ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

বাংলার লোককথা এবং জাদুবাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্ক



বাংলার লোককথা এবং জাদুবাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্ক
ছবি: সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে লোককথার জগতে নিবিড়ভাবে শেকড় গেড়ে আছে। সেই জগৎ বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে অতিলৌকিক কল্পনাশ্রিত অনুভবের মধ্য দিয়ে এক অপার বিস্ময় রচনা করেছে। অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, বোরহেস বা মারিও ভার্গাস ইয়োসাদের হাত ধরে যে ধারাটি বিশ্বসাহিত্যে পরিচিত হয়েছে ম্যাজিক রিয়েলিজম নামে, তার সঙ্গে বাংলার লোককথার অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ম্যাজিক রিয়েলিজম যেখানে বাস্তবতার বুকে জাদুর মতো অপ্রাকৃত ঘটনা ঘটায়; সেখানে বাংলার লোকগাথা রূপকথাও যুগের পর যুগ ধরে একই কাজ করেছেবাস্তব জীবনের মাঝেই অলৌকিকতার নরম ছোঁয়া বুনে দিয়েছে। এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে, বাংলার লোককথা কীভাবে ম্যাজিক রিয়েলিজমের পূর্বসূরি হয়ে ওঠে এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্য এই দুই ধারার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে কীভাবে এক বিশেষ কাব্যিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। লোককথা এমন এক মৌখিক ঐতিহ্য, যা সমাজের বিশ্বাস, সংস্কার, ভয়, আশা, প্রেম নৈতিকতার প্রতিফলন ঘটায়। এখানে মানুষ বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে অলৌকিক শক্তি, পরী, ভূত, দেবতা কিংবা অভিশাপের গল্পের মাধ্যমে জীবনকে ব্যাখ্যা করে। অন্যদিকে, ম্যাজিক রিয়েলিজম হলো এমন এক সাহিত্যধারা, যেখানে জাদুময় বা অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলো বাস্তব জীবনের প্রাকৃতিক অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়লেখক বা চরিত্র কেউই সেটিকে বিস্ময় হিসেবে গ্রহণ করে না। অর্থাৎ ম্যাজিক রিয়েলিজমে জাদু কোনো স্বপ্ন নয় বরং বাস্তবতার এক ভিন্ন মাত্রা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বাংলার লোককথা অনেকাংশে ম্যাজিক রিয়েলিজমের সঙ্গে একাত্ম। কারণ বাংলার সমাজে অলৌকিকতা কোনো বাইরের ঘটনা নয় বরং জীবনের স্বাভাবিক উপাদান। বৃষ্টির দেবতাইন্দ্র’, নদীর দেবীগঙ্গা’, কিংবাবনদেবতা’—সবই মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত। লোককথায় যখন মৃত মানুষ জীবিত হয় বা গাছ কথা বলে; তখন সেটি গ্রামীণ মানুষের চোখে অবাস্তব নয় বরং তাদের বিশ্বদৃষ্টিতে সেটিই স্বাভাবিক।

বাংলার লোককথায় বাস্তব অবাস্তবের এমন এক মিশ্রণ আছে, যা আধুনিক সাহিত্যিক ম্যাজিক রিয়েলিজমের মর্মকে আগাম জানান দেয়। যেমন—‘সাত ভাই চম্পাবাললিতা কালা নাগগল্পে দেখা যায়, মানুষ প্রাণীর রূপ নেয়, ফুল হয়ে যায় কিংবা সাপ প্রেমিক হয়ে ওঠে। এসব গল্পে জাদু কেবল ঘটনাক্রম নয়; এটি সমাজের বিশ্বাসের প্রতিফলনযেখানে প্রকৃতি মানুষ অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। গ্রামীণ জীবনে চাঁদ, নদী, বৃষ্টি বা অরণ্য কখনোই কেবল প্রাকৃতিক উপাদান নয়; তারা জীবন্ত চরিত্রের মতো আচরণ করে। কারণেই বাংলার লোককথায় অলৌকিকতা বাস্তবতার পরিপূরক। এই ভাবনা পরবর্তীকালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরপুতুলনাচের ইতিকথা’, সেলিনা হোসেনেরগঙ্গাকিংবা হুমায়ূন আহমেদেরদারুচিনি দ্বীপ’, ‘বৃষ্টির গান’–এর মতো লেখায় আধুনিক রূপে ফিরে আসে।

এবার আসি ম্যাজিক রিয়েলিজমের কথায়। ম্যাজিক রিয়েলিজমের জন্ম লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক অস্থিরতার সময়ে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসেরওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’ (১৯৬৭) এই ধারার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এখানে বুয়েন্দিয়া পরিবারের সাত প্রজন্মের ইতিহাসে অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যেমনআকাশে উঠে যাওয়া পুরুষ বা ঘরের মধ্যে শতবর্ষের বৃষ্টিএকেবারেই স্বাভাবিকভাবে বিবৃত। বাস্তবতার সঙ্গে জাদুর এই নিরবচ্ছিন্ন মিশ্রণই ম্যাজিক রিয়েলিজমের সৌন্দর্য। বাংলা সাহিত্যে ধারাটি কোনো আমদানিকৃত ভাবনা নয়। আমাদের লোককথা মিথ এই বাস্তব-অবাস্তব মিশ্রণের দীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করছে। তাই যখন সেলিনা হোসেনগঙ্গা নদীর প্রবাহকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখান বা শাহাদুজ্জামানক্রাচের কর্নেল’- অতিপ্রাকৃত সময়বোধ ব্যবহার করেন; তখন তাঁরা কেবল মার্কেসীয় প্রভাব নয় বরং বাঙালি কল্পচেতনারই আধুনিক অনুবাদ ঘটান।

লোককথার অলৌকিকতা ম্যাজিক রিয়েলিজমের জাদুবাস্তবতা দুটো ভিন্ন দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ালেও উভয়ের সংযোগসূত্র হলো—‘অবিশ্বাসের স্থগিতাবস্থা লোকগল্পে মানুষ অলৌকিকতাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, আবার ম্যাজিক রিয়েলিজমেও পাঠককে সেই বিশ্বাসে টেনে আনা হয়।

সেলিনা হোসেনের গঙ্গা উপন্যাসে গঙ্গা নদী কেবল একটি প্রাকৃতিক সত্তা নয়, এটি নারী, মা বিধাতার প্রতীক। নদীর উত্থান-পতনের সঙ্গে মানুষের ভাগ্য জড়িত। এখানে বাস্তব জীবনের রাজনৈতিক, সামাজিক সংকটের পাশাপাশি নদীর অলৌকিক আত্মা ক্রমাগত কথা বলে। এটি আসলে লোকবিশ্বাসের আধুনিক রূপান্তর, যা ম্যাজিক রিয়েলিজমের আদর্শে পরিণত হয়েছে। আবার হুমায়ূন আহমেদেরদারুচিনি দ্বীপেস্বপ্ন, বাস্তব কল্পনা একসঙ্গে মিশে যায়। চরিত্ররা এমন কিছু অনুভব করে, যা বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করলেও তাদের কাছে তা অবিশ্বাস্য নয়। লেখকের ভাষায়—‘মানুষের জীবনে কখনো কখনো জাদু এসে ঢোকে, তবু জীবন তার আপন গতিতেই চলে।এটি ম্যাজিক রিয়েলিজমেরই প্রতিফলন। একইভাবে মহাশ্বেতা দেবীর লায়োসেনা গল্পে উপজাতি সমাজের বিশ্বাস, দেবতা আত্মার ধারণা বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত। দেবতার অবতরণ, স্বপ্নে ভবিষ্যদ্বাণীসবই বাস্তবতার অংশ। লোকচেতনা এখানে ম্যাজিক রিয়েলিজমের সারবস্তু হয়ে ওঠে।

বাংলার লোককথায় নারী প্রায়ই জাদুর উৎস বা বাহক। তারা কখনো দেবী, কখনো অভিশপ্ত, কখনো পুনর্জন্মপ্রাপ্ত।সাত ভাই চম্পা চম্পা, ‘মালঞ্চবাবেহুলা মতো চরিত্রগুলো প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে একাত্ম। ধারণা আধুনিক ম্যাজিক রিয়েলিজমে পুনরাবৃত্ত হয়যেমন সেলিনা হোসেনেরগঙ্গা নারীপ্রকৃতিনদী একই প্রতীকে পরিণত হয়। এই মিল দেখায়, লোককথার নারীচেতনা আসলে এক গভীর মিথিক বাস্তবতা, যা ম্যাজিক রিয়েলিজমে নতুন রূপে ফিরে আসে।

লোককথায় সময় সরলরেখায় চলে নাঅতীত বর্তমান একাকার হয়ে যায়। বেহুলা যেমন মৃত লখিন্দরকে পুনর্জীবন দেয়; তেমনই মার্কেসেরওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’- সময় চক্রাকারে ঘুরে ফিরে আসে। বাংলার লেখকেরা এই সময়চক্রের ধারণাকে গ্রহণ করেছেনশহীদুল জহিরেরঝিলের ধারে লাশগল্পে বাস্তব অতীতের স্মৃতি একত্রে চলমান, যা পাঠককে এক জাদুবাস্তব পরিবেশে নিয়ে যায়। এটি লোককথার কালচেতনার আধুনিক রূপান্তর।

বাংলা সাহিত্যের অনেক লেখক সচেতনভাবে লোককথা ম্যাজিক রিয়েলিজমের মিশ্রণে কাজ করেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁরখোয়াবনামা লোকবিশ্বাস রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে মিশিয়েছেন। ভূতের স্বপ্ন, নদীর কণ্ঠস্বর কিংবা অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি এখানে বাস্তবতার অঙ্গ। শহীদুল জহিরের গল্পগুলোতে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি বাস্তবতার সঙ্গে এক অদ্ভুত রহস্য জড়ানো থাকে, যেন সময় স্থান কখনোই স্থির নয়। সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হক এবং হুমায়ূন আহমেদতাঁদের লেখায় লোককথার জাদু সামাজিক বাস্তবতা একত্রে চলেছে।

বাংলার লোককথা ম্যাজিক রিয়েলিজমের মধ্যে গভীর ভাবগত কাঠামোগত মিল বিদ্যমান, যদিও তাদের উৎপত্তি উদ্দেশ্য ভিন্ন। লোককথা মূলত সমাজের বিশ্বাস, ধর্মীয় ধারণা এবং নৈতিক শিক্ষার বাহক; অপরদিকে ম্যাজিক রিয়েলিজম বাস্তব জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিস্ময় অস্বাভাবিকতাকে প্রকাশ করার সাহিত্যিক কৌশল। তবুও উভয়ের মূলে রয়েছে বাস্তবতার সঙ্গে অলৌকিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। বাংলার লোককথায় অলৌকিকতা প্রকাশ পায় দেবতা, ভূত, অভিশাপ, জাদু বা রূপান্তরের মাধ্যমেযেমন কোনো মানুষ প্রাণীতে পরিণত হয়, ফুল হয়ে যায় বা মৃত্যুর পর ফিরে আসে। ঘটনাগুলোকে গল্পের চরিত্ররা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, কারণ সেগুলো তাদের বিশ্বাস সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে, ম্যাজিক রিয়েলিজমেও জাদুময় ঘটনা ঘটে কিন্তু তা ব্যাখ্যা বা যুক্তি দাবি করে না। বরং লেখক চরিত্র উভয়েই ধরে নেয়, এসব ঘটনাই বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এই দুই ক্ষেত্রেই অবিশ্বাসের স্থগিতাবস্থা বজায় থাকেপাঠক বাস্তব অবাস্তবের সীমারেখা ভুলে যায়।

লোককথা সময় স্থানকে নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে না; গল্পগুলো অনেক সময় পৌরাণিক বা অনির্দিষ্ট কোনো কালের পটভূমিতে ঘটে। ম্যাজিক রিয়েলিজমেও সময় স্থান প্রায়ই বিকৃত হয়ে যায়অতীত, বর্তমান ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়, যেন সময় কোনো সরলরেখা নয় বরং এক চক্রাকার অভিজ্ঞতা। শহীদুল জহির বা মার্কেসউভয় লেখকের লেখায় সময়বোধের জটিলতা স্পষ্ট। তাছাড়া লোককথার উদ্দেশ্য সাধারণত নৈতিক শিক্ষা বা সামাজিক বার্তা প্রদান, যেখানে ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব সুস্পষ্ট। কিন্তু ম্যাজিক রিয়েলিজম সেই দ্বন্দ্বকে অস্পষ্ট করে, বাস্তব জীবনের ধূসর অঞ্চলগুলোকে সামনে আনে। ফলে লোককথা যেখানে পাঠককে নির্দিষ্ট নৈতিক অবস্থানে নিয়ে যায়, সেখানে ম্যাজিক রিয়েলিজম পাঠককে চিন্তার গভীরে ঠেলে দেয়বাস্তবতা কী, বিশ্বাস কীসে প্রশ্ন তোলে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলার লোককথা ম্যাজিক রিয়েলিজমের পূর্বসূরিস্বরূপ। লোককথা অলৌকিকতাকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করে, আর ম্যাজিক রিয়েলিজম সেই বিশ্বাসকে নান্দনিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে। একটির শেকড় ঐতিহ্যে, অন্যটির বিকাশ আধুনিক চেতনায়তবু দুটোই মানুষের অভ্যন্তরীণ জীবন, তার ভয়, বিস্ময় কল্পনার রূপায়ণ। বাংলার লোককথা যেমন গ্রামীণ সমাজের নৈতিক বোধ বহন করে, তেমনই আধুনিক ম্যাজিক রিয়েলিজমও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর লুকিয়ে থাকা অদ্ভুততাকে উন্মোচন করে। উদাহরণস্বরূপ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেরখোয়াবনামাতে ১৯৪৭এর বিভাজন, জমিদারপ্রজা সম্পর্ক এবং কৃষকের স্বপ্ন সবকিছুই এক জাদুবাস্তব পরিমণ্ডলে উপস্থিত। ফলে লোককথার মতোই ম্যাজিক রিয়েলিজমও জনগণের মানসিক ইতিহাস বহন করে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যিকরাবিশেষ করে ১৯৮০-এর পরবর্তী সময়ের লেখকেরালোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে ম্যাজিক রিয়েলিজমকে এমনভাবে যুক্ত করেছেন, যা বৈশ্বিক সাহিত্যেও অনন্য। শাহাদুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক, ইলিয়াস, শহীদুল জহির কিংবা সৈয়দ মান্নানসবাই ধারার উত্তরসূরি। তাদের লেখায় গ্রামীণ বিশ্বাস, শহুরে বাস্তবতা সময়ের ধ্বংস একাকার হয়ে যায়।

বাংলার লোককথা ম্যাজিক রিয়েলিজমদুটি ধারাই মানুষের অস্তিত্বের জটিলতা প্রকাশ করে ভিন্ন ভিন্ন পথে। লোককথা জন্ম নেয় বিশ্বাস প্রথার মধ্যে, আর ম্যাজিক রিয়েলিজম জন্ম নেয় বাস্তবতার সীমা ভাঙার আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু উভয়ের লক্ষ্য একমানুষের জীবন সময়কে নতুন আলোয় দেখা। বাংলা সাহিত্য এই দুই ধারার মিলনে এক অনন্য বাস্তবতার সৃষ্টি করেছেযেখানে নদী কথা বলে, মানুষ উড়ে যায়, মৃতেরা ফিরে আসে, অথচ সবকিছুই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক অলৌকিকতা বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ম্যাজিক রিয়েলিজমের পারস্পরিক সেতুবন্ধনেরই সাক্ষ্য।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কাব্যালোচক এবং কলামিস্ট।

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

আপনার মতামত লিখুন

ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

রোববার, ২৯ মার্চ ২০২৬


বাংলার লোককথা এবং জাদুবাস্তবতার পারস্পরিক সম্পর্ক

প্রকাশের তারিখ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

বাংলা সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে লোককথার জগতে নিবিড়ভাবে শেকড় গেড়ে আছে। সেই জগৎ বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে অতিলৌকিক কল্পনাশ্রিত অনুভবের মধ্য দিয়ে এক অপার বিস্ময় রচনা করেছে। অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, বোরহেস বা মারিও ভার্গাস ইয়োসাদের হাত ধরে যে ধারাটি বিশ্বসাহিত্যে পরিচিত হয়েছে ম্যাজিক রিয়েলিজম নামে, তার সঙ্গে বাংলার লোককথার অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ম্যাজিক রিয়েলিজম যেখানে বাস্তবতার বুকে জাদুর মতো অপ্রাকৃত ঘটনা ঘটায়; সেখানে বাংলার লোকগাথা রূপকথাও যুগের পর যুগ ধরে একই কাজ করেছেবাস্তব জীবনের মাঝেই অলৌকিকতার নরম ছোঁয়া বুনে দিয়েছে। এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে, বাংলার লোককথা কীভাবে ম্যাজিক রিয়েলিজমের পূর্বসূরি হয়ে ওঠে এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্য এই দুই ধারার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে কীভাবে এক বিশেষ কাব্যিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। লোককথা এমন এক মৌখিক ঐতিহ্য, যা সমাজের বিশ্বাস, সংস্কার, ভয়, আশা, প্রেম নৈতিকতার প্রতিফলন ঘটায়। এখানে মানুষ বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে অলৌকিক শক্তি, পরী, ভূত, দেবতা কিংবা অভিশাপের গল্পের মাধ্যমে জীবনকে ব্যাখ্যা করে। অন্যদিকে, ম্যাজিক রিয়েলিজম হলো এমন এক সাহিত্যধারা, যেখানে জাদুময় বা অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলো বাস্তব জীবনের প্রাকৃতিক অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়লেখক বা চরিত্র কেউই সেটিকে বিস্ময় হিসেবে গ্রহণ করে না। অর্থাৎ ম্যাজিক রিয়েলিজমে জাদু কোনো স্বপ্ন নয় বরং বাস্তবতার এক ভিন্ন মাত্রা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বাংলার লোককথা অনেকাংশে ম্যাজিক রিয়েলিজমের সঙ্গে একাত্ম। কারণ বাংলার সমাজে অলৌকিকতা কোনো বাইরের ঘটনা নয় বরং জীবনের স্বাভাবিক উপাদান। বৃষ্টির দেবতাইন্দ্র’, নদীর দেবীগঙ্গা’, কিংবাবনদেবতা’—সবই মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত। লোককথায় যখন মৃত মানুষ জীবিত হয় বা গাছ কথা বলে; তখন সেটি গ্রামীণ মানুষের চোখে অবাস্তব নয় বরং তাদের বিশ্বদৃষ্টিতে সেটিই স্বাভাবিক।

বাংলার লোককথায় বাস্তব অবাস্তবের এমন এক মিশ্রণ আছে, যা আধুনিক সাহিত্যিক ম্যাজিক রিয়েলিজমের মর্মকে আগাম জানান দেয়। যেমন—‘সাত ভাই চম্পাবাললিতা কালা নাগগল্পে দেখা যায়, মানুষ প্রাণীর রূপ নেয়, ফুল হয়ে যায় কিংবা সাপ প্রেমিক হয়ে ওঠে। এসব গল্পে জাদু কেবল ঘটনাক্রম নয়; এটি সমাজের বিশ্বাসের প্রতিফলনযেখানে প্রকৃতি মানুষ অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত। গ্রামীণ জীবনে চাঁদ, নদী, বৃষ্টি বা অরণ্য কখনোই কেবল প্রাকৃতিক উপাদান নয়; তারা জীবন্ত চরিত্রের মতো আচরণ করে। কারণেই বাংলার লোককথায় অলৌকিকতা বাস্তবতার পরিপূরক। এই ভাবনা পরবর্তীকালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরপুতুলনাচের ইতিকথা’, সেলিনা হোসেনেরগঙ্গাকিংবা হুমায়ূন আহমেদেরদারুচিনি দ্বীপ’, ‘বৃষ্টির গান’–এর মতো লেখায় আধুনিক রূপে ফিরে আসে।

এবার আসি ম্যাজিক রিয়েলিজমের কথায়। ম্যাজিক রিয়েলিজমের জন্ম লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক অস্থিরতার সময়ে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসেরওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’ (১৯৬৭) এই ধারার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এখানে বুয়েন্দিয়া পরিবারের সাত প্রজন্মের ইতিহাসে অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যেমনআকাশে উঠে যাওয়া পুরুষ বা ঘরের মধ্যে শতবর্ষের বৃষ্টিএকেবারেই স্বাভাবিকভাবে বিবৃত। বাস্তবতার সঙ্গে জাদুর এই নিরবচ্ছিন্ন মিশ্রণই ম্যাজিক রিয়েলিজমের সৌন্দর্য। বাংলা সাহিত্যে ধারাটি কোনো আমদানিকৃত ভাবনা নয়। আমাদের লোককথা মিথ এই বাস্তব-অবাস্তব মিশ্রণের দীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করছে। তাই যখন সেলিনা হোসেনগঙ্গা নদীর প্রবাহকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখান বা শাহাদুজ্জামানক্রাচের কর্নেল’- অতিপ্রাকৃত সময়বোধ ব্যবহার করেন; তখন তাঁরা কেবল মার্কেসীয় প্রভাব নয় বরং বাঙালি কল্পচেতনারই আধুনিক অনুবাদ ঘটান।

লোককথার অলৌকিকতা ম্যাজিক রিয়েলিজমের জাদুবাস্তবতা দুটো ভিন্ন দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ালেও উভয়ের সংযোগসূত্র হলো—‘অবিশ্বাসের স্থগিতাবস্থা লোকগল্পে মানুষ অলৌকিকতাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, আবার ম্যাজিক রিয়েলিজমেও পাঠককে সেই বিশ্বাসে টেনে আনা হয়।

সেলিনা হোসেনের গঙ্গা উপন্যাসে গঙ্গা নদী কেবল একটি প্রাকৃতিক সত্তা নয়, এটি নারী, মা বিধাতার প্রতীক। নদীর উত্থান-পতনের সঙ্গে মানুষের ভাগ্য জড়িত। এখানে বাস্তব জীবনের রাজনৈতিক, সামাজিক সংকটের পাশাপাশি নদীর অলৌকিক আত্মা ক্রমাগত কথা বলে। এটি আসলে লোকবিশ্বাসের আধুনিক রূপান্তর, যা ম্যাজিক রিয়েলিজমের আদর্শে পরিণত হয়েছে। আবার হুমায়ূন আহমেদেরদারুচিনি দ্বীপেস্বপ্ন, বাস্তব কল্পনা একসঙ্গে মিশে যায়। চরিত্ররা এমন কিছু অনুভব করে, যা বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করলেও তাদের কাছে তা অবিশ্বাস্য নয়। লেখকের ভাষায়—‘মানুষের জীবনে কখনো কখনো জাদু এসে ঢোকে, তবু জীবন তার আপন গতিতেই চলে।এটি ম্যাজিক রিয়েলিজমেরই প্রতিফলন। একইভাবে মহাশ্বেতা দেবীর লায়োসেনা গল্পে উপজাতি সমাজের বিশ্বাস, দেবতা আত্মার ধারণা বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত। দেবতার অবতরণ, স্বপ্নে ভবিষ্যদ্বাণীসবই বাস্তবতার অংশ। লোকচেতনা এখানে ম্যাজিক রিয়েলিজমের সারবস্তু হয়ে ওঠে।

বাংলার লোককথায় নারী প্রায়ই জাদুর উৎস বা বাহক। তারা কখনো দেবী, কখনো অভিশপ্ত, কখনো পুনর্জন্মপ্রাপ্ত।সাত ভাই চম্পা চম্পা, ‘মালঞ্চবাবেহুলা মতো চরিত্রগুলো প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে একাত্ম। ধারণা আধুনিক ম্যাজিক রিয়েলিজমে পুনরাবৃত্ত হয়যেমন সেলিনা হোসেনেরগঙ্গা নারীপ্রকৃতিনদী একই প্রতীকে পরিণত হয়। এই মিল দেখায়, লোককথার নারীচেতনা আসলে এক গভীর মিথিক বাস্তবতা, যা ম্যাজিক রিয়েলিজমে নতুন রূপে ফিরে আসে।

লোককথায় সময় সরলরেখায় চলে নাঅতীত বর্তমান একাকার হয়ে যায়। বেহুলা যেমন মৃত লখিন্দরকে পুনর্জীবন দেয়; তেমনই মার্কেসেরওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’- সময় চক্রাকারে ঘুরে ফিরে আসে। বাংলার লেখকেরা এই সময়চক্রের ধারণাকে গ্রহণ করেছেনশহীদুল জহিরেরঝিলের ধারে লাশগল্পে বাস্তব অতীতের স্মৃতি একত্রে চলমান, যা পাঠককে এক জাদুবাস্তব পরিবেশে নিয়ে যায়। এটি লোককথার কালচেতনার আধুনিক রূপান্তর।

বাংলা সাহিত্যের অনেক লেখক সচেতনভাবে লোককথা ম্যাজিক রিয়েলিজমের মিশ্রণে কাজ করেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁরখোয়াবনামা লোকবিশ্বাস রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে মিশিয়েছেন। ভূতের স্বপ্ন, নদীর কণ্ঠস্বর কিংবা অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি এখানে বাস্তবতার অঙ্গ। শহীদুল জহিরের গল্পগুলোতে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি বাস্তবতার সঙ্গে এক অদ্ভুত রহস্য জড়ানো থাকে, যেন সময় স্থান কখনোই স্থির নয়। সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হক এবং হুমায়ূন আহমেদতাঁদের লেখায় লোককথার জাদু সামাজিক বাস্তবতা একত্রে চলেছে।

বাংলার লোককথা ম্যাজিক রিয়েলিজমের মধ্যে গভীর ভাবগত কাঠামোগত মিল বিদ্যমান, যদিও তাদের উৎপত্তি উদ্দেশ্য ভিন্ন। লোককথা মূলত সমাজের বিশ্বাস, ধর্মীয় ধারণা এবং নৈতিক শিক্ষার বাহক; অপরদিকে ম্যাজিক রিয়েলিজম বাস্তব জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিস্ময় অস্বাভাবিকতাকে প্রকাশ করার সাহিত্যিক কৌশল। তবুও উভয়ের মূলে রয়েছে বাস্তবতার সঙ্গে অলৌকিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। বাংলার লোককথায় অলৌকিকতা প্রকাশ পায় দেবতা, ভূত, অভিশাপ, জাদু বা রূপান্তরের মাধ্যমেযেমন কোনো মানুষ প্রাণীতে পরিণত হয়, ফুল হয়ে যায় বা মৃত্যুর পর ফিরে আসে। ঘটনাগুলোকে গল্পের চরিত্ররা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, কারণ সেগুলো তাদের বিশ্বাস সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে, ম্যাজিক রিয়েলিজমেও জাদুময় ঘটনা ঘটে কিন্তু তা ব্যাখ্যা বা যুক্তি দাবি করে না। বরং লেখক চরিত্র উভয়েই ধরে নেয়, এসব ঘটনাই বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এই দুই ক্ষেত্রেই অবিশ্বাসের স্থগিতাবস্থা বজায় থাকেপাঠক বাস্তব অবাস্তবের সীমারেখা ভুলে যায়।

লোককথা সময় স্থানকে নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে না; গল্পগুলো অনেক সময় পৌরাণিক বা অনির্দিষ্ট কোনো কালের পটভূমিতে ঘটে। ম্যাজিক রিয়েলিজমেও সময় স্থান প্রায়ই বিকৃত হয়ে যায়অতীত, বর্তমান ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়, যেন সময় কোনো সরলরেখা নয় বরং এক চক্রাকার অভিজ্ঞতা। শহীদুল জহির বা মার্কেসউভয় লেখকের লেখায় সময়বোধের জটিলতা স্পষ্ট। তাছাড়া লোককথার উদ্দেশ্য সাধারণত নৈতিক শিক্ষা বা সামাজিক বার্তা প্রদান, যেখানে ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব সুস্পষ্ট। কিন্তু ম্যাজিক রিয়েলিজম সেই দ্বন্দ্বকে অস্পষ্ট করে, বাস্তব জীবনের ধূসর অঞ্চলগুলোকে সামনে আনে। ফলে লোককথা যেখানে পাঠককে নির্দিষ্ট নৈতিক অবস্থানে নিয়ে যায়, সেখানে ম্যাজিক রিয়েলিজম পাঠককে চিন্তার গভীরে ঠেলে দেয়বাস্তবতা কী, বিশ্বাস কীসে প্রশ্ন তোলে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলার লোককথা ম্যাজিক রিয়েলিজমের পূর্বসূরিস্বরূপ। লোককথা অলৌকিকতাকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করে, আর ম্যাজিক রিয়েলিজম সেই বিশ্বাসকে নান্দনিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত করে। একটির শেকড় ঐতিহ্যে, অন্যটির বিকাশ আধুনিক চেতনায়তবু দুটোই মানুষের অভ্যন্তরীণ জীবন, তার ভয়, বিস্ময় কল্পনার রূপায়ণ। বাংলার লোককথা যেমন গ্রামীণ সমাজের নৈতিক বোধ বহন করে, তেমনই আধুনিক ম্যাজিক রিয়েলিজমও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর লুকিয়ে থাকা অদ্ভুততাকে উন্মোচন করে। উদাহরণস্বরূপ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেরখোয়াবনামাতে ১৯৪৭এর বিভাজন, জমিদারপ্রজা সম্পর্ক এবং কৃষকের স্বপ্ন সবকিছুই এক জাদুবাস্তব পরিমণ্ডলে উপস্থিত। ফলে লোককথার মতোই ম্যাজিক রিয়েলিজমও জনগণের মানসিক ইতিহাস বহন করে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যিকরাবিশেষ করে ১৯৮০-এর পরবর্তী সময়ের লেখকেরালোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে ম্যাজিক রিয়েলিজমকে এমনভাবে যুক্ত করেছেন, যা বৈশ্বিক সাহিত্যেও অনন্য। শাহাদুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক, ইলিয়াস, শহীদুল জহির কিংবা সৈয়দ মান্নানসবাই ধারার উত্তরসূরি। তাদের লেখায় গ্রামীণ বিশ্বাস, শহুরে বাস্তবতা সময়ের ধ্বংস একাকার হয়ে যায়।

বাংলার লোককথা ম্যাজিক রিয়েলিজমদুটি ধারাই মানুষের অস্তিত্বের জটিলতা প্রকাশ করে ভিন্ন ভিন্ন পথে। লোককথা জন্ম নেয় বিশ্বাস প্রথার মধ্যে, আর ম্যাজিক রিয়েলিজম জন্ম নেয় বাস্তবতার সীমা ভাঙার আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু উভয়ের লক্ষ্য একমানুষের জীবন সময়কে নতুন আলোয় দেখা। বাংলা সাহিত্য এই দুই ধারার মিলনে এক অনন্য বাস্তবতার সৃষ্টি করেছেযেখানে নদী কথা বলে, মানুষ উড়ে যায়, মৃতেরা ফিরে আসে, অথচ সবকিছুই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক অলৌকিকতা বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ম্যাজিক রিয়েলিজমের পারস্পরিক সেতুবন্ধনেরই সাক্ষ্য।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কাব্যালোচক এবং কলামিস্ট।

 

এনএম/ধ্রুবকন্ঠ


ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

“তারুণ্যের সংবাদ মাধ্যম”

কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত