প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫
‘সংকটের মুহূর্তে দায়িত্বশীলতার পরিচয়ই আমাদের পথপ্রদর্শক’া
ধ্রুবকন্ঠ ডেক্স ||
বেগম খালেদা জিয়া আজ ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যায়। একজন সাবেক
প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের প্রতীক এবং কোটি মানুষের হৃদয়ের মানুষ হিসেবে তাঁর শারীরিক
অবস্থার প্রতি আমাদের স্বাভাবিক উদ্বেগ যেমন আছে, তেমনই আছে শ্রদ্ধা, প্রার্থনা ও আশা।
দুঃখজনক হলেও সত্য—এই মানবিক পরিস্থিতিকেও কেউ কেউ রাজনীতির হাতিয়ার বানাতে দ্বিধা
করছেন না। মুমূর্ষু ব্যক্তির শয্যাকে রাজনৈতিক বিষোদগারে রূপান্তরিত করার প্রবণতা
কোনো সভ্য রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। আমরা অতীতে লাশ নিয়ে রাজনীতি
দেখেছি, তা ছিল দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটি
পরিশীলিত ও ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণের যে প্রত্যাশা, তার সাথে এই
নেতিবাচকতা সাংঘর্ষিক। অবশ্য যেসব দল ও নেতা আন্তরিকভাবে স্মৃতিচারণা করেছেন,
গণসমাবেশে হাত তুলে দোয়া করেছেন—আমরা তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।সম্প্রতি
কিছু রাজনৈতিক মহল বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব
তারেক রহমানকে দেশে ফেরার নসিহত করছেন—এমন ভাষায়, এমন ভঙ্গিতে, যা নসিহতের চেয়ে
চরিত্র হননের অস্ত্র হয়ে উঠছে।বলা হচ্ছে, তিনি নাকি লন্ডনের আরাম ছেড়ে অসুস্থ মায়ের শয্যাপাশে আসছেন না। আমাদের
লোককথায় আছে—‘মার চেয়ে যার দরদ বেশি, তাকে বলে ডাইনি’—এমন কথার তীর ছুড়ে দেওয়া শুধু
অনভিপ্রেত নয়, মানবিকতারও পরিপন্থী। একজন সন্তানের হৃদয়ে মায়ের জন্য যে বেদনা উপচে
ওঠে— তা কি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে? জনাব তারেক রহমান নিজেই তাঁর আকুলতা, অসহায়তা ও
মায়ের প্রতি সীমাহীন মমতার কথা প্রকাশ করেছেন। যে অশ্রু জনসমক্ষে ঝরে পড়েছে, তা কোনো
রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা নয়— এ এক সন্তানের মানবিক মুখ। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে—
জনাব তারেক রহমান কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধিকার ও
সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত আবেগের বাইরে
জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর দেশে
ফেরা নিয়ে নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক নয়, বরং বাস্তব।দেশের ভেতরে-বাইরে নানা কুটিল স্বার্থ ও ষড়যন্ত্র যে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করতে
পারে— এই আশঙ্কা আমরা অবহেলা করতে পারি না। একজন দায়িত্বশীল নেতার প্রথম কাজ হলো দীর্ঘমেয়াদি
লক্ষ্য রক্ষা করা—তা যতই ব্যক্তিগতভাবে কষ্টকর হোক। বেগম
খালেদা জিয়াও আজীবন বলেছেন, ‘কারো প্রভুত্ব বাংলাদেশের মানুষ স্বীকার করবে না।’
সেই অবস্থান থেকেই তো বোঝা যায়—তিনি সন্তানের এমন কোনো পদক্ষেপ চাননি বা চান না,
যাতে দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তগ্রহণের ওপর বাহ্যিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ সৃষ্টি
হয়।কেউ
কেউ প্রশ্ন তুলছেন—যিনি নাকি মায়ের পাশে দাঁড়ালেন না, তিনি সংকটে দেশের পাশে
কিভাবে দাঁড়াবেন? এই প্রশ্ন যেমন অবিচারপূর্ণ, তেমনই ইতিহাস-বিমুখ। জিয়া পরিবার
বারবারই নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে দেশের কল্যাণকে বড় করে দেখেছে। বেগম
খালেদা জিয়া দেশ ছাড়েননি; প্রতিকূলতা, মিথ্যাচার আর নিপীড়নের মুখেও তিনি
বাংলাদেশের মাটিতে অবিচল থেকেছেন। জনাব তারেক রহমান কঠিন সময়েও দলের নেতৃত্বকে দৃঢ়
ও সংগঠিত রেখেছেন, নতুন প্রজন্মকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক
পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দাবিকে ধারাবাহিকভাবে উচ্চকিত করেছেন। নেতৃত্ব
মানে যে আবেগকে শাসন করতে জানা—তিনি তার বাস্তব উদাহরণ।আমরা
লক্ষ করছি—কিছু মহল, বিশেষ করে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে
কেউ কেউ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে।
রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতেই পারে; কিন্তু অসুস্থ মানুষের শয্যাকে কেন্দ্র করে আক্রমণ,
বিদ্বেষ ও বিদ্রুপ—এগুলো কোনো সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। আমরা
বিরোধীদের প্রতিপক্ষ, শত্রু নই। তাই আবেদন জানাই—চরিত্রহননের এই নোংরা প্রতিযোগিতা
থামান। ভিন্নমত প্রকাশ করুন যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, ভদ্রতা দিয়ে।এমন
পরিস্থিতিতে একজন দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদের করণীয় কী? প্রথমত, বেগম খালেদা জিয়ার
চিকিৎসার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা—দেশে এবং প্রয়োজনে বিদেশে। এটিই বিএনপির
অগ্রাধিকার এবং জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল সে ব্যবস্থাই করছে। পুরো বিষয়টি
তত্ত্বাবধান করছেন জনাব তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, যিনি নিজেও একজন
স্বনামধন্য চিকিৎসক। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরামর্শ, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং পরিবারের
সম্মিলিত সিদ্ধান্ত—এই তিন স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আমরা এগোচ্ছি।একজন
সুযোগ্য রাজনৈতিক নেতার আরেকটি করণীয় হলো সংগঠনকে শৃঙ্খলায় রাখা— উসকানি,
বিভ্রান্তি ও আবেগতাড়িত পদক্ষেপ থেকে দূরে রেখে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও
দূরদর্শিতার চর্চা করা। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে জনাব তারেক রহমান সেই কাজটিই
করছেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিজীবনের এ চরম ক্রান্তিকালে ঠিক সেই মূল্যবোধেরই চর্চা
করছেন, যা তাঁর দল চিরকাল প্রচার করেছে, “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।”আজ
রিকশাচালক রাস্তার ধারে বসে হাত তুলে দোয়া করছেন, সাধারণ গৃহিণী চোখের জলে কোরআন
খতম করে দোয়ায় মগ্ন; শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেশাজীবী—দল-মত-নির্বিশেষে মানুষ
প্রার্থনা করছেন বেগম খালেদা জিয়ার আরোগ্যের জন্য। তিনি আজ কেবল একটি দলের নেত্রী
নন—তিনি আজ গোটা দেশের নেত্রী। তাঁর জন্য দলমত নির্বিশেষে মানুষের এই কায়মন
প্রার্থনা জাতির আবেগ, সম্মান ও স্মৃতির বহিঃপ্রকাশ। এই ভালোবাসাই প্রমাণ করে—তিনি
কত বড় নেতা, তিনি গণমানুষের কতটা প্রিয়।আমরা
সবাই চাই— গণতন্ত্রের মা, বেগম খালেদা জিয়া দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন। তাই আহ্বান
জানাই—এই ক্রান্তিলগ্নে কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হোক। আসুন, আমরা মানবিকতা দিয়ে
রাজনীতিকে শুদ্ধ করি। আমাদের মতভেদ থাক—কিন্তু অসুস্থতা নিয়ে বিদ্রুপ না করি, কারও
সন্তানের হৃদয়ের শোককে রাজনৈতিক মঞ্চে টেনে না আনি। দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্রের
ধারাবাহিকতা ও মানুষের মর্যাদা—এই তিনটি মূল্যবোধকে সামনে রেখে এগোলে আমরা সবাই
লাভবান হবো।শেষকথা—জনাব
তারেক রহমান আজ যে আত্মসংযম, দূরদৃষ্টি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিচ্ছেন, তা রাজনৈতিক
প্রজ্ঞারই বহিঃপ্রকাশ। ব্যক্তিগত বেদনার চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখা সহজ নয়,
তবু নেতার প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই। আমাদের বিশ্বাস, বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার
জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, সংগঠনকে সুসংহত রাখা এবং দেশকে বৃহত্তর
ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখা—এই ত্রিবিধ দায়িত্ব তিনি পালন করে চলেছেন। বাকিটা
সৃষ্টিকর্তার হাতে—আসুন, আমরা সবাই তাঁর কাছে প্রার্থনা করি: গণতন্ত্রের মা বেগম
খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য হোক, দেশ সুস্থ হোক, রাজনীতি হোক শিষ্টাচার ও প্রজ্ঞায়
পরিপূর্ণ।
এনএম/ধ্রুবকন্ঠ
কপিরাইট © ২০২৫ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত