ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

রমজানে আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি: দায় কি অর্থনীতির নাকি নৈতিকতার

রমজান মাস এলেই বাংলাদেশে একটি পরিচিত বাস্তবতা সামনে আসে। সেটি হলো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি। যে মাস আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও দরিদ্রের কষ্ট অনুভব করার শিক্ষা দেয়, সেই মাসটিতেই সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে বাড়তি চাপ, অনিশ্চয়তা ও বাজারভীতি। চালের বাজার থেকে শুরু করে ডাল, চিনি বা ভোজ্য তেলের দাম রোজার ঢের আগেই লাগামহীনভাবে বাড়তে দেখা যায়। রমজানের শেষ সপ্তাহে এবং ঈদুল ফিতরের ঠিক আগে ঘটে আরেক দফা অস্বাভাবিক দাম প্রতি বছরের এই পরিচিত দুর্ভোগ এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক প্রকার ভবিতব্য বা বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবেই গণ্য হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি কি সত্যিই এড়ানোর উপায় নেই অর্থনৈতিক বাস্তবতা? নাকি এটি একটি কৃত্রিম, পরিকল্পিত ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ার ফল?করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে বিশ্ববাজার যখন জ্বালানি টানাপোড়েন এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে—এ কথা দ্বিমত পোষণ করার উপায় নেই। ২০২১-২২ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বিশ্ব খাদ্যমূল্য সূচক প্রায় ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে এক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ধীরে ধীরে কমেছে। গম, ভুট্টা, ভোজ্য তেল ও চিনির মতো বহু পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম ২০২৩-২৪ সালে প্রাক্-কোভিড পর্যায়ের কাছাকাছি ফিরে আসে। অথচ বাংলাদেশে খাদ্যমূল্যস্ফীতি হাঁটতে থাকে উলটো পথে।রমজান বাংলাদেশে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। অনেক বছর ধরেই চাঁদের হিসাব, রোজার সময়সূচি, চাহিদা বৃদ্ধির সময় সবই পূর্বানুমেয়। চাহিদার এই ঊর্ধ্বগতি সম্পর্কে আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা—সবারই আগাম ধারণা থাকে। তবু প্রতি বছর দেখা যায়, রমজানের দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকেই বাজারে অস্বাভাবিক অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি দেখা যায়। এই পূর্বানুমেয় চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মজুতদারি, কৃত্রিম টানাপোড়েন সৃষ্টি ও সমন্বিত অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পথ বেছে নেন।তুরস্ক বা মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারের মতো দেশগুলোতে রমজান এলেই একটি বিশেষ দৃশ্য দেখা যায়। সৌদিতে রমজানের আগে বড় সুপারমার্কেটগুলো চাল, মাংস, ডাল ও খেজুরে ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে 'রমজান ডিসকাউন্ট ক্যাম্পেইন' সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়। তুরস্কে রমজানের জন্য আলাদা জনকল্যাণমূলক বাজার চালু থাকে, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কম দামে বিক্রি করা হয়। এসব দেশে ব্যবসায়ীরা রমজানকে বাড়তি মুনাফার সুযোগ নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সওয়াব অর্জনের সময় হিসেবে দেখেন। অথচ বাংলাদেশে রমজান হয়ে ওঠে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মাসগুলোর একটি—এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীর নৈতিক বৈপরীত্যও।বিশ্বের খ্রিষ্টান ও ইহুদি সমাজের অভিজ্ঞতা এই বৈপরীত্যকে আরো স্পষ্ট করে তোলে। খ্রিষ্টানদের বড় ধর্মীয় সময়, ক্রিসমাস ও ইস্টার এবং ইহুদিদের পাসওভার বা ইয়ম কিপুর উপলক্ষ্যে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণত বাড়ে না; বরং কমে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ক্রিসমাস মৌসুমে সুপারমার্কেটগুলো Buy One Get One Free, Buy Two Get One Free fa ৩০-৫০ শতাংশ ছাড়ের অফার দেয়। ইহুদি পাসওভারের সময় কোশার খাবার, মাংস ও আনুষ্ঠানিক খাদ্যপণ্যে বিশেষ মূল্যছাড় দেওয়া হয়, যেন ধর্মীয় আচার পালনে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে চাপে না পড়ে। এখানে একটি মৌলিক নৈতিক দর্শন কাজ করে—ধর্মীয় উৎসব মানে মানুষের ওপর বোঝা বাড়ানো নয়, বরং স্বস্তি দেওয়া। ব্যবসা সেখানে ইবাদতের পরিপূরক হয়ে ওঠে, ইবাদতের বিপরীত নয়।বাংলাদেশ প্রতি বছর রমজানের আগে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে, কিছু পণ্যে আমদানি শুল্ক কমানো হয়, টিসিবির মাধ্যমে খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি করা হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের প্রভাব সীমিত। সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবে কার্যকর হয় না। শুল্ক ছাড়ের সুবিধা অনেক সময় ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। টিসিবির পণ্য স্বল্প পরিসরে বিক্রি হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ এর সুফল পায় না। মূল সমস্যা হলো—নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও বাস্তবায়নে সমন্বয় ও কঠোরতার অভাব।বাংলাদেশে মজুতদারি অতিমুনাফাবিরোধী আইন রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। রমজান এলেই কিছুদিন বাজার নজরদারি বাড়ে, পরে আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিতে ভয় পান না। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোক্তার কেনাকাটার আচরণ রমজানের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবর্তিত হয়। মানুষ বাধ্য হয়ে বাজেট কমায়, পুষ্টিকর খাবার বাদ দেয়, প্রয়োজনের বাইরের কিছু তো দূরের কথা, অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিসও কিনতে পারে না।নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই চাপ আরো তীব্র। রমজান—যা তাদের জন্য মানসিক প্রশান্তির সময় হওয়ার কথা, তা হয়ে ওঠে খাদ্য অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মাস। সুতরাং, রমজানকেন্দ্রিক অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে প্রতীকী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত ও নৈতিক পরিবর্তন। আগাম সরবরাহ পরিকল্পনা, মজুত তথ্যের স্বচ্ছতা, বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এসব অর্থনৈতিক পদক্ষেপ জরুরি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নৈতিক দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা। ধর্মীয় নেতা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। রমজানকে যদি সত্যিই ইবাদতের মাস বানাতে হয়, তবে বাজারকেও সেই ইবাদতের অংশ করতে হবে।যে সমাজ তার সবচেয়ে পবিত্র মাসেও ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করতে পারে না, তাকে আত্মসমালোচনা করতেই হয়। রমজান কোনো ভয়ের মাস নয়, হওয়া উচিত শান্তি ও সহমর্মিতার সময়। প্রমাণ আছে, সমাধানের পথও জানা। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সেই পথে হাঁটতে প্রস্তুত? যদি নৈতিকতা ও ন্যায্যতা বাজার থেকে নির্বাসিত হয়, তাহলে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়—তা হয়ে ওঠে সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়।রমজানকেন্দ্রিক অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির লাগাম টানতে আগাম সরবরাহ পরিকল্পনা জরুরি। এতে কৃত্রিম সংকট ও তথ্য গোপনের সুযোগ কমবে। আমদানিকারক, মিলার ও বড় পাইকারদের রমজানের অন্তত তিন মাস আগে স্টক ও আমদানি পরিকল্পনা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমবে এবং বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে মজুতদারি ও সিন্ডিকেট ভাঙতে দৃশ্যমান শাস্তি এবং সারা বছর নিয়মিত বাজার নজরদারি জরুরি এবং আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। টিসিবি ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপও শুধু প্রতীকী নয়, গ্রাম-শহর সর্বত্র কার্যকর হতে হবে।ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নৈতিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে রমজান ডিসকাউন্ট ও 'ন্যায্যমূল্য অঙ্গীকার' বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। মুসলিম দেশগুলোতে যেভাবে রমজান ডিসকাউন্ট একটি সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে, বাংলাদেশেও তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব। এজন্য চাই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা।রমজান কোনো আচারসর্বস্ব ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি আত্মসংযম, ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মাস। নবী করিম (স.) সতর্ক করে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।' এই বাণীগুলো শুধু নামাজ ও রোজার জন্য নয়; এগুলো বাজার, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক আচরণের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। মনে রাখতে হবে, ইসলামের দৃষ্টিতে মুনাফা নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু জুলুম, প্রতারণা ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে লাভবান হওয়া স্পষ্টত হারাম।রমজানের মতো পবিত্র মাসেও একশ্রেণির মানুষ অন্যের চাহিদার দুর্বলতাকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, দাম বাড়ায় এবং অতিমুনাফা লুটে নেয়। এটি শুধু বাজার ব্যর্থতা নয়; এটি ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ইসলাম যেখানে মজুতদারি, প্রতারণা ও অতিমুনাফাকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে, সেখানে রমজান মাসেই এসব প্রবণতা প্রকট হয়ে ওঠা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট  এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

রমজানে আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি: দায় কি অর্থনীতির নাকি নৈতিকতার