ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

অতিরিক্ত স্মার্টফোন আসক্তি: তরুণ প্রজন্মের জন্য এক নীরব ঘাতক



অতিরিক্ত স্মার্টফোন আসক্তি: তরুণ প্রজন্মের জন্য এক নীরব ঘাতক
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে এসে ২. বিলিয়নেরও বেশি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। এটি এখন আমাদের পথ চলার সঙ্গি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৪ সালের ১৬ আগস্ট প্রথম স্মার্টফোনটি তৈরি হয়। এই স্মার্টফোনটির নাম সিমন। এই যুগে এসে স্মার্টফোন ছাড়া জীবন অন্ধকার মনে হয়, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ভয়াবহ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বসবাসকারী ১৮-২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ দিনে গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এদের মধ্যে অনেকেই সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন গেমিং অথবা বিনোদনমূলক ভিডিওতে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এই অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং দেখা দিচ্ছে নানা স্বাস্থ্য জটিলতা।

২০১৮ সালে আগস্ট মাসে যুক্তরাজ্যের টেলিকম রেগুলেটর অফকম থেকে জানা যায়, মানুষ গড়ে প্রতি বারো মিনিটে তাদের ফোন চেক করে এবং ৭১ শতাংশ কখনোই তাদের ফোন বন্ধ করে না। আর ৪০ শতাংশ মানুষ ঘুম থেকে উঠার পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাদের ফোন হাতে নেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইলফোন আসক্ততার কারণে চোখের শক্তি কমে যেতে পারে, কানের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে এবং শরীরের অস্থি-সন্ধিগুলোর ক্ষতি হতে পারে। আর মার্কিন গবেষকদের মতে, টয়লেট সিটের তুলনায় ১০গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া মোবাইলফোনে থাকে।

অনেকগুলো অ্যাপ রয়েছে যেমন: ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব এসকল সামাজিক ইন্টার্যাকশনের একটি মায়া তৈরি করে। অতিরিক্ত ব্যবহার করার ফলে মানসিক ক্ষতি হয়। মনোবিজ্ঞানী ডক্টর মেহেরুন নেসা বলেন, ‘অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার তরুণদের মধ্যে একাকীত্ব বিষণ্ণতা বাড়িয়ে তোলে। তারা ভার্চুয়াল জগতে বন্ধুদের সাথে যতটা সহজে মিশতে পারে, বাস্তব জীবনে ততটা স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। এর ফলে সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে।’

আমাদের প্রতিদিনের কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে মোবাইলফোন। মোবাইলফোনের নোটিফিকেশনের কারণে কাজ থেকে মনোযোগ নষ্ট হলে ফিরিয়ে আনা কষ্টকর। আর সেই নোটিফিকেশন হতে পারে কোনো বিজ্ঞাপন, অবসর সময়ে সমস্যা না হলেও, কাজের মধ্যে এই ধরনের নোটিফিকেশনের শব্দে মনোযোগ ছুটে গেলে ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগে।

অতিরিক্ত মোবাইলফোন ব্যবহারের ফলে তরুণদের শারীরিক স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে ভুল ভঙ্গিতে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘাড়ে পিঠে ব্যথা, চোখের ক্লান্তি এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ায় বাড়ছে ওজন, যা ডেকে আনছে হৃদরোগ ডায়াবেটিসের মতো মারাত্মক রোগ।

ফিজিওথেরাপিস্ট রাশেদুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা এখন অনেক তরুণকে পাচ্ছি যারা স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে অল্প বয়সেই হাড়ের মাংসপেশীর সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে থাকার কারণে রক্ত চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং স্নায়ুতে চাপ পড়ছে।’

মোবাইলফোনের আসক্তির হাত থেকে মুক্তি পেতে জরুরি হচ্ছে সচেতনতা। তরুণদের স্মার্টফোন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত এবং বাস্তব জীবনে সামাজিক কাজকর্ম খেলাধুলার প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত। বাবা-মা এবং শিক্ষকদেরও বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

পাশাপাশি প্রযুক্তিও এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। স্মার্টফোনে এমন কিছু অ্যাপ রয়েছে যা ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে সতর্ক করতে পারে। এছাড়াও, ডিজিটাল ডিটক্স বা প্রযুক্তি থেকে নির্দিষ্ট সময় দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।

অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি নীরব হুমকি। সময় থাকতে সচেতন না হলে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, প্রযুক্তিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবেএই সত্যটি উপলব্ধি করা জরুরি।

তবে স্মার্টফোনের অনেক সুবিধা রয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সঙ্গে সঙ্গেই যোগাযোগ করা যায়, ফলে সারা বিশ্ব আজ একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। অডিও কল এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করা সম্ভব এছাড়া ইমেইলের মাধ্যমেও যোগাযোগ করা যায়।

বর্তমানে স্মার্ট ফোন বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যমে পরিনত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও, সিনেমা, নাটক, গান, ছবি, গেমস ইত্যাদির মাধ্যমে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান উপভোগ করা যায়।

অতীতে তথ্য আদান-প্রদানে সপ্তাহ বা মাস লেগে যেত। তবে এখন তথ্য আদান-প্রদান করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। যেকোনো ধরনের ভিডিও, অডিও, ফটো, টেক্সট, ডকুমেন্ট ইত্যাদি দ্রুত শেয়ার করা যায়।

মোবাইল ফোনকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারলে এর দ্বারা সকল অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। তবে আজ-কাল বেশিরভাগ তার অপব্যবহার হচ্ছে।

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

বিষয় : স্মার্টফোন আসক্তি নীরব ঘাতক

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


অতিরিক্ত স্মার্টফোন আসক্তি: তরুণ প্রজন্মের জন্য এক নীরব ঘাতক

প্রকাশের তারিখ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

বর্তমান সময়ে এসে ২. বিলিয়নেরও বেশি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। এটি এখন আমাদের পথ চলার সঙ্গি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৪ সালের ১৬ আগস্ট প্রথম স্মার্টফোনটি তৈরি হয়। এই স্মার্টফোনটির নাম সিমন। এই যুগে এসে স্মার্টফোন ছাড়া জীবন অন্ধকার মনে হয়, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ভয়াবহ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বসবাসকারী ১৮-২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ দিনে গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এদের মধ্যে অনেকেই সামাজিক মাধ্যম, অনলাইন গেমিং অথবা বিনোদনমূলক ভিডিওতে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এই অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং দেখা দিচ্ছে নানা স্বাস্থ্য জটিলতা।

২০১৮ সালে আগস্ট মাসে যুক্তরাজ্যের টেলিকম রেগুলেটর অফকম থেকে জানা যায়, মানুষ গড়ে প্রতি বারো মিনিটে তাদের ফোন চেক করে এবং ৭১ শতাংশ কখনোই তাদের ফোন বন্ধ করে না। আর ৪০ শতাংশ মানুষ ঘুম থেকে উঠার পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাদের ফোন হাতে নেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইলফোন আসক্ততার কারণে চোখের শক্তি কমে যেতে পারে, কানের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে এবং শরীরের অস্থি-সন্ধিগুলোর ক্ষতি হতে পারে। আর মার্কিন গবেষকদের মতে, টয়লেট সিটের তুলনায় ১০গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া মোবাইলফোনে থাকে।

অনেকগুলো অ্যাপ রয়েছে যেমন: ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব এসকল সামাজিক ইন্টার্যাকশনের একটি মায়া তৈরি করে। অতিরিক্ত ব্যবহার করার ফলে মানসিক ক্ষতি হয়। মনোবিজ্ঞানী ডক্টর মেহেরুন নেসা বলেন, ‘অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার তরুণদের মধ্যে একাকীত্ব বিষণ্ণতা বাড়িয়ে তোলে। তারা ভার্চুয়াল জগতে বন্ধুদের সাথে যতটা সহজে মিশতে পারে, বাস্তব জীবনে ততটা স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। এর ফলে সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে।’

আমাদের প্রতিদিনের কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে মোবাইলফোন। মোবাইলফোনের নোটিফিকেশনের কারণে কাজ থেকে মনোযোগ নষ্ট হলে ফিরিয়ে আনা কষ্টকর। আর সেই নোটিফিকেশন হতে পারে কোনো বিজ্ঞাপন, অবসর সময়ে সমস্যা না হলেও, কাজের মধ্যে এই ধরনের নোটিফিকেশনের শব্দে মনোযোগ ছুটে গেলে ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগে।

অতিরিক্ত মোবাইলফোন ব্যবহারের ফলে তরুণদের শারীরিক স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে ভুল ভঙ্গিতে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘাড়ে পিঠে ব্যথা, চোখের ক্লান্তি এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ায় বাড়ছে ওজন, যা ডেকে আনছে হৃদরোগ ডায়াবেটিসের মতো মারাত্মক রোগ।

ফিজিওথেরাপিস্ট রাশেদুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা এখন অনেক তরুণকে পাচ্ছি যারা স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে অল্প বয়সেই হাড়ের মাংসপেশীর সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে থাকার কারণে রক্ত চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং স্নায়ুতে চাপ পড়ছে।’

মোবাইলফোনের আসক্তির হাত থেকে মুক্তি পেতে জরুরি হচ্ছে সচেতনতা। তরুণদের স্মার্টফোন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত এবং বাস্তব জীবনে সামাজিক কাজকর্ম খেলাধুলার প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত। বাবা-মা এবং শিক্ষকদেরও বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

পাশাপাশি প্রযুক্তিও এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। স্মার্টফোনে এমন কিছু অ্যাপ রয়েছে যা ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে সতর্ক করতে পারে। এছাড়াও, ডিজিটাল ডিটক্স বা প্রযুক্তি থেকে নির্দিষ্ট সময় দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।

অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি নীরব হুমকি। সময় থাকতে সচেতন না হলে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, প্রযুক্তিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবেএই সত্যটি উপলব্ধি করা জরুরি।

তবে স্মার্টফোনের অনেক সুবিধা রয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সঙ্গে সঙ্গেই যোগাযোগ করা যায়, ফলে সারা বিশ্ব আজ একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। অডিও কল এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করা সম্ভব এছাড়া ইমেইলের মাধ্যমেও যোগাযোগ করা যায়।

বর্তমানে স্মার্ট ফোন বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যমে পরিনত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও, সিনেমা, নাটক, গান, ছবি, গেমস ইত্যাদির মাধ্যমে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান উপভোগ করা যায়।

অতীতে তথ্য আদান-প্রদানে সপ্তাহ বা মাস লেগে যেত। তবে এখন তথ্য আদান-প্রদান করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। যেকোনো ধরনের ভিডিও, অডিও, ফটো, টেক্সট, ডকুমেন্ট ইত্যাদি দ্রুত শেয়ার করা যায়।

মোবাইল ফোনকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারলে এর দ্বারা সকল অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। তবে আজ-কাল বেশিরভাগ তার অপব্যবহার হচ্ছে।

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত