প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ক্যারিয়ার গড়ুন আন্তর্জাতিক সংস্থায়: কীভাবে নেবেন সেরা প্রস্তুতিা
ধ্রুবকন্ঠ ডেক্স ||
আজকের দিনে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থায় (আইএনজিও) ক্যারিয়ার গড়া অনেকেরই লালিত স্বপ্ন। তবে এই সম্মানজনক খাতে নিজের জায়গা নিশ্চিত করা কেবল ভালো রেজাল্ট বা উচ্চতর ডিগ্রির ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষাগত যোগ্যতার গণ্ডি পেরিয়ে এখানে সফল হতে হলে প্রয়োজন বিশেষ কিছু দক্ষতা ও কৌশল। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—ঠিক কী ধরনের গুণাবলী থাকলে বিশ্বখ্যাত এসব সংস্থায় কাজের সুযোগ মিলবে? এই খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের পরামর্শ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরা হয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রবেশের সেই গোপন সূত্রগুলো।সাফল্যের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছেআন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে পদের ভিন্নতা অনুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতার চাহিদাও ভিন্ন হয়। সাধারণত অর্থনীতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, উন্নয়ন অধ্যয়ন কিংবা সমাজবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো এই খাতে বেশ জনপ্রিয়। তবে এর বাইরেও চারুকলা বা অন্য যেকোনো সৃজনশীল বিষয়ের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করে বিশ্বমঞ্চে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। বিষয় যাই হোক না কেন, সংশ্লিষ্ট পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চতর শিক্ষা বা মাস্টার্স ডিগ্রি প্রার্থীকে অন্যদের চেয়ে একধাপ এগিয়ে রাখে। বিশেষ করে পলিসি মেকিং বা কারিগরি পদগুলোর জন্য থিসিস এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়। মনে রাখবেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেবল সনদ নয়, বরং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা ও অর্জিত জ্ঞানই হলো আসল চাবিকাঠি।বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পেশাদার কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ দক্ষতা বা ‘কমিউনিকেশন স্কিল’ অত্যন্ত অপরিহার্য। বিশেষ করে বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই সাবলীলভাবে কথা বলা, মানসম্মত লেখালেখি এবং পাবলিক স্পিকিংয়ে পারদর্শিতা থাকলে আইএনজিওতে নিজের অবস্থান শক্ত করা অনেক সহজ হয়ে যায়। জটিল কোনো বিষয়কে সহজভাবে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা, স্টোরিটেলিং বা গল্পের মাধ্যমে তথ্য উপস্থাপন এবং আধুনিক ডিজিটাল বা এআই (AI) টুলস ব্যবহারে
দক্ষতা থাকলে তা যেকোনো প্রার্থীর জন্য বাড়তি পাওনা হিসেবে গণ্য হয়।অভিজ্ঞদের মতে, শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা কেবল সনদে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদী প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জনে বিনিয়োগ করা উচিত। পড়াশোনার পাশাপাশি রিসার্চ ডিজাইন, ক্যাম্পেইন পরিচালনা কিংবা মার্কেট রিসার্চের মতো টেকনিক্যাল বিষয়গুলোতে দক্ষতা বাড়াতে পারলে তা ক্যারিয়ারে দারুণ প্রভাব ফেলে। যারা উচ্চতর শিক্ষার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য সেরা পরামর্শ হলো—মাস্টার্স শুরু করার আগে মাঠ পর্যায়ে বা ‘এন্ট্রি লেভেল’-এ সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করা। এই বাস্তব জ্ঞান আপনাকে থিওরিটিক্যাল পড়াশোনার চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে, যা পরবর্তীতে বড় কোনো সংস্থায় রিজিওনাল বা গ্লোবাল লিড হিসেবে কাজ করার পথ প্রশস্ত করবে।চাই শুধু দক্ষতাবিশেষজ্ঞরা
বলছেন, প্রতিবেদন তৈরি করার অভিজ্ঞতা, প্রেজেন্টেশনের দক্ষতা, ডেটা ম্যানেজমেন্ট
(উপাত্ত ব্যবস্থাপনা), এ ধরনের দক্ষতাগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া প্রযুক্তির
উন্নয়নের সঙ্গে নিজেকে হালনাগাদ রাখাটা জরুরি। ভাষাবিষয়ক দক্ষতা থাকতেই হবে।
ইংরেজিটা ভালো জানার কোনো বিকল্প নেই। অন্যান্য ভাষাও যদি জানেন, যেমন ফরাসি,
স্প্যানিশ বা আরবি, তাহলে আপনার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে। তানজিলা মজুমদার বলেন,
‘আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করতে হলে ডিজিটাল লিটারেসি এবং কালচারাল ইন্টেলিজেন্স
অপরিহার্য। বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী এবং সব বয়সী মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার
সক্ষমতা এখন সবচেয়ে জরুরি। এআই সম্পর্কে ধারণা রাখাটা এখন একরকম বাধ্যতামূলক হয়ে
গেছে। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের ক্ষমতা আপনাকে
এগিয়ে রাখবে। আমি পরামর্শ দেব, ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বা
কমিউনিটি সার্ভিসে যুক্ত হোন। বাস্তব অভিজ্ঞতা আপনার দক্ষতা বাড়াবে।’নেটওয়ার্কিংয়ের বিকল্প
নেইআন্তর্জাতিক সংস্থায় নিজের শক্ত অবস্থান গড়ার জন্য নেটওয়ার্কিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে লিঙ্কডইন বা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে পেশাদার যোগাযোগ তৈরি করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। তবে কেবল অনলাইনে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা এবং প্রফেশনাল কোর্সে নিয়মিত অংশগ্রহণ করা উচিত। এর ফলে এই খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ার একটি স্থায়ী সুযোগ তৈরি হয়।এছাড়া বিভিন্ন আইএনজিও-র ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নজর রাখলে ইন্টার্নশিপ বা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করার অবারিত সুযোগ পাওয়া যায়। কর্মজীবনের শুরুতে এই অভিজ্ঞতাগুলো ক্যারিয়ারকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করে। মনে রাখবেন, কার্যকর নেটওয়ার্কিংয়ের মূল মন্ত্র হলো অন্যের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা ও বোঝা। কেবল নিজেকে তুলে ধরা বা 'পিচ' করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং মানুষের সাথে অর্থবহ সম্পর্ক তৈরি করাই হলো আসল সাফল্য। তাই প্রথমে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝুন, এরপর যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া জানান এবং সবশেষে পেশাদার সার্কেলে নিজেকে যুক্ত করুন।মো.
আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘নেটওয়ার্কিং এখন ক্যারিয়ার উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু অনলাইন
নয়, অফলাইন যোগাযোগও সমান জরুরি।’জাইকা বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ প্রোগ্রাম অফিসার আলীমূল
হাসান শোনালেন তাঁর অভিজ্ঞতা, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে
শেষ বর্ষে পড়ার সময়ই ইউএনএইডসে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাই। আমার অনেক বন্ধুও আইওএম,
সেভ দ্য চিলড্রেন, একশনএইডের মতো প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। ইন্টার্নশিপ করার
সময় সত্যিকার কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে। রিপোর্ট তৈরি, প্রেজেন্টেশন বানানো, নানা কিছু
শিখেছি। পরে সেই অভিজ্ঞতার জোরেই বিভিন্ন দেশীয় প্রতিষ্ঠানে ডাক পাই। কয়েক বছর
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করে তারপর আন্তর্জাতিক সংস্থায় আবেদন করেছি।’কয়েকটি ওয়েবসাইটের নামও উল্লেখ করলেন, যেগুলো থেকে
কোর্স করে সনদ নিলে এগিয়ে থাকা সহজ হয়। যেমন—www.unsdglearn.org/learning/unric.org/en/sharpen-your-skills-during-lockdown-with-united-nations-e-learning-courses/capacity.desa.un.org/লিংকডইন, ফেসবুক, এক্স বা ইনস্টাগ্রামের মতো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নিজের দক্ষতা, ভাবনা, অভিজ্ঞতা তুলে ধরার ওপরও
গুরুত্ব দিলেন মো. আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, ‘এই পারসোনাল ব্র্যান্ডিংও এখনকার
সময়ে গুরুত্বপূর্ণ।’আধুনিক সিভিযেকোনো আন্তর্জাতিক সংস্থায় ক্যারিয়ার গড়ার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো একটি মানসম্মত সিভি। সাধারণত এসব বড় প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে নিজস্ব ফরম্যাট দেওয়া থাকে, যেখানে তথ্য পূরণের মাধ্যমেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে একটি সমৃদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি আগে থেকেই তৈরি রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখবেন, একটি পদের বিপরীতে যখন শত শত যোগ্য প্রার্থী আবেদন করেন, তখন কেবল পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। নিজেকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে হলে আপনাকে যোগ্যতার পাশাপাশি বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।প্রাথমিক বাছাই পর্বে একটি গোছানো সিভি আপনার পেশাদারিত্ব প্রকাশ করলেও নিয়োগের পরবর্তী ধাপগুলোতে প্রার্থীর মানবিক গুণাবলি ও ব্যক্তিত্বই মূল নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এমন কর্মীদের খুঁজে যারা কেবল কাজে দক্ষ নয়, বরং মানসিকভাবেও সৃজনশীল এবং আত্মবিশ্বাসী। আপনার সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, ধৈর্য এবং দলের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুণগুলো ইন্টারভিউ বা পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাই নিজেকে কেবল একজন অভিজ্ঞ প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং একজন ইতিবাচক ও আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রস্তুতি নিন।যেসব ওয়েবসাইটে চাকরির
খোঁজ পাবেনআন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নিয়মিত খোঁজখবর রাখা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত এসব প্রতিষ্ঠান তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ কিংবা লিঙ্কডইন প্রোফাইলে সরাসরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে। তাই পছন্দের সংস্থায় যোগ দিতে হলে এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়মিত চোখ রাখা বা নোটিফিকেশন অন করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।এছাড়া বর্তমানে বেশ কিছু বিশ্বস্ত ফেসবুক গ্রুপ এবং লিঙ্কডইন কমিউনিটি রয়েছে, যেখানে নিয়মিত দেশি-বিদেশি বড় বড় এনজিওর চাকরির খবর শেয়ার করা হয়। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যের জন্য নিচের এই নির্ভরযোগ্য উৎসগুলো আপনার জন্য সহায়ক হতে পারে-https://www.facebook.com/groups/VacancyAnnouncementBDhttps://www.facebook.com/groups/1686711091497991https://www.linkedin.com/company/humanitarian-jobs-hub/https://www.linkedin.com/company/we-work-remote-global/https://www.linkedin.com/company/intern-hive/https://www.linkedin.com/company/international-careers-update/https://unjobs.org/duty_stations/bangladeshhttps://www.undp.org/bangladesh/careersreliefweb.inthttps://careers.brac.net/jobshttps://career.icddrb.org/https://www.bracinternational.org/career/
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত