ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho

১৯৯১-২০০৮: বাংলাদেশের রাজনীতির সেই উত্তাল ১৮ বছর

বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান কেবল একজন শাসকের পতন ছিল না, বরং তা ছিল গণতন্ত্রের এক নতুন সূর্যোদয়। জেনারেল এইচ এম এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর শুরু হয় ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের’ এক ঘটনাবহুল পথচলা।১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়কালকে দেশের রাজনীতির স্বর্ণযুগ বলা হোক বা সংঘাতের সময়—এই কালপর্বে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সাধারণ নির্বাচনই বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এই দীর্ঘ সময়ে একটি অদ্ভুত রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল: পরাজিত পক্ষ কোনোভাবেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। জয়ী পক্ষ যখন উল্লাস করেছে, পরাজিত পক্ষ তখন কারচুপির অভিযোগে রাজপথ উত্তপ্ত করেছে।১৯৯১: নির্বাচনে বিএনপির জয়১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। প্রথমবারের মতো কোনো দলীয় সরকারের পরিবর্তে সব দলের সম্মতিতে গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোটগ্রহণ হয়। যদিও তখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না, তবুও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছায় এটি সম্ভব হয়েছিল।ছবিঃ দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শপথতৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রধান দুই দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—পরস্পরের প্রতি অনেকটা নমনীয় ছিল। নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ৭২-এর সংবিধান ফিরিয়ে আনা এবং সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে। শেখ হাসিনা তখন এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তিনি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ার আশা প্রকাশ করেছিলেন। খুলনার এক জনসভায় তাকে উদ্ধৃত করে দৈনিক ইত্তেফাক শিরোনাম করেছিল— “দেশে-বিদেশে রব উঠিয়াছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাইবে।”অন্যদিকে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করেন। ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, অন্যদের হাতে গোলামির জিঞ্জির।” তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে দেশ বিদেশের গোলামিতে আবদ্ধ হবে।নির্বাচনের দিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদ সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করেছিলেন। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার কোনো সহিংসতা ছাড়াই ভোট দেন। ফলাফল যখন এলো, তখন সবাই অবাক! কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বিএনপি ১৪০টি আসন নিয়ে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিপরীতে আওয়ামী লীগ পায় মাত্র ৮৪টি আসন। এই হার মেনে নিতে পারেননি শেখ হাসিনা। তিনি অভিযোগ তোলেন, এক ‘অদৃশ্য শক্তি’র সহায়তায় সূক্ষ্ম কারচুপি করে তাদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগেরই তৎকালীন নেতা ড. কামাল হোসেন দলের পরাজয়ের পেছনে অতি-আত্মবিশ্বাস ও সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করে এক দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন, যা সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং ২০শে মার্চ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।১৯৯৬-এর দুটি ভিন্ন চিত্র: বিতর্কিত নির্বাচন১৯৯১ সালে শুরু হওয়া গণতন্ত্রের যাত্রা পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সংকটে পড়ে। ১৯৯৪ সালে মাগুরার এক উপ-নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আওয়ামী লীগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। বিএনপি এই দাবি মানতে নারাজ ছিল। শুরু হয় হরতাল-অবরোধের এক অস্থির অধ্যায়।সংবিধানের দোহাই দিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি একতরফাভাবে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। আওয়ামীলীগ সহ সব বড় দল সেই নির্বাচন বয়কট করে। ফলে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। অন্তত ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে সেই নির্বাচনী সহিংসতায়। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি একেএম সাদেক বলেছিলেন, “কত শতাংশ ভোট পড়ল সেটা বড় কথা নয়, নির্বাচন হয়েছে সেটাই আসল।” ৩০০ আসনের মধ্যে ৪৬টিতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে সরকার গঠন করলেও এই নির্বাচন বৈধতা পায়নি। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই বিএনপি সরকার সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।ছবিঃ ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার লড়াই ছিল সমানে সমান। আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারে ফারাক্কা সমস্যার সমাধান ও মৈত্রী চুক্তি নবায়ন না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। শেখ হাসিনা বিনয়ের সাথে বলেন, “ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেশ ও জাতিকে সেবা করার সুযোগ দিন।” ভোটের ঠিক আগে আগে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীতে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হলেও তা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।ফলাফল ছিল চমকপ্রদ—আওয়ামী লীগ ১৪৬টি এবং বিএনপি ১১৬টি আসন পায়। এবারও কারচুপির অভিযোগ তোলে বিএনপি। মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদার ১১১টি আসনে পুনরায় ভোটের দাবি করেন। কিন্তু মার্কিন এনডিআই এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো এই নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু ও অবাধ’ বলে সার্টিফিকেট দেয়। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে ২১ বছর পর ক্ষমতার মঞ্চে ফেরেন শেখ হাসিনা।ছবিঃ ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা।২০০১: নির্বাচনে বিএনপির বিজয়অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দলিল। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় রদবদল নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। বিএনপি এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও আওয়ামী লীগ নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেয়। নির্বাচনী প্রচারণায় খালেদা জিয়া দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন যে, বিএনপি যা বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঠিক তাই করছে। ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। কিন্তু ফলাফল যখন এলো, আওয়ামী লীগ শিবির স্তম্ভিত হয়ে গেল। চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে জয়লাভ করে। শেখ হাসিনা তাৎক্ষণিকভাবে এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন এবং দাবি করেন যে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।ছবিঃ ২০০১ সালে নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর স্বাক্ষর করছেন খালেদা জিয়া।নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের খবর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। ইউরোপীয় কমিশন এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগ অনড় থাকলেও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তারা যোগ দেয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান আরও প্রবল হয়ে ওঠে।২০০৮: আওয়ামী লীগের মহাবিজয়২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অনেকেই বাংলাদেশের ইতিহাসের শেষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে মনে করেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির শাসনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে যে অরাজকতা তৈরি হয়েছিল, তার ফলে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বা ‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর সময় সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে।জরুরি অবস্থার সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রধান দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার এক দীর্ঘ পরিকল্পনা চলে। তবে ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন সরকার ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরি এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের মাধ্যমে দুই বছর পর ভোটের ব্যবস্থা করে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সাথে দলগুলোর অনেক দরকষাকষি চলে পর্দার আড়ালে। বিশেষ করে ছেলেদের মুক্তি ও চিকিৎসার বিনিময়ে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।ছবিঃ ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ের পর শপথ গ্রহণ করছেন শেখ হাসিনাআওয়ামী লীগ এই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছিল বেশ সুশৃঙ্খলভাবে। তাদের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও ‘দিনবদলের সনদ’ তরুণ ভোটারদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। নির্বাচনের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন ছিল। ৮৬ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়েছিল সেই নির্বাচনে। ফলাফল ছিল অভাবনীয়—আওয়ামী লীগ একাই ২৩০টি আসন পায়, আর বিএনপি পায় মাত্র ৩০টি। প্রাপ্ত ভোটের হারের ক্ষেত্রেও দুই দলের ব্যবধান ছিল আকাশচুম্বী। বিএনপি কারচুপির অভিযোগ তুললেও জেসাস ও কমনওয়েলথের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একে শতভাগ সফল নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করে।এই ১৮ বছরের (১৯৯১ থেকে ২০০৮) নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চেয়েছে। ১৯৯১ সালে যে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ১৯৯৬-এর মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়ে ২০০৮-এ এসে এক বিশাল জনম্যান্ডেট পায়। তবে এই প্রতিটি নির্বাচনে একটি বিষয় সাধারণ ছিল—নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার অভাব এবং পরাজিত পক্ষের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা। গণতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়ায় জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো যে জনমতের একটি প্রকৃত প্রতিফলন ঘটিয়েছিল, তা অনস্বীকার্য।  এনএম/ধ্রুবকন্ঠ

১৯৯১-২০০৮: বাংলাদেশের রাজনীতির সেই উত্তাল ১৮ বছর