প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬
যেভাবে বেগম খালেদা জিয়া ‘দেশনেত্রী’ হলেনা
ধ্রুবকন্ঠ ডেক্স ||
সময়টা স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়। ১৯৮৭ সালের ৪ নভেম্বর। চট্টগ্রাম লালদিঘী ময়দানে বিএনপির জনসভার দিন। বিকালে লালদিঘির জনসভায় বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য রাখার কথা।এ দিন সকালের প্রথম বিমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার কথা ছিলো বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরীর। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে দেশের মানুষের কাছে একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য নেতায় পরিণত হন বেগম জিয়া।চট্টগ্রামে লালদিঘী ময়দানে বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিত থাকা ঠেকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায় স্বৈরাচারী সরকার। ঢাকা থেকে ফাস্ট ফ্লাইটে বেগম খালেদা জিয়ার চট্টগ্রাম আসা বন্ধ করলেও দলের ভাইস চেয়ারম্যান ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী ঠিকই সেই বিমানে চট্টগ্রাম পৌছে যান।তখন বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানাতে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী বিমান বন্দরের বাহিরে অবস্থান করছিলেন। তারা যখন শুনলেন বেগম জিয়াকে চট্টগ্রাম আসতে দেওয়া হচ্ছে না বা হবে না তখন অনেক নেতাকর্মী বিমান বন্দরের বাহিরে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকে। আর ওই বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম। ওই সময়কার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক কে এম ফেরদৌসের সাথে।১৯৮৭ সালের ৪ নভেম্বর সকালে ফাষ্ট ফ্লাইটে দলের চেয়ারপার্সন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে পারেননি এই খবরে বিক্ষোভের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। সকালের প্রথম বিমানে বিএনপির চেয়ারপার্সন আসতে না পারলেও ভাইস চেয়ারম্যান ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঠিকই চট্টগ্রাম পৌঁছেছেন। সে সময় চট্টগ্রামের অনেক সিনিয়র নেতাদের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি ছিলো। অনেকেই আত্মগোপনে ছিলেন, গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য।তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ আল নোমান অন্যতম। বিমানবন্দরে ভাইস চেয়ারম্যান ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে অভ্যর্থনা জানাতে তখন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক কে এম ফেরদৌস, উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আকবর খন্দকার , বোয়ালখলী থেকে নির্বাচিক সাবেক এমপি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রাম বিমান বন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে অপেক্ষমান ছিলেন ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তখনও বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রাম এসে পৌঁছতে পারবেন কিনা নিশ্চিত নয়। তবে তিনি ঢাকা বিমানবন্দরে অপেক্ষায় রয়েছেন। তখন মোবাইলের যুগ ছিলো না। বিমানবন্দরের একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে ঢাকার খবর নেওয়া হচ্ছে। স্বল্প সংখ্যক নেতার আলাপচারিতায় দেশে চলমান রাজনীতি নিয়ে কথার এক ফাঁকে ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী চট্টগ্রামে নেতাদের উদ্দেশ্যে একটা প্রস্তাব রাখেন তা হচ্ছে; ‘যেহেতু চট্টগ্রাম বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনসহ অনেক আন্দোলন সংগ্রামের সুতিগার, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া এই চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন, এর আগে ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের লালদিঘির মাঠ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাই বেগম খালেদা জিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে একটা কিছু উপহার দেওয়া হোক।’ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরীর এমন কথায় চট্টগ্রামের নেতারা আলোচনা করছিলেন কি করা যায়। তখন ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রস্তাব রাখেন, স্বৈারাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের যে আপোষহীন ভুমিকা তা স্মরণীয় করে রাখতে আজ লালদীঘির মাঠে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধি দেওয়ার কথা। এই উপাধি দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এই লালদীঘির মাঠে পনের দলীয় জোটের সমাবেশে ১৯৮৬ সালে জোটের নেত্রী ও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন স্বৈারাচার এরশাদ অধীনে যারাই তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে তারা জাতীয় বেইমান হিসাবে চিহ্নিত হবে। লালদীঘির মাঠে বিকালে এই ঘোষণা দিয়ে ঢাকায় ফিরে রাতেই তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদ জানান বেগম খালেদা জিয়া। ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরীর অসাধারণ এই প্রস্তাবের পর বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের আশপাশে কোথাও কোন কাগজ না পেয়ে একটি সিাগারেটের প্যাকেটেই এম ফেরদৌস প্রথমে দেশনেত্রী খেতাবের একটি খসরা অভিনন্দন পত্র তৈরি করেন। পরে বদরুদ্দোজা চৌধুরী তা দেখে ছোট দুই একটি সংশোধন করে দেন। তখন উপস্থিত চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি নুরুল আমিনকে দিয়ে নগরীর হাজারীগলির ফটোবান্টিং এর দোকানে পাঠিয়ে অভিনন্দন পত্রটি লিখিয়ে তৈরি করার জন্য দেন। উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আকবর খন্দকার আনুসঙ্গিক খরচপত্র দিয়ে নুরুল আমিনকে পাঠিয়ে দেন। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম চট্টগ্রামে জনসমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। নির্বাচনের পর থেকে বেগম খালেদা জিয়া আপোষহীন আন্দোলনে দিশেহারা হয়ে পড়ে স্বৈরশাসক এরশাদ। সকালের ফাস্ট ফ্লাইটে বেগম জিয়া চট্টগ্রামে আসা ঠেকাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত বিমানেই তিনি চট্টগ্রাম পৌছেন দুপুরের দিকে। বিকালের আগেই দুপুর থেকেই লালদিঘির ময়দান লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। এসময় মাঠে এসে উপস্থিত হন এরশাদ সরকারের হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে থাকা সেই সময়ের চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নোমান। সমাবেশে তার উপস্থিতি নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে তোলে। সমাবেশে বেগম খালেদা জিয়া ছাড়াও ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। লালদিঘির বিশাল সমাবেশে উপস্থিত লাখো জনতার সামনে সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নোমান বেগম জিয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করার ঐতিহাসিক মানপত্রটি যখন পাঠ করেন। তখন সমাবেশে উপস্থিত লাখো জানতার মূহমূহ করতালী শ্লোগানের মধ্যেই দেশনেত্রী’ অভিনন্দন পত্রটি বিএনপি চেয়ারপার্সনের হাতে তুলেদেন। সেই থেকে বেগম খালেদা জিয়া ‘দেশনেত্রী’ হিসাবে দেশ বিদেশের গণমাধ্যমেও প্রচারিত হতো। বীর প্রসবিনী চট্টগ্রামের জনগনের পক্ষ থেকে দেওয়া ‘দেশনেত্রী’ উপাধির সম্মান তিনি আমৃত্যু মর্যাদার সাথে রক্ষা করেছেন।এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত