ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

আক্কেলপুরের প্রবীণ নৈশপ্রহরী মাহতাব হাড়কাঁপানো শীতেও নিরব পাহারা



আক্কেলপুরের প্রবীণ নৈশপ্রহরী মাহতাব হাড়কাঁপানো শীতেও নিরব পাহারা

চারদিক যখন ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়, বাতাসে যখন কনকনে ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আক্কেলপুর পৌর শহরের মানুষ নিজেদের ঘরে লেপ-কম্বলের নিচে আশ্রয় নেয়। থার্মোমিটারে তাপমাত্রা নেমে এসেছে মাত্র ৯ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এমন হাড়কাঁপানো শীতে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা, দোকানপাট বন্ধ, মানুষজনের চলাচল সীমিত। অথচ এই নীরব রাতেই শহরের বাজার এলাকা পাহারা দিতে নিরবিচারে  হাঁটছেন জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের নিচাবাজার বণিক সমিতির মাহতাব (৭৫) নামের এক প্রবীণ নৈশপ্রহরী।

শরীরে বয়সের ভার, তবুও দায়িত্বের ভার তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। মোটা জামা আর পুরোনো চাঁদর নিজেকে জড়িয়ে নিয়েও শীতের কাছে হার মানছে তার শরীর। কাঁপতে কাঁপতে তিনি দোকানের শাটারের সামনে দাঁড়ান, গলিপথ ধরে হেঁটে যান, কোথাও সন্দেহজনক কিছু আছে কি না তা খেয়াল রাখেন। প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে কিছুক্ষণ থেমে নিশ্চিত হন-সব ঠিক আছে কিনা। ঘুম জাতে না ধরে বাঁশিতে হুইসেল বাজিয়েও থাকে।

প্রবীণ নৈশপ্রহরী  মাহতাব বলেন, শরীরটা আর আগের মতো নেই। ঠান্ডায় খুব কষ্ট হয়, হাড়ে হাড়ে লাগে। কিন্তু দায়িত্ব তো ফেলে রাখা যায় না। আমি না থাকলে এই দোকানগুলো ঝুঁকিতে পড়বে। তাই কষ্ট হলেও কাজটা করতে হয়। তবে আমাদেরকে দেখার কেউ নাই। মাসে মাত্র আট হাজার টাকা বেতন পাই। রাত্রি ১০টার আগে আসি। প্রায় ৩০বছর ধরে সারা রাত ডিউটি করে ভোরে বাড়িতে যায়। আমি আগে আনসার ভিডিপির সদস্য ছিলাম আমার সাংসারিক খরচের টানা পরনের জন্য  নিচাবাজার বণিক সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি ওমপ্রকাশ আগরওয়ালা প্রথম আমায় এই পেশায় আসেন। তখন মাসে মাত্র ১২শ টাকা বেতন ছিল। বর্তমান সময়ে গুটি কয়েক টাকা দিয়ে সংসারও তেমন চলে। আমার পাঁচটি কন্যা সন্তান। তাদের বিয়েও দিয়েছি। বয়সের ভারে তেমন আর কিছু করতেও পারিনা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বহু বছর ধরেই এই প্রবীণ নৈশপ্রহরী রাত জেগে তাদের দোকানপাট পাহারা দিয়ে আসছেন। চুরি, ডাকাতি বা ভাঙচুরের আশঙ্কায় যখন ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় থাকেন, তখন তার উপস্থিতিই তাদের ভরসা হয়ে ওঠে। শীত, বর্ষা কিংবা অসুস্থতা—কোনো কিছুই তাকে দায়িত্ব থেকে সরাতে পারেনি।

ব্যবসায়ী ইউনুস বলেন, এমন ঠান্ডায় তরুণদেরও দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর।  আক্কেলপুরে বেশ কয়েকজন এমন প্রবীন নৈশপ্রহরী রয়েছে। তারা তো বয়সে অনেক বড়। তারাও রাতভর বাজারে ঘুরে ঘুরে আমাদের দোকান পাহারা দেন। তাদের জন্যই আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি।

স্থানীয়দের অনেকেই জানান, গভীর রাতে কুয়াশার ভেতর একা একা হাঁটতে থাকা এই প্রবীণ নৈশপ্রহরী যেন শহরের এক নীরব প্রহরী। আলো-আঁধারির মধ্যে তার ছায়া শুধু নিরাপত্তার নয়, দায়িত্ববোধ আর মানবিকতারও প্রতীক।

এই শীতের রাতে যখন সবাই নিজের আরাম ও নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত, তখন এই প্রবীণ নৈশপ্রহরী নিজের কষ্ট ভুলে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। তার এই অবিচল দায়িত্ববোধ শুধু একটি চাকরি নয়—এটি জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার গল্প।

কলেজবাজার বণিক সমিতির সভাপতি কাজী শফিউদ্দীন ও নিচাবাজার বণিক সমিতির সভাপতি ওয়াহেদ প্রামানিক বলেন, নিচাবাজার ও কলেজ বাজারে ১০জন নৈশপ্রহরী রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন প্রবীণ। র্দীঘদিন থেকে তারা রাতে পাহারা দিচ্ছেন।  অনেক কিছু ইচ্ছে থাকলে পেরে উঠিনা। তাদের বেতন আমরা সন্তোষজন দিতে পারি না। আগামীতে তাদের প্রতি আরও সহানুভূতি ও বেতন বৃদ্ধি করব।

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬


আক্কেলপুরের প্রবীণ নৈশপ্রহরী মাহতাব হাড়কাঁপানো শীতেও নিরব পাহারা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

চারদিক যখন ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়, বাতাসে যখন কনকনে ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আক্কেলপুর পৌর শহরের মানুষ নিজেদের ঘরে লেপ-কম্বলের নিচে আশ্রয় নেয়। থার্মোমিটারে তাপমাত্রা নেমে এসেছে মাত্র ৯ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এমন হাড়কাঁপানো শীতে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা, দোকানপাট বন্ধ, মানুষজনের চলাচল সীমিত। অথচ এই নীরব রাতেই শহরের বাজার এলাকা পাহারা দিতে নিরবিচারে  হাঁটছেন জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের নিচাবাজার বণিক সমিতির মাহতাব (৭৫) নামের এক প্রবীণ নৈশপ্রহরী।

শরীরে বয়সের ভার, তবুও দায়িত্বের ভার তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। মোটা জামা আর পুরোনো চাঁদর নিজেকে জড়িয়ে নিয়েও শীতের কাছে হার মানছে তার শরীর। কাঁপতে কাঁপতে তিনি দোকানের শাটারের সামনে দাঁড়ান, গলিপথ ধরে হেঁটে যান, কোথাও সন্দেহজনক কিছু আছে কি না তা খেয়াল রাখেন। প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে কিছুক্ষণ থেমে নিশ্চিত হন-সব ঠিক আছে কিনা। ঘুম জাতে না ধরে বাঁশিতে হুইসেল বাজিয়েও থাকে।

প্রবীণ নৈশপ্রহরী  মাহতাব বলেন, শরীরটা আর আগের মতো নেই। ঠান্ডায় খুব কষ্ট হয়, হাড়ে হাড়ে লাগে। কিন্তু দায়িত্ব তো ফেলে রাখা যায় না। আমি না থাকলে এই দোকানগুলো ঝুঁকিতে পড়বে। তাই কষ্ট হলেও কাজটা করতে হয়। তবে আমাদেরকে দেখার কেউ নাই। মাসে মাত্র আট হাজার টাকা বেতন পাই। রাত্রি ১০টার আগে আসি। প্রায় ৩০বছর ধরে সারা রাত ডিউটি করে ভোরে বাড়িতে যায়। আমি আগে আনসার ভিডিপির সদস্য ছিলাম আমার সাংসারিক খরচের টানা পরনের জন্য  নিচাবাজার বণিক সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি ওমপ্রকাশ আগরওয়ালা প্রথম আমায় এই পেশায় আসেন। তখন মাসে মাত্র ১২শ টাকা বেতন ছিল। বর্তমান সময়ে গুটি কয়েক টাকা দিয়ে সংসারও তেমন চলে। আমার পাঁচটি কন্যা সন্তান। তাদের বিয়েও দিয়েছি। বয়সের ভারে তেমন আর কিছু করতেও পারিনা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বহু বছর ধরেই এই প্রবীণ নৈশপ্রহরী রাত জেগে তাদের দোকানপাট পাহারা দিয়ে আসছেন। চুরি, ডাকাতি বা ভাঙচুরের আশঙ্কায় যখন ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় থাকেন, তখন তার উপস্থিতিই তাদের ভরসা হয়ে ওঠে। শীত, বর্ষা কিংবা অসুস্থতা—কোনো কিছুই তাকে দায়িত্ব থেকে সরাতে পারেনি।

ব্যবসায়ী ইউনুস বলেন, এমন ঠান্ডায় তরুণদেরও দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর।  আক্কেলপুরে বেশ কয়েকজন এমন প্রবীন নৈশপ্রহরী রয়েছে। তারা তো বয়সে অনেক বড়। তারাও রাতভর বাজারে ঘুরে ঘুরে আমাদের দোকান পাহারা দেন। তাদের জন্যই আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি।

স্থানীয়দের অনেকেই জানান, গভীর রাতে কুয়াশার ভেতর একা একা হাঁটতে থাকা এই প্রবীণ নৈশপ্রহরী যেন শহরের এক নীরব প্রহরী। আলো-আঁধারির মধ্যে তার ছায়া শুধু নিরাপত্তার নয়, দায়িত্ববোধ আর মানবিকতারও প্রতীক।

এই শীতের রাতে যখন সবাই নিজের আরাম ও নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত, তখন এই প্রবীণ নৈশপ্রহরী নিজের কষ্ট ভুলে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। তার এই অবিচল দায়িত্ববোধ শুধু একটি চাকরি নয়—এটি জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার গল্প।

কলেজবাজার বণিক সমিতির সভাপতি কাজী শফিউদ্দীন ও নিচাবাজার বণিক সমিতির সভাপতি ওয়াহেদ প্রামানিক বলেন, নিচাবাজার ও কলেজ বাজারে ১০জন নৈশপ্রহরী রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন প্রবীণ। র্দীঘদিন থেকে তারা রাতে পাহারা দিচ্ছেন।  অনেক কিছু ইচ্ছে থাকলে পেরে উঠিনা। তাদের বেতন আমরা সন্তোষজন দিতে পারি না। আগামীতে তাদের প্রতি আরও সহানুভূতি ও বেতন বৃদ্ধি করব।


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত