হয়। এতে বালেগদের তারাবি আদায় হয় না।অনেকে মনে করে, নাবালেগ হাফেজ বালেগ পুরুষদের ইমামতি না করতে পারলেও মহিলাদের ইমামতি করতে পারবে। তাই বাসাবাড়িতে নাবালেগ হাফেজদের নিয়ে তাদের পেছনে মহিলারা জামাত করে তারাবি পড়ে; অথচ নাবালেগের পেছনে বালেগদের ইকতিদা সহিহ নয়। চাই বালেগ পুরুষ হোক বা মহিলা উভয়ের একই হুকুম। (নাইলুল আওতার ১/২০১, মুসান্নাফ আব্দিররাজ্জাক ২/৩৯৮; বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৫৯, রদ্দুল মুহতার ১/৫৭৭)১০ বছর থেকে বালেগ হওয়ার নিকটবর্তী বয়স পর্যন্ত আমল বিছানা পৃথক না করা : সন্তানের বয়স ১০ বছর হয়ে গেলে তার শোয়ার জায়গা পৃথক করার ব্যাপারে হাদিসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এ বয়সের আগ থেকেই পৃথক শোয়ানোর জন্য বাচ্চাকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। যেন দশম বছরে পদার্পণ করলেই এ হুকুমের ওপর পরিপূর্ণ আমল করা যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, ইসলামের এ হুকুমটির ব্যাপারে অনেকেই ভ্রুক্ষেপ করে না। ১০ বছরেরও বেশি বয়সী ছেলে-মেয়েরা মা-বাবার সঙ্গেই ঘুমায়। কোনো মা-বাবা তাদের সঙ্গে নিজেদের বিছানা পৃথক করলেও ছেলে-মেয়েদের একত্রেই শোয়ায়। তাদের প্রত্যেকের ঘুমানোর ব্যবস্থা পৃথক করে না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫-৪৯৬; ফাতাওয়া শামি ৬/৩৮২)  এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

মুসলিম শিশুদের নামাজ ও ইবাদত সংক্রান্ত জরুরি কিছু মাসআলা