প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কতক্ষণ স্ক্রিনে থাকা নিরাপদ? চোখ বাঁচাতে আদর্শ স্ক্রিন টাইমা
ধ্রুবকন্ঠ ডেক্স ||
বর্তমান যুগে পড়াশোনা, অফিসের কাজ কিংবা বিনোদন সবই যেন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দি। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগে পর্যন্ত আমরা কোনো না কোনো ডিভাইসের দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু কাজের বাইরে এই বাড়তি সময়টুকু আমাদের অজান্তেই শরীরের বারোটা বাজাচ্ছে। অতিরিক্ত নীল আলো চোখের জ্যোতি কমানোর পাশাপাশি মস্তিষ্কের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে অনিদ্রা ও দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।চিকিৎসকদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দৈনিক দুই ঘণ্টার বেশি হওয়া মোটেও উচিত নয়। অথচ আমরা অনেকেই দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা স্ক্রিনে ব্যয় করি। তাই এখনই সময় নিজের ফোনের ‘ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং’ অপশনে গিয়ে চেক করার যে, আসলে কতটুকু সময় আপনি নষ্ট করছেন। স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমিয়ে বই পড়া বা কায়িক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়লে আপনার শরীর ও মন—দুই-ই সতেজ থাকবে। মনে রাখবেন, স্ক্রিন যেন আপনার জীবন নিয়ন্ত্রণ না করে।প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে১. দিনে ২–৪ ঘণ্টা: নিরাপদ মাত্রাকাজ ও বিনোদন—সবকিছু মিলিয়ে। তবে একটানা নয়, মাঝে বিরতি দিয়ে দিয়ে। একটানা ৩০ মিনিটের বেশি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা যাবে না। আর রাতে, বিশেষ করে ঘুমের আগে স্ক্রিন টাইম নয়। অন্ধকারেও স্ক্রিন টাইম নয়। দিনে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম চোখ ও শরীরের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ।২. দিনে ৪-৬ ঘণ্টা: বিপৎসীমার কাছাকাছিচোখে চাপ পড়তে শুরু করে। দীর্ঘ মেয়াদে ঘাড়ে–পিঠে ব্যথা হতে পারে। মনোযোগ ও ঘুমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।৩. দিনে ৬–৮ ঘণ্টা বা তার বেশি: ক্ষতিকর মাত্রাঘণ্টার পর ঘণ্টা বিরতিহীন স্ক্রিন টাইমে চোখ ভীষণ শুষ্ক হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে ঝাপসা দেখতে পারেন। মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিরক্তি—এসব এই স্ক্রিন টাইমের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ওজন বেড়ে যেতে পারে। শারীরিকভাবে আপনি ক্রমশ দুর্বল হয়ে যেতে পারেনশিশুদের ক্ষেত্রেশিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য স্ক্রিন টাইমের সঠিক হিসাব রাখা এখন সময়ের দাবি। চিকিৎসকদের মতে, ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের হাতে কোনো ধরনের স্মার্টফোন বা গ্যাজেট দেওয়া একদমই উচিত নয়; এটি তাদের মস্তিষ্কের গঠনে বাধা দেয়।২ থেকে ৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম রাখা যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই শিক্ষণীয় কিছু হওয়া ভালো।আর ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য পড়াশোনার প্রয়োজনীয় কাজ বাদে বিনোদনের জন্য ১ থেকে ২ ঘণ্টার বেশি সময় দেওয়া ঠিক নয়। মনে রাখবেন, শৈশবে ডিভাইসের প্রতি এই আসক্তি পরবর্তী জীবনে শারীরিক ও মানসিক নানা জটিলতার জন্ম দিতে পারে।অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কী ক্ষতি করে?১. একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক কম পড়ে, যার ফলে চোখের স্বাভাবিক পানি শুকিয়ে যায়। এতে চোখ জ্বালাপোড়া করে, লাল হয়ে যায় আর মাঝেমধ্যে সবকিছু ঝাপসা দেখা দেয়।২. আমরা যখন ফোন চালাই, তখন ঘাড় নিচু করে কুঁজো হয়ে থাকি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই অবস্থায় থাকার কারণে ঘাড়ের হাড় আর পিঠের পেশিতে স্থায়ী ব্যথা শুরু হয়।৩. স্ক্রিনে মজে থাকলে আমাদের হাঁটাচলা বা শারীরিক পরিশ্রম একদম বন্ধ হয়ে যায়। অলস বসে থাকার কারণে শরীরে মেদ জমে দ্রুত ওজন বাড়ে, যা পরে ডায়াবেটিস বা হার্টের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।৪. সারাক্ষণ ইন্টারনেটে ডুবে থাকলে ব্রেইন অস্থির হয়ে থাকে। এতে কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায় আর তুচ্ছ কারণে মেজাজ গরম হয়।৫. রাতে ফোনের নীল আলো আমাদের মস্তিষ্কে ভুল সিগন্যাল দেয় যে এখনো দিন আছে। এর ফলে মেলাটোনিন হরমোন কাজ করে না, ঘুম আসতে দেরি হয় এবং পরদিন শরীর খুব ক্লান্ত লাগে।৬. সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের জীবন দেখে নিজের অজান্তেই আমরা নিজেদের ছোট ভাবতে শুরু করি। সারাক্ষণ অন্যের সাথে এই তুলনা করাটা আমাদের মনে বিষণ্ণতা আর হীনম্মন্যতা তৈরি করে।চোখ ও শরীর বাঁচাতে সহজ ৪ নিয়ম১. চোখের আরামের জন্য ২০–২০–২০ নিয়মটি মেনে চলা খুব জরুরি। প্রতি ২০ মিনিট একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকানোর পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য বিরতি নিন এবং এই সময়টাতে মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকুন। এতে চোখের পেশিগুলো বিশ্রাম পায়।২. ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করে দিন। বিছানায় ফোন নিয়ে যাওয়ার অভ্যাসটা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে কারণ ফোনের নীল আলো আপনার ঘুমের হরমোন নষ্ট করে দেয়। ঘুমানোর আগে ফোন না ঘেঁটে বই পড়ার অভ্যাস করা চোখের জন্য ভালো।৩. চোখ ও স্ক্রিনের মধ্যে সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় চোখ থেকে কমপক্ষে ৩০-৪০ সেন্টিমিটার বা প্রায় এক হাত দূরে রাখুন। ট্যাবের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব ৪০-৫০ সেন্টিমিটার এবং ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের মনিটর চোখ থেকে ৫০-৭০ সেন্টিমিটার দূরে রাখা উচিত।৪. টেলিভিশন দেখার সময় পর্দার দৈর্ঘ্যের অন্তত ৩ থেকে ৫ গুণ দূরত্বে বসে দেখা উচিত। খেয়াল রাখবেন যেন টিভি এবং আপনার চোখ একই সমান্তরালে থাকে। খুব নিচুতে বা অনেক উঁচুতে টিভি দেখলে ঘাড় ও চোখের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে যা দীর্ঘমেয়াদী ব্যথার কারণ হয়।৫. কোনোভাবেই একটানা ৩০ মিনিটের বেশি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা যাবে না। প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর নিজের জায়গা থেকে উঠে একটু হাঁটাহাঁটি করুন বা শরীর স্ট্রেচিং করে নিন। চোখের ক্লান্তি কমাতে মাঝেমধ্যে সবুজের দিকে তাকানো খুব দরকার, তাই কাজের টেবিলের ওপর একটি ছোট জীবন্ত গাছ রাখতে পারেন।৬. ঘরের আলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডিভাইসের ব্রাইটনেস সেট করে নিন। খুব অন্ধকার ঘরে মোবাইল চালানো বা অতিরিক্ত ব্রাইটনেস দিয়ে কাজ করা চোখের রেটিনার ক্ষতি করে। এছাড়া পড়ার সুবিধার্থে ফন্ট সাইজ বড় করে নিন যাতে ছোট ছোট অক্ষরের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়।৭. দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে চোখের জল শুকিয়ে যায়, তাই মাঝেমধ্যে চোখে পরিষ্কার পানির ঝাপটা দেওয়া উচিত। পাশাপাশি প্রচুর পানি পান করুন যেন শরীর হাইড্রেটেড থাকে, কারণ শরীরে পানির অভাব হলে চোখ দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে জ্বালাপোড়া শুরু করে।সূত্র: দ্য গার্ডিয়ানএনএম/ধ্রুবকন্ঠ
কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত