সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় বোরো ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে ব্যাপক অনিয়ম, লুটপাটের আশঙ্কা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের কর্মচারীদের নজিরবিহীন খবরদারির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) পাশ কাটিয়ে প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন ইউএনও অফিসের নাজির ও অফিস সহকারী। এ বিষয়ে জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ইউএনও মো. বরকত উল্লাহর চরম অসহযোগিতা ও ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন জেলা থেকে যাওয়া সংবাদকর্মীরা।অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জগন্নাথপুরে ৩৭টি পিআইসির (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) মাধ্যমে ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৬ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা কমিটির সভাপতি ইউএনও এবং সচিব হলেন পাউবোর শাখা কর্মকর্তা। কারিগরি তদারকি ও বিলের চেক বিতরণের প্রধান দায়িত্ব পাউবোর হলেও জগন্নাথপুরে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।অভিযোগ উঠেছে, ইউএনও মো. বরকত উল্লাহর প্রশ্রয়ে তার কার্যালয়ের নাজির মো. মিজানুর রহমান এবং অফিস সহকারী লিটন পুরো প্রকল্পের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন। পিআইসি গঠন থেকে শুরু করে অনুমোদন এবং চূড়ান্ত বিলের চেক বিতরণ—সবই হচ্ছে এই দুই কর্মচারীর হাত দিয়ে। কারিগরি জ্ঞানহীন এই কর্মচারীদের হস্তক্ষেপে পাউবোর শাখা কর্মকর্তারা এখন ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছেন। এতে প্রকল্পের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।গত ৩ মার্চ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই অনিয়মের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর, প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে উপজেলা পরিষদে যান একদল সাংবাদিক। আনসার সদস্যের অনুমতি নিয়ে তারা ইউএনও-র কক্ষে প্রবেশ করে প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করেন। কিন্তু বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে সাংবাদিকদের পরিচয় পেয়ে ক্ষিপ্ত হন ইউএনও মো. বরকত উল্লাহ।তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে তাচ্ছিল্যের সুরে প্রশ্ন করেন, “আপনারা কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসেছেন? অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসতেন” সরকারি দপ্তরে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে এমন ‘কর্পোরেট সংস্কৃতি’ বা অ্যাপয়েন্টমেন্টের দোহাই দেওয়াকে তথ্য অধিকার আইনের পরিপন্থী বলে মনে করছেন সচেতন মহল।ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একজন সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন “আমরা পাহাড় সমান অনিয়মের তথ্য নিয়ে ইউএনও সাহেবের কাছে গিয়েছিলাম। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া। কিন্তু তিনি আমাদের বসিয়ে রেখে অপমান করেছেন এবং ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ এর অজুহাত তুলে পাশ কাটিয়ে গেছেন। যখন অফিসের পিয়ন আর নাজির কোটি টাকার চেক নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ইউএনও সাহেবের এই লুকোচুরি আচরণ প্রমাণ করে যে—ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। আমরা এই অপেশাদার আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই।”স্থানীয়দের দাবি, পাউবোকে সরিয়ে নাজির ও অফিস সহকারীকে দিয়ে চেক বিতরণ করানোর পেছনে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সচিবের (পাউবো কর্মকর্তা) মাধ্যমে চেক বিতরণ হওয়ার কথা থাকলেও ইউএনও-র এই দুই ‘খাস’ লোক কেন এটি নিয়ন্ত্রণ করছেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।এই বিষয়ে কথা বলতে ইউএনও মো. বরকত উল্লাহর সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি 'ফোন রিসিভ করেননি। তাই সাংবাদিকদের সাথে ঘটা ঘটনার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।বেড়িবাঁধের মতো স্পর্শকাতর প্রকল্পে এমন অনিয়ম এবং সাংবাদিকদের সাথে প্রশাসনিক কর্মকর্তার এই বৈরী আচরণ খুবই নিন্দনীয়। জেলার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করলে ফসলের নিরাপত্তা ও সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এনএম/ধ্রুবকন্ঠ