এমআইটির গবেষণায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিটা ক্ষেত্রে অনেক প্রভাব ফেলছে, তার
মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে চাকরির ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মানবসম্পদ কর্মকর্তারা সিএনবিসির এক জরিপ থেকে জানা যায়,
পরবর্তী বছরে প্রায় ৮৯ শতাংশ চাকরিতে এআইয়ের প্রভাব পড়বে।উক্ত জরিপের অংশ হতে আরও জানা যায়, এআই চাকরির ক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান
এখনো এআইয়ের সম্পূর্ণ ব্যবহার শুরু করেনি।জরিপে অংশ নেওয়া শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে
করেন, এখনো সম্পূর্ণ বলা সম্ভব নয়, কতটা চাকরিতে প্রকৃত প্রভাব পড়বে। তবে চাকরির ধরন
ও অবকাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার শঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে সকল একঘেয়ে কাজ, এখন এআই দ্বারা সম্পন্ন হচ্ছে এবং কর্মীরা
বেশি সৃজনশীল ও কৌশলগত কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন।যুক্তরাষ্ট্রের সিএনবিসির তথ্য অনুযায়ী, এআই ব্যবহার করার মাধ্যমে গড়ে প্রায় ৭ দশমিক ৫ ঘণ্টা প্রতি সপ্তাহে
সময় বাঁচানো যাবে। এআইের সহায়তায় কাজের গুণগত মান বজায় রেখে সময় সাশ্রয় করা সম্ভব। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ অফিস, কল সেন্টার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে
বিশেষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।তবে জরিপের
প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা যায়, পরবর্তী বছরগুলোতে অনেক প্রতিষ্ঠান হতে কর্মী ছাঁটাই
করতে পারে। এর মুল কারণ প্রতিষ্ঠানের খরচ নিয়ন্ত্রণ। এআই দক্ষতা বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি চাকরি হ্রাসের কারণ হিসেবে দায়ী হবে
না এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। ৬১ শতাংশ কর্মকর্তারা মনে করেন, এআই
ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ ও উৎপাদনশীল করা হচ্ছে। আর ৭৮ শতাংশ কর্মকর্তারা
মনে করেন, এআই তাঁদের প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি করছে।চাকরির বাজারে
নিয়োগের প্রক্রিয়া পরিবর্তন হচ্ছে। আগের মতো শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ডিগ্রির ওপর
চাকরি নির্ভর করা হবে না। জরিপের এক কর্মকর্তা তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে
চাকরি পাওয়া শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ডিগ্রির ওপর নির্ভর করবে না। এআই দক্ষতার মাধ্যমে
নিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে।সারাবিশ্বে
এআই দক্ষতার মাধ্যমে কর্মীদের সৃজনশীলতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি শুধুমাত্র
সময় বাঁচাবে না, বরং নতুন ধরনের উদ্ভাবন বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়। তথ্যপ্রযুক্তি,
মিডিয়া, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে কল সেন্টার ও তৈরি পোশাক খাতগুলোতে এআইয়ের প্রয়োগ
আগের তুলনায় অনেক উন্নত হচ্ছে। যদি সকল প্রতিষ্ঠান এআইকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে
পারে, তাহলে কর্মীদের কাজের চাপ কমে, সৃজনশীল কাজের জন্য আরও সময় বের করা সম্ভব।বিশেষজ্ঞদের
তথ্য অনুসারে, এআই কেবল মানুষের কর্মস্থল কেড়ে নেওয়ার প্রযুক্তি নয়, বরং মানুষের কাজকে আরও আরামদায়ক
করার উপায়। বাংলাদেশেও পর্যায়ক্রমে চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দেশের চাকরিপ্রার্থী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি অনেক
চ্যালেঞ্জিং বিষয়। সরকার ও সকল প্রতিষ্ঠান গুলোকে নীতি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা
উন্নয়নের মাধ্যমে এর প্রস্তুতি নিতে হবে। ভবিষ্যতে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র
শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, এর পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহার, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীলতার মাপকাঠি
গুরুত্ব পাবে।সিএনবিসির বিশেষজ্ঞদের
মতে, এ ধরনের প্রস্তুতি ভবিষ্যতে কর্মীদের কর্মজীবনে স্থায়িত্ব দেবে এবং এআইয়ের
পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে। পর্যায়ক্রমে এআই বিশ্বজুড়ে এবং
বাংলাদেশে চাকরির চালচিত্র পরিবর্তন করে দিচ্ছে, নতুন দক্ষতা ও উদ্ভাবনের পথ
খুলছে।বর্তমানে অর্থনৈতিক
দিক থেকে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন
মানুষ চ্যাটজিপিটির মতো এআই ব্যবহার করেন। অসংখ্য কর্মী
তাদের কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের সহায়তা নিচ্ছে। তবে এখনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এআই ব্যবহারের
প্রবণতা কম।যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২৫০ বা তার বেশি কর্মী নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ১০ শতাংশ তাদের
উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এআই ব্যবহার করেছে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গত জুলাইের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে এআইয়ের উদ্যোগে কোনো আর্থিক লাভ এনে দিতে পারেনি।প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এআই গ্রহণ করে, তবে তা বিনিয়োগকারীদের
ভরসা দিতে পারলে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করা সম্ভব। বর্তমানে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো ভার্চুয়াল ‘এজেন্ট’ তৈরি করছে, যারা মানুষের মতো একের পর এক কাজ মানুষের সাহায্য ছাড়াই করতে পারে কম খরচে ও দিনরাত ২৪ ঘণ্টা। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ আর্টিজান বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, ‘মানুষ নিয়োগ বন্ধ করুন’। বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের বার্তা এআইকে চাকরি কেড়ে নেওয়া প্রযুক্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও বাড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক পাস সকল বেকাররা এখন এআইকে দায়ী করছেন। ইয়েল বাজেট ল্যাবসহ কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায়, এআই এখনো শ্রমবাজারে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেনি এবং এআইনির্ভর খাতে অন্য খাতের তুলনায় বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।বর্তমানে
এআই কন্টেন্ট তৈরি, ডেটা ব্যবস্থাপনার মতো কাজগুলো করছে
এবং মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত কন্টেন্ট তৈরি করে দিতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে লেখক, সম্পাদক, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার, ডেটা এন্ট্রি স্পেশালিস্ট এমনকি বেসিক গ্রাফিক ডিজাইনারদেরও চাকরি হারানোর আশঙ্কার আছে। এআই নির্ভরতার পর থেকেই মানুষের বিচারবুদ্ধি
বা ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ এর ওপর অনেক প্রভাব ফেলছে। এমআইটির এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যারা কেবল
এআই ব্যবহার করে কাজ করেন, অন্যদের তুলনায় তাঁদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা এবং সংযোগ প্রায়
৫৫ শতাংশ কমে যায়। এআই
দিয়ে কাজ করালে মানুষ সেই কাজের ওপর আর ‘মালিকানা বোধ’ অনুভব করে না। এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি
করা লেখায় কাঠামো সুন্দর হলেও তাতে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বা মৌলিক চিন্তার অভাব থাকে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি মানুষের স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ