ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

স্মৃতির নীল খাম



স্মৃতির নীল খাম
ছবি: ফারজানা ইসলাম

আরিয়ান সাহেব যখন তার পুরোনো সেগুন কাঠের ড্রয়ারটা খুললেন, তখন বাইরে গোধূলির আলোটা জানালার কাঁচের ওপর এসে শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছে। চারদিকে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। তার স্ত্রী মিতা বাচ্চার স্কুলের মিটিংয়ে গিয়েছেন, বাড়িতে তিনি একাই।

ড্রয়ারের একদম কোণায়, পুরোনো ডায়েরি আর কিছু কাগজের নিচে চাপা পড়ে ছিল সেই নীল খামটি। সাতাশ বছর পর আজ আবার খামটার ওপর আঙুল ছোঁয়াতেই আরিয়ানের শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। কাগজের খসখসে ভাবটা যেন তার অবচেতন মনের কোনো বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ছে।

সাতাশ বছর! কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে আরিয়ান একজন সফল কার্ডিওলজিস্ট হয়েছেন, বিয়ে করেছেন, সংসারী হয়েছেন। কিন্তু আজ এই নীল খামটা হাতে নিতেই তার মনে হলো, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েও তিনি নিজের হৃদয়ের এই চিনচিনে ব্যথাটা কোনোদিন সারাতে পারেননি।

তিনি ধীর পায়ে বারান্দায় এসে বসলেন। হাতে খামটা। খামের ওপর নীলিমার হাতের সেই পরিচিত কাটাকাটা অক্ষরে লেখা- আরিয়ান, এটা তুমি আমার চলে যাওয়ার পর খুলবে।

আরিয়ানের মনে পড়ে গেল ১৯৯৮ সালের সেই ঝকঝকে রোদের দিনটার কথা। তখন তারা ক্লাস নাইনে পড়ে। ঢাকার আজিমপুর কলোনির গলিগুলোতে তখন বিকেল মানেই ছিল একরাশ আনন্দ। আরিয়ান আর নীলিমা ছিল একে অপরের ছায়া। নীলিমা ছিল একটু ডানপিটে টাইপের। স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে সে আরিয়ানের টিফিন বক্স থেকে ডিম ভাজিটা চুরি করে খেয়ে ফেলত। আরিয়ান যখন রেগে যেত, নীলিমা তখন দুই কানে হাত দিয়ে এমনভাবে মুখভঙ্গি করত যে আরিয়ানের রাগ মুহূর্তেই জল হয়ে যেত।

আরিয়ান! এই শোন... নীলিমা বলেছিল সেদিন।

কী? আরিয়ান একটু বিরক্ত হওয়ার ভান করল।

যদি কোনোদিন আমি তোকে ছেড়ে চলে যাই, তুই কি আমার জন্য কাঁদবি?

আরিয়ান তখন বুঝতে পারেনি এই কথার ওজন। সে হাসতে হাসতে বলেছিল, কাঁদতে যাব কেন? তুই গেলে আমার ডিম ভাজিটা অন্তত আস্ত থাকবে!

নীলিমা হাসেনি। সে স্থির চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই চাহনিতে কী ছিল, আরিয়ান আজ সাতাশ বছর পর বারান্দায় বসে উপলব্ধি করতে পারছে। ওটা ছিল বিদায়ের প্রস্তুতি।

আরিয়ান খামটা খোলার জন্য হাত বাড়ালেন। তার হাত কাঁপছে। ভেতরে যে চিঠিটা আছে, সেটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য অথবা সবচেয়ে বড় মিথ্যার মুখোমুখি তাকে দাঁড় করিয়ে দেবে।

খামটা ছিঁড়তেই বের হয়ে এলো নীল রঙের একটা কাগজ। আরিয়ানের মনে হলো, এই কাগজটার নীল রঙ নীলিমার গায়ের ওড়নাটার মতো। যে ওড়নাটা সে শেষবার বিদায় বেলায় পরেছিল।

চিঠিটা পড়ার আগে আরিয়ান চোখ বন্ধ করলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনটা, যেদিন নীলিমারা কাউকে কিছু না জানিয়ে কলোনি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে আরিয়ান দেখেছিল নীলিমাদের জানালার পর্দাগুলো নেই। বারান্দায় রাখা নীলিমার প্রিয় কামিনী ফুলের গাছটা নেই। শুধু পড়ে ছিল একরাশ নীরবতা।

আরিয়ান চিঠির প্রথম লাইনটায় চোখ রাখলেন--

আরিয়ান, যখন তুই এটা পড়ছিস, তখন হয়তো আমি তোর ধরাছোঁয়ার বাইরে অনেক দূরে। তুই আমাকে স্বার্থপর ভাবছিস, তাই না? ভাবছিস, একটা বারের জন্য কেন তোকে বলে এলাম না? সত্যিটা হলো আরিয়ান, তোর চোখের দিকে তাকিয়ে বিদায় বলার সাহস আমার ছিল না..

আরিয়ানের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল।

বারান্দায় বসে আরিয়ান সাহেব যখন চিঠির দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় হাত রাখলেন, তখন সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে নেমেছে। পাশের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। এই শব্দটা শুনলেই আরিয়ানের বুকটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। আজিমপুর কলোনির সেই বিকেলগুলোতে আজান দেওয়ার সাথে সাথেই নীলিমার মা বারান্দা থেকে ডাক দিতেন— "নীলু, ঘরে আয়! সন্ধ্যাবেলায় বাইরে থাকতে নেই।

নীলিমা তখন আরিয়ানের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলত, "আরিয়ান, বড় হয়ে আমরা এমন একটা বাড়ি বানাব যেখানে কোনো মা থাকবে না, আজান দিলেই কেউ ভেতরে ডাকবে না। আমরা সারা সন্ধ্যা বারান্দায় বসে তারা গুনব।

আরিয়ান চিঠির পাতায় আঙুল বোলালেন। কাগজের ভাঁজে ভাঁজে নীলিমার গায়ের সেই হালকা বকুল ফুলের সুবাস যেন আজও লেগে আছে। তিনি পড়তে শুরু করলেন:

"আরিয়ান, মনে আছে আমাদের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের কথা? যেদিন তুই তোর নতুন সাইকেলটা নিয়ে কলোনির মাঠে এসেছিলি? আমি জেদ ধরেছিলাম তোর সাইকেলে চড়ব। তুই কত বারণ করলি, 'নীলিমা, পড়ে যাবি, হাত-পা ছিলে যাবে'। কিন্তু আমি তো চিরকালের একগুঁয়ে। যখন তোর সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে বসলাম, তুই খুব সাবধানে চালাচ্ছিলি। আমি তোর শার্টের পেছনটা শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম। সেই প্রথম আমি অনুভব করেছিলাম, একটা মানুষকে বিশ্বাস করে সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু কপাল দেখ আরিয়ান, যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম, তার ওপরই সবচেয়ে বড় অবিশ্বাসের বোঝা চাপিয়ে আমি চলে এলাম।"

চিঠির এই অংশটা পড়ে আরিয়ান থামলেন। তার স্পষ্ট মনে পড়ছে সেই দিনটার কথা। সাইকেল থেকে নামার পর নীলিমা একটা ছোট পাথর কুড়িয়ে নিয়ে আরিয়ানের সাইকেলের হ্যান্ডেলে একটা আঁচড় কেটে দিয়েছিল। বলেছিল, "এটা আমার চিহ্ন। এই সাইকেলটা এখন থেকে আমার।" আরিয়ান আজ ভাবছেন, সাইকেলটা অনেক আগেই ভাঙারি দোকানে বিক্রি হয়ে গেছে, কিন্তু নীলিমার দেওয়া সেই আঁচড়টা আজ সাতাশ বছর পর তার হৃদয়ে নতুন করে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।

চিঠির পাতায় আবার মন দিলেন তিনি:

"তোর হয়তো মনে আছে, আমাদের চলে যাওয়ার ঠিক তিন দিন আগে আমি স্কুলে আসিনি। তুই বিকেলে আমাদের বাসার নিচে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলি। আমি জানালা দিয়ে তোকে দেখছিলাম। আমার খুব ইচ্ছা করছিল চিৎকার করে ডাকি, তোকে বলি— আরিয়ান, আমি মরে যাচ্ছি! ডাক্তাররা বলেছে আমার রক্তে কী একটা বিষ ঢুকেছে, যেটার কোনো ওষুধ নেই। কিন্তু আমি তোকে দুর্বল করতে চাইনি। আমি চাইনি তুই আমার জন্য সারা জীবন এক মরণব্যাধি রোগীর স্মৃতি বয়ে বেড়াস। তাই বাবাকে বলেছিলাম, আমাদের বদলির ব্যবস্থা যেন দ্রুত করা হয়। আমি চেয়েছিলাম তুই আমাকে ঘৃণা করিস। কারণ ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকা সহজ, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকা নরক যন্ত্রণার চেয়েও কঠিন।"

আরিয়ানের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল চিঠির ওপর। সাতাশ বছর ধরে সে জেনে এসেছে নীলিমা তাকে অবজ্ঞা করে চলে গেছে। সে ভেবেছিল নীলিমা হয়তো কোনো বড়লোকের ছেলের সাথে প্রেম করে শহর ছেড়েছে। অপমানে, অভিমানে আরিয়ান নিজেও নিজেকে বদলে ফেলেছিল। রাত জেগে পড়াশোনা করে বড় ডাক্তার হয়েছে শুধু এটা প্রমাণ করতে যে— সে হেরে যায়নি।

কিন্তু আজ এই জীর্ণ নীল কাগজটা চিৎকার করে বলছে, আরিয়ানই সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছিল। নীলিমা যখন একা মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিল, আরিয়ান তখন তাকে ঘৃণা করার অজুহাত খুঁজছিল।

আরিয়ানের মনে পড়ল, নীলিমা একবার তার খাতায় একটা কবিতা লিখেছিল

"যদি আমি মেঘ হই, তবে বৃষ্টি হয়ে তোমার আঙিনায় ঝরিব।

যদি আমি বাতাস হই, তবে তোমার চুলে বিলি কেটে হারাব।

কিন্তু যদি আমি তোমার চোখের জল হই,

তবে যেন তোমার গাল বেয়ে কখনো না ঝরি,

আমি তোমার চোখের তারায় বন্দি হয়ে থাকতে চাই।"

আরিয়ান ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ফাঁকা বাড়িতে তার কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "কেন নীলু? কেন বললি না? আমি কি তোর সেই কষ্টের ভাগীদার হতে পারতাম না? কেন আমাকে অপরাধী করে রাখলি সারাটা জীবন?"

চিঠির পরের পাতায় যাওয়ার আগে আরিয়ান উঠে দাঁড়ালেন। বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেন। শহরের নিয়ন আলোগুলো আজ বড্ড বেশি ঝাপসা লাগছে। আরিয়ানের মনে হচ্ছে, তিনি যেন আবার সেই তেরো বছরের কিশোর হয়ে গেছেন, যে নীলিমার ফেরার অপেক্ষায় আজিমপুরের সেই গলির মোড়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

আরিয়ান সাহেব আজ আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটা টিক টিক শব্দ করে সময় বয়ে চলার জানান দিচ্ছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছে সময়টা সেই ১৯৯৮ সালে থমকে দাঁড়িয়েছে। তিনি আজ শুধু একজন ডাক্তার নন, আজ তিনি সেই কিশোর যে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ধ্রুবতারাকে হারিয়ে ফেলেছে।

চিঠির তৃতীয় পৃষ্ঠার রঙটা বাকিগুলোর চেয়ে কিছুটা ফ্যাকাশে। মনে হয় নীলিমা যখন এটা লিখেছিল, তখন তার কলমের কালির চেয়ে চোখের জল বেশি ঝরছিল। কাগজের কয়েকটা জায়গায় কালির লেখা লেপটে গেছে, ঠিক যেন এক একটা দীর্ঘশ্বাসের ছাপ।

আরিয়ান সাহেব চশমাটা মুছে আবার পড়তে শুরু করলেন:

"আরিয়ান, তোকে ছেড়ে আসার পর আমাদের নতুন ঠিকানা হয়েছিল ময়মনসিংহের এক নির্জন মফস্বল শহরে। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে একটা পুরনো আমলের বাড়ি। জানিস আরিয়ান, আমার জানালার ঠিক পাশেই একটা বিশাল কদম গাছ ছিল। যখন বৃষ্টি হতো, কদম ফুলের গন্ধে ঘর ভরে যেত। কিন্তু সেই সুবাস আমার নাকে আসত না। আমার নাকে তখন শুধু হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর কড়া ওষুধের গন্ধ লেগে থাকত। আমার রক্তে লোহিত কণিকাগুলো নাকি কমতে শুরু করেছিল— যেটাকে বড়রা বলে 'অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া' (Aplastic Anemia)।

মা সারাদিন জায়নামাজে বসে কাঁদতেন। বাবা অফিসে যেতেন না, শুধু ফোন করে কার সাথে যেন কথা বলতেন রক্তের সন্ধানে। আর আমি? আমি শুধু তাকিয়ে থাকতাম জানালার বাইরে। মাঝে মাঝে মনে হতো, এই বুঝি তুই সাইকেল চালিয়ে আমাদের গেটের সামনে এসে দাঁড়ালি! এই বুঝি চিৎকার করে বললি— 'নীলু, আয়! আজ আকাশটা ঠিক তোর গায়ের ওড়নাটার মতো নীল হয়ে আছে।' কিন্তু পরক্ষণেই মনে হতো, তুই হয়তো এখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিস, কিংবা আমাকে ঘৃণা করে আমার নামটা তোর ডায়েরি থেকে কেটে দিচ্ছিস। আরিয়ান, আমি সেই ঘৃণাটা চেয়েছিলাম, কারণ আমি জানতাম আমি ফিরব না। আমি চাইনি তুই কোনো মৃত মানুষের ছায়ার পেছনে নিজের যৌবনটা নষ্ট করিস।"

আরিয়ান সাহেবের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া! তিনি একজন ডাক্তার হিসেবে জানেন এই রোগটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক। শরীরে একটু টোকা লাগলেই রক্ত জমে যায়, হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে যায়। তিনি ভাবছেন, নীলিমা যখন যন্ত্রণায় ছটফট করত, তখন তিনি হয়তো কোনো এক ক্যাফেতে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলেন আর ভাবছিলেন— "মেয়েরা এমনই হয়, হুট করে হারিয়ে যায়।" নিজের ওপর এক তীব্র বিতৃষ্ণা জন্মালো তার।

 

চিঠির পাতায় নীলিমা আরও লিখেছে:

"জানিস আরিয়ান, আমাদের কলোনির সেই বকুল তলাটার কথা খুব মনে পড়ত। সেই যেবার আমরা অনেক বকুল ফুল কুড়িয়ে একটা মালা গেঁথেছিলাম? তুই বলেছিলি, এই মালাটা কোনোদিন শুকাবে না। কিন্তু দেখ, মালাটা শুকিয়ে গেছে, আর আজ আমিও শুকিয়ে যাচ্ছি। আমার চুলগুলো উঠে যাচ্ছে, হাতগুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আয়নায় নিজেকে দেখলে নিজেরই ভয় লাগে। তবু আমি একটা ডায়েরি লিখেছিলাম। সেই ডায়েরিতে শুধু তোর আর আমার ছোটবেলার গল্পগুলো ছিল। বাবা একদিন দেখে ফেলেছিলেন। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এত কেঁদেছিলেন যে আমি আর লিখতে পারিনি।

আমার শেষ ইচ্ছে ছিল তোকে একবার দেখার। কিন্তু ডাক্তাররা তখন আমাকে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছিল না। আমার ইনফেকশন হওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু আমি পাগল হয়ে উঠেছিলাম। বাবাকে বলেছিলাম— 'বাবা, আমাকে শুধু একবার আজিমপুর নিয়ে চলো। আমি আরিয়ানের সাথে কথা বলব না, শুধু দূর থেকে ওকে একবার দেখব।' বাবা রাজি হয়েছিলেন। সেই দিনটার কথা তোর মনে আছে আরিয়ান? ১৯৯৯ সালের এক কুয়াশাভেজা ডিসেম্বর।"

আরিয়ান থমকে গেলেন। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর? তার মনে পড়ে গেল এক হিমশীতল বিকেলের কথা। তখন তিনি ক্লাস টেনে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাসার সামনের চায়ের দোকানে বসে এককাপ চা খাচ্ছিলেন আর ভাবছিলেন নীলিমার কথা। হঠাৎ তার মনে হয়েছিল একটা ধূসর রঙের গাড়ি তাদের গলির মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়ির জানালার কাঁচটা একটু নামানো ছিল। আরিয়ানের মনে হয়েছিল কেউ একজন তাকে নিবিড়ভাবে দেখছে। তিনি যখন সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিল।

তিনি কি তবে সেদিন নীলিমাকেই দেখেছিলেন?

"হ্যাঁ আরিয়ান, আমি সেদিন ওই গাড়িটার ভেতরেই ছিলাম। তুই কালো রঙের একটা সোয়েটার পরেছিলি, তোর চুলগুলো একটু বড় হয়েছিল। তোকে দেখেই আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিল গাড়ি থেকে নেমে তোর হাতটা ধরে বলি— 'আরিয়ান, আমাকে বাঁচা! আমি মরতে চাই না।' কিন্তু আমি পারিনি। জানালার কাঁচটা তুলে দিয়ে আমি বাবাকে বললাম— 'বাবা,

চলো চলে যাই। ও এখন ভালো আছে।' আমি চাইনি তুই আমার সেই কঙ্কালসার চেহারাটা দেখিস। আমি চেয়েছিলাম তোর মনে আমার সেই চঞ্চল মুখটাই চিরকাল গেঁথে থাকুক।"

আরিয়ান সাহেব আর পড়তে পারলেন না। ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। সাতাশ বছর আগে সেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীলিমা তার হাতের নাগালে ছিল। তিনি চাইলে সেদিন গাড়িটা আটকাতে পারতেন। তিনি চাইলে পারতেন নীলিমার জীবনের শেষ কয়েকটা দিন রাঙিয়ে দিতে। কিন্তু নিয়তি তাকে সেই সুযোগ দেয়নি।

তিনি এখন ভাবছেন, তার এই সাজানো সংসার, এই খ্যাতি, এই অর্থ— সব কিছুর পেছনে কত বড় একটা শূন্যতা লুকিয়ে আছে। তিনি প্রতিদিন হাজার হাজার রোগীর প্রাণ বাঁচান, কিন্তু সাতাশ বছর আগে তার নিজের পৃথিবীটা যখন বিনা চিকিৎসায় মরে যাচ্ছিল, তখন তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

বারান্দার বাইরে এখন ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। আরিয়ানের মনে হচ্ছে, এই অন্ধকারটা আসলে সাতাশ বছর ধরেই তার ভেতরে ছিল, আজ এই নীল খামটা কেবল সেই অন্ধকারকে আলো দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

আরিয়ান সাহেব কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। রাতের বাতাসটা এখন আরও ঠান্ডা হয়ে এসেছে। ড্রয়িংরুমের আলোগুলো তিনি নেভানোই রেখেছেন, কারণ এই অন্ধকারের মধ্যেই তিনি নীলিমার উপস্থিতি বেশি অনুভব করছেন। চিঠির চতুর্থ পৃষ্ঠায় যাওয়ার আগে তিনি একটা লম্বা শ্বাস নিলেন। তার মনে হচ্ছে, তিনি কোনো কাগজের চিঠি পড়ছেন না, বরং নীলিমার আত্মা সাতাশ বছর পর তার সাথে কথা বলছে।

স্মৃতির নীল খাম

চিঠির এই অংশটা পড়তে গিয়ে আরিয়ান সাহেবের চোখে ঝাপসা হয়ে এল। কালির দাগগুলো এখানে খুব অস্পষ্ট, যেন কলম চালাতে গিয়ে লেখক বারবার থমকে গিয়েছেন। তিনি খুব সাবধানে অক্ষরগুলো জোড়া দিতে লাগলেন:

"আরিয়ান, ১৯৯৯ সালের সেই শেষ দেখার পর আমি যখন ময়মনসিংহ ফিরে গেলাম, তখন আমি জানতাম আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। আমার শরীরে তখন আর কোনো শক্তি ছিল না। জানিস, মানুষ যখন জানে সে মারা যাচ্ছে, তখন তার চারপাশের তুচ্ছ জিনিসগুলোও অনেক দামী মনে হয়। আমি আমার পড়ার টেবিলটা, জানালার গ্রিলটা, এমনকি বালিশের পাশের সেই পুরোনো পুতুলটাকেও জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম। আমার খুব হিংসে হতো সেই পাখিগুলোর ওপর যারা রোজ সকালে আমার জানালার কার্নিশে এসে বসত। ভাবতাম, ওরা তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু আমি থাকব না।

আমার শেষ কটা দিন শুধু তোর স্মৃতির ওপর ভর করে কেটেছে। মনে আছে আরিয়ান, ক্লাস এইটে পড়ার সময় একদিন বৃষ্টিতে ভিজে তুই আমার জন্য একটা আইসক্রিম এনেছিলি? আইসক্রিমটা গলে জল হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তোর সেই ভেজা মুখ আর কাঁপাকাঁপা হাতে ধরা আইসক্রিমের কাঠিটা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী উপহার ছিল। সেই দিনের কথা মনে করে আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে হাসতাম। নার্সরা ভাবত আমি পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু আমি জানতাম, আমি পাগল হইনি, আমি শুধু তোর ভালোবাসার শক্তিতে টিকে থাকার চেষ্টা করছিলাম।"

আরিয়ান সাহেবের মনে পড়ল সেই দিনটার কথা। আইসক্রিমটা গলে যাওয়ার পর নীলিমা বলেছিল— "গাধা, আইসক্রিম তো গলে গেল, এখন কী খাব?" আরিয়ান তখন লাজুক হেসে বলেছিল— "গলে গেছে তো কী হয়েছে? জলটুকু তো মিষ্টি!" সেদিন তারা সেই গলানো আইসক্রিম ভাগ করে খেয়েছিল। আজ আরিয়ান সাহেবের মনে হচ্ছে, জীবনটাও সেই আইসক্রিমের মতোই। হাতে থাকতে থাকতে গলে গেল, শুধু পড়ে রইল নোনা জলের মতো কিছু স্মৃতি।

চিঠির পরের প্যারাগ্রাফটা আরও মর্মস্পর্শী:

"২০০০ সালের ২০শে আগস্ট। শ্রাবণের শেষ রাত। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। জানিস আরিয়ান, আমার খুব ইচ্ছে ছিল সেই বৃষ্টির দিনে তোর সাথে একবার ছাদে গিয়ে ভিজব। আমি বাবাকে বললাম— 'বাবা, আমাকে একটু বারান্দায় নিয়ে চলো না? আকাশটা দেখব।' বাবা আমার অবস্থা দেখে না করতে পারেননি। অক্সিজেন সিলিন্ডারটা সাথে নিয়ে বাবা আমাকে হুইলচেয়ারে করে বারান্দায় নিয়ে গেলেন। বৃষ্টির ঝাপটা যখন আমার মুখে লাগছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল তুই আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছিস। তুই আমার হাত ধরে বলছিস— 'নীলু, আর একটু ধৈর্য ধর, সব ঠিক হয়ে যাবে।'

কিন্তু কিছু ঠিক হয়নি আরিয়ান। সেই রাতটাই ছিল আমার শেষ রাত। আমি জানতাম আমি আর কালকের সূর্য দেখব না। তাই ওই রাতেই আমি এই নীল খামটা শেষ করি। আমার কাঁপাকাঁপা হাতে লেখা এই শব্দগুলো হয়তো তোকে অনেক কষ্ট দিচ্ছে, কিন্তু আমি চাই তুই সত্যটা জানিস। আমি চাই তুই জানিস যে, নীলিমা তোকে কোনোদিন ছেড়ে যায়নি, বরং সে তোর ভালোবাসার চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। বাবা আমাকে কথা দিয়েছিলেন, এই খামটা কোনোভাবে তোর কাছে পৌঁছে দেবেন। জানি না কত বছর পর তুই এটা পাবি, কিন্তু যখনই পাবি, মনে রাখবি— পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে একটা মেয়ে ছিল যে তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোর নামটা বিড়বিড় করে বলে গেছে।

চিঠিটা এখানেই শেষ হয়নি, কিন্তু আরিয়ান সাহেবের পড়ার শক্তি আর নেই। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তার কান্না এখন আর কোনো সামাজিক লোকলজ্জার তোয়াক্কা করে না। তিনি ভাবছেন, ২০শে আগস্ট ২০০০ সাল— ওই দিন তিনি কী করছিলেন? ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে তিনি মনে করার চেষ্টা করলেন। হ্যাঁ, সেদিন তার মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের রেজাল্ট দিয়েছিল। তিনি বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন, রেস্টুরেন্টে খেয়েছিলেন। অথচ ঠিক সেই রাতেই, মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে, তার প্রিয় মানুষটি অক্সিজেন মাস্কের নিচে তার নাম নিতে নিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিল।

অসহ্য এক অপরাধবোধ আরিয়ান সাহেবকে গ্রাস করল। তিনি একজন ডাক্তার হিসেবে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন। তিনি কেন তখন নীলিমার রোগের কথা বুঝতে পারেননি? কেন তিনি আরও একটু খোঁজ নেননি?

হঠাৎ তার মনে পড়ল, চিঠির সাথে নীলিমা একটা ঠিকানার কথা লিখেছে। ময়মনসিংহের সেই পুরোনো বাড়িটার ঠিকানা। যেখানে নীলিমার দাদী এখনও বেঁচে থাকতে পারেন, অথবা হয়তো নীলিমার কোনো স্মৃতি চিহ্ন সেখানে রয়ে গেছে। আরিয়ান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখের দৃষ্টি এখন স্থির। সাতাশ বছর পর তিনি এক নতুন গন্তব্য খুঁজে পেয়েছেন।

তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "আমি আসছি নীলু। অনেক দেরি হয়ে গেছে জানি, কিন্তু আমি আসছি। তোর সেই বকুল ফুলের গন্ধমাখা ডায়েরিটা আমাকে খুঁজে পেতেই হবে।"

তিনি দ্রুত আলমারি থেকে তার গাড়ির চাবি আর একটা ছোট ব্যাগ নিলেন। রাত এখন ১২টা। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে এখন ভোর। যে ভোরের আলো তাকে নীলিমার শেষ স্মৃতিটুকুর কাছে নিয়ে যাবে।

আরিয়ান সাহেব গভীর রাতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ঢাকার ফাঁকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন তিনি। সামনের হেডলাইটের আলোয় কুয়াশা আর ধুলোর আস্তরণ চিরে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন এক অজানা গন্তব্যে, যেখানে তার সাতাশ বছরের জমানো প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে।

ভোরের দিকে আরিয়ান সাহেবের গাড়ি যখন ময়মনসিংহের সীমানায় ঢুকল, তখন পুব আকাশে হালকা লালিমা দেখা দিয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে নীলিমার সেই শেষ চিঠির কথা— "শ্রাবণের শেষ রাত"। আজ শ্রাবণ নয়, কিন্তু প্রকৃতিতে যেন এক ধরণের হাহাকার মিশে আছে।

চিঠিতে লেখা সেই ঠিকানা খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট হলো না। শহরের এক কোণে, নদীর কাছাকাছি একটা নিরিবিলি পাড়ায় বাড়িটি। পুরনো ধাঁচের একতলা দালান, নোনা ধরা দেয়ালে শ্যাওলার আস্তরণ। গেটের সামনে বিশাল এক কদম গাছ— ঠিক যেমনটা নীলিমা বর্ণনা করেছিল।

আরিয়ান সাহেব কম্পিত হাতে গেটের বেল চাপলেন। অনেকক্ষণ পর একজন বৃদ্ধ মানুষ গেট খুললেন। তার পিঠ কুঁজো হয়ে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালি। তিনি আরিয়ান সাহেবের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।

"কাকে খুঁজছেন বাবা?" বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত দুর্বল।

আরিয়ান সাহেবের গলা শুকিয়ে এল। তিনি পকেট থেকে সেই নীল খামটা বের করে দেখালেন। "আমি আরিয়ান। ঢাকা থেকে এসেছি। নীলিমা... নীলিমা কি এখানে থাকত?"

'নীলিমা' নামটা শুনতেই বৃদ্ধের চোখে যেন এক চিলতে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তিনি কয়েক মুহূর্ত স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ আরিয়ানের হাতটা চেপে ধরলেন। তার হাত কাঁপছে। "তুমি আরিয়ান? নীলুর সেই আরিয়ান? বাবা রে, তুমি আসতে এত দেরি করলে কেন? আমার নাতনিটা তো সাতাশ বছর ধরে তোমার পথ চেয়ে ওই বকুল তলায় শুয়ে আছে।"

বৃদ্ধ ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ইনি নীলিমার দাদা। আরিয়ান সাহেব বুঝতে পারলেন, নীলিমার বাবা-মা হয়তো আর বেঁচে নেই বা অন্য কোথাও চলে গেছেন, কিন্তু এই বৃদ্ধ আজও স্মৃতি আগলে এই জীর্ণ বাড়িতে পড়ে আছেন।

বৃদ্ধ আরিয়ানকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। ঘরটি বড়ই বিষণ্ণ। ধুলো জমা আসবাবপত্র আর দেয়ালে টাঙানো নীলিমার একটা বড় বাঁধানো ছবি। ছবিতে নীলিমা হাসছে— সেই চিরচেনা অমলিন হাসি। তার গলায় একটা বকুল ফুলের মালা। আরিয়ান সাহেবের মনে হলো, ছবিটা যেন কথা বলে উঠবে।

"বোসো বাবা," বৃদ্ধ একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন। "নীলুর বাবা-মা ওর মৃত্যুর দুই বছর পর শোক সইতে না পেরে দেশ ছেড়ে চলে যায়। তারা এখন কানাডায়। কিন্তু আমি যেতে পারিনি। আমি যে নীলুকে এখানে একা ফেলে যেতে পারব না। ও বলেছিল— 'দাদাভাই, আরিয়ান একদিন আসবেই। ও যখন আসবে, ওকে আমার এই ডায়েরিটা দিও।'"

বৃদ্ধ আলমারির ভেতর থেকে মখমলে মোড়ানো একটি লাল রঙের ডায়েরি বের করে আনলেন। ডায়েরিটা আরিয়ানের হাতে দিতেই তার মনে হলো তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তুটা স্পর্শ করছেন।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা:

"আজ ২রা মে, ১৯৯৯। আরিয়ানকে ছাড়া আমার আজ তিন মাস হলো। আকাশটা আজ খুব নীল, ঠিক যেমন ওর শার্টের রঙ ছিল শেষ যেদিন ওকে দেখেছিলাম। আমি জানি আমি আর বেশিদিন নেই। কিন্তু এই ডায়েরিটা থাকবে। আরিয়ান, যদি কোনোদিন এটা তোর হাতে পড়ে, তবে জানবি— আমি তোকে ঘৃণা করে আসিনি, আমি তোকে ভালোবেসে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম।"

আরিয়ান সাহেব ডায়েরির পাতা ওল্টাতে লাগলেন। প্রতিটি পাতায় নীলিমা তার প্রতিদিনের যন্ত্রণার কথা লিখেছে, কিন্তু সেই যন্ত্রণার চেয়েও বেশি ছিল আরিয়ানের প্রতি তার আকুলতা। একটা পাতায় লেখা ছিল:

"আজ খুব রক্তবমি হলো। খুব ভয় পাচ্ছিলাম। মা পাশে বসে কাঁদছিল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, যদি আরিয়ান একবার এসে আমার হাতটা ধরত, তবে হয়তো সব ব্যাথা মুছে যেত। ও কি খুব রাগ করে আছে? ও কি জানে না আমি ওর ওপর রাগ করে থাকতে পারি না?"

আরিয়ান সাহেবের চোখের জল ডায়েরির পাতার ওপর টপ টপ করে পড়ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, সাতাশ বছর ধরে তিনি যে সাফল্য আর আভিজাত্যের পাহাড় গড়েছেন, তা এই জীর্ণ ডায়েরির একটা শব্দের কাছেও নগণ্য। তিনি একজন ডাক্তার হিসেবে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না।

হঠাৎ তার চোখ গেল ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায়। সেখানে একটি ছোট মানচিত্র আঁকা। বাড়ির পেছনের বাগানের মানচিত্র। নিচে লেখা— "বকুল তলার নিচে আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া সময়টা গেঁথে রেখেছি।"

আরিয়ান সাহেব দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ছুটলেন বাড়ির পেছনের বাগানে। সেখানে একটি বিশাল পুরনো বকুল গাছ। গাছের নিচে একটি ছোট কবর, সাদা মার্বেল পাথরে বাঁধানো। কবরের ওপর লেখা— "নীলিমা (১৯৮৪-২০০০)"। কবরের পাশে একটা ছোট গর্তের চিহ্ন, যেন কেউ সেখানে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছিল।

বৃদ্ধ পেছন থেকে এসে বললেন, "নীলু যাওয়ার আগে একটা কাঁচের বয়ামে করে তোমাদের ছোটবেলার কিছু জিনিস এখানে পুঁতে রেখেছিল। ও বলেছিল, তুমি এলে এটা তুলে নিতে।"

আরিয়ান সাহেব নিজের হাতে মাটি সরাতে লাগলেন। কিছুটা গভীরে যেতেই তার হাতে ঠেকল একটা শক্ত বস্তু। একটি কাঁচের বয়াম। ভেতরে কয়েকটা শুকনো বকুল ফুল, একটা প্লাস্টিকের আংটি (যা আরিয়ান তাকে মেলা থেকে কিনে দিয়েছিল), আর একটা চিরকুট।

চিরকুটে লেখা— "আরিয়ান, আমরা আবার দেখা করব। এই জন্মে না হোক, অন্য কোনো এক শ্রাবণের রাতে, যেখানে কোনো রোগ থাকবে না, কোনো দূরত্ব থাকবে না। শুধু তুই আর আমি থাকব।"

আরিয়ান সাহেব কবরের পাশে মাটির ওপর বসে পড়লেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। সাতাশ বছরের জমানো পাথরটা আজ গলে জল হয়ে নেমে আসছে।

আরিয়ান সাহেব সেই বকুল তলায় কতক্ষণ বসে ছিলেন, তার হিসেব নেই। তার প্যান্টের হাঁটুতে কাদা লেগেছে, দামি ঘড়িটা কবরের পাশের ঘাসে ঘষা খেয়ে দাগ পড়ে গেছে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। জীবনের সাতাশটা বছর তিনি যে হৃদরোগীর চিকিৎসা করেছেন, আজ অনুভব করছেন তার নিজের হৃদপিণ্ডটাই যেন একটা জীর্ণ খাঁচা, যার ভেতরটা শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে।

বৃদ্ধ দাদামশাই খুব ধীর পায়ে আরিয়ানের পাশে এসে বসলেন। তার শীর্ণ হাতটা আরিয়ানের কাঁধে রাখলেন। এই স্পর্শে যেন এক ধরণের অদ্ভুত সান্ত্বনা ছিল। বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন, "বাবা আরিয়ান, নীলু যখন ওর শেষ দিনগুলোতে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেত, তখন ও কাউকে কাছে ঘেঁষতে দিত না। শুধু বালিশের নিচে তোমার দেওয়া সেই পুরোনো ছবিটা বের করে রাখত। ছবিটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল ওর চোখের জলে। ও বলত— 'দাদাভাই, আরিয়ান একদিন বড় ডাক্তার হবে। ও তখন কত মানুষের কষ্ট দূর করবে, তাই না?'"

আরিয়ান সাহেবের বুকটা চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, "দাদামশাই, আমি কেমন ডাক্তার? আমি তো ওকে বাঁচাতে পারিনি! এমনকি ও যে ধুঁকে ধুঁকে মরছে, আমি সেই খবরটাও জানতাম না। আমি ওকে ঘৃণা করেছি দাদামশাই, প্রতিটা দিন আমি ওকে স্বার্থপর ভেবে গালি দিয়েছি। এই পাপ আমি কোথায় রাখব?

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালেন। "মানুষের জীবনটা বড্ড অদ্ভুত বাবা। আমরা যেটা ভাবি, সেটা হয় না। আর যেটা হয়, সেটার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি না। নীলু তোমাকে ঘৃণা পেতে চেয়েছিল যাতে তুমি ওকে ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে পারো। ও নিজের বুকটা পুড়িয়ে তোমাকে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দিয়ে গেছে। তোমার এই সফলতা, এই ডাক্তার হওয়া— এর পেছনে ওর সেই নীরব আত্মত্যাগ মিশে আছে। তুমি যদি এখন ভেঙে পড়ো, তবে তো ওর সেই ত্যাগটা বৃথা হয়ে যাবে।"

আরিয়ান সাহেব কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। বৃদ্ধের কথাগুলো তার কানে মন্ত্রের মতো বাজতে লাগল। তিনি ডায়েরিটা আবার খুললেন। মাঝখানের একটা পাতায় নীলিমা লিখেছে:

"আজ খুব ইচ্ছে করছে আরিয়ানের কানে কানে একটা কথা বলতে। যদি ও কোনোদিন অনেক বড় মানুষ হয়, তবে ও যেন আমার মতো গরিব রোগীদের জন্য একটা ছোট হাসপাতাল বানায়। যেখানে কেউ টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মরবে না। আমি তো চলে যাচ্ছি, কিন্তু আমার মতো কোনো নীলু যেন ওর আরিয়ানকে ছেড়ে অকালে চলে না যায়।"

আরিয়ান সাহেবের মনে হলো, নীলিমা যেন কবর থেকে উঠে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো বলছে। তিনি সাতাশ বছর ধরে শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়েছেন, নাম-যশ কামিয়েছেন। কিন্তু নীলিমার এই শেষ ইচ্ছাটার কথা কোনোদিন ভাবেননি। তার মনে হলো, এটাই হয়তো তার মুক্তির পথ।

"দাদামশাই," আরিয়ান সাহেব শান্ত গলায় বললেন, "আপনি কি আমার সাথে ঢাকা যাবেন?"

বৃদ্ধ হাসলেন, তবে সেই হাসিতে ছিল বিষণ্ণতা। "না বাবা। আমার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আমি নীলুর এই কবরটা ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না। আমি থাকলে ওর কবরে অন্তত প্রতিদিন এক মুঠো বকুল ফুল তো পড়বে। আমি মরে গেলে এই কবরটা হয়তো জঙ্গলে ঢেকে যাবে। আমি সেই দিনের অপেক্ষা করছি, যেদিন আমি ওর পাশে গিয়ে শোব।"

আরিয়ান সাহেবের চোখ আবার ভিজে উঠল। তিনি বুঝলেন, এই বৃদ্ধই গত সাতাশ বছর ধরে নীলিমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তার স্মৃতিতে। তিনি পকেট থেকে ফোন বের করলেন। মিতার (তার স্ত্রী) কথা মনে পড়ল। মিতা তাকে ভালোবাসে, কিন্তু সে কোনোদিন আরিয়ানের এই অতীতে বাস করা কিশোরকে দেখেনি। আরিয়ান ঠিক করলেন, তিনি আর লুকোবেন না। তিনি মিতাকে সব বলবেন। নীলিমা তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাকে অস্বীকার করা মানে নিজেকেই অস্বীকার করা।

তিনি ডায়েরি আর সেই কাঁচের বয়ামটা সযত্নে ব্যাগে রাখলেন। তারপর নীলিমার কবরের ওপর হাত রেখে বিড়বিড় করে বললেন, "নীলু, আমি তোকে কথা দিচ্ছি— তোর এই শেষ ইচ্ছা আমি পূরণ করব। আমি তোর নামে একটা ফাউন্ডেশন করব, একটা ছোট ক্লিনিক করব এই ব্রহ্মপুত্রের পাড়েই। তুই আমাকে মাফ করে দিস রে। আমি তোকে চিনতে ভুল করেছিলাম।"

সূর্য তখন মাথার ওপর উঠে এসেছে। আরিয়ান সাহেব যখন গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ তার মনে হলো যেন বাতাসের সাথে ভেসে আসছে সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর— "গাধা একটা! এত দেরি করলি আসতে?

আরিয়ান সাহেব একবার পেছন ফিরে তাকালেন। কদম গাছের তলায় বাতাসের দোলায় ঝরে পড়া ফুলগুলো যেন তাকে বিদায় জানাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি আজ একা ফিরছেন না; তার সাথে ফিরেছে এক কিশোরীর অনন্ত ভালোবাসা এবং এক নতুন জীবনের উদ্দেশ্য।

আরিয়ান সাহেব অনুভব করছেন, তিনি যেন জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে পা রেখেছেন যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই নীলিমার অদৃশ্য অস্তিত্ব তাকে পথ দেখাচ্ছে। ময়মনসিংহে হাসপাতালের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু এর মাঝেই ডায়েরির সেই রহস্যময় শেষ পাতাটি তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

হাসপাতালের কাজ তদারকি করতে আরিয়ান সাহেব এখন প্রায়ই ময়মনসিংহে থাকেন। নদীর ধারের সেই জীর্ণ বাড়িটি তিনি মেরামত করে নিয়েছেন। মিতাও এখন মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে থাকে। আশ্চর্যজনকভাবে, মিতা আর নীলিমার দাদামশাইয়ের মধ্যে এক চমৎকার সখ্যতা তৈরি হয়েছে। দাদামশাই মিতাকে এখন 'নীলুর বোন' বলে ডাকেন।

এক বর্ষণমুখর রাতে আরিয়ান সাহেব একা বসে নীলিমার সেই লাল ডায়েরিটা আবার পড়ছিলেন। হঠাৎ তার নজরে এল ডায়েরির একদম শেষ কভারের সাথে একটা পাতলা কাগজ আঠা দিয়ে আটকানো। সাতাশ বছরেও কেউ এটা খেয়াল করেনি। আরিয়ান সাহেব খুব সাবধানে ব্লেড দিয়ে কাগজটি আলাদা করলেন।

ভেতরে ছোট ছোট অক্ষরে নীলিমা লিখেছে:

"আরিয়ান, জানি না এই কথাটা বলা ঠিক হবে কি না। কিন্তু আমার খুব ভয় হয়। আমার অসুখটা যখন ধরা পড়ে, তখন বাবা আমাকে ময়মনসিংহে নিয়ে আসার আগে ঢাকার এক বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ডাক্তার আমায় দেখে খুব অবাক হয়েছিলেন। তিনি বাবাকে আড়ালে ডেকে কী যেন বলেছিলেন। বাবা তখন খুব কান্নাকাটি করেছিলেন। পরে আমি বাবার ড্রয়ারে একটা রিপোর্ট দেখেছিলাম, সেখানে আমার নামের পাশে একটা অদ্ভুত শব্দ লেখা ছিল— 'মিডিক্যাল নেগলিজেন্স'। আরিয়ান, আমার মনে হয় ছোটবেলায় আমার যখন একবার অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশন হয়েছিল, তখন কোনো একটা ভুল হয়েছিল। আমি জানি না সত্যটা কী, কিন্তু আমার মনে হয় আমি কোনো অসুখে নয়, বরং কারো অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছি।"

আরিয়ান সাহেবের হাতের ডায়েরিটা ধপ করে ফ্লোরে পড়ে গেল। তার সারা শরীর কাঁপছে। একজন কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে তিনি জানেন, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া অনেক সময় ভুল রক্ত সঞ্চালন বা ভুল ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও হতে পারে। সাতাশ বছর পর এক ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি। নীলিমা কি তবে শুধু ভাগ্যের শিকার ছিল না? সে কি ছিল কোনো এক পেশাদারী ভুলের শিকার?

তিনি দ্রুত নীলিমার বাবাকে ফোন করলেন কানাডায়। দীর্ঘ চেষ্টার পর তাকে পাওয়া গেল।

"চাচা, নীলিমার কি ছোটবেলায় কোনো অপারেশন হয়েছিল? ওর অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হওয়ার আগে?"

ওপার থেকে নীলিমার বাবা দীর্ঘ নীরবতা পালন করলেন। তারপর ভারী গলায় বললেন, "হ্যাঁ বাবা। ১৯৯৭ সালে ওর একবার অ্যাপেন্ডিক্স হয়েছিল। তখন আজিমপুরের এক ছোট ক্লিনিকে ওর অপারেশন হয়। অপারেশনের পর ওর শরীর খুব খারাপ হতে থাকে। আমরা সেই ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদের উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। আমাদের তখন টাকা ছিল না, ক্ষমতা ছিল না আরিয়ান। আমরা ভয়ে চুপ করে গিয়েছিলাম।"

"সেই ডাক্তারের নাম মনে আছে আপনার?" আরিয়ানের কণ্ঠস্বর এখন ইস্পাতের মতো শক্ত।

"নামটা ছিল ডাক্তার শওকত। এখন তো তিনি শহরের অনেক নামী ডাক্তার।"

নামটা শুনতেই আরিয়ান সাহেবের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। ডাক্তার শওকত! তিনি আর কেউ নন, আরিয়ান যে হাসপাতালে প্র্যাকটিস করেন, সেই হাসপাতালের বর্তমান চেয়ারম্যান। যাকে আরিয়ান এতোদিন আদর্শ মেনে এসেছেন।

প্রতিশোধের নেশা আরিয়ানের মাথায় কোনোদিন ছিল না, কিন্তু আজ নীলিমার সেই শেষ কথাগুলো তার কানে বিষের মতো বাজছে। নীলিমা বিচার পায়নি, সে অভিমানে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। আরিয়ান আজ বুঝতে পারলেন, শুধু হাসপাতাল বানালেই নীলিমার আত্মা শান্তি পাবে না, সাতাশ বছর আগের সেই অবিচারের মুখোশ খুলে দেওয়াটাও তার দায়িত্ব।

পরদিন আরিয়ান সাহেব সরাসরি ডাক্তার শওকতের কেবিনে গিয়ে ঢুকলেন। হাতে সেই পুরোনো ফাইল আর ডায়েরির পাতা।

শওকত সাহেব তখন আয়েশ করে কফি খাচ্ছিলেন। আরিয়ানকে দেখে হাসলেন। "কী আরিয়ান সাহেব? আপনার সেই ময়মনসিংহের প্রজেক্ট কতদূর?"

আরিয়ান কোনো ভণিতা না করে ফাইলটা তার টেবিলের ওপর রাখলেন। "১৯৯৭ সাল। আজিমপুর 'সেবা ক্লিনিক'। নীলিমা আক্তার। মনে পড়ে ডাক্তার?"

শওকত সাহেবের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার হাত থেকে কফির কাপটা কেঁপে উঠল। "এসব কী বলছ আরিয়ান? পুরোনো কথা তুলে লাভ কী?"

"লাভ আছে ডাক্তার। কারণ আপনি আপনার ভুলের প্রমাণ লোপাট করার জন্য এক মধ্যবিত্ত পরিবারকে গ্রাম ছাড়া করেছিলেন। আপনি জানতেন আপনার ভুল রক্ত সঞ্চালনের কারণে মেয়েটার হাড়ের মজ্জা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আপনি সেদিন শুধু একজন রোগীকে মারেননি, আপনি আমার নীলিমাকে মেরেছিলেন!"

আরিয়ানের গলার স্বর পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। নার্স আর অন্য ডাক্তাররা ভিড় করতে শুরু করল।

"তোমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই আরিয়ান!" শওকত সাহেব চিৎকার করে উঠলেন।

"প্রমাণ আমার কাছে নেই, কিন্তু সাতাশ বছরের জমানো এই চোখের জলে আছে।" আরিয়ান তার মোবাইলটা বের করলেন। তিনি জানতেন এই লোকটা অস্বীকার করবে, তাই তিনি কথাগুলো রেকর্ড করে রেখেছিলেন।

সেই বিকেলেই আরিয়ান সাহেব বিএমডিসি (BMDC) এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেন। তার ক্যারিয়ার এখন হুমকির মুখে। হাসপাতালের সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গেল। কিন্তু মিতা তার পাশে এসে দাঁড়াল।

মিতা বলল, "আরিয়ান, আজ তোমাকে দেখে নীলিমা নিশ্চয়ই হাসছে। সে জানত তুমিই একদিন ওর হয়ে লড়বে।"

হাসপাতালের কাজ আপাতত থমকে গেছে আইনি জটিলতায়। আরিয়ান সাহেব ময়মনসিংহে নীলিমার কবরের পাশে গিয়ে বসলেন। আজ আকাশটা ঠিক তেমনই নীল, যেমনটা নীলিমার ওড়না ছিল। তিনি কবরের মাটিতে হাত রেখে বললেন, "নীলু, বিচার পেতে একটু দেরি হয়ে গেল। কিন্তু এবার তুই শান্তিতে ঘুমা। আমি আসছি তোর সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে।"

আরিয়ান সাহেব এখন এক অগ্নিনিলীক্ষায় দাঁড়িয়ে। একদিকে তার দীর্ঘ সাতাশ বছরের গড়া পেশাদার সম্মান, অন্যদিকে তার কিশোরবেলার পবিত্র ভালোবাসার কাছে দায়বদ্ধতা। হাসপাতালের করিডোর থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্রই তখন একটাই আলোচনা: "বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট আরিয়ান কেন সাতাশ বছর আগের এক মৃত কিশোরীর জন্য নিজের ক্যারিয়ার বাজি ধরলেন?"

মামলাটা যখন আদালতে উঠল, তখন চারদিকে ব্যাপক আলোড়ন। ডাক্তার শওকত সাহেব তার টাকার জোরে বড় বড় উকিল নিয়োগ করলেন। তারা আরিয়ান সাহেবকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগলেন।

"মহামান্য আদালত, ডাক্তার আরিয়ান একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ। তিনি সাতাশ বছর আগের এক কাল্পনিক প্রেমের গল্প শুনিয়ে আমার মক্কেলের সম্মানহানি করছেন। তার কাছে কোনো অকাট্য মেডিকেল রিপোর্ট নেই, আছে শুধু এক কিশোরীর ডায়েরি। ডায়েরি কি কোনো প্রমাণ হতে পারে?" উকিলের বিদ্রূপাত্মক হাসি আরিয়ান সাহেবের কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছিল।

আরিয়ান সাহেব শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি জানতেন, বিজ্ঞান আর আইনের মারপ্যাঁচে নীলিমার কান্না হয়তো হেরে যাবে। কিন্তু হঠাৎ করেই এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল।

আদালতের দরজায় এক জীর্ণশীর্ণ বৃদ্ধা এসে দাঁড়ালেন। তার হাতে একটি পুরনো প্লাস্টিকের ফাইল। ইনি সেই 'সেবা ক্লিনিক'-এর তৎকালীন আয়া, রহিমা বানু। সাতাশ বছর আগে ডাক্তার শওকত তাকে ভয় দেখিয়ে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিলেন কারণ তিনি সব জানতেন।

রহিমা বানু কাঁপাকাঁপা গলায় সাক্ষ্য দিলেন, "সেদিন ডাক্তার সাহেব তাড়াহুড়ো করে ভুল গ্রুপের রক্ত নীলু মার শরীরে দিয়েছিলেন। আমি যখন বাধা দিছিলাম, তখন উনি আমারে গলা ধাক্কা দিয়া বাইর কইরা দিছিলেন। যাওয়ার সময় আমি এই রেকর্ড ফাইলটা চুরি কইরা নিয়া গেছিলাম, যদি কোনোদিন বিচার হয়।"

পুরো আদালত কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সেই ফাইলে নীলিমার সেই ভুল রক্ত সঞ্চালনের প্রতিটি তথ্য নথিবদ্ধ ছিল। ডাক্তার শওকতের ফ্যাকাশে মুখ দেখে বোঝা গেল, সত্যের কাছে আজ অহংকার নতজানু। বিচারক রায় দিলেন— ডাক্তার শওকতের লাইসেন্স বাতিল এবং তাকে আইনি হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।

আদালত থেকে বের হয়ে আরিয়ান সাহেব আকাশের দিকে তাকালেন। অদ্ভুতভাবে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তার মনে হলো, বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা যেন নীলিমার পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।

ময়মনসিংহের "নীলিমা মেমোরিয়াল কেয়ার" হাসপাতালের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। উদ্বোধনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। আরিয়ান সাহেব একা বসে আছেন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। দাদামশাই গত রাতে ঘুমের মধ্যেই মারা গেছেন। নীলিমার ঠিক পাশেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। আরিয়ান এখন এই পৃথিবীতে নীলিমার একমাত্র স্মৃতিবাহক।

মিতা এসে পাশে বসল। "আরিয়ান, হাসপাতালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটা বিশেষ অতিথি আসছেন। আমি তাকে খুঁজে বের করেছি।"

আরিয়ান অবাক হলেন। "কে?"

"নীলিমার সেই স্কুল শিক্ষিকা, সুলতানা আপা। মনে আছে? যিনি তোমাদের দুজনকে একসাথে দেখলে হাসতেন?"

আরিয়ানের চোখে জল চলে এল। সুলতানা আপা মানেই তো শৈশবের সেই হারানো ক্লাসরুম।

উদ্বোধনের দিন হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ফুলে ফুলে সাজানো হলো। নীলিমার ছবিটাকে বকুল ফুল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সুলতানা আপা যখন ফিতা কাটতে এলেন, তার হাতে একটি পুরনো খাম। তিনি আরিয়ানের মাথায় হাত রেখে বললেন, "আরিয়ান, তুই আমার ছাত্র হিসেবে আজ আমাকে গর্বিত করলি। নীলু তোকে এই কথাটা পৌঁছে দিতে বলেছিল, কিন্তু তখন তুই চলে গিয়েছিলি।"

তিনি খামটা খুললেন। ভেতরে একটি ছোট্ট চিরকুট, ১৯৯৮ সালের সেই শেষ স্কুলের দিনে নীলিমা সুলতানা আপার কাছে রেখে গিয়েছিল।

লেখা ছিল— "আপা, আরিয়ানকে বলবেন, বড় হয়ে ও যেন ওর চোখের জলগুলো দিয়ে অন্য কারো জীবনের আগুন নেভায়। ও যেন কাঁদতে না পারে, শুধু হাসাতে পারে।"

আরিয়ান সাহেব সুলতানা আপার পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, নীলিমা তাকে শুধু ভালোই বাসেনি, তাকে একজন ভালো মানুষ হওয়ার পথ দেখিয়ে গেছে।

কিন্তু ওই রাতে হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে আরিয়ান সাহেবের সাথে এমন এক ঘটনা ঘটল, যা বিজ্ঞানের কোনো সংজ্ঞায় ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি দেখলেন, নতুন আইসিইউ-র জানালার পাশে এক কিশোরী দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সেই নীল ওড়না, হাতে একগুচ্ছ বকুল। মেয়েটি একবার আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে হাসল— সেই অমলিন, স্বর্গীয় হাসি। আরিয়ান সাহেব যখন কাছে গেলেন, সেখানে কেউ নেই। শুধু বাতাসে ভেসে আসছে বকুল ফুলের তীব্র সুবাস।

আরিয়ান সাহেব হাসলেন। তিনি জানেন, নীলিমা এই হাসপাতালেই থাকবে। প্রতিটি রোগীর সেরে ওঠার হাসিতে নীলিমা বেঁচে থাকবে।

জীবন সায়াহ্নে এসে মানুষ পেছনের দিকে তাকায়। আরিয়ান সাহেবের বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সাতাশ বছর আগের সেই কিশোর এখন সত্তর বছরের এক অভিজ্ঞ মানুষ। তার চুলে সাদা মেঘের প্রলেপ, কপালে অভিজ্ঞতার ভাঁজ। কিন্তু তার চোখের সেই নীলিমার প্রতি ভালোবাসা আজও তেরো বছরের কিশোরের মতোই অমলিন।

নীলিমা মেমোরিয়াল কেয়ার' এখন আর কেবল একটি ছোট হাসপাতাল নয়, এটি এখন পুরো অঞ্চলের মানুষের শেষ আশ্রয়ের নাম। হাজার হাজার 'নীলিমা' আজ এখানে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। আরিয়ান সাহেব প্রতিদিন একবার করে হাসপাতালের প্রতিটি বেডে গিয়ে রোগীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তিনি যখন ছোট ছোট মেয়েদের দিকে তাকান, তার মনে হয় নীলিমা যেন বহু রূপে তার চারপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মিতা আজ থেকে পাঁচ বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে তিনি আরিয়ানের হাত ধরে বলে গিয়েছিলেন, "আরিয়ান, আমি তোমার বর্তমানকে পেয়েছি, কিন্তু নীলিমা তোমার আত্মাকে পেয়েছিল। এবার তুমি তোমার আত্মার কাছে ফিরে যাও।" মিতা ছিলেন এক অসাধারণ নারী, যিনি আরিয়ানের হৃদয়ে নীলিমার পাশের জায়গাটা খুব সযত্নে তৈরি করে নিয়েছিলেন।

আজ ২০শে আগস্ট। সেই রাত, যেদিন নীলিমা চলে গিয়েছিল। আরিয়ান সাহেব আজ খুব অসুস্থ বোধ করছেন। তিনি কাউকে কিছু না বলে খুব ধীর পায়ে নীলিমার সেই প্রিয় বকুল তলার কবরের পাশে গিয়ে বসলেন। আজ আকাশটা অদ্ভুত পরিষ্কার। কোটি কোটি তারা জ্বলছে। ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে বয়ে আসা বাতাসটা আজ খুব শীতল।

আরিয়ান সাহেব তার পকেট থেকে সেই জীর্ণ নীল খামটা বের করলেন। চিঠির লেখাগুলো এখন প্রায় মুছে গেছে, কিন্তু আরিয়ানের তো সেগুলো মুখস্থ। তিনি বিড়বিড় করে পড়তে লাগলেন— "আরিয়ান, আমরা আবার দেখা করব। এই জন্মে না হোক, অন্য কোনো এক শ্রাবণের রাতে..."

হঠাৎ আরিয়ান সাহেবের মনে হলো তার চারপাশের দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। হাসপাতালের লাইটগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে, শহরের কোলাহল দূরে সরে যাচ্ছে। তার কানে ভেসে আসছে আজিমপুর কলোনির সেই পুরোনো বিকেলের শব্দ। সাইকেলের টুংটাং বেল, ছেলেদের ক্রিকেট খেলার চিৎকার, আর নীলিমার সেই খিলখিল হাসি।

তিনি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন। তার হাতের চামড়ার ভাঁজগুলো নেই! তিনি আবার সেই তেরো বছরের কিশোর। পরনে স্কুলের শার্ট, পায়ে সেই পুরোনো কেডস।

"আরিয়ান! এই গাধা, এত দেরি করলি কেন?"

আরিয়ান সাহেব চমকে পেছনে ফিরলেন। বকুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে সেই কিশোরী নীলিমা। তার পরনে নীল ওড়না, চুলে বকুল ফুলের মালা। ঠিক যেমনটা আরিয়ানের মনের গভীরে সাতাশ বছর ধরে আঁকা ছিল।

আরিয়ান কাঁদতে চাইলেন, কিন্তু তার চোখ দিয়ে জল বের হলো না। এক বুক হাহাকার নিয়ে তিনি বললেন, "নীলু, তুই জানিস না আমি কতদিন তোর জন্য অপেক্ষা করেছি। সাতাশ বছর... প্রতিটা রাত আমি তোর ওই নীল খামটা বুকে নিয়ে শুয়েছি।"

নীলিমা এগিয়ে এসে আরিয়ানের হাতটা ধরল। তার হাতের স্পর্শে কোনো শীতলতা নেই, আছে এক অদ্ভুত উষ্ণতা। নীলিমা হাসল, "আমি তো তোর পাশেই ছিলাম রে পাগল! যখন তুই ওই হাসপাতালে বসে রোগীদের সেবা করতিস, আমি তখন তোর ঘামের ফোঁটা হয়ে ঝরতাম। যখন তুই কবরের পাশে বসে কাঁদতিস, আমি তখন বাতাসের হয়ে তোর চোখের জল মুছিয়ে দিতাম।"

আরিয়ান নীলিমার হাতটা শক্ত করে ধরলেন। "এবার তো আর হারিয়ে যাবি না?"

নীলিমা মাথা নাড়ল। "না। এবার আমরা এমন এক জায়গায় যাব, যেখানে কোনো নীল খাম থাকবে না, কোনো মরণব্যাধি থাকবে না, আর কোনো বিচ্ছেদ থাকবে না। দেখ আরিয়ান, আজ আকাশটা ঠিক আমার ওড়নার মতো নীল হয়ে আছে না?"

আরিয়ান আকাশের দিকে তাকালেন। সত্যিই, অন্ধকার রাত ভেদ করে এক মায়াবী নীল আলো পুরো বিশ্বকে ঢেকে দিচ্ছে।

পরদিন সকালে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মী এসে দেখল, বকুল তলায় নীলিমার কবরের ওপর মাথা রেখে ডাক্তার আরিয়ান সাহেব শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন। তার মুখে এক অদ্ভুত স্বর্গীয় প্রশান্তির হাসি। তার ডান হাতে ধরা একটি অতি জীর্ণ নীল খাম।

আরিয়ান সাহেব মারা গেছেন। কিন্তু এলাকার মানুষ বলে, সেই রাতের পর থেকে যখনই নীলিমা মেমোরিয়াল কেয়ারে কোনো জটিল রোগী আসে, তখন নাকি হাসপাতালের করিডোরে একজন নীল ওড়না পরা কিশোরী আর একজন সাদা শার্ট পরা কিশোরকে একসাথে হাঁটতে দেখা যায়। তারা নাকি রোগীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, আর তাদের ছোঁয়ায় যমদূতও হার মেনে ফিরে যায়।

ভালোবাসা মরতে জানে না। ভালোবাসা কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে প্রবাহিত হয়। নীলিমা আর আরিয়ানের ভালোবাসা কোনো এক নীল খামে বন্দি থাকেনি, বরং তা হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকার বিশ্বাস হয়ে আজীবন টিকে রইল।

 

লেখক: ফারজানা ইসলাম

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

রোববার, ২৯ মার্চ ২০২৬


স্মৃতির নীল খাম

প্রকাশের তারিখ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

আরিয়ান সাহেব যখন তার পুরোনো সেগুন কাঠের ড্রয়ারটা খুললেন, তখন বাইরে গোধূলির আলোটা জানালার কাঁচের ওপর এসে শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছে। চারদিকে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। তার স্ত্রী মিতা বাচ্চার স্কুলের মিটিংয়ে গিয়েছেন, বাড়িতে তিনি একাই।

ড্রয়ারের একদম কোণায়, পুরোনো ডায়েরি আর কিছু কাগজের নিচে চাপা পড়ে ছিল সেই নীল খামটি। সাতাশ বছর পর আজ আবার খামটার ওপর আঙুল ছোঁয়াতেই আরিয়ানের শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। কাগজের খসখসে ভাবটা যেন তার অবচেতন মনের কোনো বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ছে।

সাতাশ বছর! কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে আরিয়ান একজন সফল কার্ডিওলজিস্ট হয়েছেন, বিয়ে করেছেন, সংসারী হয়েছেন। কিন্তু আজ এই নীল খামটা হাতে নিতেই তার মনে হলো, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েও তিনি নিজের হৃদয়ের এই চিনচিনে ব্যথাটা কোনোদিন সারাতে পারেননি।

তিনি ধীর পায়ে বারান্দায় এসে বসলেন। হাতে খামটা। খামের ওপর নীলিমার হাতের সেই পরিচিত কাটাকাটা অক্ষরে লেখা- আরিয়ান, এটা তুমি আমার চলে যাওয়ার পর খুলবে।

আরিয়ানের মনে পড়ে গেল ১৯৯৮ সালের সেই ঝকঝকে রোদের দিনটার কথা। তখন তারা ক্লাস নাইনে পড়ে। ঢাকার আজিমপুর কলোনির গলিগুলোতে তখন বিকেল মানেই ছিল একরাশ আনন্দ। আরিয়ান আর নীলিমা ছিল একে অপরের ছায়া। নীলিমা ছিল একটু ডানপিটে টাইপের। স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে সে আরিয়ানের টিফিন বক্স থেকে ডিম ভাজিটা চুরি করে খেয়ে ফেলত। আরিয়ান যখন রেগে যেত, নীলিমা তখন দুই কানে হাত দিয়ে এমনভাবে মুখভঙ্গি করত যে আরিয়ানের রাগ মুহূর্তেই জল হয়ে যেত।

আরিয়ান! এই শোন... নীলিমা বলেছিল সেদিন।

কী? আরিয়ান একটু বিরক্ত হওয়ার ভান করল।

যদি কোনোদিন আমি তোকে ছেড়ে চলে যাই, তুই কি আমার জন্য কাঁদবি?

আরিয়ান তখন বুঝতে পারেনি এই কথার ওজন। সে হাসতে হাসতে বলেছিল, কাঁদতে যাব কেন? তুই গেলে আমার ডিম ভাজিটা অন্তত আস্ত থাকবে!

নীলিমা হাসেনি। সে স্থির চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই চাহনিতে কী ছিল, আরিয়ান আজ সাতাশ বছর পর বারান্দায় বসে উপলব্ধি করতে পারছে। ওটা ছিল বিদায়ের প্রস্তুতি।

আরিয়ান খামটা খোলার জন্য হাত বাড়ালেন। তার হাত কাঁপছে। ভেতরে যে চিঠিটা আছে, সেটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য অথবা সবচেয়ে বড় মিথ্যার মুখোমুখি তাকে দাঁড় করিয়ে দেবে।

খামটা ছিঁড়তেই বের হয়ে এলো নীল রঙের একটা কাগজ। আরিয়ানের মনে হলো, এই কাগজটার নীল রঙ নীলিমার গায়ের ওড়নাটার মতো। যে ওড়নাটা সে শেষবার বিদায় বেলায় পরেছিল।

চিঠিটা পড়ার আগে আরিয়ান চোখ বন্ধ করলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনটা, যেদিন নীলিমারা কাউকে কিছু না জানিয়ে কলোনি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে আরিয়ান দেখেছিল নীলিমাদের জানালার পর্দাগুলো নেই। বারান্দায় রাখা নীলিমার প্রিয় কামিনী ফুলের গাছটা নেই। শুধু পড়ে ছিল একরাশ নীরবতা।

আরিয়ান চিঠির প্রথম লাইনটায় চোখ রাখলেন--

আরিয়ান, যখন তুই এটা পড়ছিস, তখন হয়তো আমি তোর ধরাছোঁয়ার বাইরে অনেক দূরে। তুই আমাকে স্বার্থপর ভাবছিস, তাই না? ভাবছিস, একটা বারের জন্য কেন তোকে বলে এলাম না? সত্যিটা হলো আরিয়ান, তোর চোখের দিকে তাকিয়ে বিদায় বলার সাহস আমার ছিল না..

আরিয়ানের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল।

বারান্দায় বসে আরিয়ান সাহেব যখন চিঠির দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় হাত রাখলেন, তখন সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে নেমেছে। পাশের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। এই শব্দটা শুনলেই আরিয়ানের বুকটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। আজিমপুর কলোনির সেই বিকেলগুলোতে আজান দেওয়ার সাথে সাথেই নীলিমার মা বারান্দা থেকে ডাক দিতেন— "নীলু, ঘরে আয়! সন্ধ্যাবেলায় বাইরে থাকতে নেই।

নীলিমা তখন আরিয়ানের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলত, "আরিয়ান, বড় হয়ে আমরা এমন একটা বাড়ি বানাব যেখানে কোনো মা থাকবে না, আজান দিলেই কেউ ভেতরে ডাকবে না। আমরা সারা সন্ধ্যা বারান্দায় বসে তারা গুনব।

আরিয়ান চিঠির পাতায় আঙুল বোলালেন। কাগজের ভাঁজে ভাঁজে নীলিমার গায়ের সেই হালকা বকুল ফুলের সুবাস যেন আজও লেগে আছে। তিনি পড়তে শুরু করলেন:

"আরিয়ান, মনে আছে আমাদের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের কথা? যেদিন তুই তোর নতুন সাইকেলটা নিয়ে কলোনির মাঠে এসেছিলি? আমি জেদ ধরেছিলাম তোর সাইকেলে চড়ব। তুই কত বারণ করলি, 'নীলিমা, পড়ে যাবি, হাত-পা ছিলে যাবে'। কিন্তু আমি তো চিরকালের একগুঁয়ে। যখন তোর সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে বসলাম, তুই খুব সাবধানে চালাচ্ছিলি। আমি তোর শার্টের পেছনটা শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম। সেই প্রথম আমি অনুভব করেছিলাম, একটা মানুষকে বিশ্বাস করে সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু কপাল দেখ আরিয়ান, যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম, তার ওপরই সবচেয়ে বড় অবিশ্বাসের বোঝা চাপিয়ে আমি চলে এলাম।"

চিঠির এই অংশটা পড়ে আরিয়ান থামলেন। তার স্পষ্ট মনে পড়ছে সেই দিনটার কথা। সাইকেল থেকে নামার পর নীলিমা একটা ছোট পাথর কুড়িয়ে নিয়ে আরিয়ানের সাইকেলের হ্যান্ডেলে একটা আঁচড় কেটে দিয়েছিল। বলেছিল, "এটা আমার চিহ্ন। এই সাইকেলটা এখন থেকে আমার।" আরিয়ান আজ ভাবছেন, সাইকেলটা অনেক আগেই ভাঙারি দোকানে বিক্রি হয়ে গেছে, কিন্তু নীলিমার দেওয়া সেই আঁচড়টা আজ সাতাশ বছর পর তার হৃদয়ে নতুন করে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।

চিঠির পাতায় আবার মন দিলেন তিনি:

"তোর হয়তো মনে আছে, আমাদের চলে যাওয়ার ঠিক তিন দিন আগে আমি স্কুলে আসিনি। তুই বিকেলে আমাদের বাসার নিচে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলি। আমি জানালা দিয়ে তোকে দেখছিলাম। আমার খুব ইচ্ছা করছিল চিৎকার করে ডাকি, তোকে বলি— আরিয়ান, আমি মরে যাচ্ছি! ডাক্তাররা বলেছে আমার রক্তে কী একটা বিষ ঢুকেছে, যেটার কোনো ওষুধ নেই। কিন্তু আমি তোকে দুর্বল করতে চাইনি। আমি চাইনি তুই আমার জন্য সারা জীবন এক মরণব্যাধি রোগীর স্মৃতি বয়ে বেড়াস। তাই বাবাকে বলেছিলাম, আমাদের বদলির ব্যবস্থা যেন দ্রুত করা হয়। আমি চেয়েছিলাম তুই আমাকে ঘৃণা করিস। কারণ ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকা সহজ, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকা নরক যন্ত্রণার চেয়েও কঠিন।"

আরিয়ানের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল চিঠির ওপর। সাতাশ বছর ধরে সে জেনে এসেছে নীলিমা তাকে অবজ্ঞা করে চলে গেছে। সে ভেবেছিল নীলিমা হয়তো কোনো বড়লোকের ছেলের সাথে প্রেম করে শহর ছেড়েছে। অপমানে, অভিমানে আরিয়ান নিজেও নিজেকে বদলে ফেলেছিল। রাত জেগে পড়াশোনা করে বড় ডাক্তার হয়েছে শুধু এটা প্রমাণ করতে যে— সে হেরে যায়নি।

কিন্তু আজ এই জীর্ণ নীল কাগজটা চিৎকার করে বলছে, আরিয়ানই সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছিল। নীলিমা যখন একা মৃত্যুর সাথে লড়াই করছিল, আরিয়ান তখন তাকে ঘৃণা করার অজুহাত খুঁজছিল।

আরিয়ানের মনে পড়ল, নীলিমা একবার তার খাতায় একটা কবিতা লিখেছিল

"যদি আমি মেঘ হই, তবে বৃষ্টি হয়ে তোমার আঙিনায় ঝরিব।

যদি আমি বাতাস হই, তবে তোমার চুলে বিলি কেটে হারাব।

কিন্তু যদি আমি তোমার চোখের জল হই,

তবে যেন তোমার গাল বেয়ে কখনো না ঝরি,

আমি তোমার চোখের তারায় বন্দি হয়ে থাকতে চাই।"

আরিয়ান ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ফাঁকা বাড়িতে তার কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "কেন নীলু? কেন বললি না? আমি কি তোর সেই কষ্টের ভাগীদার হতে পারতাম না? কেন আমাকে অপরাধী করে রাখলি সারাটা জীবন?"

চিঠির পরের পাতায় যাওয়ার আগে আরিয়ান উঠে দাঁড়ালেন। বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেন। শহরের নিয়ন আলোগুলো আজ বড্ড বেশি ঝাপসা লাগছে। আরিয়ানের মনে হচ্ছে, তিনি যেন আবার সেই তেরো বছরের কিশোর হয়ে গেছেন, যে নীলিমার ফেরার অপেক্ষায় আজিমপুরের সেই গলির মোড়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

আরিয়ান সাহেব আজ আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটা টিক টিক শব্দ করে সময় বয়ে চলার জানান দিচ্ছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছে সময়টা সেই ১৯৯৮ সালে থমকে দাঁড়িয়েছে। তিনি আজ শুধু একজন ডাক্তার নন, আজ তিনি সেই কিশোর যে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ধ্রুবতারাকে হারিয়ে ফেলেছে।

চিঠির তৃতীয় পৃষ্ঠার রঙটা বাকিগুলোর চেয়ে কিছুটা ফ্যাকাশে। মনে হয় নীলিমা যখন এটা লিখেছিল, তখন তার কলমের কালির চেয়ে চোখের জল বেশি ঝরছিল। কাগজের কয়েকটা জায়গায় কালির লেখা লেপটে গেছে, ঠিক যেন এক একটা দীর্ঘশ্বাসের ছাপ।

আরিয়ান সাহেব চশমাটা মুছে আবার পড়তে শুরু করলেন:

"আরিয়ান, তোকে ছেড়ে আসার পর আমাদের নতুন ঠিকানা হয়েছিল ময়মনসিংহের এক নির্জন মফস্বল শহরে। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে একটা পুরনো আমলের বাড়ি। জানিস আরিয়ান, আমার জানালার ঠিক পাশেই একটা বিশাল কদম গাছ ছিল। যখন বৃষ্টি হতো, কদম ফুলের গন্ধে ঘর ভরে যেত। কিন্তু সেই সুবাস আমার নাকে আসত না। আমার নাকে তখন শুধু হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর কড়া ওষুধের গন্ধ লেগে থাকত। আমার রক্তে লোহিত কণিকাগুলো নাকি কমতে শুরু করেছিল— যেটাকে বড়রা বলে 'অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া' (Aplastic Anemia)।

মা সারাদিন জায়নামাজে বসে কাঁদতেন। বাবা অফিসে যেতেন না, শুধু ফোন করে কার সাথে যেন কথা বলতেন রক্তের সন্ধানে। আর আমি? আমি শুধু তাকিয়ে থাকতাম জানালার বাইরে। মাঝে মাঝে মনে হতো, এই বুঝি তুই সাইকেল চালিয়ে আমাদের গেটের সামনে এসে দাঁড়ালি! এই বুঝি চিৎকার করে বললি— 'নীলু, আয়! আজ আকাশটা ঠিক তোর গায়ের ওড়নাটার মতো নীল হয়ে আছে।' কিন্তু পরক্ষণেই মনে হতো, তুই হয়তো এখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিস, কিংবা আমাকে ঘৃণা করে আমার নামটা তোর ডায়েরি থেকে কেটে দিচ্ছিস। আরিয়ান, আমি সেই ঘৃণাটা চেয়েছিলাম, কারণ আমি জানতাম আমি ফিরব না। আমি চাইনি তুই কোনো মৃত মানুষের ছায়ার পেছনে নিজের যৌবনটা নষ্ট করিস।"

আরিয়ান সাহেবের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া! তিনি একজন ডাক্তার হিসেবে জানেন এই রোগটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক। শরীরে একটু টোকা লাগলেই রক্ত জমে যায়, হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে যায়। তিনি ভাবছেন, নীলিমা যখন যন্ত্রণায় ছটফট করত, তখন তিনি হয়তো কোনো এক ক্যাফেতে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলেন আর ভাবছিলেন— "মেয়েরা এমনই হয়, হুট করে হারিয়ে যায়।" নিজের ওপর এক তীব্র বিতৃষ্ণা জন্মালো তার।

 

চিঠির পাতায় নীলিমা আরও লিখেছে:

"জানিস আরিয়ান, আমাদের কলোনির সেই বকুল তলাটার কথা খুব মনে পড়ত। সেই যেবার আমরা অনেক বকুল ফুল কুড়িয়ে একটা মালা গেঁথেছিলাম? তুই বলেছিলি, এই মালাটা কোনোদিন শুকাবে না। কিন্তু দেখ, মালাটা শুকিয়ে গেছে, আর আজ আমিও শুকিয়ে যাচ্ছি। আমার চুলগুলো উঠে যাচ্ছে, হাতগুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আয়নায় নিজেকে দেখলে নিজেরই ভয় লাগে। তবু আমি একটা ডায়েরি লিখেছিলাম। সেই ডায়েরিতে শুধু তোর আর আমার ছোটবেলার গল্পগুলো ছিল। বাবা একদিন দেখে ফেলেছিলেন। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এত কেঁদেছিলেন যে আমি আর লিখতে পারিনি।

আমার শেষ ইচ্ছে ছিল তোকে একবার দেখার। কিন্তু ডাক্তাররা তখন আমাকে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছিল না। আমার ইনফেকশন হওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু আমি পাগল হয়ে উঠেছিলাম। বাবাকে বলেছিলাম— 'বাবা, আমাকে শুধু একবার আজিমপুর নিয়ে চলো। আমি আরিয়ানের সাথে কথা বলব না, শুধু দূর থেকে ওকে একবার দেখব।' বাবা রাজি হয়েছিলেন। সেই দিনটার কথা তোর মনে আছে আরিয়ান? ১৯৯৯ সালের এক কুয়াশাভেজা ডিসেম্বর।"

আরিয়ান থমকে গেলেন। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর? তার মনে পড়ে গেল এক হিমশীতল বিকেলের কথা। তখন তিনি ক্লাস টেনে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাসার সামনের চায়ের দোকানে বসে এককাপ চা খাচ্ছিলেন আর ভাবছিলেন নীলিমার কথা। হঠাৎ তার মনে হয়েছিল একটা ধূসর রঙের গাড়ি তাদের গলির মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়ির জানালার কাঁচটা একটু নামানো ছিল। আরিয়ানের মনে হয়েছিল কেউ একজন তাকে নিবিড়ভাবে দেখছে। তিনি যখন সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিল।

তিনি কি তবে সেদিন নীলিমাকেই দেখেছিলেন?

"হ্যাঁ আরিয়ান, আমি সেদিন ওই গাড়িটার ভেতরেই ছিলাম। তুই কালো রঙের একটা সোয়েটার পরেছিলি, তোর চুলগুলো একটু বড় হয়েছিল। তোকে দেখেই আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিল গাড়ি থেকে নেমে তোর হাতটা ধরে বলি— 'আরিয়ান, আমাকে বাঁচা! আমি মরতে চাই না।' কিন্তু আমি পারিনি। জানালার কাঁচটা তুলে দিয়ে আমি বাবাকে বললাম— 'বাবা,

চলো চলে যাই। ও এখন ভালো আছে।' আমি চাইনি তুই আমার সেই কঙ্কালসার চেহারাটা দেখিস। আমি চেয়েছিলাম তোর মনে আমার সেই চঞ্চল মুখটাই চিরকাল গেঁথে থাকুক।"

আরিয়ান সাহেব আর পড়তে পারলেন না। ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। সাতাশ বছর আগে সেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য নীলিমা তার হাতের নাগালে ছিল। তিনি চাইলে সেদিন গাড়িটা আটকাতে পারতেন। তিনি চাইলে পারতেন নীলিমার জীবনের শেষ কয়েকটা দিন রাঙিয়ে দিতে। কিন্তু নিয়তি তাকে সেই সুযোগ দেয়নি।

তিনি এখন ভাবছেন, তার এই সাজানো সংসার, এই খ্যাতি, এই অর্থ— সব কিছুর পেছনে কত বড় একটা শূন্যতা লুকিয়ে আছে। তিনি প্রতিদিন হাজার হাজার রোগীর প্রাণ বাঁচান, কিন্তু সাতাশ বছর আগে তার নিজের পৃথিবীটা যখন বিনা চিকিৎসায় মরে যাচ্ছিল, তখন তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

বারান্দার বাইরে এখন ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। আরিয়ানের মনে হচ্ছে, এই অন্ধকারটা আসলে সাতাশ বছর ধরেই তার ভেতরে ছিল, আজ এই নীল খামটা কেবল সেই অন্ধকারকে আলো দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

আরিয়ান সাহেব কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। রাতের বাতাসটা এখন আরও ঠান্ডা হয়ে এসেছে। ড্রয়িংরুমের আলোগুলো তিনি নেভানোই রেখেছেন, কারণ এই অন্ধকারের মধ্যেই তিনি নীলিমার উপস্থিতি বেশি অনুভব করছেন। চিঠির চতুর্থ পৃষ্ঠায় যাওয়ার আগে তিনি একটা লম্বা শ্বাস নিলেন। তার মনে হচ্ছে, তিনি কোনো কাগজের চিঠি পড়ছেন না, বরং নীলিমার আত্মা সাতাশ বছর পর তার সাথে কথা বলছে।

স্মৃতির নীল খাম

চিঠির এই অংশটা পড়তে গিয়ে আরিয়ান সাহেবের চোখে ঝাপসা হয়ে এল। কালির দাগগুলো এখানে খুব অস্পষ্ট, যেন কলম চালাতে গিয়ে লেখক বারবার থমকে গিয়েছেন। তিনি খুব সাবধানে অক্ষরগুলো জোড়া দিতে লাগলেন:

"আরিয়ান, ১৯৯৯ সালের সেই শেষ দেখার পর আমি যখন ময়মনসিংহ ফিরে গেলাম, তখন আমি জানতাম আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। আমার শরীরে তখন আর কোনো শক্তি ছিল না। জানিস, মানুষ যখন জানে সে মারা যাচ্ছে, তখন তার চারপাশের তুচ্ছ জিনিসগুলোও অনেক দামী মনে হয়। আমি আমার পড়ার টেবিলটা, জানালার গ্রিলটা, এমনকি বালিশের পাশের সেই পুরোনো পুতুলটাকেও জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম। আমার খুব হিংসে হতো সেই পাখিগুলোর ওপর যারা রোজ সকালে আমার জানালার কার্নিশে এসে বসত। ভাবতাম, ওরা তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু আমি থাকব না।

আমার শেষ কটা দিন শুধু তোর স্মৃতির ওপর ভর করে কেটেছে। মনে আছে আরিয়ান, ক্লাস এইটে পড়ার সময় একদিন বৃষ্টিতে ভিজে তুই আমার জন্য একটা আইসক্রিম এনেছিলি? আইসক্রিমটা গলে জল হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তোর সেই ভেজা মুখ আর কাঁপাকাঁপা হাতে ধরা আইসক্রিমের কাঠিটা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী উপহার ছিল। সেই দিনের কথা মনে করে আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে হাসতাম। নার্সরা ভাবত আমি পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু আমি জানতাম, আমি পাগল হইনি, আমি শুধু তোর ভালোবাসার শক্তিতে টিকে থাকার চেষ্টা করছিলাম।"

আরিয়ান সাহেবের মনে পড়ল সেই দিনটার কথা। আইসক্রিমটা গলে যাওয়ার পর নীলিমা বলেছিল— "গাধা, আইসক্রিম তো গলে গেল, এখন কী খাব?" আরিয়ান তখন লাজুক হেসে বলেছিল— "গলে গেছে তো কী হয়েছে? জলটুকু তো মিষ্টি!" সেদিন তারা সেই গলানো আইসক্রিম ভাগ করে খেয়েছিল। আজ আরিয়ান সাহেবের মনে হচ্ছে, জীবনটাও সেই আইসক্রিমের মতোই। হাতে থাকতে থাকতে গলে গেল, শুধু পড়ে রইল নোনা জলের মতো কিছু স্মৃতি।

চিঠির পরের প্যারাগ্রাফটা আরও মর্মস্পর্শী:

"২০০০ সালের ২০শে আগস্ট। শ্রাবণের শেষ রাত। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। জানিস আরিয়ান, আমার খুব ইচ্ছে ছিল সেই বৃষ্টির দিনে তোর সাথে একবার ছাদে গিয়ে ভিজব। আমি বাবাকে বললাম— 'বাবা, আমাকে একটু বারান্দায় নিয়ে চলো না? আকাশটা দেখব।' বাবা আমার অবস্থা দেখে না করতে পারেননি। অক্সিজেন সিলিন্ডারটা সাথে নিয়ে বাবা আমাকে হুইলচেয়ারে করে বারান্দায় নিয়ে গেলেন। বৃষ্টির ঝাপটা যখন আমার মুখে লাগছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল তুই আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছিস। তুই আমার হাত ধরে বলছিস— 'নীলু, আর একটু ধৈর্য ধর, সব ঠিক হয়ে যাবে।'

কিন্তু কিছু ঠিক হয়নি আরিয়ান। সেই রাতটাই ছিল আমার শেষ রাত। আমি জানতাম আমি আর কালকের সূর্য দেখব না। তাই ওই রাতেই আমি এই নীল খামটা শেষ করি। আমার কাঁপাকাঁপা হাতে লেখা এই শব্দগুলো হয়তো তোকে অনেক কষ্ট দিচ্ছে, কিন্তু আমি চাই তুই সত্যটা জানিস। আমি চাই তুই জানিস যে, নীলিমা তোকে কোনোদিন ছেড়ে যায়নি, বরং সে তোর ভালোবাসার চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। বাবা আমাকে কথা দিয়েছিলেন, এই খামটা কোনোভাবে তোর কাছে পৌঁছে দেবেন। জানি না কত বছর পর তুই এটা পাবি, কিন্তু যখনই পাবি, মনে রাখবি— পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে একটা মেয়ে ছিল যে তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোর নামটা বিড়বিড় করে বলে গেছে।

চিঠিটা এখানেই শেষ হয়নি, কিন্তু আরিয়ান সাহেবের পড়ার শক্তি আর নেই। তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তার কান্না এখন আর কোনো সামাজিক লোকলজ্জার তোয়াক্কা করে না। তিনি ভাবছেন, ২০শে আগস্ট ২০০০ সাল— ওই দিন তিনি কী করছিলেন? ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে তিনি মনে করার চেষ্টা করলেন। হ্যাঁ, সেদিন তার মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের রেজাল্ট দিয়েছিল। তিনি বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন, রেস্টুরেন্টে খেয়েছিলেন। অথচ ঠিক সেই রাতেই, মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে, তার প্রিয় মানুষটি অক্সিজেন মাস্কের নিচে তার নাম নিতে নিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিল।

অসহ্য এক অপরাধবোধ আরিয়ান সাহেবকে গ্রাস করল। তিনি একজন ডাক্তার হিসেবে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন। তিনি কেন তখন নীলিমার রোগের কথা বুঝতে পারেননি? কেন তিনি আরও একটু খোঁজ নেননি?

হঠাৎ তার মনে পড়ল, চিঠির সাথে নীলিমা একটা ঠিকানার কথা লিখেছে। ময়মনসিংহের সেই পুরোনো বাড়িটার ঠিকানা। যেখানে নীলিমার দাদী এখনও বেঁচে থাকতে পারেন, অথবা হয়তো নীলিমার কোনো স্মৃতি চিহ্ন সেখানে রয়ে গেছে। আরিয়ান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখের দৃষ্টি এখন স্থির। সাতাশ বছর পর তিনি এক নতুন গন্তব্য খুঁজে পেয়েছেন।

তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "আমি আসছি নীলু। অনেক দেরি হয়ে গেছে জানি, কিন্তু আমি আসছি। তোর সেই বকুল ফুলের গন্ধমাখা ডায়েরিটা আমাকে খুঁজে পেতেই হবে।"

তিনি দ্রুত আলমারি থেকে তার গাড়ির চাবি আর একটা ছোট ব্যাগ নিলেন। রাত এখন ১২টা। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে এখন ভোর। যে ভোরের আলো তাকে নীলিমার শেষ স্মৃতিটুকুর কাছে নিয়ে যাবে।

আরিয়ান সাহেব গভীর রাতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ঢাকার ফাঁকা রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন তিনি। সামনের হেডলাইটের আলোয় কুয়াশা আর ধুলোর আস্তরণ চিরে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন এক অজানা গন্তব্যে, যেখানে তার সাতাশ বছরের জমানো প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে।

ভোরের দিকে আরিয়ান সাহেবের গাড়ি যখন ময়মনসিংহের সীমানায় ঢুকল, তখন পুব আকাশে হালকা লালিমা দেখা দিয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে নীলিমার সেই শেষ চিঠির কথা— "শ্রাবণের শেষ রাত"। আজ শ্রাবণ নয়, কিন্তু প্রকৃতিতে যেন এক ধরণের হাহাকার মিশে আছে।

চিঠিতে লেখা সেই ঠিকানা খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট হলো না। শহরের এক কোণে, নদীর কাছাকাছি একটা নিরিবিলি পাড়ায় বাড়িটি। পুরনো ধাঁচের একতলা দালান, নোনা ধরা দেয়ালে শ্যাওলার আস্তরণ। গেটের সামনে বিশাল এক কদম গাছ— ঠিক যেমনটা নীলিমা বর্ণনা করেছিল।

আরিয়ান সাহেব কম্পিত হাতে গেটের বেল চাপলেন। অনেকক্ষণ পর একজন বৃদ্ধ মানুষ গেট খুললেন। তার পিঠ কুঁজো হয়ে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালি। তিনি আরিয়ান সাহেবের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।

"কাকে খুঁজছেন বাবা?" বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত দুর্বল।

আরিয়ান সাহেবের গলা শুকিয়ে এল। তিনি পকেট থেকে সেই নীল খামটা বের করে দেখালেন। "আমি আরিয়ান। ঢাকা থেকে এসেছি। নীলিমা... নীলিমা কি এখানে থাকত?"

'নীলিমা' নামটা শুনতেই বৃদ্ধের চোখে যেন এক চিলতে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তিনি কয়েক মুহূর্ত স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ আরিয়ানের হাতটা চেপে ধরলেন। তার হাত কাঁপছে। "তুমি আরিয়ান? নীলুর সেই আরিয়ান? বাবা রে, তুমি আসতে এত দেরি করলে কেন? আমার নাতনিটা তো সাতাশ বছর ধরে তোমার পথ চেয়ে ওই বকুল তলায় শুয়ে আছে।"

বৃদ্ধ ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ইনি নীলিমার দাদা। আরিয়ান সাহেব বুঝতে পারলেন, নীলিমার বাবা-মা হয়তো আর বেঁচে নেই বা অন্য কোথাও চলে গেছেন, কিন্তু এই বৃদ্ধ আজও স্মৃতি আগলে এই জীর্ণ বাড়িতে পড়ে আছেন।

বৃদ্ধ আরিয়ানকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। ঘরটি বড়ই বিষণ্ণ। ধুলো জমা আসবাবপত্র আর দেয়ালে টাঙানো নীলিমার একটা বড় বাঁধানো ছবি। ছবিতে নীলিমা হাসছে— সেই চিরচেনা অমলিন হাসি। তার গলায় একটা বকুল ফুলের মালা। আরিয়ান সাহেবের মনে হলো, ছবিটা যেন কথা বলে উঠবে।

"বোসো বাবা," বৃদ্ধ একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন। "নীলুর বাবা-মা ওর মৃত্যুর দুই বছর পর শোক সইতে না পেরে দেশ ছেড়ে চলে যায়। তারা এখন কানাডায়। কিন্তু আমি যেতে পারিনি। আমি যে নীলুকে এখানে একা ফেলে যেতে পারব না। ও বলেছিল— 'দাদাভাই, আরিয়ান একদিন আসবেই। ও যখন আসবে, ওকে আমার এই ডায়েরিটা দিও।'"

বৃদ্ধ আলমারির ভেতর থেকে মখমলে মোড়ানো একটি লাল রঙের ডায়েরি বের করে আনলেন। ডায়েরিটা আরিয়ানের হাতে দিতেই তার মনে হলো তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তুটা স্পর্শ করছেন।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা:

"আজ ২রা মে, ১৯৯৯। আরিয়ানকে ছাড়া আমার আজ তিন মাস হলো। আকাশটা আজ খুব নীল, ঠিক যেমন ওর শার্টের রঙ ছিল শেষ যেদিন ওকে দেখেছিলাম। আমি জানি আমি আর বেশিদিন নেই। কিন্তু এই ডায়েরিটা থাকবে। আরিয়ান, যদি কোনোদিন এটা তোর হাতে পড়ে, তবে জানবি— আমি তোকে ঘৃণা করে আসিনি, আমি তোকে ভালোবেসে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম।"

আরিয়ান সাহেব ডায়েরির পাতা ওল্টাতে লাগলেন। প্রতিটি পাতায় নীলিমা তার প্রতিদিনের যন্ত্রণার কথা লিখেছে, কিন্তু সেই যন্ত্রণার চেয়েও বেশি ছিল আরিয়ানের প্রতি তার আকুলতা। একটা পাতায় লেখা ছিল:

"আজ খুব রক্তবমি হলো। খুব ভয় পাচ্ছিলাম। মা পাশে বসে কাঁদছিল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, যদি আরিয়ান একবার এসে আমার হাতটা ধরত, তবে হয়তো সব ব্যাথা মুছে যেত। ও কি খুব রাগ করে আছে? ও কি জানে না আমি ওর ওপর রাগ করে থাকতে পারি না?"

আরিয়ান সাহেবের চোখের জল ডায়েরির পাতার ওপর টপ টপ করে পড়ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, সাতাশ বছর ধরে তিনি যে সাফল্য আর আভিজাত্যের পাহাড় গড়েছেন, তা এই জীর্ণ ডায়েরির একটা শব্দের কাছেও নগণ্য। তিনি একজন ডাক্তার হিসেবে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না।

হঠাৎ তার চোখ গেল ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায়। সেখানে একটি ছোট মানচিত্র আঁকা। বাড়ির পেছনের বাগানের মানচিত্র। নিচে লেখা— "বকুল তলার নিচে আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া সময়টা গেঁথে রেখেছি।"

আরিয়ান সাহেব দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ছুটলেন বাড়ির পেছনের বাগানে। সেখানে একটি বিশাল পুরনো বকুল গাছ। গাছের নিচে একটি ছোট কবর, সাদা মার্বেল পাথরে বাঁধানো। কবরের ওপর লেখা— "নীলিমা (১৯৮৪-২০০০)"। কবরের পাশে একটা ছোট গর্তের চিহ্ন, যেন কেউ সেখানে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছিল।

বৃদ্ধ পেছন থেকে এসে বললেন, "নীলু যাওয়ার আগে একটা কাঁচের বয়ামে করে তোমাদের ছোটবেলার কিছু জিনিস এখানে পুঁতে রেখেছিল। ও বলেছিল, তুমি এলে এটা তুলে নিতে।"

আরিয়ান সাহেব নিজের হাতে মাটি সরাতে লাগলেন। কিছুটা গভীরে যেতেই তার হাতে ঠেকল একটা শক্ত বস্তু। একটি কাঁচের বয়াম। ভেতরে কয়েকটা শুকনো বকুল ফুল, একটা প্লাস্টিকের আংটি (যা আরিয়ান তাকে মেলা থেকে কিনে দিয়েছিল), আর একটা চিরকুট।

চিরকুটে লেখা— "আরিয়ান, আমরা আবার দেখা করব। এই জন্মে না হোক, অন্য কোনো এক শ্রাবণের রাতে, যেখানে কোনো রোগ থাকবে না, কোনো দূরত্ব থাকবে না। শুধু তুই আর আমি থাকব।"

আরিয়ান সাহেব কবরের পাশে মাটির ওপর বসে পড়লেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। সাতাশ বছরের জমানো পাথরটা আজ গলে জল হয়ে নেমে আসছে।

আরিয়ান সাহেব সেই বকুল তলায় কতক্ষণ বসে ছিলেন, তার হিসেব নেই। তার প্যান্টের হাঁটুতে কাদা লেগেছে, দামি ঘড়িটা কবরের পাশের ঘাসে ঘষা খেয়ে দাগ পড়ে গেছে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। জীবনের সাতাশটা বছর তিনি যে হৃদরোগীর চিকিৎসা করেছেন, আজ অনুভব করছেন তার নিজের হৃদপিণ্ডটাই যেন একটা জীর্ণ খাঁচা, যার ভেতরটা শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে।

বৃদ্ধ দাদামশাই খুব ধীর পায়ে আরিয়ানের পাশে এসে বসলেন। তার শীর্ণ হাতটা আরিয়ানের কাঁধে রাখলেন। এই স্পর্শে যেন এক ধরণের অদ্ভুত সান্ত্বনা ছিল। বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন, "বাবা আরিয়ান, নীলু যখন ওর শেষ দিনগুলোতে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেত, তখন ও কাউকে কাছে ঘেঁষতে দিত না। শুধু বালিশের নিচে তোমার দেওয়া সেই পুরোনো ছবিটা বের করে রাখত। ছবিটা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল ওর চোখের জলে। ও বলত— 'দাদাভাই, আরিয়ান একদিন বড় ডাক্তার হবে। ও তখন কত মানুষের কষ্ট দূর করবে, তাই না?'"

আরিয়ান সাহেবের বুকটা চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, "দাদামশাই, আমি কেমন ডাক্তার? আমি তো ওকে বাঁচাতে পারিনি! এমনকি ও যে ধুঁকে ধুঁকে মরছে, আমি সেই খবরটাও জানতাম না। আমি ওকে ঘৃণা করেছি দাদামশাই, প্রতিটা দিন আমি ওকে স্বার্থপর ভেবে গালি দিয়েছি। এই পাপ আমি কোথায় রাখব?

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালেন। "মানুষের জীবনটা বড্ড অদ্ভুত বাবা। আমরা যেটা ভাবি, সেটা হয় না। আর যেটা হয়, সেটার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি না। নীলু তোমাকে ঘৃণা পেতে চেয়েছিল যাতে তুমি ওকে ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে পারো। ও নিজের বুকটা পুড়িয়ে তোমাকে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দিয়ে গেছে। তোমার এই সফলতা, এই ডাক্তার হওয়া— এর পেছনে ওর সেই নীরব আত্মত্যাগ মিশে আছে। তুমি যদি এখন ভেঙে পড়ো, তবে তো ওর সেই ত্যাগটা বৃথা হয়ে যাবে।"

আরিয়ান সাহেব কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। বৃদ্ধের কথাগুলো তার কানে মন্ত্রের মতো বাজতে লাগল। তিনি ডায়েরিটা আবার খুললেন। মাঝখানের একটা পাতায় নীলিমা লিখেছে:

"আজ খুব ইচ্ছে করছে আরিয়ানের কানে কানে একটা কথা বলতে। যদি ও কোনোদিন অনেক বড় মানুষ হয়, তবে ও যেন আমার মতো গরিব রোগীদের জন্য একটা ছোট হাসপাতাল বানায়। যেখানে কেউ টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মরবে না। আমি তো চলে যাচ্ছি, কিন্তু আমার মতো কোনো নীলু যেন ওর আরিয়ানকে ছেড়ে অকালে চলে না যায়।"

আরিয়ান সাহেবের মনে হলো, নীলিমা যেন কবর থেকে উঠে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো বলছে। তিনি সাতাশ বছর ধরে শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়েছেন, নাম-যশ কামিয়েছেন। কিন্তু নীলিমার এই শেষ ইচ্ছাটার কথা কোনোদিন ভাবেননি। তার মনে হলো, এটাই হয়তো তার মুক্তির পথ।

"দাদামশাই," আরিয়ান সাহেব শান্ত গলায় বললেন, "আপনি কি আমার সাথে ঢাকা যাবেন?"

বৃদ্ধ হাসলেন, তবে সেই হাসিতে ছিল বিষণ্ণতা। "না বাবা। আমার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আমি নীলুর এই কবরটা ছেড়ে কোথাও যেতে পারব না। আমি থাকলে ওর কবরে অন্তত প্রতিদিন এক মুঠো বকুল ফুল তো পড়বে। আমি মরে গেলে এই কবরটা হয়তো জঙ্গলে ঢেকে যাবে। আমি সেই দিনের অপেক্ষা করছি, যেদিন আমি ওর পাশে গিয়ে শোব।"

আরিয়ান সাহেবের চোখ আবার ভিজে উঠল। তিনি বুঝলেন, এই বৃদ্ধই গত সাতাশ বছর ধরে নীলিমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তার স্মৃতিতে। তিনি পকেট থেকে ফোন বের করলেন। মিতার (তার স্ত্রী) কথা মনে পড়ল। মিতা তাকে ভালোবাসে, কিন্তু সে কোনোদিন আরিয়ানের এই অতীতে বাস করা কিশোরকে দেখেনি। আরিয়ান ঠিক করলেন, তিনি আর লুকোবেন না। তিনি মিতাকে সব বলবেন। নীলিমা তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাকে অস্বীকার করা মানে নিজেকেই অস্বীকার করা।

তিনি ডায়েরি আর সেই কাঁচের বয়ামটা সযত্নে ব্যাগে রাখলেন। তারপর নীলিমার কবরের ওপর হাত রেখে বিড়বিড় করে বললেন, "নীলু, আমি তোকে কথা দিচ্ছি— তোর এই শেষ ইচ্ছা আমি পূরণ করব। আমি তোর নামে একটা ফাউন্ডেশন করব, একটা ছোট ক্লিনিক করব এই ব্রহ্মপুত্রের পাড়েই। তুই আমাকে মাফ করে দিস রে। আমি তোকে চিনতে ভুল করেছিলাম।"

সূর্য তখন মাথার ওপর উঠে এসেছে। আরিয়ান সাহেব যখন গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ তার মনে হলো যেন বাতাসের সাথে ভেসে আসছে সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর— "গাধা একটা! এত দেরি করলি আসতে?

আরিয়ান সাহেব একবার পেছন ফিরে তাকালেন। কদম গাছের তলায় বাতাসের দোলায় ঝরে পড়া ফুলগুলো যেন তাকে বিদায় জানাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি আজ একা ফিরছেন না; তার সাথে ফিরেছে এক কিশোরীর অনন্ত ভালোবাসা এবং এক নতুন জীবনের উদ্দেশ্য।

আরিয়ান সাহেব অনুভব করছেন, তিনি যেন জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে পা রেখেছেন যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই নীলিমার অদৃশ্য অস্তিত্ব তাকে পথ দেখাচ্ছে। ময়মনসিংহে হাসপাতালের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু এর মাঝেই ডায়েরির সেই রহস্যময় শেষ পাতাটি তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

হাসপাতালের কাজ তদারকি করতে আরিয়ান সাহেব এখন প্রায়ই ময়মনসিংহে থাকেন। নদীর ধারের সেই জীর্ণ বাড়িটি তিনি মেরামত করে নিয়েছেন। মিতাও এখন মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে থাকে। আশ্চর্যজনকভাবে, মিতা আর নীলিমার দাদামশাইয়ের মধ্যে এক চমৎকার সখ্যতা তৈরি হয়েছে। দাদামশাই মিতাকে এখন 'নীলুর বোন' বলে ডাকেন।

এক বর্ষণমুখর রাতে আরিয়ান সাহেব একা বসে নীলিমার সেই লাল ডায়েরিটা আবার পড়ছিলেন। হঠাৎ তার নজরে এল ডায়েরির একদম শেষ কভারের সাথে একটা পাতলা কাগজ আঠা দিয়ে আটকানো। সাতাশ বছরেও কেউ এটা খেয়াল করেনি। আরিয়ান সাহেব খুব সাবধানে ব্লেড দিয়ে কাগজটি আলাদা করলেন।

ভেতরে ছোট ছোট অক্ষরে নীলিমা লিখেছে:

"আরিয়ান, জানি না এই কথাটা বলা ঠিক হবে কি না। কিন্তু আমার খুব ভয় হয়। আমার অসুখটা যখন ধরা পড়ে, তখন বাবা আমাকে ময়মনসিংহে নিয়ে আসার আগে ঢাকার এক বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ডাক্তার আমায় দেখে খুব অবাক হয়েছিলেন। তিনি বাবাকে আড়ালে ডেকে কী যেন বলেছিলেন। বাবা তখন খুব কান্নাকাটি করেছিলেন। পরে আমি বাবার ড্রয়ারে একটা রিপোর্ট দেখেছিলাম, সেখানে আমার নামের পাশে একটা অদ্ভুত শব্দ লেখা ছিল— 'মিডিক্যাল নেগলিজেন্স'। আরিয়ান, আমার মনে হয় ছোটবেলায় আমার যখন একবার অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশন হয়েছিল, তখন কোনো একটা ভুল হয়েছিল। আমি জানি না সত্যটা কী, কিন্তু আমার মনে হয় আমি কোনো অসুখে নয়, বরং কারো অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছি।"

আরিয়ান সাহেবের হাতের ডায়েরিটা ধপ করে ফ্লোরে পড়ে গেল। তার সারা শরীর কাঁপছে। একজন কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে তিনি জানেন, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া অনেক সময় ভুল রক্ত সঞ্চালন বা ভুল ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও হতে পারে। সাতাশ বছর পর এক ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি। নীলিমা কি তবে শুধু ভাগ্যের শিকার ছিল না? সে কি ছিল কোনো এক পেশাদারী ভুলের শিকার?

তিনি দ্রুত নীলিমার বাবাকে ফোন করলেন কানাডায়। দীর্ঘ চেষ্টার পর তাকে পাওয়া গেল।

"চাচা, নীলিমার কি ছোটবেলায় কোনো অপারেশন হয়েছিল? ওর অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হওয়ার আগে?"

ওপার থেকে নীলিমার বাবা দীর্ঘ নীরবতা পালন করলেন। তারপর ভারী গলায় বললেন, "হ্যাঁ বাবা। ১৯৯৭ সালে ওর একবার অ্যাপেন্ডিক্স হয়েছিল। তখন আজিমপুরের এক ছোট ক্লিনিকে ওর অপারেশন হয়। অপারেশনের পর ওর শরীর খুব খারাপ হতে থাকে। আমরা সেই ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি আমাদের উল্টো ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। আমাদের তখন টাকা ছিল না, ক্ষমতা ছিল না আরিয়ান। আমরা ভয়ে চুপ করে গিয়েছিলাম।"

"সেই ডাক্তারের নাম মনে আছে আপনার?" আরিয়ানের কণ্ঠস্বর এখন ইস্পাতের মতো শক্ত।

"নামটা ছিল ডাক্তার শওকত। এখন তো তিনি শহরের অনেক নামী ডাক্তার।"

নামটা শুনতেই আরিয়ান সাহেবের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। ডাক্তার শওকত! তিনি আর কেউ নন, আরিয়ান যে হাসপাতালে প্র্যাকটিস করেন, সেই হাসপাতালের বর্তমান চেয়ারম্যান। যাকে আরিয়ান এতোদিন আদর্শ মেনে এসেছেন।

প্রতিশোধের নেশা আরিয়ানের মাথায় কোনোদিন ছিল না, কিন্তু আজ নীলিমার সেই শেষ কথাগুলো তার কানে বিষের মতো বাজছে। নীলিমা বিচার পায়নি, সে অভিমানে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। আরিয়ান আজ বুঝতে পারলেন, শুধু হাসপাতাল বানালেই নীলিমার আত্মা শান্তি পাবে না, সাতাশ বছর আগের সেই অবিচারের মুখোশ খুলে দেওয়াটাও তার দায়িত্ব।

পরদিন আরিয়ান সাহেব সরাসরি ডাক্তার শওকতের কেবিনে গিয়ে ঢুকলেন। হাতে সেই পুরোনো ফাইল আর ডায়েরির পাতা।

শওকত সাহেব তখন আয়েশ করে কফি খাচ্ছিলেন। আরিয়ানকে দেখে হাসলেন। "কী আরিয়ান সাহেব? আপনার সেই ময়মনসিংহের প্রজেক্ট কতদূর?"

আরিয়ান কোনো ভণিতা না করে ফাইলটা তার টেবিলের ওপর রাখলেন। "১৯৯৭ সাল। আজিমপুর 'সেবা ক্লিনিক'। নীলিমা আক্তার। মনে পড়ে ডাক্তার?"

শওকত সাহেবের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার হাত থেকে কফির কাপটা কেঁপে উঠল। "এসব কী বলছ আরিয়ান? পুরোনো কথা তুলে লাভ কী?"

"লাভ আছে ডাক্তার। কারণ আপনি আপনার ভুলের প্রমাণ লোপাট করার জন্য এক মধ্যবিত্ত পরিবারকে গ্রাম ছাড়া করেছিলেন। আপনি জানতেন আপনার ভুল রক্ত সঞ্চালনের কারণে মেয়েটার হাড়ের মজ্জা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আপনি সেদিন শুধু একজন রোগীকে মারেননি, আপনি আমার নীলিমাকে মেরেছিলেন!"

আরিয়ানের গলার স্বর পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। নার্স আর অন্য ডাক্তাররা ভিড় করতে শুরু করল।

"তোমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই আরিয়ান!" শওকত সাহেব চিৎকার করে উঠলেন।

"প্রমাণ আমার কাছে নেই, কিন্তু সাতাশ বছরের জমানো এই চোখের জলে আছে।" আরিয়ান তার মোবাইলটা বের করলেন। তিনি জানতেন এই লোকটা অস্বীকার করবে, তাই তিনি কথাগুলো রেকর্ড করে রেখেছিলেন।

সেই বিকেলেই আরিয়ান সাহেব বিএমডিসি (BMDC) এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেন। তার ক্যারিয়ার এখন হুমকির মুখে। হাসপাতালের সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গেল। কিন্তু মিতা তার পাশে এসে দাঁড়াল।

মিতা বলল, "আরিয়ান, আজ তোমাকে দেখে নীলিমা নিশ্চয়ই হাসছে। সে জানত তুমিই একদিন ওর হয়ে লড়বে।"

হাসপাতালের কাজ আপাতত থমকে গেছে আইনি জটিলতায়। আরিয়ান সাহেব ময়মনসিংহে নীলিমার কবরের পাশে গিয়ে বসলেন। আজ আকাশটা ঠিক তেমনই নীল, যেমনটা নীলিমার ওড়না ছিল। তিনি কবরের মাটিতে হাত রেখে বললেন, "নীলু, বিচার পেতে একটু দেরি হয়ে গেল। কিন্তু এবার তুই শান্তিতে ঘুমা। আমি আসছি তোর সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে।"

আরিয়ান সাহেব এখন এক অগ্নিনিলীক্ষায় দাঁড়িয়ে। একদিকে তার দীর্ঘ সাতাশ বছরের গড়া পেশাদার সম্মান, অন্যদিকে তার কিশোরবেলার পবিত্র ভালোবাসার কাছে দায়বদ্ধতা। হাসপাতালের করিডোর থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্রই তখন একটাই আলোচনা: "বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট আরিয়ান কেন সাতাশ বছর আগের এক মৃত কিশোরীর জন্য নিজের ক্যারিয়ার বাজি ধরলেন?"

মামলাটা যখন আদালতে উঠল, তখন চারদিকে ব্যাপক আলোড়ন। ডাক্তার শওকত সাহেব তার টাকার জোরে বড় বড় উকিল নিয়োগ করলেন। তারা আরিয়ান সাহেবকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগলেন।

"মহামান্য আদালত, ডাক্তার আরিয়ান একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ। তিনি সাতাশ বছর আগের এক কাল্পনিক প্রেমের গল্প শুনিয়ে আমার মক্কেলের সম্মানহানি করছেন। তার কাছে কোনো অকাট্য মেডিকেল রিপোর্ট নেই, আছে শুধু এক কিশোরীর ডায়েরি। ডায়েরি কি কোনো প্রমাণ হতে পারে?" উকিলের বিদ্রূপাত্মক হাসি আরিয়ান সাহেবের কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছিল।

আরিয়ান সাহেব শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি জানতেন, বিজ্ঞান আর আইনের মারপ্যাঁচে নীলিমার কান্না হয়তো হেরে যাবে। কিন্তু হঠাৎ করেই এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল।

আদালতের দরজায় এক জীর্ণশীর্ণ বৃদ্ধা এসে দাঁড়ালেন। তার হাতে একটি পুরনো প্লাস্টিকের ফাইল। ইনি সেই 'সেবা ক্লিনিক'-এর তৎকালীন আয়া, রহিমা বানু। সাতাশ বছর আগে ডাক্তার শওকত তাকে ভয় দেখিয়ে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিলেন কারণ তিনি সব জানতেন।

রহিমা বানু কাঁপাকাঁপা গলায় সাক্ষ্য দিলেন, "সেদিন ডাক্তার সাহেব তাড়াহুড়ো করে ভুল গ্রুপের রক্ত নীলু মার শরীরে দিয়েছিলেন। আমি যখন বাধা দিছিলাম, তখন উনি আমারে গলা ধাক্কা দিয়া বাইর কইরা দিছিলেন। যাওয়ার সময় আমি এই রেকর্ড ফাইলটা চুরি কইরা নিয়া গেছিলাম, যদি কোনোদিন বিচার হয়।"

পুরো আদালত কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সেই ফাইলে নীলিমার সেই ভুল রক্ত সঞ্চালনের প্রতিটি তথ্য নথিবদ্ধ ছিল। ডাক্তার শওকতের ফ্যাকাশে মুখ দেখে বোঝা গেল, সত্যের কাছে আজ অহংকার নতজানু। বিচারক রায় দিলেন— ডাক্তার শওকতের লাইসেন্স বাতিল এবং তাকে আইনি হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।

আদালত থেকে বের হয়ে আরিয়ান সাহেব আকাশের দিকে তাকালেন। অদ্ভুতভাবে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তার মনে হলো, বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা যেন নীলিমার পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।

ময়মনসিংহের "নীলিমা মেমোরিয়াল কেয়ার" হাসপাতালের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। উদ্বোধনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। আরিয়ান সাহেব একা বসে আছেন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। দাদামশাই গত রাতে ঘুমের মধ্যেই মারা গেছেন। নীলিমার ঠিক পাশেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। আরিয়ান এখন এই পৃথিবীতে নীলিমার একমাত্র স্মৃতিবাহক।

মিতা এসে পাশে বসল। "আরিয়ান, হাসপাতালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটা বিশেষ অতিথি আসছেন। আমি তাকে খুঁজে বের করেছি।"

আরিয়ান অবাক হলেন। "কে?"

"নীলিমার সেই স্কুল শিক্ষিকা, সুলতানা আপা। মনে আছে? যিনি তোমাদের দুজনকে একসাথে দেখলে হাসতেন?"

আরিয়ানের চোখে জল চলে এল। সুলতানা আপা মানেই তো শৈশবের সেই হারানো ক্লাসরুম।

উদ্বোধনের দিন হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ফুলে ফুলে সাজানো হলো। নীলিমার ছবিটাকে বকুল ফুল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সুলতানা আপা যখন ফিতা কাটতে এলেন, তার হাতে একটি পুরনো খাম। তিনি আরিয়ানের মাথায় হাত রেখে বললেন, "আরিয়ান, তুই আমার ছাত্র হিসেবে আজ আমাকে গর্বিত করলি। নীলু তোকে এই কথাটা পৌঁছে দিতে বলেছিল, কিন্তু তখন তুই চলে গিয়েছিলি।"

তিনি খামটা খুললেন। ভেতরে একটি ছোট্ট চিরকুট, ১৯৯৮ সালের সেই শেষ স্কুলের দিনে নীলিমা সুলতানা আপার কাছে রেখে গিয়েছিল।

লেখা ছিল— "আপা, আরিয়ানকে বলবেন, বড় হয়ে ও যেন ওর চোখের জলগুলো দিয়ে অন্য কারো জীবনের আগুন নেভায়। ও যেন কাঁদতে না পারে, শুধু হাসাতে পারে।"

আরিয়ান সাহেব সুলতানা আপার পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, নীলিমা তাকে শুধু ভালোই বাসেনি, তাকে একজন ভালো মানুষ হওয়ার পথ দেখিয়ে গেছে।

কিন্তু ওই রাতে হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে আরিয়ান সাহেবের সাথে এমন এক ঘটনা ঘটল, যা বিজ্ঞানের কোনো সংজ্ঞায় ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি দেখলেন, নতুন আইসিইউ-র জানালার পাশে এক কিশোরী দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সেই নীল ওড়না, হাতে একগুচ্ছ বকুল। মেয়েটি একবার আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে হাসল— সেই অমলিন, স্বর্গীয় হাসি। আরিয়ান সাহেব যখন কাছে গেলেন, সেখানে কেউ নেই। শুধু বাতাসে ভেসে আসছে বকুল ফুলের তীব্র সুবাস।

আরিয়ান সাহেব হাসলেন। তিনি জানেন, নীলিমা এই হাসপাতালেই থাকবে। প্রতিটি রোগীর সেরে ওঠার হাসিতে নীলিমা বেঁচে থাকবে।

জীবন সায়াহ্নে এসে মানুষ পেছনের দিকে তাকায়। আরিয়ান সাহেবের বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সাতাশ বছর আগের সেই কিশোর এখন সত্তর বছরের এক অভিজ্ঞ মানুষ। তার চুলে সাদা মেঘের প্রলেপ, কপালে অভিজ্ঞতার ভাঁজ। কিন্তু তার চোখের সেই নীলিমার প্রতি ভালোবাসা আজও তেরো বছরের কিশোরের মতোই অমলিন।

নীলিমা মেমোরিয়াল কেয়ার' এখন আর কেবল একটি ছোট হাসপাতাল নয়, এটি এখন পুরো অঞ্চলের মানুষের শেষ আশ্রয়ের নাম। হাজার হাজার 'নীলিমা' আজ এখানে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে। আরিয়ান সাহেব প্রতিদিন একবার করে হাসপাতালের প্রতিটি বেডে গিয়ে রোগীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তিনি যখন ছোট ছোট মেয়েদের দিকে তাকান, তার মনে হয় নীলিমা যেন বহু রূপে তার চারপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মিতা আজ থেকে পাঁচ বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে তিনি আরিয়ানের হাত ধরে বলে গিয়েছিলেন, "আরিয়ান, আমি তোমার বর্তমানকে পেয়েছি, কিন্তু নীলিমা তোমার আত্মাকে পেয়েছিল। এবার তুমি তোমার আত্মার কাছে ফিরে যাও।" মিতা ছিলেন এক অসাধারণ নারী, যিনি আরিয়ানের হৃদয়ে নীলিমার পাশের জায়গাটা খুব সযত্নে তৈরি করে নিয়েছিলেন।

আজ ২০শে আগস্ট। সেই রাত, যেদিন নীলিমা চলে গিয়েছিল। আরিয়ান সাহেব আজ খুব অসুস্থ বোধ করছেন। তিনি কাউকে কিছু না বলে খুব ধীর পায়ে নীলিমার সেই প্রিয় বকুল তলার কবরের পাশে গিয়ে বসলেন। আজ আকাশটা অদ্ভুত পরিষ্কার। কোটি কোটি তারা জ্বলছে। ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে বয়ে আসা বাতাসটা আজ খুব শীতল।

আরিয়ান সাহেব তার পকেট থেকে সেই জীর্ণ নীল খামটা বের করলেন। চিঠির লেখাগুলো এখন প্রায় মুছে গেছে, কিন্তু আরিয়ানের তো সেগুলো মুখস্থ। তিনি বিড়বিড় করে পড়তে লাগলেন— "আরিয়ান, আমরা আবার দেখা করব। এই জন্মে না হোক, অন্য কোনো এক শ্রাবণের রাতে..."

হঠাৎ আরিয়ান সাহেবের মনে হলো তার চারপাশের দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। হাসপাতালের লাইটগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে, শহরের কোলাহল দূরে সরে যাচ্ছে। তার কানে ভেসে আসছে আজিমপুর কলোনির সেই পুরোনো বিকেলের শব্দ। সাইকেলের টুংটাং বেল, ছেলেদের ক্রিকেট খেলার চিৎকার, আর নীলিমার সেই খিলখিল হাসি।

তিনি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন। তার হাতের চামড়ার ভাঁজগুলো নেই! তিনি আবার সেই তেরো বছরের কিশোর। পরনে স্কুলের শার্ট, পায়ে সেই পুরোনো কেডস।

"আরিয়ান! এই গাধা, এত দেরি করলি কেন?"

আরিয়ান সাহেব চমকে পেছনে ফিরলেন। বকুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে সেই কিশোরী নীলিমা। তার পরনে নীল ওড়না, চুলে বকুল ফুলের মালা। ঠিক যেমনটা আরিয়ানের মনের গভীরে সাতাশ বছর ধরে আঁকা ছিল।

আরিয়ান কাঁদতে চাইলেন, কিন্তু তার চোখ দিয়ে জল বের হলো না। এক বুক হাহাকার নিয়ে তিনি বললেন, "নীলু, তুই জানিস না আমি কতদিন তোর জন্য অপেক্ষা করেছি। সাতাশ বছর... প্রতিটা রাত আমি তোর ওই নীল খামটা বুকে নিয়ে শুয়েছি।"

নীলিমা এগিয়ে এসে আরিয়ানের হাতটা ধরল। তার হাতের স্পর্শে কোনো শীতলতা নেই, আছে এক অদ্ভুত উষ্ণতা। নীলিমা হাসল, "আমি তো তোর পাশেই ছিলাম রে পাগল! যখন তুই ওই হাসপাতালে বসে রোগীদের সেবা করতিস, আমি তখন তোর ঘামের ফোঁটা হয়ে ঝরতাম। যখন তুই কবরের পাশে বসে কাঁদতিস, আমি তখন বাতাসের হয়ে তোর চোখের জল মুছিয়ে দিতাম।"

আরিয়ান নীলিমার হাতটা শক্ত করে ধরলেন। "এবার তো আর হারিয়ে যাবি না?"

নীলিমা মাথা নাড়ল। "না। এবার আমরা এমন এক জায়গায় যাব, যেখানে কোনো নীল খাম থাকবে না, কোনো মরণব্যাধি থাকবে না, আর কোনো বিচ্ছেদ থাকবে না। দেখ আরিয়ান, আজ আকাশটা ঠিক আমার ওড়নার মতো নীল হয়ে আছে না?"

আরিয়ান আকাশের দিকে তাকালেন। সত্যিই, অন্ধকার রাত ভেদ করে এক মায়াবী নীল আলো পুরো বিশ্বকে ঢেকে দিচ্ছে।

পরদিন সকালে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মী এসে দেখল, বকুল তলায় নীলিমার কবরের ওপর মাথা রেখে ডাক্তার আরিয়ান সাহেব শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন। তার মুখে এক অদ্ভুত স্বর্গীয় প্রশান্তির হাসি। তার ডান হাতে ধরা একটি অতি জীর্ণ নীল খাম।

আরিয়ান সাহেব মারা গেছেন। কিন্তু এলাকার মানুষ বলে, সেই রাতের পর থেকে যখনই নীলিমা মেমোরিয়াল কেয়ারে কোনো জটিল রোগী আসে, তখন নাকি হাসপাতালের করিডোরে একজন নীল ওড়না পরা কিশোরী আর একজন সাদা শার্ট পরা কিশোরকে একসাথে হাঁটতে দেখা যায়। তারা নাকি রোগীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, আর তাদের ছোঁয়ায় যমদূতও হার মেনে ফিরে যায়।

ভালোবাসা মরতে জানে না। ভালোবাসা কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে প্রবাহিত হয়। নীলিমা আর আরিয়ানের ভালোবাসা কোনো এক নীল খামে বন্দি থাকেনি, বরং তা হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকার বিশ্বাস হয়ে আজীবন টিকে রইল।

 

লেখক: ফারজানা ইসলাম


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত