শীতে বেশি রাত করে খাবার খেলে যা হতে পারে
শীতের
সময়ে দিন থাকে ছোট। আর দিনে আলোও কমে আসে দ্রুত, সন্ধ্যা নামে আগেভাগে, আর অজান্তেই
আমাদের দৈনন্দিন রুটিনেও পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে রাতের খাবারের সময় অনেকটাই
পিছিয়ে যায়। বেশিরভাগ মানুষই শীতকালে অফিস বা কাজ থেকে ফিরতে দেরি করেন এবং
ডিনারও হয় রাত ৯টা বা তারও পরে। কিন্তু গবেষণা এখন স্পষ্ট জানাচ্ছে, শীতকালে রাতের খাবার দেরিতে
খেলে শরীরের বিপাকক্রিয়া, ঘুমের মান এবং রক্তে শর্করার মাত্রার ওপর বিরূপ প্রভাব
পড়তে পারে। কারণ এই সময়ে শরীরের জৈবিক ঘড়ি খুব দ্রুত সক্রিয়তা হারায় এবং
বিশ্রামের দিকে এগোতে শুরু করে।জৈবিক ঘড়িমানুষের
শরীরে একটি স্বাভাবিক চলাচলের তাল আছে, তাকে জৈবিক ঘড়ি বলা হয়। এই ঘড়ি
আলো-অন্ধকারের সঙ্গে মিল রেখে ঘুম, খিদে, হজম, শক্তি খরচ, হরমোন নিঃসরণ—সবই
নিয়ন্ত্রণ করে।শীতের দিনে সূর্যাস্ত
তাড়াতাড়ি হয়ে গেলে শরীরও মনে করে দিনের কাজ শেষ হয়ে গেছে এবং বিশ্রামের
প্রয়োজন শুরু হয়েছে। ঠিক তখন যদি ভারী রাতের খাবার খাওয়া হয়, তাহলে জৈবিক ঘড়ি
বিভ্রান্ত হয়ে যায়। ফলে খাবার ঠিকভাবে হজম হয় না, রাতে ঘুম বারবার ভেঙে যায়
এবং সকালে উঠে শরীর ভারী ও ক্লান্ত লাগে।খাবারের
সময় শরীরের হজম এবং শক্তি ব্যবহারের ওপর যে বড় প্রভাব পড়ে, তাকে নিয়ে
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ক্রমশ আরো বেশি করে হচ্ছে।গবেষণায়
দেখা গেছে, শীতকালে যারা নিয়মিত দেরিতে রাতের খাবার খান, তাদের রক্তে শর্করার
মাত্রা বাড়ে এবং চর্বি পোড়ার ক্ষমতা কমে যায়। কারণ সন্ধ্যার পর শরীরের
হজমক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। তাই একই খাবার দুপুরে খেলে যেভাবে হজম হয়,
রাতে দেরিতে খেলে তা হজম হতে অনেক বেশি সময় লাগে।শীতকালে
অনেক মানুষ মনমরা ভাব, শক্তির ঘাটতি বা মৌসুমি হতাশার মতো সমস্যার মুখোমুখি হন।
আলো কমে যাওয়ায় শরীরে সেরোটোনিন নামের রাসায়নিক উপাদানের উৎপাদন কমে যাওয়া
আমাদের মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করে।আবার রাতে দেরিতে
খাওয়ার ফলে পেট ভারী লাগে, এসিডিটি বা গ্যাসের সমস্যা বাড়ে, ঘুম নষ্ট হয়—এগুলোও
মুডকে আরো খারাপ করে। শরীরে রাতের দিকে মেলাটোনিন নামের ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান
বাড়তে থাকে, যা হজমকে আরো মন্থর করে দেয়। তাই দেরিতে খাওয়া এবং কম ঘুম সমস্যা
তৈরি করে, যা শীতকালে আরো বাড়তে পারে।তবে
এর মানে এই নয় যে সবাইকে একই নিয়ম মেনে রাতের খাবার খেতে হবে। ব্যক্তির কাজের
ধরন, ব্যস্ততা, শারীরিক পরিশ্রম এবং জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে খাবারের সময় ভিন্ন
হতে পারে। কেউ যদি সন্ধ্যায় ব্যায়াম বা দৌড়ঝাঁপ করেন, তাকে হয়তো একটু দেরিতে
হালকা খাবার খেতে হতে পারে।কিন্তু
যারা খুব একটা সক্রিয় নন বা তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যান, তারা আগেভাগে হালকা ডিনার
করলে উপকার পাবেন অনেক বেশি। নিয়ম না মানলেও সমস্যা নেই, কিন্তু শরীরের স্বাভাবিক
চলার সঙ্গে খাবারের সময়কে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে শরীর অনেকটাই স্বস্তি
পাবে।শীতকালে
ডিনারের সময় একটু আগিয়ে আনলে কী ধরনের উপকার পাওয়া যায় তা গবেষণায় স্পষ্ট।১. শরীরের জৈবিক ঘড়ির
সঙ্গে খাবারের সময় মিলে গেলে হজম ও শক্তির ব্যবহার আরো স্বাভাবিক হয়।২. খাওয়ার পর অন্তত
দুই ঘণ্টা বিরতি দিয়ে ঘুমাতে গেলে পেট হালকা থাকে এবং ঘুম হয় আরো গভীর ও
আরামদায়ক। তৃতীয়ত, নিয়মিত ও নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া শরীরের ঘড়িকে স্থিতিশীল
রাখে, যা শীতকালে বিশেষভাবে দরকার।যদি
প্রতিদিন রাত ৯টার পরে খাবার খান, তবে সকালে ঘুম ঘুম ভাব, ক্লান্তি বা আগের মতো
শক্তি না পাওয়ার সমস্যা আসতে বাধ্য। তাই, অন্তত এক সপ্তাহ খাবারের সময়টাকে এগিয়ে
আনুন। বেশিরভাগ মানুষই কয়েক দিনের মধ্যেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন।সকালের
নাস্তা ও দুপুরের খাবারকে একটু বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর করা গেলে তখন শরীরের শক্তি
খরচ বেশি হয়। রাতে রাখুন হালকা খাবার, যেমন স্যুপ, ভাতের কম পরিমাণ, ডাল, সবজি বা
সহজপাচ্য প্রোটিন।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো, খাবারের সময়কে কঠোর নিয়ম হিসেবে দেখার দরকার নেই। এটিকে নিজের শরীরের
সুবিধা অনুযায়ী নমনীয়ভাবে ব্যবহার করা যায়। কখন খেলে শরীর ভালো লাগে, কখন ঘুম
ভালো হয়—এসব ভেবে নিজের জন্য একটি সহজ রুটিন বানিয়ে নেওয়াই মূল লক্ষ্য।শীতের
দিনে যখন আলো কম এবং শরীরের তাল সহজেই নষ্ট হয়ে যায়, তখন একটি সহজ-সরল ও শান্ত
খাবার রুটিন শরীরকে ভারসাম্য দিতে পারে।শীতের
সময় আমাদের শরীর যেভাবে ধীরে ধীরে বিশ্রামের দিকে যায়, খাবারের সময় যদি তার
সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে দিনের শক্তি, মুড ও ঘুম—সবই অনেক বেশি স্থিতিশীল
থাকে। তাই শীতের সন্ধ্যায় একটু আগে ডিনার করে দেখুন শরীরের মধ্যে কী হচ্ছে নিজেই
পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন। সূত্র
: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ