ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ৩০ জন। আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি উল্টে থাকা বাস, আর্তনাদ, ছোটাছুটি—সব মিলিয়ে আজ শুক্রবার দুপুরে দাউদকান্দির বানিয়াপাড়া এলাকা পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।এ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে মোটরসাইকেল আরোহী দাউদকান্দি উপজেলার পেন্নই গ্রামের মো. শামীম হোসেন (৩৮) ও তাঁর সাত বছর বয়সী ছেলে নাদিফ হোসেন। বাবা-ছেলে যাচ্ছিল পাশের বানিয়াপাড়া দরবার শরিফ মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নামাজের পথে যাত্রা বদলে গেল চিরবিদায়ের পথে। বাসের আরেকজন নিহত নারী যাত্রীর পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রামমুখী লেনে একটি যাত্রীবাহী বাস যাত্রীদের সঙ্গে চালকের বাগ্বিতণ্ডার পর বেপরোয়া গতিতে চলতে শুরু করে। একপর্যায়ে বাসটি একটি অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেলকে চাপা দেয়। ত্রিমুখী সংঘর্ষের পর বাসটি উল্টে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাসে।দাউদকান্দি হাইওয়ে থানা-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, বাসের আগুনে দগ্ধ হয়ে চারজন নিহত হয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে একজন নারী, একজন পুরুষ ও দুটি শিশু। আহত অবস্থায় অন্তত ৩০ জনকে উদ্ধার করে দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ কুমিল্লা ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মৃত্যু ১৬ মাস বয়সী শিশু হোসাইনের। সে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মাঝেরচর গ্রামের সুমন মিয়ার ছেলে। পরিবারের সঙ্গে বাসে করে কুমিল্লার দেবিদ্বারে আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছিল শিশুটি। কিন্তু পথেই থেমে গেল তার ছোট্ট জীবনের গল্প।নিহত শিশু হোসাইনের বাবা সুমন মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বাসটি বারবার বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছিল। যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে চালককে না দাঁড়াতে বললে তিনি রাগে গতি বাড়িয়ে দেন। এরপরই এ দুর্ঘটনা। তিনি জানান, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলকে চাপা দেওয়ার পর বাসটি উল্টে গিয়ে আগুন ধরে যায়।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পরপরই বাসে আগুন লাগলে যাত্রীরা বের হতে হুড়োহুড়ি শুরু করেন। অনেকেই ভেতরে আটকা পড়ে যান। আগুন আর ধোঁয়ার মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচিতে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। দাউদকান্দি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার মো. এরশাদ বলেন, বাসটির আগুন নিভিয়ে দগ্ধ অবস্থায় চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার এসআই সন্দ্বীপ সাহা বলেন, বাসটির অতিরিক্ত গতি ছিল। হার্ডব্রেকের কারণে বাসটি উল্টে গিয়ে সড়কের সঙ্গে ঘর্ষণে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। আহত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার বলেন, ঘটনাস্থল থেকে দুই শিশু, এক নারী ও এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর বানিয়াপাড়া থেকে গৌরিপুর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় যানজট সৃষ্টি হলেও পরে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। ঘাতক বাসচালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।এ দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের বেপরোয়া গতি, চালকের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং তদারকির ঘাটতি নিয়ে। প্রতিদিনই মহাসড়কে চলাচলকারী হাজারো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা যেন এক অনিশ্চিত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে রয়েছে। এমএইছ / ধ্রুবকণ্ঠ