সাম্প্রতিক সময়ে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের কিছু মন্তব্য সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিতে বাউলদের অবস্থান
এবং তাদের বিশ্বাস নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। তার বক্তব্যকে
ঘিরে একদিকে যেমন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে, তেমনি
বামপন্থী কিছু গোষ্ঠীর সমর্থনও দেখা যাচ্ছে, যা সমাজে মতবিরোধকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
সমালোচকদের মূল অভিযোগ, আবুল সরকারের বক্তব্যগুলো ধর্মীয়
অনুভূতিকে আঘাত করছে এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তাদের দাবি, বামপন্থীদের
একাংশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে এই বক্তব্যকে সমর্থন দিয়ে প্রকারান্তরে প্রচলিত ধর্মীয়
মূল্যবোধের বিরোধিতা করছে।
বাউল মতবাদের দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি বাউলদের বিশ্বাস
ও দেহতাত্ত্বিক সাধনা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের হলেও, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিতে তাদের
একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। গবেষকদের একাংশের মতে, বাউল মতবাদ হলো প্রচলিত শরিয়তি বিধান
বা ব্রাহ্মণ্য আচারের বাইরে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র লোকধর্ম। এই ধারার শিকড় তন্ত্র,
যোগ এবং বৌদ্ধ সহজিয়া দর্শনে প্রোথিত। বাউলতত্ত্বে মানবদেহকে আধ্যাত্মিক সাধনার প্রধান
কেন্দ্র মনে করা হয় এবং 'অচিন মানুষ' বা 'মনের মানুষ'-কে খুঁজে পাওয়ার জন্য নারী-পুরুষের
যুগল সাধনা বা দেহতাত্ত্বিক সাধনাকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাউল শব্দের উৎস নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ড. আনোয়ারুল
করিম দাবি করেন যে, এর উৎস মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন পৌত্তলিক বা’আল উপাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত,
যেখানে যৌনাচার প্রাধান্য পেত। অন্যদিকে, ড. আহমদ শরীফ মনে করেন, বাউলতত্ত্বের বিকাশ
মূলত নাথপন্থা ও সহজিয়া দর্শন থেকে ঘটেছে, যা পরে ইসলাম বা বৈষ্ণব ধর্মের সংস্পর্শে
এসে হিন্দু-মুসলমান মিশ্রিত একটি নতুন লোকধর্মের জন্ম দেয়।
বিতর্কিত অনুশীলন ও মুক্ত সাধনার পথ সমালোচকরা বাউল সম্প্রদায়ের
কিছু অনুশীলনকে সামাজিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিযোগ করেন।
এর মধ্যে রয়েছে কামযোগ, যৌনাচারনির্ভর সাধনা, রজঃপান, বীর্য রক্ষা এবং প্রচলিত ইসলামি
বা হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিহার।
তবে বাউল অনুসারীরা নিজেদের জীবনদর্শনকে প্রচলিত ধর্মীয়
কাঠামোর পরিবর্তে মানবিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সাধনা-পথ হিসেবে বিবেচনা
করেন। তারা বিশ্বাস করেন, তাদের সাধনার মাধ্যমে জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি এবং আধ্যাত্মিক
মুক্তি লাভ সম্ভব।
আবুল সরকারের বক্তব্য ঘিরে চলমান এই বিতর্ক একদিকে যেমন মতপ্রকাশের
স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতির সংঘাত তুলে ধরছে, তেমনি অন্যদিকে বাউল মতবাদ ও দেহতাত্ত্বিক
সাধনা নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিনের ভিন্নমত এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের জটিলতা আরও স্পষ্ট করে
তুলছে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
বিষয় : বাউল মতবাদ দেহতত্ত্ব সরকারের মন্তব্য
.png)
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রকাশের তারিখ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫
সাম্প্রতিক সময়ে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের কিছু মন্তব্য সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিতে বাউলদের অবস্থান
এবং তাদের বিশ্বাস নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। তার বক্তব্যকে
ঘিরে একদিকে যেমন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে, তেমনি
বামপন্থী কিছু গোষ্ঠীর সমর্থনও দেখা যাচ্ছে, যা সমাজে মতবিরোধকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
সমালোচকদের মূল অভিযোগ, আবুল সরকারের বক্তব্যগুলো ধর্মীয়
অনুভূতিকে আঘাত করছে এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তাদের দাবি, বামপন্থীদের
একাংশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে এই বক্তব্যকে সমর্থন দিয়ে প্রকারান্তরে প্রচলিত ধর্মীয়
মূল্যবোধের বিরোধিতা করছে।
বাউল মতবাদের দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি বাউলদের বিশ্বাস
ও দেহতাত্ত্বিক সাধনা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের হলেও, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিতে তাদের
একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। গবেষকদের একাংশের মতে, বাউল মতবাদ হলো প্রচলিত শরিয়তি বিধান
বা ব্রাহ্মণ্য আচারের বাইরে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র লোকধর্ম। এই ধারার শিকড় তন্ত্র,
যোগ এবং বৌদ্ধ সহজিয়া দর্শনে প্রোথিত। বাউলতত্ত্বে মানবদেহকে আধ্যাত্মিক সাধনার প্রধান
কেন্দ্র মনে করা হয় এবং 'অচিন মানুষ' বা 'মনের মানুষ'-কে খুঁজে পাওয়ার জন্য নারী-পুরুষের
যুগল সাধনা বা দেহতাত্ত্বিক সাধনাকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাউল শব্দের উৎস নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ড. আনোয়ারুল
করিম দাবি করেন যে, এর উৎস মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন পৌত্তলিক বা’আল উপাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত,
যেখানে যৌনাচার প্রাধান্য পেত। অন্যদিকে, ড. আহমদ শরীফ মনে করেন, বাউলতত্ত্বের বিকাশ
মূলত নাথপন্থা ও সহজিয়া দর্শন থেকে ঘটেছে, যা পরে ইসলাম বা বৈষ্ণব ধর্মের সংস্পর্শে
এসে হিন্দু-মুসলমান মিশ্রিত একটি নতুন লোকধর্মের জন্ম দেয়।
বিতর্কিত অনুশীলন ও মুক্ত সাধনার পথ সমালোচকরা বাউল সম্প্রদায়ের
কিছু অনুশীলনকে সামাজিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিযোগ করেন।
এর মধ্যে রয়েছে কামযোগ, যৌনাচারনির্ভর সাধনা, রজঃপান, বীর্য রক্ষা এবং প্রচলিত ইসলামি
বা হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিহার।
তবে বাউল অনুসারীরা নিজেদের জীবনদর্শনকে প্রচলিত ধর্মীয়
কাঠামোর পরিবর্তে মানবিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন সাধনা-পথ হিসেবে বিবেচনা
করেন। তারা বিশ্বাস করেন, তাদের সাধনার মাধ্যমে জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তি এবং আধ্যাত্মিক
মুক্তি লাভ সম্ভব।
আবুল সরকারের বক্তব্য ঘিরে চলমান এই বিতর্ক একদিকে যেমন মতপ্রকাশের
স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতির সংঘাত তুলে ধরছে, তেমনি অন্যদিকে বাউল মতবাদ ও দেহতাত্ত্বিক
সাধনা নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিনের ভিন্নমত এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের জটিলতা আরও স্পষ্ট করে
তুলছে।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
.png)
আপনার মতামত লিখুন