প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬
রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ প্রাণহানি, শীর্ষে বিএনপির ৯৩ জনা
ধ্রুবকন্ঠ ডেক্স ||
২০২৫ সালে সারাদেশে রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল কেন্দ্রিক ৯১৪ টি সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে বিএনপির ৯৩ জন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২৩ জন, জামায়াতের ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের ১ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ১ জন, ইউপিডিএফের ৬ জন এবং চরমপন্থী দলের ১ জন রয়েছেন। এসব ঘটনায় ৭ হাজার ৫১১ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং নিজেদের তথ্যানুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে নানাবিধ সহিংসতার দিক বিবেচনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।বিশেষকে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন এবং শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৯২ টি ঘটনায় মব সহিংসতা ও গনপিটুনীতে ১৬৮ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারাদেশে ৩১৮ টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জনকে হত্যা, ২৭৩ জনকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত, ৮৩ জনকে হুমকি এবং ১৭ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়াও ৩৪ টি মামলায় ১০৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সীমান্তে হতাহত, আটক ও অবৈধভাবে পুশইন এর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৩০ জন নিহত, ২জনকে পিটিয়ে হত্যা, আহত ৩৯ জন এবং ৬৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় নাগরিকদের গুলিতে ও হামলায় অন্তত ৭ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কমপক্ষে ৩৪৯৩ জনকে বাংলাদেশে পুশইন ও ভারতীয় জলসীমার কাছে বঙ্গোপসাগর থেকে ১৪৩ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে ভারতীয় কোস্টগার্ড । প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে ২ জন আহত হয়েছেন। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক আনসার সদস্যসহ ১২ জন বাংলাদেশী আহত হয়েছেন এবং ১ জন নিহত হয়েছেন। সীমান্তের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের জলসীমা থেকে ২১ টি ট্রলারসহ কমপক্ষে ১৭৬ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।২০২৫ সালে কমপক্ষে ২০৪৭ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এর মধ্যে ৪৭৪ জন ১৮ বছরের কম বয়সী/শিশু। এছাড়া ১৭৯ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার এবং ধর্ষনের পর হত্যা ২৮ জনকে করা হয়েছে। এছাড়া এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী । ৪১৪ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২৩৬ জন। এছাড়া যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩৫ জন (আত্মহত্যা-৪) ও আহত ৩২ জন। তাছাড়া পারিবারিক সহিংসতায় ৩৮৩ জন (আত্মহত্যা ১৯৪ জন) নিহত ও আহত ১৩৩ জন। এসিড সহিংসতায় শিকার হয়ে নিহত ২জন এবং আহত ২ জন। অন্যদিকে, শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৩৭১ জন, যাদের মধ্যে ২৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১০৮৩ জন শিশু বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর অধীনে ২৭ টি মামলায় ২৪ জনকে গ্রেফতার এবং ৫৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্বারা সারাদেশে ৪৭ টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে বাধা প্রদান, ১৪৪ ধারা জারি, সংঘর্ষ, সভাসমাবেশ থেকে আটকসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে । এতে ৫১২ জন আহত এবং ৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।বিচার বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশি হেফাজত, নির্যাতন, গুলি, বন্দুকযুদ্ধ, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংষর্ষ ইত্যাদি ৪০ জন নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ৬ জন সংঘর্ষে বা কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে, ১২ জন নির্যাতনে, ১২ জন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে ও অসুস্থ হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কারাগারে বা কারা হেফাজতে কমপক্ষে অসুস্থ, আত্মহত্যা ও নির্যাতনে ৯২ জন আসামী (৩০ জন কয়েদী ও ৬২ জন হাজতি) মারা গিয়েছেন। এছাড়া ২০২৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামীলীগ এবং অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ২৪৪ টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ১১৯৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে ৪২৫২৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মামলায় ও যৌথবাহিনীর অভিযানে ৫০ হাজারের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী । এ ছাড়া, পুলিশ গত এক বছরে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের অন্তত ৪৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ২৮ টি হামলার ঘটনায় ১ জন নিহত, ১৬ জন আহত, ৬ টি মন্দির, ৩৭ টি প্রতিমা ও ৩৮ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং ৫ টি জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সারাদেশে ৫৬ টিরও বেশি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাজারে ও বাউল অনুসারীদের মধ্যে ১জন নিহতসহ অর্ধ-শতাধিক আহত হয়েছে। শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৩৫৯ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, হামলাসহ নানা কারণে ৯৬ জন নিহত ও ১০২১ জন আহত হয়েছে। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৬৮ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ৪ জন গৃহকর্মী মালিকের নির্যাতনে নিহত এবং ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।সার্বিক বিষয়ে এইচআরএসএস নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয় সমাধান না করা হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এমএইছ/ধ্রুবকন্ঠ
কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত