ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যায় এআই ব্যবহারে কঠোর সতর্কতা

আজকের যুগে আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। তবে ইসলামের পবিত্র কোরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ওপর ভরসা করা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, কোরআনের আয়াতের অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ঘাটন কিংবা শরীয়তের সূক্ষ্ম বিধান নির্ধারণে সরাসরি এআই-এর সাহায্য নেওয়া মোটেও নিরাপদ নয়। তাঁদের মতে, কেবল প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে পবিত্র কালামের অর্থ বের করা ইসলামি নীতিমালায় বৈধ হতে পারে না। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল বিশ্লেষণের ফলে কোরআনের অপব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ার এবং ধর্মের ভুল চিত্র ফুটে ওঠার এক ভয়াবহ ঝুঁকি থেকে যায়।মানুষের জ্ঞান বনাম এআই জ্ঞানপবিত্র কোরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা প্রদান করা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এটি মূলত অত্যন্ত গভীর এবং উচ্চতর আলেমদের কাজ। এই দায়িত্ব পালনের জন্য ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার ওপর পূর্ণ দখল থাকা আবশ্যক, কারণ তাফসিরের প্রতিটি বিষয়ই শাস্ত্রীয় বিভিন্ন জ্ঞানের সাথে গভীরভাবে জড়িত।মিসরের ফতোয়াবিষয়ক সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘দার আল-ইফতা আল-মিসরিয়াহ’-এর অফিশিয়াল বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে কোরআনের সঠিক মর্ম অনুধাবনের জন্য নির্ধারিত কিছু স্বীকৃত যোগ্যতা ও পদ্ধতির প্রয়োজন। একজন মুফাসসির বা ব্যাখ্যাকারীকে আরবি ভাষা, ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), অলংকারশাস্ত্র (বালাগাত), হাদিস শাস্ত্র এবং ফিকাহ বা আইনশাস্ত্রের গভীর জ্ঞান রাখতে হয়।কিন্তু একটি এআই মডেল কেবল ইন্টারনেটে থাকা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শব্দ সাজায়। তার কোনো আধ্যাত্মিক সচেতনতা বা শরিয়াহর সূক্ষ্ম প্যাঁচগুলো বোঝার ক্ষমতা নেই। ফলে এআই যখন কোনো আয়াতের ব্যাখ্যা দেয়, তখন তা অনুমাননির্ভর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতভাগ।এ প্রসঙ্গে কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এগুলোর প্রতিটি সম্পর্কেই তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)অনুমান ও বিকৃতির ঝুঁকিগ্র্যান্ড মুফতি সতর্ক করে বলেছেন, বিশেষজ্ঞের যাচাই ছাড়া কোরআনের আয়াতের অর্থ নির্ধারণ করা ঐশ্বরিক বাণীর পবিত্রতা ও মর্যাদা নষ্ট করে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহের ফলে অনেক অনির্ভরযোগ্য ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে। এআই যদি ভুল উৎস থেকে তথ্য নিয়ে কোরআনের অর্থ প্রদান করে, তবে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে।ইসলামি জ্ঞানার্জনের মূল ভিত্তি হলো ‘সনদ’ বা নির্ভরযোগ্য পরম্পরা। যুগ যুগ ধরে আলেমরা এক প্রজন্মের কাছ থেকে অন্য প্রজন্মে এই জ্ঞান নির্ভুলভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। (আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন, জালালুদ্দিন সুয়ুতি, ২/২৫০)এআইয়ের ক্ষেত্রে এই নির্ভরযোগ্যতার শৃঙ্খল অনুপস্থিত।নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি কোনটিকোরআনের কোনো আয়াতের মূল ভাব বুঝতে চাইলে স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোর সাহায্য নিতে হবে। এ ছাড়া কোনো বিষয়ে সন্দেহ বা জিজ্ঞাসার উদয় হলে সরাসরি আলেমদের সঙ্গে অথবা স্বীকৃত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা এই পদ্ধতির কথাই নির্দেশ করেছেন, ‘সুতরাং তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞাসা করো।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৩)আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের শেখার কাজে সাহায্য করতে পারে—যেমন শব্দার্থ খোঁজা বা আয়াতের দ্রুত তল্লাশি চালানো। কিন্তু যখনই ব্যাখ্যা বা কোনো জটিল বিধানের প্রশ্ন আসবে, তখন এই প্রযুক্তি কখনোই একজন যোগ্য আলেমের বিকল্প হতে পারবে না।প্রযুক্তির ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে তার একটি যুক্তিশীল সুনির্দিষ্ট সীমা থাকা জরুরি। পবিত্র কোরআনের অর্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজন বিনয়, শৃঙ্খলা এবং বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত বিশুদ্ধ জ্ঞানের ওপর নির্ভরতা। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে টুল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু একে শিক্ষক বা ব্যাখ্যা প্রদানকারী হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক।আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি না জেনে কোরআন সম্পর্কে নিজের রায় বা মত প্রদান করে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২,৯৫১)প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগেও আমাদের শিকড়ের দিকে তাকাতে হবে এবং পবিত্র কোরআনের সঠিক দিশা পেতে নির্ভরযোগ্য আলেম ও প্রামাণ্য কিতাবগুলোর দ্বারস্থ হতে হবে।ইসলামি গবেষণায় এআই কতটা কার্যকরচাকা, ছাপাখানা বা ইন্টারনেটের উদ্ভাবন একটা সময় বিশ্বজুড়ে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। মানুষের চিন্তা-চেতনা আর যোগাযোগের মাধ্যমকে বদলে দিয়েছিল আমূল। ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের মতো ইসলামি বিশ্বও এসব প্রযুক্তির বাইরে থাকেনি। প্রতিটি নতুন প্রযুক্তিই পুরনো ব্যবস্থা বা তত্ত্বকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে।তবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এআই-এর এই বর্তমান গতির তুলনায় অতীতের প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোকে এখন শান্ত নদীর মতোই মনে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইসলামি আইন ও জীবনযাত্রাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আইন বিশেষজ্ঞ, ধর্মীয় নেতা, গবেষক থেকে শুরু করে প্রকৌশলী ও সরকারগুলো এখন সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো— এআই-এর বর্তমান সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে ইসলামি আইনের চর্চা ও গবেষণায় কী ধরনের গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে তা খতিয়ে দেখা।এআইর বর্তমান প্রভাব ও সীমাবদ্ধতাবর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাগুলো ইসলাম বা আরবি ভাষার গভীর জ্ঞান সম্পন্ন প্রকৌশলীদের তৈরি করা নয়। যার ফলে, যখন ইসলাম বা ইসলামি আইন সম্পর্কিত প্রশ্ন করা হয়, তখন এইআই’র উত্তর হয় হয়তো খুবই সীমিত বা অতিরঞ্জিত।দেখা যায়, হয় ইসলামি আইনের প্রসঙ্গ উপেক্ষা করে কেবল পশ্চিমা আইন (যেমন মার্কিন, ইউরোপীয়, চীনা বা লাতিন আমেরিকার আইন) সম্পর্কে তথ্য প্রদান করছে; অথচ ইসলামি আইন ১.৬ বিলিয়নের বেশি মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং ১৪০০ বছরের ইতিহাস ধারণ করে রেখেছে। অথবা অনেক সময় এমন উত্তর দেয় যা বাস্তবতার সঙ্গে যৌক্তিক নয়।কেন এআই যথাযথ উত্তর দিতে পারছে নাএর বড় কারণ হলো, ইসলামি আইনের প্রাচীন ও ক্ল্যাসিক্যাল গ্রন্থগুলো এখনো ডিজিটাল রূপে সহজলভ্য নয়। এআই সাধারণত অনলাইনে থাকা তথ্য বিশ্লেষণ করে উত্তর তৈরি করে, কিন্তু ইসলামি জ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো ডিজিটালাইজড হয়নি বা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর অগ্রাধিকার পায়নি।ফলে, এআই এখনো ইসলামি আইন গবেষণায় নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে ওঠেনি। তবে ভবিষ্যতে যদি ইসলামি জ্ঞানের তথ্যভান্ডার উন্নত করা যায়, তাহলে এআই ইসলামি আইনের গবেষণা, ফতোয়া প্রদান ও আইনি বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।গবেষকেরা কি এআই ব্যবহার করবেন নাতাহলে কি ইসলামি আইন নিয়ে গবেষণা করতে আগ্রহীরা এআই পরিবর্তে বই ব্যবহার করবেন, যেমন একসময় মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ চাকার পরিবর্তে উট ব্যবহার করেছিল? একদম না। আমরা মনে করি না যে, গবেষকেরা সম্পূর্ণভাবে এআই পরিত্যাগ করবেন বা সব সময় কেবল বইয়ের ওপর নির্ভর করবেন।তবে, এআইকে ইসলামি বইয়ের জ্ঞান উন্মোচন করতে ব্যবহার করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। অর্থাৎ, ইসলামের প্রাচীন ও ক্ল্যাসিক্যাল গ্রন্থগুলো খুঁজে বের করে ডিজিটালাইজ করা, সেগুলো এমন ফরম্যাটে রূপান্তর করা যাতে বড় ভাষা মডেল (এলএলএম) সহজে ব্যবহার করতে পারে এবং এআইর ফলাফল আরও প্রাসঙ্গিক ও নির্ভরযোগ্য হয়। যদি এআই সত্যিই একটি সর্বজনীন জ্ঞানভান্ডার হতে চায়, যা অর্থবহ, কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বমূলক, তাহলে এটিকে ইসলামি গ্রন্থ ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া জরুরি।ক্ল্যাসিক জ্ঞান ডিজিটালাইজড করার চ্যালেঞ্জএআইর বর্তমান মডেলগুলো ইসলামি আইন গবেষণায় সমস্যায় পড়ে মূলত প্রয়োজনীয় উৎসগুলোর অভাবে। তাই, এআইর নির্ভরযোগ্যতা ও নির্ভুলতা বাড়ানোর প্রথম ধাপ হলো ক্ল্যাসিক্যাল ইসলামি আইন গ্রন্থগুলো ডিজিটালাইজ করা ও সেগুলোকে এআইর প্রশিক্ষণ ডাটাসেটে অন্তর্ভুক্ত করা। প্রধান সমস্যা হলো উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ডেটা প্রস্তুত করা। এ ক্ষেত্রে তিনটি চ্যালেঞ্জ আছে :১. আরবি ভাষার বিভিন্ন উপভাষা ও শৈলী থাকায় এআই সহজে বোঝে না।২. ইসলামি পাণ্ডুলিপি ডিজিটাল করণের ক্ষেত্রে অসংখ্য ত্রুটি হয়।৩. ওসিআর দুর্বলতার কারণে বেশির ভাগ সফটওয়্যার ক্ল্যাসিক্যাল আরবি বইগুলোকে সঠিকভাবে ডিজিটাল টেক্সটে রূপান্তর করতে পারে না।যা করণীয়ইসলামি গবেষণার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আরও ব্যাপক উন্নয়ন। বিশেষ করে, এআই-কে প্রশিক্ষিত করতে নির্ভরযোগ্য ইসলামি গ্রন্থগুলোর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং এর জটিল প্রেক্ষাপট বোঝানোর জন্য ইসলামি বিশেষজ্ঞদের সরাসরি তত্ত্বাবধান এখন সময়ের দাবি।যদিও ওপেনআইটিআই (OpenITI) এবং উসুল ডট এআই (usul.ai)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, তবে ইসলামি শাস্ত্রের গভীর প্রাসঙ্গিকতা বোঝার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি এআই-কে সঠিকভাবে ইসলামি গবেষণার উপযোগী করে তোলা যায়, তবে এটি ইসলামি আইনের ইতিহাস ও পর্যালোচনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তিবিদ, ইতিহাসবিদ এবং ইসলামি চিন্তাবিদদের সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।সূত্র: ইসলামিক ল ডট ব্লগ এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যায় এআই ব্যবহারে কঠোর সতর্কতা