ইরানের সাথে আলোচনার সময় ফুরিয়ে আসছে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড
ট্রাম্প গতকাল শুক্রবার বলেছেন, ইরান মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের মুখোমুখি না হয়ে
বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইবে বলে তিনি আশা করছেন। যদিও তেহরান
আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার ও ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কখনোই
কোনো আলোচনা হবে না।শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটুকু বলতে পারি, তারা (ইরান) একটি চুক্তি করতে চায়।’ সম্প্রতি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বড় ধরনের উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে বুধবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময় ‘ফুরিয়ে আসছে’।ইরানের পারমাণবিক ও
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি কোনো সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন কি না,
এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি দিয়েছি।’ তবে সেই সময়সীমা ঠিক কবে, তা তিনি
প্রকাশ করতে রাজি হননি।ইরানের
জলসীমামুখী মার্কিন রণতরিবহরের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের একটি বিশাল
‘নৌবহর’ এখন ইরানের দিকে যাচ্ছে। আশা করি, আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব। যদি চুক্তি
হয়, তবে ভালো, আর না হলে কী হয়, তা দেখা যাবে।’পশ্চিমাভিত্তিক
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ইরানে সর্বশেষ বিক্ষোভে ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত
হয়েছেন। তবে ইরান সরকারের হিসাবমতে, বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ তিন
হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।তেহরান
কিছু বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটিকে
ট্রাম্প তেহরানের আলোচনার প্রস্তুতির প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।ওই
অঞ্চলের মার্কিন মিত্ররা উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, ইরানের ওপর যেকোনো মার্কিন হামলা
অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।ট্রাম্প
প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম
প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা আশা করি, যা–ই ঘটুক না কেন, তা যেন স্থিতিশীলতা
বয়ে আনে। ইরানিরা সঠিক কাজটি করলে এই ফলাফল অর্জন সম্ভব এবং আমরা সেটিই আশা করছি।’ইরানের
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি মস্কোতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট
ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করেছেন। আলোচনার বিস্তারিত জানা না গেলেও মস্কো
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে।তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার সূচি নির্ধারিত নেই। তবু ‘পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে’ আলোচনার জন্য ইরান প্রস্তুত আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।ইস্তাম্বুলে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে আরাগচি বলেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কখনোই আলোচনার টেবিলে আসবে না।’ তিনি দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।এদিকে ক্রেমলিন জানিয়েছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি। রুশ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তি জানায়, বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে।আলোচনার
শর্ত ও বাধাইরানের
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেপণাস্ত্র
ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে ‘কখনোই’ আলোচনার টেবিলে বসা হবে না। তেহরান সমমর্যাদার
ভিত্তিতে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত থাকলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো
পরিকল্পনা বর্তমানে নেই।মার্কিন
সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, ওয়াশিংটন এমন একটি চুক্তি চাইছে, যেখানে
ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সীমাবদ্ধতা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে
নেওয়া এবং নিজেরা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করার শর্ত থাকবে।তবে
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুকে যুক্ত করা
প্রায় অসম্ভব। কারণ, এটি ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি।উত্তেজনা প্রশমনইরান
সতর্ক করে বলেছে, আক্রান্ত হলে তারা তাৎক্ষণিক মার্কিন ঘাঁটি, জাহাজ ও তাদের
মিত্রদেশগুলোর (বিশেষ করে ইসরায়েল) ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে।ইরানের
প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান আলি শামখানি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের লড়াইকে শুধু
সমুদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি না। আরও বড় পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত
করেছি।’ ইস্তাম্বুলে আরাগচির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হাকান ফিদান বলেন, ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করছে ইসরায়েল। তিনি
ওয়াশিংটনকে এই পথে না যাওয়ার আহ্বান জানান। অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে ডিসেম্বরের শেষ
দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের জন্য ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএনএ) দাবি করেছে, গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে পাওয়া আরও প্রায় ১৭ হাজার মৃত্যুর খবর তারা যাচাই করছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।নরওয়েভিত্তিক সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস সতর্ক করে বলেছে, চূড়ান্ত মৃতের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইরান সরকার বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া দেয়নি। বরাবরের মতোই তারা বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি অস্ত্র তৈরির জন্য নয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
এমএইছ / ধ্রুবকন্ঠ