আলো
এক ধরনের শক্তি, যা চোখে
প্রবেশ করে দর্শনের অনুভূতি জন্মায়।
আলো
বস্তুকে দৃশ্যমান করে, কিন্তু এটি নিজে অদৃশ্য।
আমরা
আলোকে দেখতে পাই না, কিন্তু আলোকিত বস্তুকে দেখি।
আলো
এক ধরনের তরঙ্গ।
আলো
তরঙ্গের আকারে এক স্থান
থেকে আরেক স্থানে গমন করে।
মাধ্যমভেদে আলোর
বেগের পরিবর্তন হয়ে থাকে।শুন্য মাধ্যমে আলোর বেগ সবচেয়ে বেশি: প্রতি সেকেন্ডে ৩০,০০০
মিটার। কোন ভাবেই আলোর গতিকে স্পর্শ করা সম্ভব নয়।
আলোক
রশ্মি এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে তীর্যকভাবে পতিত হলে মাধ্যম পরিবর্তনের ফলে এর গতিপথের ভিন্নতা দেখা
যায়। এটি হলো আলোর প্রতিসরণ।
পাঠ
১ : আলোর প্রতিসরণ
আলো
যখন তীর্যকভাবে এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে
অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে চলে যায় তখন এর গতিপথ
মাধ্যম পরিবর্তনের ফলে আলো গতিপথের ভিন্নতা দেখা যায়। এটি হলো আলোর প্রতিসরণ।
নিচের
কাজটি দেখা যাক:
এ ক্ষেত্রে পানির
ভিতরে পেন্সিলের নিচের অংশ থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়ছে। এর পূর্বে এটি
এক স্বচ্ছ মাধ্যম পানি থেকে অন্য স্বচ্ছ বায়ুতে এসে তোমাদের চোখে পড়ছে। দুইটি ভিন্ন মাধ্যমে আলো যদি একই সরল রেখায় চলত তাহলে পেন্সিলটিকে নিশ্চয়ই সোজা দেখাত। কিন্তু তোমরা দেখতে পেলে এটিকে পানির তলে ভেঙ্গে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এর থেকে
সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে আলো
যখন এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন এটি তার গতিপথের দিক পরিবর্তন করে। আলোক রশ্মির এই দিক
পরিবর্তনই হলো আলোর প্রতিসরণ। একটি নির্দিষ্ট স্বচ্ছ মাধ্যমে আলো সরল রেখায় চলে কিন্তু অন্য মাধ্যমে প্রবেশের সাথে সাথেই এটি মাধ্যমের ঘনত্ব অনুসারে এর দিক
পরিবর্তন করে। এখানে উল্লেখ্য যে লম্বভাবে আলো
এক মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে যাওয়ার সময় এর গতিপথের কোনো
দিক পরিবর্তন হয় না।
আলোর
প্রতিসরণের নিয়ম
আলোক
রশ্মির প্রতিসরণের সময় নিয়মগুলো মেনে চলে। প্রথমেই পরীক্ষাটা করে নাও।
কাচ
ফলকে আলোর প্রতিসরণ
প্রয়োজনীয় উপকরণ
: আলপিন,
কাচফলক, ড্রইং বোর্ড।
পদ্ধতি :
প্রথমেই ড্রইং বোর্ডে একটি সাদা কাগজ আটকিয়ে নাও। কাচফলকটিকে সাদা কাগজের কেন্দ্রে রাখ এবং এর চারদিকে দাগাঙ্কিত কর।
এবার কাচফলকটি সরিয়ে নাও এবং একটি আপতিত রশ্মি AB আঁক। মোটামুটি ৫ সে.মি দূরত্বে AB রেখার উপর P এবং Q বিন্দুটি দুটো পিন খাড়াভাবে রাখ। কাচফলকটি পুনরায় রাখ এবং পিন যে প্রান্তে রেখেছ
তার উল্টো দিক থেকে পিন দুটোকে দেখার চেষ্টা কর (শিক্ষকের নির্দেশনা প্রয়োজন)
এবার
কাচফলকের অপর প্রান্তে R এবং S বিন্দুতে আরও দুটো পিন খাড়াভাবে রাখ যেন কাচফলকের মধ্য দিয়ে P, Q, R ও S একই
লাইনে আছে বলে মনে হয়। R এবং S বিন্দু দুটি চিহ্নিত করে এবং পুনরায় কাচফলক সরিয়ে CD লাইন টান। পাশাপাশি BC প্রতিসরিত রশ্মি, অভিলম্ব MM/ এবং NN/ আঁক। চাঁদা দিয়ে আপতন কোণ ABN, প্রতিসরণ কোণ CBN/ এবং নির্গত কোণ DCM/ চিহ্নিত করে মাপ।
উপরের
কাজটি করে তোমরা কী পর্যবেক্ষণ করতে
পারছ? এখানে আলোক রশ্মি হালকা মাধ্যম (বায়ু) থেকে ঘন মাধ্যমে (কাচ)
প্রবেশ করেছে। কোণগুলোকে মেপে দেখা যাচ্ছে আপতন কোণ i প্রতিসরণ কোণ r অপেক্ষা বড় এবং
আপতন কোণ i ও নির্গত কোণ e সমান। তাহলে তোমরা কী সিদ্ধান্ত নিতে
পার :
১. আলোক রশ্মি যখন হালকা মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে প্রবেশ করে
তখন এটি অভিলম্বের দিকে সরে আসে। এই ক্ষেত্রে আপতন
কোণ প্রতিসরণ কোণ অপেক্ষা বড় হয়।
২. আলোকরশ্মি প্রথমে একটি মাধ্যম থেকে (যেমন বায়ু) অন্য মাধ্যমে (কাচ) প্রতিসরিত হয় এবং
পুনরায় একই মাধ্যমে (বায়ু) নির্গত হলে আপতন কোণ ও নির্গত কোণ
সমান হয়।
৩. আপতিত রশ্মি, প্রতিসরিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে দুই মাধ্যমে বিভেদ তলে অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে। এছাড়াও উপরের পরীক্ষাটির ন্যায় অনুরূপ পরীক্ষণ থেকে দেখা গেছে যে, আলোক
রশ্মি যখন ঘন মাধ্যম থেকে
হালকা মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন এটি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। এই ক্ষেত্রে আপতন
কোণ প্রতিসরণ কোণ অপেক্ষা ছোট হয়। অপর পক্ষে আলোক রশ্মি যখন অভিলম্ব বরাবর আপতিত হয় তখন
আপতন কোণ, প্রতিসরণ কোণ ও নির্গত কোণের
মান শূন্য হয়। এক্ষেত্রে আপতিত রশ্মির দিক পরিবর্তন হয় না।
প্রতিসরণের বাস্তব প্রয়োগ
তোমরা
এখন নিচের কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রতিসরণের বাস্তব প্রয়োগ দেখতে পাবে।
(১) একটি সোজা লাঠিকে কাত করে পানিতে ডুবালে উপর থেকে তাকালে পানির ভিতর লাঠির অংশটি কেমন দেখাবে। পর্যবেক্ষণ করে দেখ লাঠিটি ছোট, মোটা বা উপরে
দেখা যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে? আসলে প্রতিসরণের ফলে এমন হচ্ছে। চিত্র অনুসারে এখানে ঘন মাধ্যমে পানি
থেকে আলো প্রতিসরিত হয়ে হালকা
মাধ্যমে তোমার
চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে। লাঠিটির নিমজ্জিত অংশের প্রতিটি বিন্দু উপরে উঠে আসে। ফলে লাঠিকে খানিকটা উপরে, দৈর্ঘ্য কম এবং
মোটা দেখায়।
(২)একটি স্টীলের মগ বা চিনামাটির বাটি নাও। এরপর মগ বা বাটিতে একটি টাকার মুদ্রা রাখ। এখন তোমার চোখকে এমন স্থানে রাখ যেন তুমি মুদ্রাটিকে না দেখতে
পাও। এবার অন্য একজনকে ধীরে ধীরে মগ বা পাত্রে পানি ঢালতে বল। কী হবে
এবং কেন হবে তা বলতে
পারবে? পর্যবেক্ষণ করে দেখবে আস্তে আস্তে তুমি মুদ্রাটিকে দেখতে পাবে। এটি প্রতিসরণের ফলে সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিসরণের ফলে আলো ঘন
মাধ্যম পানি থেকে হালকা মাধ্যম বায়ুতে তোমার চোখে প্রতিসরিত হওয়ায় তুমি মুদ্রার অবাস্তব প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছ।
(৩) তুমি কি কখনো
মাছ শিকার করেছ? সাধারণত পানিতে যে জায়গায় মাছটি
দেখা যায় আসলে কি মাছটি
ঐ জায়গায় থাকে? মোটেই না? আসলে
যে মাছটি আমরা দেখি এটি হলো তার অবাস্তব প্রতিবিম্ব। প্রকৃতপক্ষে মাছ থাকে আরেকটু দূরে এবং গভীরে। যদি তুমি টেঁটা দিয়ে মাছ মারতে চাও তাহলে এটিকে মারতে হবে আরও নিচে ও দূরে।
(৪) তুমি নিশ্চয়ই বর্ষাকালে দেখেছ যে পুকুর
ঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। বর্ষার স্বচ্ছ পানির জন্য পুকুর ঘাটের সিড়িটা কোথায় দেখা যায়। আসলে এটিকে যেখানে দেখা যায় এটি থাকে তার চেয়ে একটু নিচে। ফলে অনেকেই বুঝতে না পেরে
পড়ে যায়। এমন ঘটনাটি আরও দেখতে পাবে তোমাদের কেউ যদি সেন্টমার্টিনের দ্বীপের পাশে অবস্থিত ছেঁড়া দ্বীপে বেড়াতে গিয়ে থাক। ওখানকার স্বচ্ছ পানিতে নিচের পাথর ও শৈবাল
অনেক কাছে মনে হয়। এটা হয় মূলত
আলোর প্রতিসরণের জন্যই।
পূর্ণ
অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ও সংকট
কোণ (ক্রান্তি কোণ)
আলোক
রশ্মি যখন ঘন স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে
হালকা স্বচ্ছ মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন প্রতিসরিত রশ্মি আপতন বিন্দুতে অঙ্কিত অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। ফলে প্রতিসরণ কোণ আপতন কোণের চেয়ে বড় হয়।
এভাবে আপতনকোণের মান ক্রমশ বাড়তে থাকলে প্রতিসরণ কোণও অনুরূপভাবে বাড়তে থাকে।
কিন্তু ঐ নির্দিষ্ট দুটি
মাধ্যমের জন্য আপতন কোণের কোনো একটি মানের জন্য (এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ৯০ ডিগ্রী অপেক্ষা কম) প্রতিসরণ কোণের
মান ৯০ ডিগ্রী হয় অর্থাৎ প্রতিসরিত রশ্মিটি বিভেদ
তল বরাবর চলে আসে। এ ক্ষেত্রে ঐ আপতন কোণকে আমরা সংকট কোণ বলি। এখন আপতন কোণের মান যদি সংকট কোণের চেয়ে বেশি হয় তখন
কী হবে? প্রতিসরণ কোণের মান তো আর ৯০ ডিগ্রী এর বেশি
হতে পারে না?
পরীক্ষা করে
দেখা গেছে ঐ ক্ষেত্রে আলোক
রশ্মি আর প্রতিসরিত না হয়ে
বিভেদ তল থেকে একই মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে আসবে। এক্ষেত্রে বিভেদতল প্রতিফলক হিসেবে কাজ করে এবং এই প্রতিফলন সাধারণ প্রতিফলনের নিয়মানুসারে হয়।
এই ঘটনাকে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন বলা হয়। অর্থাৎ ঘন মাধ্যম থেকে
আপতিত রশ্মি তখন দুই মাধ্যমের বিভেদ তলে সাধারণ প্রতিফলনের নিয়মানুসারে সম্পূর্ণ প্রতিফলিত হয়ে আবার ঘন মাধ্যমেই ফিরে
আসবে।
চিত্র
অনুসারে PO` আপতিত রশ্মির জন্য আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে ছোট, যার প্রতিসরিত রশ্মি হলো – OP/। QO আপতিত
রশ্মিটির জন্য আপতন কোণ সংকট কোণের সমান। যার প্রতিসরিত রশ্মি হলো OQ/ রশ্মি এবং এটি বিভেদ তল বরাবর
প্রতিসরিত হয়েছে অর্থাৎ প্রতিসরণ কোণ ৯০০। RO রশ্মিটির জন্য আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে বড়। এক্ষেত্রে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হয়েছে OR/ রশ্মিটি প্রতিফলিত রশ্মি।
এখন
প্রশ্ন হলো এর সাথে
সাধারণ প্রতিফলনের পার্থক্য কোথায়? সাধারণ প্রতিফলনের সময় দেখা যায় আলোর কিছু না কিছু
অংশ প্রতিসরিত হয়; কিন্তু অভ্যন্তুরীণ প্রতিফলনের ক্ষেত্রে দেখা
যায় এক্ষেত্রে সমস্ত আলোক রশ্মি প্রতিফলিত হয়।
পূর্ণ
অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত
১) আলোক রশ্মি কেবলমাত্র ঘন থেকে
হালকা মাধ্যমে যাওয়ার সময় এটি ঘটে।
২) ঘন মাধ্যমে আপতন কোণ অবশ্যই এর মাধ্যম দুটির
সংকট কোণের চেয়ে বড় হতে
হবে।
অপটিক্যাল ফাইবার ও ম্যাগনিফাইং গ্লাস
অপটিক্যাল ফাইবার
অপটিক্যাল ফাইবার হলো
একটি খুব সরু কাচতন্তু। এটা মানুষের চুলের মতো চিকন এবং নমনীয়। আলোক রশ্মিকে বহনের কাজে এটি ব্যবহৃত হয়। আলোক রশ্বি যখন এই কাচতন্তুর মধ্যে
প্রবেশ করে তখন এর দেয়ালে পুনঃপুন পূর্ণ
অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটতে থাকে। এই প্রক্রিয়া চলতে
থাকে আলোক রশ্মি কাচতন্তুর অপর প্রান্ত দিয়ে বের না হওয়া
পর্যন্ত। সাধারণত ডাক্তার মানবদেহের ভিতরের কোনো অংশ (যেমন পাকস্থলী, কোলন দেখার জন্য) যে আলোক
নলটি ব্যবহার করে এটি একগুচ্ছ অপটিক্যাল ফাইবারের সমন্বয়ে গঠিত। এছাড়া অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারের আরেকটি ক্ষেত্র হলো টেলিযোগাযোগ। এতে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে একই সাথে অনেকগুলো সংকেত প্রেরণ করা যায়। সংকেত যত দূরই
যাক না কেন এর শক্তি
হ্রাস পায় না।
ম্যাগনিফাইং গ্লাস
কোনো
উত্তল লেন্সের ফোকাস দূরত্বের মধ্যে কোনো বস্ত্তকে স্থাপন করে লেন্সের অপর পাশ থেকে বস্তুটিকে দেখলে বস্ত্তটির একটি সোজা, বিবর্ধিত ও অবাস্তব বিম্ব
দেখা যায়। এখন এই বিম্ব
চোখের যত কাছে গঠিত হবে চোখের বীক্ষণ কোণও তত বড় হবে এবং বিম্বটিকেও বড় দেখাবে। কিন্তু বিম্ব
চোখের নিকট বিন্দুর চেয়ে কাছে গঠিত হলে সেই বিম্ব আর স্পষ্ট দেখা
যায় না।
সুতরাং বিম্ব
যখন চোখের নিকট বিন্দু অর্থাৎ স্পষ্ট দর্শনের নিকটতম দূরত্বে গঠিত হয় তখনই
তা খালি চোখে সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। ফলে যে সমস্ত
লেখা বা বস্ত্ত চোখে পরিষ্কার দেখা যায় না তা স্পষ্ট ও বড় করে দেখার জন্য স্বল্প ফোকাস দূরত্বের একটি উত্তল লেন্স ব্যবহার করা হয়। উপযুক্ত ফ্রেমে আবদ্ধ এই উত্তল
লেন্সকে বিবর্ধক কাচ বা পঠন
কাচ বা সরল অনুবীক্ষণ যন্ত্র বলে। এই যন্ত্রে খুব
বেশি বিবর্ধন পাওয়া যায় না।
শিক্ষকের সহায়তায় তোমরা
এ ধরনের ম্যাগনিফাইং গ্লাস দেখতে পার।
মানব
চক্ষু
চোখ
আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের অন্যতম। চোখ দিয়ে আমরা দেখি। মানব চক্ষুর কার্যপ্রণালি ছবি তোলার ক্যামেরার মতো। চিত্রে মানব চক্ষুর বিশেষ বিশেষ অংশ দেখানো হয়েছে। প্রধান অংশগুলোর বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো (চিত্র ১১.৯ )।
(ক) অক্ষিগোলক (Eye-ball) :
চোখের কোটরে অবস্থিত এর গোলাকার অংশকে
অক্ষিগোলক বলে। একে চক্ষু কোটরের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সীমার চারদিকে ঘুরানো যায়।
(খ) শ্বেতমন্ডল (Sclera) :
এটা
অক্ষিগোলকের বাহিরের সাদা, শক্ত ও ঘন আঁশযুক্ত অস্বচ্ছ আবরণবিশেষ। এটি চক্ষুকে বাহিরের বিভিন্ন প্রকার অনিষ্ট হতে রক্ষা করে এবং চোখের আকৃতি ঠিক রাখে।
(গ) কর্নিয়া (Cornea) :
শ্বেতমন্ডলের সামনের অংশকে
কর্নিয়া বলে। শ্বেতমন্ডলের এই অংশ
স্বচ্ছ এবং অন্যান্য অংশ অপেক্ষা বাহিরের দিকে অধিকতর উত্তল।
(ঘ) কোরয়েড বা কৃষ্ণমন্ডল (Choroid) :
এটি
কালো রঙের এক ঝিল্লি দ্বারা গঠিত
শ্বেতমন্ডলের ভিতরের গাত্রের আচ্ছাদন বিশেষ। এই কালো
রঙের জন্য চোখের ভিতরে প্রবিষ্ট আলোকের প্রতিফলন হয় না।
(ঙ) আইরিস (Iris) :
এটি
কর্নিয়ার ঠিক পিছনে অবস্থিত একটি অস্বচ্ছ পর্দা। পর্দাটি স্থান ও লোকবিশেষে বিভিন্ন রঙের
নীল, গাঢ়, বাদামি, কালো ইত্যাদি হয়ে থাকে।
(চ) মণি বা তারারন্ধ্র (Pupil):
এটি
কর্নিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মাংসপেশি যুক্ত একটি গোলাকার ছিদ্রপথ। মাংসপেশির সংকোচন ও প্রসারণে তারা
রন্ধ্রের আকার পরিবর্তিত হয়।
(ছ) স্ফটিক উত্তল লেন্স (Crystalline Convex lens) :
এটি
কর্নিয়ার পিছনে অবস্থিত জেলির ন্যায় নরম স্বচ্ছ পদার্থে তৈরি একটি উত্তল লেন্স।
(জ) অক্ষিপট বা রেটিনা (Retina):
এটি
গোলকের পিছনে অবস্থিত একটি ঈষদচ্ছ গোলাপি আলোকগ্রাহী পর্দা। রেটিনার উপর আলো পড়লে ঐ স্নায়ুতন্ত্রতে এক প্রকার উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং
মস্তিষ্কে দর্শনের অনুভূতি জাগায়।
(ঝ) অ্যাকুয়াস হিউমার ও ভিট্রিয়াস হিউমার (Aqueous hummour and vitreous humour) : লেন্স ও
কর্নিয়ার মধ্যবর্তী স্থান
এক প্রকার স্বচ্ছ জলীয় পদার্থে ভর্তি থাকে। একে বলা হয় অ্যাকুয়াস হিউমার। লেন্স
ও রেটিনার মধ্যবর্তী অংশে এক প্রকার জেলি
জাতীয় পদার্থে পূর্ণ থাকে। একে বলা হয় ভিট্রিয়াস হিউমার।
আলোক-চিত্রগ্রাহী ক্যামেরা
এই যন্ত্রে আলোকিত বস্ত্তর চিত্র লেন্সের সাহায্যে আলোক চিত্রগ্রাহী প্লটের উপর গ্রহণ করা হয়। এই কারণে
যন্ত্রটি আলোক-চিত্রগ্রাহী ক্যামেরা সংক্ষেপে ক্যামেরা নামে পরিচিত।
ক্যামেরার বিভিন্ন অংশ
হলো :
(১) ক্যামেরা বাক্স.(২) ক্যামেরা লেন্স,
৩) রন্ধ্র বা ডায়াফ্রাম, (৪) সাটার, (৫) পর্দা, (৬) আলোকচিত্রগ্রাহী প্লেট, (৭) স্লাইড।
ক্রিয়া (Action) :
কোনো
বস্ত্তর ফটো তোলার পূর্বে ক্যামেরায় ঘষা কাচের পর্দাটি বসিয়ে যন্ত্রটিকে লক্ষ্যবস্ত্ত PQ এর দিকে
ধরে সাটার খুলে দেওয়া হয়। অতঃপর ক্যামেরা বাক্সের দৈর্ঘ্য কমিয়ে বাড়িয়ে এমন অবস্থায় রাখা হয় যাতে
লক্ষ্যবস্ত্তর উল্টাপ্রতিবিম্ব pq পর্দার উপর গঠিত হয়। ডায়াফ্রামের সাহায্যে প্রতিবিম্বটি প্রয়োজনমতো উজ্জ্বল করা হয়। এরপর ঘষা কাচের পর্দা সরিয়ে সাটার বন্ধ করা হয় এবং
ঐ স্থানে আলোক চিত্রগ্রাহী প্লেটসহ স্লাইড বসানো হয়। এখন স্লাইডের ঢাকনা সরিয়ে নিয়ে সাটার ও ডায়াফ্রামের মধ্য
দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আলোক চিত্রগ্রাহী প্লেটের উপর আলোক আপতিত হতে দিয়ে পুনরায় ডায়াফ্রেম বন্ধ করা হয়। এই প্রতিক্রিয়াকে এক্সপোজার বা আলোক সম্পাত(exposure) বলে। এই আপতিত
আলোকে আলোক চিত্রগ্রাহী প্লেটের রৌপ্য দ্রবণে রাসায়নিকক্রিয়া ঘটে। এইবার স্লাইডের মুখের ঢাকনা বন্ধ করে অন্ধকার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং
আলোক চিত্রগ্রাহী প্লেটটিকে স্লাইড হতে বের করে ডেভেলপার (developer) নামক এক প্রকার রাসায়নিক দ্রবণে ডুবিয়ে রাখা
হয়। সিলভার হ্যালাইডকে ডেভেলপার বিজারণ (reduction) প্রক্রিয়ায় রৌপ্য ধাতবে পরিণত করে। লক্ষ্যবস্ত্তর যে অংশ
যত উজ্জ্বল, প্লেটের সেই অংশে তত রূপা
জমা হয় এবং তত বেশি
কালো দেখায়। আলোর তীব্রতা ও উন্মোচনকালের উপর
রূপার স্তরের পুরত্বের তারতম্য নির্ভর করে। এখন প্লেটটিকে পানিতে ধুয়ে হাইপো (Sodium thiosulphate) নামক দ্রবণে ডুবানো হয়। এতে প্লেটের যে যে অংশে আলোক পড়ে না সেই
সকল অংশের সিলভার হ্যালাইড গলে যায়। অতঃপর পরিষ্কার পানি দ্বারা প্লেটটি ধুয়ে ফেলা হয়। এভাবে প্লেটে লক্ষ্যবস্ত্তর একটি নিগেটিভ চিত্র পাওয়া যায়।
নিগেটিভ হতে
প্রকৃত চিত্র অর্থাৎ পজিটিভ মুদ্রিত করার জন্য নিগেটিভের নিচে সিলভার হ্যালাইড দ্রবণের প্রলেপ দেওয়া ফটোগ্রাফের কাগজ স্থাপন করে অল্প সময়ের জন্য নিগেটিভের উপর আলোক সম্পাত করতে হয়। এরপর পূর্বের মতো হাইপোর দ্রবণে ফটোগ্রাফের কাগজ ডুবিয়ে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে পজিটিভ পাওয়া যায়।
.png)
বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
আলো
এক ধরনের শক্তি, যা চোখে
প্রবেশ করে দর্শনের অনুভূতি জন্মায়।
আলো
বস্তুকে দৃশ্যমান করে, কিন্তু এটি নিজে অদৃশ্য।
আমরা
আলোকে দেখতে পাই না, কিন্তু আলোকিত বস্তুকে দেখি।
আলো
এক ধরনের তরঙ্গ।
আলো
তরঙ্গের আকারে এক স্থান
থেকে আরেক স্থানে গমন করে।
মাধ্যমভেদে আলোর
বেগের পরিবর্তন হয়ে থাকে।শুন্য মাধ্যমে আলোর বেগ সবচেয়ে বেশি: প্রতি সেকেন্ডে ৩০,০০০
মিটার। কোন ভাবেই আলোর গতিকে স্পর্শ করা সম্ভব নয়।
আলোক
রশ্মি এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে তীর্যকভাবে পতিত হলে মাধ্যম পরিবর্তনের ফলে এর গতিপথের ভিন্নতা দেখা
যায়। এটি হলো আলোর প্রতিসরণ।
পাঠ
১ : আলোর প্রতিসরণ
আলো
যখন তীর্যকভাবে এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে
অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে চলে যায় তখন এর গতিপথ
মাধ্যম পরিবর্তনের ফলে আলো গতিপথের ভিন্নতা দেখা যায়। এটি হলো আলোর প্রতিসরণ।
নিচের
কাজটি দেখা যাক:
এ ক্ষেত্রে পানির
ভিতরে পেন্সিলের নিচের অংশ থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পড়ছে। এর পূর্বে এটি
এক স্বচ্ছ মাধ্যম পানি থেকে অন্য স্বচ্ছ বায়ুতে এসে তোমাদের চোখে পড়ছে। দুইটি ভিন্ন মাধ্যমে আলো যদি একই সরল রেখায় চলত তাহলে পেন্সিলটিকে নিশ্চয়ই সোজা দেখাত। কিন্তু তোমরা দেখতে পেলে এটিকে পানির তলে ভেঙ্গে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এর থেকে
সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে আলো
যখন এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন এটি তার গতিপথের দিক পরিবর্তন করে। আলোক রশ্মির এই দিক
পরিবর্তনই হলো আলোর প্রতিসরণ। একটি নির্দিষ্ট স্বচ্ছ মাধ্যমে আলো সরল রেখায় চলে কিন্তু অন্য মাধ্যমে প্রবেশের সাথে সাথেই এটি মাধ্যমের ঘনত্ব অনুসারে এর দিক
পরিবর্তন করে। এখানে উল্লেখ্য যে লম্বভাবে আলো
এক মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে যাওয়ার সময় এর গতিপথের কোনো
দিক পরিবর্তন হয় না।
আলোর
প্রতিসরণের নিয়ম
আলোক
রশ্মির প্রতিসরণের সময় নিয়মগুলো মেনে চলে। প্রথমেই পরীক্ষাটা করে নাও।
কাচ
ফলকে আলোর প্রতিসরণ
প্রয়োজনীয় উপকরণ
: আলপিন,
কাচফলক, ড্রইং বোর্ড।
পদ্ধতি :
প্রথমেই ড্রইং বোর্ডে একটি সাদা কাগজ আটকিয়ে নাও। কাচফলকটিকে সাদা কাগজের কেন্দ্রে রাখ এবং এর চারদিকে দাগাঙ্কিত কর।
এবার কাচফলকটি সরিয়ে নাও এবং একটি আপতিত রশ্মি AB আঁক। মোটামুটি ৫ সে.মি দূরত্বে AB রেখার উপর P এবং Q বিন্দুটি দুটো পিন খাড়াভাবে রাখ। কাচফলকটি পুনরায় রাখ এবং পিন যে প্রান্তে রেখেছ
তার উল্টো দিক থেকে পিন দুটোকে দেখার চেষ্টা কর (শিক্ষকের নির্দেশনা প্রয়োজন)
এবার
কাচফলকের অপর প্রান্তে R এবং S বিন্দুতে আরও দুটো পিন খাড়াভাবে রাখ যেন কাচফলকের মধ্য দিয়ে P, Q, R ও S একই
লাইনে আছে বলে মনে হয়। R এবং S বিন্দু দুটি চিহ্নিত করে এবং পুনরায় কাচফলক সরিয়ে CD লাইন টান। পাশাপাশি BC প্রতিসরিত রশ্মি, অভিলম্ব MM/ এবং NN/ আঁক। চাঁদা দিয়ে আপতন কোণ ABN, প্রতিসরণ কোণ CBN/ এবং নির্গত কোণ DCM/ চিহ্নিত করে মাপ।
উপরের
কাজটি করে তোমরা কী পর্যবেক্ষণ করতে
পারছ? এখানে আলোক রশ্মি হালকা মাধ্যম (বায়ু) থেকে ঘন মাধ্যমে (কাচ)
প্রবেশ করেছে। কোণগুলোকে মেপে দেখা যাচ্ছে আপতন কোণ i প্রতিসরণ কোণ r অপেক্ষা বড় এবং
আপতন কোণ i ও নির্গত কোণ e সমান। তাহলে তোমরা কী সিদ্ধান্ত নিতে
পার :
১. আলোক রশ্মি যখন হালকা মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে প্রবেশ করে
তখন এটি অভিলম্বের দিকে সরে আসে। এই ক্ষেত্রে আপতন
কোণ প্রতিসরণ কোণ অপেক্ষা বড় হয়।
২. আলোকরশ্মি প্রথমে একটি মাধ্যম থেকে (যেমন বায়ু) অন্য মাধ্যমে (কাচ) প্রতিসরিত হয় এবং
পুনরায় একই মাধ্যমে (বায়ু) নির্গত হলে আপতন কোণ ও নির্গত কোণ
সমান হয়।
৩. আপতিত রশ্মি, প্রতিসরিত রশ্মি এবং আপতন বিন্দুতে দুই মাধ্যমে বিভেদ তলে অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে। এছাড়াও উপরের পরীক্ষাটির ন্যায় অনুরূপ পরীক্ষণ থেকে দেখা গেছে যে, আলোক
রশ্মি যখন ঘন মাধ্যম থেকে
হালকা মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন এটি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। এই ক্ষেত্রে আপতন
কোণ প্রতিসরণ কোণ অপেক্ষা ছোট হয়। অপর পক্ষে আলোক রশ্মি যখন অভিলম্ব বরাবর আপতিত হয় তখন
আপতন কোণ, প্রতিসরণ কোণ ও নির্গত কোণের
মান শূন্য হয়। এক্ষেত্রে আপতিত রশ্মির দিক পরিবর্তন হয় না।
প্রতিসরণের বাস্তব প্রয়োগ
তোমরা
এখন নিচের কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রতিসরণের বাস্তব প্রয়োগ দেখতে পাবে।
(১) একটি সোজা লাঠিকে কাত করে পানিতে ডুবালে উপর থেকে তাকালে পানির ভিতর লাঠির অংশটি কেমন দেখাবে। পর্যবেক্ষণ করে দেখ লাঠিটি ছোট, মোটা বা উপরে
দেখা যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে? আসলে প্রতিসরণের ফলে এমন হচ্ছে। চিত্র অনুসারে এখানে ঘন মাধ্যমে পানি
থেকে আলো প্রতিসরিত হয়ে হালকা
মাধ্যমে তোমার
চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে। লাঠিটির নিমজ্জিত অংশের প্রতিটি বিন্দু উপরে উঠে আসে। ফলে লাঠিকে খানিকটা উপরে, দৈর্ঘ্য কম এবং
মোটা দেখায়।
(২)একটি স্টীলের মগ বা চিনামাটির বাটি নাও। এরপর মগ বা বাটিতে একটি টাকার মুদ্রা রাখ। এখন তোমার চোখকে এমন স্থানে রাখ যেন তুমি মুদ্রাটিকে না দেখতে
পাও। এবার অন্য একজনকে ধীরে ধীরে মগ বা পাত্রে পানি ঢালতে বল। কী হবে
এবং কেন হবে তা বলতে
পারবে? পর্যবেক্ষণ করে দেখবে আস্তে আস্তে তুমি মুদ্রাটিকে দেখতে পাবে। এটি প্রতিসরণের ফলে সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিসরণের ফলে আলো ঘন
মাধ্যম পানি থেকে হালকা মাধ্যম বায়ুতে তোমার চোখে প্রতিসরিত হওয়ায় তুমি মুদ্রার অবাস্তব প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছ।
(৩) তুমি কি কখনো
মাছ শিকার করেছ? সাধারণত পানিতে যে জায়গায় মাছটি
দেখা যায় আসলে কি মাছটি
ঐ জায়গায় থাকে? মোটেই না? আসলে
যে মাছটি আমরা দেখি এটি হলো তার অবাস্তব প্রতিবিম্ব। প্রকৃতপক্ষে মাছ থাকে আরেকটু দূরে এবং গভীরে। যদি তুমি টেঁটা দিয়ে মাছ মারতে চাও তাহলে এটিকে মারতে হবে আরও নিচে ও দূরে।
(৪) তুমি নিশ্চয়ই বর্ষাকালে দেখেছ যে পুকুর
ঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। বর্ষার স্বচ্ছ পানির জন্য পুকুর ঘাটের সিড়িটা কোথায় দেখা যায়। আসলে এটিকে যেখানে দেখা যায় এটি থাকে তার চেয়ে একটু নিচে। ফলে অনেকেই বুঝতে না পেরে
পড়ে যায়। এমন ঘটনাটি আরও দেখতে পাবে তোমাদের কেউ যদি সেন্টমার্টিনের দ্বীপের পাশে অবস্থিত ছেঁড়া দ্বীপে বেড়াতে গিয়ে থাক। ওখানকার স্বচ্ছ পানিতে নিচের পাথর ও শৈবাল
অনেক কাছে মনে হয়। এটা হয় মূলত
আলোর প্রতিসরণের জন্যই।
পূর্ণ
অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ও সংকট
কোণ (ক্রান্তি কোণ)
আলোক
রশ্মি যখন ঘন স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে
হালকা স্বচ্ছ মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন প্রতিসরিত রশ্মি আপতন বিন্দুতে অঙ্কিত অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়। ফলে প্রতিসরণ কোণ আপতন কোণের চেয়ে বড় হয়।
এভাবে আপতনকোণের মান ক্রমশ বাড়তে থাকলে প্রতিসরণ কোণও অনুরূপভাবে বাড়তে থাকে।
কিন্তু ঐ নির্দিষ্ট দুটি
মাধ্যমের জন্য আপতন কোণের কোনো একটি মানের জন্য (এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ৯০ ডিগ্রী অপেক্ষা কম) প্রতিসরণ কোণের
মান ৯০ ডিগ্রী হয় অর্থাৎ প্রতিসরিত রশ্মিটি বিভেদ
তল বরাবর চলে আসে। এ ক্ষেত্রে ঐ আপতন কোণকে আমরা সংকট কোণ বলি। এখন আপতন কোণের মান যদি সংকট কোণের চেয়ে বেশি হয় তখন
কী হবে? প্রতিসরণ কোণের মান তো আর ৯০ ডিগ্রী এর বেশি
হতে পারে না?
পরীক্ষা করে
দেখা গেছে ঐ ক্ষেত্রে আলোক
রশ্মি আর প্রতিসরিত না হয়ে
বিভেদ তল থেকে একই মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে আসবে। এক্ষেত্রে বিভেদতল প্রতিফলক হিসেবে কাজ করে এবং এই প্রতিফলন সাধারণ প্রতিফলনের নিয়মানুসারে হয়।
এই ঘটনাকে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন বলা হয়। অর্থাৎ ঘন মাধ্যম থেকে
আপতিত রশ্মি তখন দুই মাধ্যমের বিভেদ তলে সাধারণ প্রতিফলনের নিয়মানুসারে সম্পূর্ণ প্রতিফলিত হয়ে আবার ঘন মাধ্যমেই ফিরে
আসবে।
চিত্র
অনুসারে PO` আপতিত রশ্মির জন্য আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে ছোট, যার প্রতিসরিত রশ্মি হলো – OP/। QO আপতিত
রশ্মিটির জন্য আপতন কোণ সংকট কোণের সমান। যার প্রতিসরিত রশ্মি হলো OQ/ রশ্মি এবং এটি বিভেদ তল বরাবর
প্রতিসরিত হয়েছে অর্থাৎ প্রতিসরণ কোণ ৯০০। RO রশ্মিটির জন্য আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে বড়। এক্ষেত্রে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হয়েছে OR/ রশ্মিটি প্রতিফলিত রশ্মি।
এখন
প্রশ্ন হলো এর সাথে
সাধারণ প্রতিফলনের পার্থক্য কোথায়? সাধারণ প্রতিফলনের সময় দেখা যায় আলোর কিছু না কিছু
অংশ প্রতিসরিত হয়; কিন্তু অভ্যন্তুরীণ প্রতিফলনের ক্ষেত্রে দেখা
যায় এক্ষেত্রে সমস্ত আলোক রশ্মি প্রতিফলিত হয়।
পূর্ণ
অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত
১) আলোক রশ্মি কেবলমাত্র ঘন থেকে
হালকা মাধ্যমে যাওয়ার সময় এটি ঘটে।
২) ঘন মাধ্যমে আপতন কোণ অবশ্যই এর মাধ্যম দুটির
সংকট কোণের চেয়ে বড় হতে
হবে।
অপটিক্যাল ফাইবার ও ম্যাগনিফাইং গ্লাস
অপটিক্যাল ফাইবার
অপটিক্যাল ফাইবার হলো
একটি খুব সরু কাচতন্তু। এটা মানুষের চুলের মতো চিকন এবং নমনীয়। আলোক রশ্মিকে বহনের কাজে এটি ব্যবহৃত হয়। আলোক রশ্বি যখন এই কাচতন্তুর মধ্যে
প্রবেশ করে তখন এর দেয়ালে পুনঃপুন পূর্ণ
অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটতে থাকে। এই প্রক্রিয়া চলতে
থাকে আলোক রশ্মি কাচতন্তুর অপর প্রান্ত দিয়ে বের না হওয়া
পর্যন্ত। সাধারণত ডাক্তার মানবদেহের ভিতরের কোনো অংশ (যেমন পাকস্থলী, কোলন দেখার জন্য) যে আলোক
নলটি ব্যবহার করে এটি একগুচ্ছ অপটিক্যাল ফাইবারের সমন্বয়ে গঠিত। এছাড়া অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারের আরেকটি ক্ষেত্র হলো টেলিযোগাযোগ। এতে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে একই সাথে অনেকগুলো সংকেত প্রেরণ করা যায়। সংকেত যত দূরই
যাক না কেন এর শক্তি
হ্রাস পায় না।
ম্যাগনিফাইং গ্লাস
কোনো
উত্তল লেন্সের ফোকাস দূরত্বের মধ্যে কোনো বস্ত্তকে স্থাপন করে লেন্সের অপর পাশ থেকে বস্তুটিকে দেখলে বস্ত্তটির একটি সোজা, বিবর্ধিত ও অবাস্তব বিম্ব
দেখা যায়। এখন এই বিম্ব
চোখের যত কাছে গঠিত হবে চোখের বীক্ষণ কোণও তত বড় হবে এবং বিম্বটিকেও বড় দেখাবে। কিন্তু বিম্ব
চোখের নিকট বিন্দুর চেয়ে কাছে গঠিত হলে সেই বিম্ব আর স্পষ্ট দেখা
যায় না।
সুতরাং বিম্ব
যখন চোখের নিকট বিন্দু অর্থাৎ স্পষ্ট দর্শনের নিকটতম দূরত্বে গঠিত হয় তখনই
তা খালি চোখে সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। ফলে যে সমস্ত
লেখা বা বস্ত্ত চোখে পরিষ্কার দেখা যায় না তা স্পষ্ট ও বড় করে দেখার জন্য স্বল্প ফোকাস দূরত্বের একটি উত্তল লেন্স ব্যবহার করা হয়। উপযুক্ত ফ্রেমে আবদ্ধ এই উত্তল
লেন্সকে বিবর্ধক কাচ বা পঠন
কাচ বা সরল অনুবীক্ষণ যন্ত্র বলে। এই যন্ত্রে খুব
বেশি বিবর্ধন পাওয়া যায় না।
শিক্ষকের সহায়তায় তোমরা
এ ধরনের ম্যাগনিফাইং গ্লাস দেখতে পার।
মানব
চক্ষু
চোখ
আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের অন্যতম। চোখ দিয়ে আমরা দেখি। মানব চক্ষুর কার্যপ্রণালি ছবি তোলার ক্যামেরার মতো। চিত্রে মানব চক্ষুর বিশেষ বিশেষ অংশ দেখানো হয়েছে। প্রধান অংশগুলোর বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো (চিত্র ১১.৯ )।
(ক) অক্ষিগোলক (Eye-ball) :
চোখের কোটরে অবস্থিত এর গোলাকার অংশকে
অক্ষিগোলক বলে। একে চক্ষু কোটরের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সীমার চারদিকে ঘুরানো যায়।
(খ) শ্বেতমন্ডল (Sclera) :
এটা
অক্ষিগোলকের বাহিরের সাদা, শক্ত ও ঘন আঁশযুক্ত অস্বচ্ছ আবরণবিশেষ। এটি চক্ষুকে বাহিরের বিভিন্ন প্রকার অনিষ্ট হতে রক্ষা করে এবং চোখের আকৃতি ঠিক রাখে।
(গ) কর্নিয়া (Cornea) :
শ্বেতমন্ডলের সামনের অংশকে
কর্নিয়া বলে। শ্বেতমন্ডলের এই অংশ
স্বচ্ছ এবং অন্যান্য অংশ অপেক্ষা বাহিরের দিকে অধিকতর উত্তল।
(ঘ) কোরয়েড বা কৃষ্ণমন্ডল (Choroid) :
এটি
কালো রঙের এক ঝিল্লি দ্বারা গঠিত
শ্বেতমন্ডলের ভিতরের গাত্রের আচ্ছাদন বিশেষ। এই কালো
রঙের জন্য চোখের ভিতরে প্রবিষ্ট আলোকের প্রতিফলন হয় না।
(ঙ) আইরিস (Iris) :
এটি
কর্নিয়ার ঠিক পিছনে অবস্থিত একটি অস্বচ্ছ পর্দা। পর্দাটি স্থান ও লোকবিশেষে বিভিন্ন রঙের
নীল, গাঢ়, বাদামি, কালো ইত্যাদি হয়ে থাকে।
(চ) মণি বা তারারন্ধ্র (Pupil):
এটি
কর্নিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মাংসপেশি যুক্ত একটি গোলাকার ছিদ্রপথ। মাংসপেশির সংকোচন ও প্রসারণে তারা
রন্ধ্রের আকার পরিবর্তিত হয়।
(ছ) স্ফটিক উত্তল লেন্স (Crystalline Convex lens) :
এটি
কর্নিয়ার পিছনে অবস্থিত জেলির ন্যায় নরম স্বচ্ছ পদার্থে তৈরি একটি উত্তল লেন্স।
(জ) অক্ষিপট বা রেটিনা (Retina):
এটি
গোলকের পিছনে অবস্থিত একটি ঈষদচ্ছ গোলাপি আলোকগ্রাহী পর্দা। রেটিনার উপর আলো পড়লে ঐ স্নায়ুতন্ত্রতে এক প্রকার উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং
মস্তিষ্কে দর্শনের অনুভূতি জাগায়।
(ঝ) অ্যাকুয়াস হিউমার ও ভিট্রিয়াস হিউমার (Aqueous hummour and vitreous humour) : লেন্স ও
কর্নিয়ার মধ্যবর্তী স্থান
এক প্রকার স্বচ্ছ জলীয় পদার্থে ভর্তি থাকে। একে বলা হয় অ্যাকুয়াস হিউমার। লেন্স
ও রেটিনার মধ্যবর্তী অংশে এক প্রকার জেলি
জাতীয় পদার্থে পূর্ণ থাকে। একে বলা হয় ভিট্রিয়াস হিউমার।
আলোক-চিত্রগ্রাহী ক্যামেরা
এই যন্ত্রে আলোকিত বস্ত্তর চিত্র লেন্সের সাহায্যে আলোক চিত্রগ্রাহী প্লটের উপর গ্রহণ করা হয়। এই কারণে
যন্ত্রটি আলোক-চিত্রগ্রাহী ক্যামেরা সংক্ষেপে ক্যামেরা নামে পরিচিত।
ক্যামেরার বিভিন্ন অংশ
হলো :
(১) ক্যামেরা বাক্স.(২) ক্যামেরা লেন্স,
৩) রন্ধ্র বা ডায়াফ্রাম, (৪) সাটার, (৫) পর্দা, (৬) আলোকচিত্রগ্রাহী প্লেট, (৭) স্লাইড।
ক্রিয়া (Action) :
কোনো
বস্ত্তর ফটো তোলার পূর্বে ক্যামেরায় ঘষা কাচের পর্দাটি বসিয়ে যন্ত্রটিকে লক্ষ্যবস্ত্ত PQ এর দিকে
ধরে সাটার খুলে দেওয়া হয়। অতঃপর ক্যামেরা বাক্সের দৈর্ঘ্য কমিয়ে বাড়িয়ে এমন অবস্থায় রাখা হয় যাতে
লক্ষ্যবস্ত্তর উল্টাপ্রতিবিম্ব pq পর্দার উপর গঠিত হয়। ডায়াফ্রামের সাহায্যে প্রতিবিম্বটি প্রয়োজনমতো উজ্জ্বল করা হয়। এরপর ঘষা কাচের পর্দা সরিয়ে সাটার বন্ধ করা হয় এবং
ঐ স্থানে আলোক চিত্রগ্রাহী প্লেটসহ স্লাইড বসানো হয়। এখন স্লাইডের ঢাকনা সরিয়ে নিয়ে সাটার ও ডায়াফ্রামের মধ্য
দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আলোক চিত্রগ্রাহী প্লেটের উপর আলোক আপতিত হতে দিয়ে পুনরায় ডায়াফ্রেম বন্ধ করা হয়। এই প্রতিক্রিয়াকে এক্সপোজার বা আলোক সম্পাত(exposure) বলে। এই আপতিত
আলোকে আলোক চিত্রগ্রাহী প্লেটের রৌপ্য দ্রবণে রাসায়নিকক্রিয়া ঘটে। এইবার স্লাইডের মুখের ঢাকনা বন্ধ করে অন্ধকার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং
আলোক চিত্রগ্রাহী প্লেটটিকে স্লাইড হতে বের করে ডেভেলপার (developer) নামক এক প্রকার রাসায়নিক দ্রবণে ডুবিয়ে রাখা
হয়। সিলভার হ্যালাইডকে ডেভেলপার বিজারণ (reduction) প্রক্রিয়ায় রৌপ্য ধাতবে পরিণত করে। লক্ষ্যবস্ত্তর যে অংশ
যত উজ্জ্বল, প্লেটের সেই অংশে তত রূপা
জমা হয় এবং তত বেশি
কালো দেখায়। আলোর তীব্রতা ও উন্মোচনকালের উপর
রূপার স্তরের পুরত্বের তারতম্য নির্ভর করে। এখন প্লেটটিকে পানিতে ধুয়ে হাইপো (Sodium thiosulphate) নামক দ্রবণে ডুবানো হয়। এতে প্লেটের যে যে অংশে আলোক পড়ে না সেই
সকল অংশের সিলভার হ্যালাইড গলে যায়। অতঃপর পরিষ্কার পানি দ্বারা প্লেটটি ধুয়ে ফেলা হয়। এভাবে প্লেটে লক্ষ্যবস্ত্তর একটি নিগেটিভ চিত্র পাওয়া যায়।
নিগেটিভ হতে
প্রকৃত চিত্র অর্থাৎ পজিটিভ মুদ্রিত করার জন্য নিগেটিভের নিচে সিলভার হ্যালাইড দ্রবণের প্রলেপ দেওয়া ফটোগ্রাফের কাগজ স্থাপন করে অল্প সময়ের জন্য নিগেটিভের উপর আলোক সম্পাত করতে হয়। এরপর পূর্বের মতো হাইপোর দ্রবণে ফটোগ্রাফের কাগজ ডুবিয়ে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে পজিটিভ পাওয়া যায়।
.png)
আপনার মতামত লিখুন